কলাপাড়ায় নদীগ্রাসে উপকূলের বেড়িবাঁধ, ক্ষত-বিক্ষত একাধিক এলাকা

ছগির হোসেন, কলাপাড়া (পটুয়াখালী)

সারাদেশ

সাগরকন্যা পটুয়াখালীর উপকূলীয় কলাপাড়া উপজেলার প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নের কোল ঘেঁষে বয়ে গেছে নদী ও সাগর। প্রায় এক যুগেরও বেশি সময়

2026-10-14T15:02:31+00:00
2026-10-14T15:04:34+00:00
 
  বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬,
২৯ আশ্বিন ১৪৩৩
বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬
সারাদেশ
কলাপাড়ায় নদীগ্রাসে উপকূলের বেড়িবাঁধ, ক্ষত-বিক্ষত একাধিক এলাকা
ছগির হোসেন, কলাপাড়া (পটুয়াখালী)
প্রকাশ: বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:০২ পিএম  আপডেট: ১৪.১০.২০২৬ ৩:০৪ পিএম
নদীগ্রাসে উপকূলের বেড়িবাঁধ। ছবি : সময়ের আলো
সাগরকন্যা পটুয়াখালীর উপকূলীয় কলাপাড়া উপজেলার প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নের কোল ঘেঁষে বয়ে গেছে নদী ও সাগর। প্রায় এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ভাঙনের মুখে পড়েছে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের বেড়িবাঁধ। অনেক এলাকার বাঁধ ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে সমতল ভূমিতে পরিণত হয়েছে। বর্ষা মৌসুমে ভাঙা অংশ দিয়ে অমাবস্যা ও পূর্ণিমার জোয়ারের পানি ঢুকে গৃহবন্দী হয়ে পড়েন স্থানীয় বাসিন্দারা। ফলে নারী, শিশু, শিক্ষার্থী, প্রবীণ ব্যক্তি ও গৃহপালিত পশু নিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে উপকূলবাসীকে। প্রয়োজনীয় বরাদ্দের অভাবে প্রতি বছর পানি উন্নয়ন বোর্ড কেবল নামমাত্র সংস্কারকাজ চালালেও স্থানীয় ভুক্তভোগীদের দাবি টেকসই ও স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণের।

বর্তমানে সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা উপজেলার চম্পাপুর ইউনিয়নের দেবপুর এলাকার বেড়িবাঁধের। ভাঙনের কবলে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে বাঁধটি এখন জোয়ার-ভাটার পানির সমাতলে গিয়ে ঠেকেছে।


সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উপকূলের মানুষ প্রতিনিয়ত নদীর জোয়ার-ভাটা আর উত্তাল ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে আছেন। নদী শাসনের টেকসই ব্যবস্থা না থাকায় সেই ভাঙনেই এখন হুমকির মুখে পড়েছে মানুষের ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও বেড়িবাঁধ। কোথাও বাঁধের ঢালে ধস, কোথাও জিওব্যাগ নদীতে বিলীন, আবার কোথাও স্লুইসগেটের পাশে তৈরি হয়েছে ভয়াবহ ভাঙন। ফলে যেকোনো মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ কোনো বাঁধ ভেঙে সম্পূর্ণ প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে এলাকাগুলো, যাতে পানিবন্দী হয়ে পড়তে পারেন কয়েক হাজার পরিবার।


উল্লেখ্য, কলাপাড়া উপজেলার ১২টি ইউনিয়ন ও ২টি পৌরসভার অভ্যন্তরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে সাগরসহ আন্ধারমানিক, রাবনাবাদ, টিয়াখালী, সোনাতলা, খাপড়াভাঙ্গা ও চাকামইয়া নদী। অতীতে নদী উপচে পানি ঢুকে ফসলি জমিসহ ঘরবাড়ি তলিয়ে যেত। ফলে জমিতে ফসল হতো না এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে সংগ্রাম করেই মানুষ বেঁচে থাকত। প্রায়শই বন্যায় প্লাবিত হয়ে অসংখ্য মানুষের প্রাণহানির পাশাপাশি গবাদিপশু ও বন্যপ্রাণী ভেসে যেত। তৎকালীন সময়ে আধুনিক প্রযুক্তি কিংবা উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় উপকূলীয় জনপদ ও ফসলি জমি রক্ষায় ১৯৬৫ সালে ৩৩০.৪৬ কিলোমিটার ওয়াপদা বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়। একদিকে নদীগুলো জেলেদের জীবিকার উৎস, অন্যদিকে বর্ষা মৌসুমে পূর্ণিমা ও অমাবস্যার জোয়ারে তা কাল হয়ে দাঁড়ায়। প্রকৃতির এই প্রতিকূল রূপ মোকাবিলায় স্থায়ী সমাধান না পাওয়ায় চরম ঝুঁকি নিয়েই বসবাস করছেন স্থানীয়রা।


উপজেলার চাকামইয়ার কাঠালপাড়া, টিয়াখালী, লালুয়ার মহল্লাপাড়া, চারিপাড়া, দশকানি; মিঠাগঞ্জের বাংলাবাজার-আলীগঞ্জ-তেগাছিয়া; নীলগঞ্জের পূর্ব গৈয়াতলা-খ্রিস্টানপল্লী-জালালপুর; মহিপুরের নিজামপুর; লতাচাপলীর নাইওরীপাড়া; কুয়াকাটার খাজুরা; ধানখালীর হাফিজ প্যাদারহাট, নিশানবাড়িয়া, করমজাতলা; ধুলাসারের চর ধুলাসার; বালিয়াতলীর দিঘর বারিয়াতলী; ডালবুগঞ্জের পেয়ারপুর, রমজানপুর এবং চম্পাপুর ইউনিয়নের দেবপুর এলাকা ঘুরে দেখা যায়—গত ১০-১৫ বছরে এখানকার অন্তত ৬০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। ইতোমধ্যে খাজুরা, নিজামপুর, চারিপাড়া, চর ধুলাসার, জালালপুর, খ্রিস্টানপল্লী, দেবপুর ও পেয়ারপুর পয়েন্টের প্রায় ৭ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নদীর তীরসহ বিলীন হয়ে গেছে।

এ অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ বেড়িবাঁধ সংলগ্ন এলাকায় বসবাস করেন। উপকূলের সম্পূর্ণ কৃষি জমি রক্ষায় এই বাঁধের ভূমিকা অপরিসীম। তবে বাঁধের অধিকাংশ স্থানে ধস নেমেছে, তৈরি হয়েছে বড় বড় গর্ত, আর নদীর তীর চলে এসেছে বাঁধের একদম কাছাকাছি। কোনো কোনো ভাঙন তীব্র হয়ে কৃষি জমির সঙ্গে মিশে গেছে। কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে আগামী বর্ষা বা ঘূর্ণিঝড়ে বিশাল এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয়রা। নদী যেমন উপকূলবাসীর জীবিকার প্রধান মাধ্যম, তেমনই এখন তা আতঙ্কের সবচেয়ে বড় কারণ।


বেড়িবাঁধ ভেঙে নোনা পানি প্রবেশের কারণে অনেক কৃষক জমি চাষ করতে পারছেন না। ফলে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয়ে কৃষকদের আয়-রোজগার বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

দেবপুর গ্রামের পল্লী চিকিৎসক মো. শাহ আলম আক্ষেপ করে বলেন, আমার দুটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছিল, নদীর ভাঙনে মুহূর্তের মধ্যে শেষ হয়ে গেছে। রক্ষা করার সুযোগও পাইনি। এখন আমি নিঃস্ব, কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সহায়তা পাইনি।


একই গ্রামের কৃষক মো. আবদুর রহমান হাওলাদার বলেন, মাস যায়, বছর যায়—জোয়ারের পানি আসে আবার ভাটায় নেমে যায়। ঘরের মধ্যে কোমর সমান পানি উঠে রান্না পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যায়। বাচ্চারা স্কুলে যেতে পারে না। এখন অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে আছি, এই দুর্ভোগ কবে শেষ হবে জানি না।


গৃহিণী মোসা. মিনারা বেগম বলেন, রাবনাবাদ নদী আমাদের সব জমি গিলে খেয়েছে। শুধু ভিটেটুকু আছে, সেখানেও জোয়ারের পানি ওঠে। কলেজ শিক্ষার্থী মো. রাব্বি মোল্লা জানান, সংকেত দিলেই পুরো এলাকা পানিতে তলিয়ে যায় এবং প্রায় ৫০টির মতো ঘরবাড়ি ডুবে গিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়ে। তাই দ্রুত এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি চান তারা।

তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, জরুরি প্রকল্পের আওতায়, লটারি ও উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে উপজেলার ধানখালীর নিশানবাড়িয়া, লালুয়ার মহল্লাপাড়া, ধুলাসার, চম্পাপুরের দেবপুর ও নীলগঞ্জের জালালপুরে সাম্প্রতিক সময়ে মোট ১৯ দশমিক ৩৫ কিলোমিটার বিকল্প বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া এর আগে ডালবুগঞ্জে ১৭ দশমিক ৫০ কিলোমিটার এবং কুয়াকাটা-লেম্বুরবনে ৪ কিলোমিটার ও নাইওরীপাড়ায় ২ কিলোমিটারসহ মোট ২৩ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মিত হয়েছে।


কলাপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আরাফাত হোসেন জানান, উপজেলায় ৩১ হাজার হেক্টর আবাদি জমি রয়েছে, যার পুরোটাতেই এখন আমন চাষের মৌসুম। কিন্তু দুঃখজনকভাবে ওয়াপদা বেড়িবাঁধের বিভিন্ন পয়েন্টে ভাঙন তৈরি হওয়ায় জোয়ারের নোনা পানি খেতে ওঠানামা করছে। এতে আমন ধানের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। কৃষকদের স্বার্থে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে অনুরোধ, দ্রুত টেকসই ও স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হোক।

বিষয়টি নিয়ে কলাপাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের (কলাপাড়া, রাঙ্গাবালী ও গলাচিপা আংশিক জোন) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহ আলম বলেন, উপজেলায় মোট ৩৩০ দশমিক ৪৬ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ রয়েছে, যার একটি অংশ নদীভাঙনের কারণে প্রতি বছর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত স্থানগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে মেরামত করা হয়েছে। আরও যেসব এলাকা ঝুঁকিপূর্ণ, সেগুলোর জন্য বাজেট প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পেলেই মেইনটেনেন্স কাজ শুরু হবে। ধানখালীর দেবপুরের প্রায় ১ দশমিক ৩ কিলোমিটার ব্যাতীত আর কোনো স্থান দিয়ে জোয়ারের পানি ওঠানামা করার মতো বড় ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ আপাতত নেই। এসব স্থানেও দ্রুত কাজ শুরু করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

সময়ের আলো/জোই
  বিষয়:   পটুয়াখালী  কলাপাড়া  নদী  গ্রাস  উপকূল  বেড়িবাঁধ  ক্ষত-বিক্ষত  এলাকা  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: