মিয়ানমারে গৃহযুদ্ধ, বেসামরিক মানুষের ওপর বিমান হামলা ও ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি অব্যাহত। এর মধ্যেই দেশটির সামরিক অভ্যুত্থানের নেতা ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে হাঁটছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো। থাইল্যান্ড থেকে মালয়েশিয়া—আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর নেতারা তাকে স্বাগত জানাচ্ছেন। সমালোচকদের আশঙ্কা, এই কূটনৈতিক তৎপরতা মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীকে আন্তর্জাতিক বৈধতা পাওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে, অথচ দেশটির সংকট নিরসনে কার্যকর অগ্রগতি নেই।
গত সপ্তাহে মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুর সফরে গেলে মিন অং হ্লাইংকে লালগালিচা সংবর্ধনা ও গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। অথচ সেপ্টেম্বরে তার সফরের আমন্ত্রণ জানানোর সময় মালয়েশিয়া বলেছিল, এর অর্থ মিয়ানমারের সরকারকে স্বীকৃতি দেওয়া নয়। দেশটিতে বসবাসরত মিয়ানমারের শরণার্থী ও অভিবাসীদের দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধানই সফরের উদ্দেশ্য বলে জানিয়েছিলেন মালয়েশিয়ার এক কর্মকর্তা।
বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিক মধ্যাহ্নভোজের পর মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম জানান, মিয়ানমার নিজ খরচে তাদের নাগরিকদের দেশে ফিরিয়ে নিতে প্রস্তুত। শরণার্থীদের নিয়ে মালয়েশিয়ায় বিরূপ মনোভাব বাড়তে থাকায় এ ঘোষণা দেশটির সরকারের জন্য রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মালয়েশিয়ায় প্রায় ১ লাখ ৯৩ হাজার মিয়ানমারের নাগরিক রয়েছেন, যাদের অধিকাংশই নিপীড়নের শিকার রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীর সদস্য।
মিন অং হ্লাইং বলেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় নাগরিকদের ফিরিয়ে নিতে নৌবাহিনীর জাহাজ পাঠাবেন তিনি।
একই সঙ্গে মিয়ানমারকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক জোট আসিয়ানে পুনরায় সম্পৃক্ত করতে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন আনোয়ার। ১১ সদস্যের এই জোট শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হওয়ায় মিন অং হ্লাইংকে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেওয়া থেকে বিরত রেখেছিল। ‘ফাইভ-পয়েন্ট কনসেনসাস’ নামে পরিচিত ওই পরিকল্পনায় সহিংসতা বন্ধ এবং সংঘাতরত পক্ষগুলোর মধ্যে গঠনমূলক সংলাপের আহ্বান জানানো হয়েছিল। পরিকল্পনাটির পক্ষে আগে সোচ্চার ছিল মালয়েশিয়াও।
আনোয়ার বলেন, মিয়ানমারকে শেষ পর্যন্ত আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর পরিবারের অংশ হিসেবে ফিরিয়ে আনতে মালয়েশিয়া সম্ভাব্য সবকিছু করবে।
২০২১ সালে মিন অং হ্লাইংয়ের নেতৃত্বে সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোর হিসাব অনুযায়ী, পাঁচ বছর ধরে চলা এই সংঘাতে নিহতের সংখ্যা এক লাখ পর্যন্ত হতে পারে। বাস্তুচ্যুত হয়েছেন অন্তত ৩৫ লাখ মানুষ।
এপ্রিল মাসে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকে মিন অং হ্লাইংকে আতিথ্য দেওয়া পঞ্চম আসিয়ানভুক্ত দেশ মালয়েশিয়া। এর আগে তিনি থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও লাওস সফর করেছেন। ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দলগুলো অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়নি। মালয়েশিয়া সফর শেষে তার মুখপাত্র জানিয়েছেন, পরবর্তী সময়ে ইন্দোনেশিয়া ও ব্রুনেই সফর করতে পারেন তিনি।
মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে অবস্থিত নটিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এশিয়া রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সম্মানসূচক গবেষক ব্রিজেট ওয়েলশের মতে, মিন অং হ্লাইংকে স্বাগত জানিয়ে মালয়েশিয়া জান্তার বিরোধিতার ক্ষেত্রে আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে এত দিন যে বাধা ছিল, তা ভেঙে দিয়েছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তাঁকে গ্রহণ করে আঞ্চলিক নেতারা মানবাধিকারের চেয়ে বাস্তব রাজনৈতিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন বলে মনে করেন তিনি।
ওয়েলশ বলেন, এটি আসিয়ান ও মিয়ানমার—উভয়ের জন্যই পিছিয়ে যাওয়ার পদক্ষেপ। এতে সংকট সমাধানের কোনো সুনির্দিষ্ট পথ তৈরি হচ্ছে না। বরং আন্তর্জাতিকভাবে সামরিক বাহিনীর গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলার আশঙ্কা রয়েছে। মিয়ানমারের অভ্যন্তরেও সামরিক বাহিনীর সেই বৈধতা নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।
প্রতিবেশীদের স্বার্থ, বাড়ছে কূটনৈতিক যোগাযোগ
মিন অং হ্লাইংয়ের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর প্রচেষ্টা শুধু দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতেই সীমাবদ্ধ নয়। এপ্রিল থেকে তিনি ভারত, চীন, রাশিয়া ও বেলারুশও সফর করেছেন। এসব সফরে তাঁর সরকারকে স্থিতিশীল ও গণতন্ত্রের পথে অগ্রসর হিসেবে তুলে ধরার পাশাপাশি বাণিজ্য ও অবকাঠামো খাতে চুক্তির প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রও তার সরকারের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার পথ খুলেছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। গত সপ্তাহে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সংস্থাটি জানায়, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে মিন অং হ্লাইংয়ের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও ওয়াশিংটন তার সরকারের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে। আলোচনার একটি প্রধান বিষয় মিয়ানমার থেকে পরিচালিত প্রতারণাকেন্দ্রগুলো বন্ধ করা। এসব কেন্দ্র থেকে মার্কিন নাগরিকদের কাছ থেকে কোটি কোটি ডলার হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের সামরিক অভিযানে সাত লাখের বেশি মানুষ বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন। ওই অভিযানকে যুক্তরাষ্ট্র গণহত্যা হিসেবে আখ্যা দিয়েছিল।
ইয়াঙ্গুনের তাম্পাদিপা ইনস্টিটিউটের পরিচালক খিন জাও উইনের মতে, চীন, ভারত ও থাইল্যান্ডের সমন্বিত উদ্যোগ মিন অং হ্লাইংয়ের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে ভূমিকা রাখছে। তিনটি দেশের সঙ্গেই মিয়ানমারের স্থলসীমান্ত রয়েছে। গৃহযুদ্ধের প্রভাব হিসেবে সীমান্ত এলাকায় সংঘর্ষ, বাণিজ্যে বিঘ্ন এবং শরণার্থীদের আগমন সামলাতে হচ্ছে তাদের।
খিন জাও উইন বলেন, মিয়ানমারের ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিয়ে এই তিন দেশের স্বার্থ সবচেয়ে বেশি। তাই সামরিক বাহিনীর নিয়োগ করা সরকারকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়ে তাদের আগ্রহ রয়েছে। অন্যদিকে রাশিয়া ও বেলারুশ মিয়ানমারের অস্ত্র সরবরাহকারী গুরুত্বপূর্ণ দেশ। মিয়ানমারও ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনকে সমর্থন করেছে। এসব সম্পর্কের পেছনে বাস্তব স্বার্থ কাজ করছে বলে মনে করেন তিনি।
তবে কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়লেও সংঘাত থামেনি। মিন অং হ্লাইং সব সশস্ত্র গোষ্ঠীকে শান্তি আলোচনায় বসার আহ্বান জানালেও দেশটির বিস্তীর্ণ অঞ্চলে লড়াই চলছে। রাখাইন, চিন, কাচিন ও কারেন রাজ্য এবং সাগাইং অঞ্চলে বিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠী ও জাতিগত বিদ্রোহীদের কাছ থেকে হারানো এলাকা পুনর্দখলে অভিযান চালাচ্ছে সামরিক বাহিনী। বিমান হামলা জোরদার এবং নতুন করে সেনা নিয়োগের মাধ্যমে বাহিনীর শক্তি বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। চীনও সীমান্তবর্তী কয়েকটি শক্তিশালী জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সামরিক বাহিনীর যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠায় মধ্যস্থতা করেছে।
তবে নেদারল্যান্ডসের সাবেক কূটনীতিক লেটিশিয়া ফান ডেন আসুম মনে করেন, সামরিক বাহিনীর পক্ষে পুরো মিয়ানমারের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করা কঠিন। তার ভাষায়, এর জন্য শুধু নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান নেওয়া বাহিনী নয়, বিশাল দখলদার সেনাবাহিনী প্রয়োজন হবে। এ কারণেই মিন অং হ্লাইং কিছু এলাকায় সাময়িক যুদ্ধবিরতির ওপর নির্ভর করছেন বলে তার ধারণা। এতে সেনাদের অন্য এলাকায় লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের বিষয়ে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর উদ্যোগ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ফান ডেন আসুম। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ যার বিরুদ্ধে রয়েছে, সেই মিন অং হ্লাইংয়ের কাছেই তাদের ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা তার কাছে বিস্ময়কর। মিয়ানমার দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব অস্বীকার করে আসছে। ফলে তাঁদের নিজ দেশের নাগরিক হিসেবে গ্রহণ করা হবে কি না, তা অনিশ্চিত। তাদের আদি নিবাস রাখাইনের বড় অংশও এখন আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। তাই প্রত্যাবাসন হলেও রোহিঙ্গাদের কোথায় ফিরিয়ে নেওয়া হবে, তা স্পষ্ট নয়।
প্রতীকী পদক্ষেপ, কিন্তু থামেনি হামলা
আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে মিন অং হ্লাইং আরও কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন। আগস্টে থাইল্যান্ড সফরের আগে তিনি ২০২১ সালের অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত বেসামরিক নেত্রী অং সান সু চির সঙ্গে আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটিকে (আইসিআরসি) দেখা করার অনুমতি দেন। ৮১ বছর বয়সী নোবেলজয়ী এই নেত্রী অভ্যুত্থানের পর থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় আটক ছিলেন। ৩ আগস্টের ওই সাক্ষাতে বহু বছর পর তাঁর ছবি প্রকাশ্যে আসে।
সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক সাই কি জিন সো এই পদক্ষেপকে প্রকৃত রাজনৈতিক পরিবর্তনের বদলে ‘কম খরচে বেশি প্রচার পাওয়ার কৌশল’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, ওই সাক্ষাৎ থেকে শুধু জানা গেছে যে অং সান সু চি বেঁচে আছেন—এর বেশি কিছু নয়।
তিনি আরও বলেন, আসিয়ান নেতারা মিন অং হ্লাইংকে লালগালিচা সংবর্ধনা দিলেও সামরিক বাহিনীর বিমান হামলা থামেনি। এর উদাহরণ হিসেবে তিনি ২৮ সেপ্টেম্বর রাখাইন রাজ্যের একটি বাজারে হামলার কথা উল্লেখ করেন, যেখানে আনুমানিক ৫০ জন নিহত হন।
সাই কি জিন সোয়ের মতে, হামলা অব্যাহত থাকাই প্রমাণ করে যে নমনীয় কূটনীতি সামরিক বাহিনীকে নিবৃত্ত করতে পারেনি। বিদেশি নেতাদের সঙ্গে মিন অং হ্লাইংয়ের যোগাযোগ তাঁকে আরও উৎসাহিত করতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। তার ভাষ্য, কার্যকর নিষেধাজ্ঞার অভাব, আসিয়ানের পুনরায় সম্পৃক্ত হওয়ার উদ্যোগ এবং চীন ও রাশিয়ার মাধ্যমে অস্ত্র ও জ্বালানি পাওয়ার সুযোগ—সব মিলিয়ে সামরিক বাহিনীর সামনে সংঘাত বাড়িয়ে যাওয়ার প্রণোদনা রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে আসিয়ানের বর্তমান ও পরবর্তী সভাপতির দায়িত্বে থাকা ফিলিপাইন ও সিঙ্গাপুরের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এশিয়া হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড লেবার অ্যাডভোকেটসের পরিচালক ফিল রবার্টসনের মতে, মিয়ানমারকে দ্রুত জোটের মূলধারায় ফিরিয়ে নেওয়ার আহ্বানের বিরুদ্ধে দেশ দুটিকে অবস্থান নিতে হবে এবং আসিয়ানের পাঁচ দফা শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চাপ অব্যাহত রাখতে হবে।
একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নকে লক্ষ্যভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। এর মধ্যে বিমান চলাচলের জ্বালানি সরবরাহে নিষেধাজ্ঞার কথাও বলেছেন। তাঁর মতে, মিয়ানমার সংকটের সমাধানের দায়িত্ব শুধু আঞ্চলিক জোটের ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়।
রবার্টসন আরও বলেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে জরুরি। এ জন্য বিভিন্ন দেশের আইনে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার কিংবা মিয়ানমারের জেনারেলদের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে পাঠানোর উদ্যোগ প্রয়োজন হতে পারে।
সূত্র : আল-জাজিরা
সময়ের আলো/জেডি