খাদ্যের গুরুত্ব কেবল বেঁচে থাকার রসদ জোগানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সমাজবিজ্ঞানী ও দার্শনিকদের দৃষ্টিতে খাদ্য সংস্কৃতি, রাজনীতি, ক্ষমতা ও মানবিক অস্তিত্বের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। জার্মান বস্তুবাদী দার্শনিক লুডভিগ ফয়ারবাখ বলেছিলেন, ‘মানুষ যা খায়, সে তা-ই।’
তার মতে, মানুষের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার সঙ্গে খাদ্যাভ্যাসের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। ফরাসি অস্তিত্ববাদী দার্শনিক জ্যঁ-পল সার্ত্রও খাদ্যকে ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের সঙ্গে যুক্ত করে দেখেছেন। অর্থাৎ খাদ্য কেবল ক্ষুধা নিবারণের উপায় নয়; এটি মানুষের জীবনযাপন ও অস্তিত্বের সঙ্গেও সম্পর্কিত। বাংলাদেশে যেখানে ৩৮ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ স্বাস্থ্যকর ও পুষ্টিকর খাবার কেনার সামর্থ্য রাখেন না, সেখানে সবার জন্য সুষম খাদ্য নিশ্চিত করা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশ্ব খাদ্য দিবসের তাৎপর্য
প্রতি বছর ১৬ অক্টোবর বিশ্ব খাদ্য দিবস পালিত হয়। ১৯৭৯ সালের নভেম্বরে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার ২০তম সম্মেলনে দিবসটি পালনের প্রস্তাব গৃহীত হয়। ১৯৮১ সাল থেকে নিয়মিতভাবে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। ক্ষুধা ও অপুষ্টি দূর করা, সবার জন্য নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করা এবং টেকসই কৃষিব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করাই এ দিবসের অন্যতম উদ্দেশ্য। এবারের বিশ্ব খাদ্য দিবসের প্রতিপাদ্য ‘আজকের উদ্ভাবন, আগামীতে পুষ্টি’।
বিশ্বে খাদ্য ও পুষ্টির চিত্র
বিশ্বে প্রায় ৮২০ কোটি মানুষের বসবাস। বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য উৎপাদিত হলেও বণ্টনের বৈষম্য, দারিদ্র্য ও সংঘাতের কারণে সবাই সমানভাবে পুষ্টিকর খাবার পায় না। বিশ্বে প্রায় ৬৪ কোটি ৫০ লাখ থেকে ৬৭ কোটি ৩০ লাখ মানুষ দীর্ঘস্থায়ী ক্ষুধার শিকার। অন্যদিকে প্রায় ২১০ কোটি থেকে ২৩৩ কোটি মানুষ মাঝারি বা তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। অর্থাৎ তাদের নিয়মিত পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাবার পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। উদ্বেগের বিষয় হলো, একদিকে কোটি কোটি মানুষ ক্ষুধার্ত থাকছে, অন্যদিকে বিপুল পরিমাণ খাবার অপচয় হচ্ছে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার সংজ্ঞা অনুযায়ী, খাদ্যনিরাপত্তা বলতে এমন পরিস্থিতিকে বোঝায়, যেখানে প্রত্যেক মানুষের সবসময় পর্যাপ্ত, নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবার পাওয়ার সুযোগ থাকে। শুধু খাদ্য উৎপাদন করলেই এ নিশ্চয়তা তৈরি হয় না। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা, খাদ্যের গুণগত মান এবং সারা বছর খাবার পাওয়ার সুযোগও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের মানুষের খাদ্যাভ্যাস প্রধানত শর্করানির্ভর। দৈনিক ক্যালরির বড় অংশ আসে চাল বা ভাত থেকে। খাদ্যতালিকায় মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, ডাল, ফলমূল ও শাকসবজির পর্যাপ্ত উপস্থিতি অনেক পরিবারের ক্ষেত্রে নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। ফলে অপুষ্টির পাশাপাশি ভিটামিন ও খনিজের ঘাটতিও দেখা দেয়। একই সঙ্গে শহরাঞ্চলে অতিরিক্ত ওজন, স্থূলতা, ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের মতো অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়ছে।
অর্থাৎ দেশে অপুষ্টি ও অতিপুষ্টি— দুই ধরনের সমস্যাই বিদ্যমান। বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন প্রতিবেদনে স্বাস্থ্যকর খাদ্যের ব্যয় বহনের অক্ষমতাকে খাদ্যনিরাপত্তার অন্যতম বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাংলাদেশের প্রায় ৩৮ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ স্বাস্থ্যকর ও পুষ্টিকর খাবার কেনার সামর্থ্য রাখেন না বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য খাদ্যের দাম বেড়ে গেলে পুষ্টিকর খাবার কেনা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
অনেক পরিবার তখন তুলনামূলক সস্তা, কিন্তু পুষ্টিমান কম— এমন খাবারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় খাদ্যের উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোও জরুরি।
নিরাপদ খাদ্য ও পুষ্টির সংকট
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের পরীক্ষাগারে ২০২৩ অর্থবছরে পরীক্ষিত খাদ্যনমুনার ৮ দশমিক ৫ শতাংশে দূষণ পাওয়া গিয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৫ অর্থবছরে এ হার বেড়ে ৩৩ দশমিক ৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট তথ্যে দাবি করা হয়েছে। এই পরিসংখ্যান সঠিক হলে তা উদ্বেগজনক। তবে পরীক্ষিত নমুনার সংখ্যা, নমুনা নির্বাচনের পদ্ধতি এবং দূষণের ধরন বিবেচনায় নিয়ে এসব তথ্য বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। কারণ পরীক্ষাগারে পাওয়া দূষণের হার এবং দেশের সব খাদ্যপণ্যে দূষণের প্রকৃত হার এক নয়।
বাংলাদেশে শিশু ও নারীদের মধ্যে পুষ্টির ঘাটতি একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। সুষম খাদ্যের অভাবে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ভিটামিন এ, আয়োডিন ও আয়রনের ঘাটতি থেকে নানা ধরনের স্বাস্থ্যসমস্যা দেখা দেয়। বিশেষ করে আয়রনের অভাবে রক্তস্বল্পতা শিশু ও নারীদের কর্মক্ষমতা এবং সামগ্রিক সুস্থতাকে প্রভাবিত করে। অন্যদিকে অতিরিক্ত ক্যালরিযুক্ত খাবার ও অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের কারণে স্থূলতা এবং ডায়াবেটিসের মতো রোগের ঝুঁকিও বাড়ছে। তাই খাদ্যনীতিতে শুধু ক্ষুধা দূর করার বিষয়টি নয়, পুষ্টিমান ও নিরাপত্তাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে করণীয়
খাদ্যের পর্যাপ্ততা, প্রাপ্যতা, পুষ্টিমান ও নিরাপত্তা— এই চারটি বিষয় পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। দারিদ্র্য, সংঘাত ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বের বহু মানুষ খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। বাংলাদেশেও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য পুষ্টিকর খাবার কেনা কঠিন হয়ে পড়ছে। তাই খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি খাদ্যের ন্যায্য বণ্টন, ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নিরাপদ খাদ্য সরবরাহের ওপর জোর দিতে হবে।
খাদ্য অপচয় কমানোও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। ফসল তোলার পর সংরক্ষণ ও পরিবহনে উন্নত ব্যবস্থা গড়ে তোলা, বাজারে পচনশীল পণ্যের অপচয় কমানো এবং উদ্বৃত্ত খাবার প্রয়োজনীয় মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে পরিবার ও ব্যক্তি পর্যায়ে প্রয়োজন অনুযায়ী খাবার কেনা, সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা এবং খাবার নষ্ট না করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। এতে খাদ্যের অপচয় কমার পাশাপাশি অর্থ ও প্রাকৃতিক সম্পদেরও সাশ্রয় হবে। বাংলাদেশে নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩-এর আওতায় ২০১৫ সালে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ গঠিত হয়। খাদ্য উৎপাদন, আমদানি, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণের বিভিন্ন পর্যায়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, খাদ্যের মান নির্ধারণ এবং আইন প্রয়োগে এ সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তবে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষের সক্ষমতা আরও বাড়ানো জরুরি।
প্রথমত খাদ্য পরীক্ষার জন্য পর্যাপ্ত ও আধুনিক পরীক্ষাগার, উন্নত প্রযুক্তি এবং দক্ষ জনবল নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত খাদ্য উৎপাদন, আমদানি, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে।
তৃতীয়ত বাজার পরিদর্শন, নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার পরিধি বাড়াতে হবে, যাতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্রি হওয়া খাদ্যের মান নিয়মিত যাচাই করা যায়। চতুর্থত কৃষক, উৎপাদক, ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের নিরাপদ খাদ্য সম্পর্কে বিজ্ঞানভিত্তিক ধারণা দিতে হবে। পঞ্চমত খাদ্যে ভেজাল ও ক্ষতিকর রাসায়নিক মেশানোর বিরুদ্ধে আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিয়মিত নজরদারিও জোরদার করতে হবে।
নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য মানুষের মৌলিক চাহিদা এবং সুস্থ জীবনের অন্যতম পূর্বশর্ত। খাদ্যের পর্যাপ্ত উৎপাদন যেমন জরুরি, তেমনি সবার জন্য তা সাশ্রয়ী করা এবং খাদ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করাও অপরিহার্য। বিশ্ব খাদ্য দিবসের অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সরকার, উৎপাদক, ব্যবসায়ী ও ভোক্তা— সব পক্ষকেই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। খাদ্যে ভেজাল রোধ, পুষ্টিকর খাবারের সহজলভ্যতা বৃদ্ধি এবং অপচয় কমানোর কার্যকর উদ্যোগই পারে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সুস্থ ও নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করতে।
লেখক : অতিরিক্ত সচিব (অব.)
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে