মণ্ডপে মণ্ডপে চণ্ডীপাঠ, ঢাক ও কাঁসরের বাদ্য, শঙ্খ ও উলুধ্বনিতে মহাষষ্ঠীতে দেবীদুর্গাকে বরণ করেছেন ভক্তরা। শুক্রবার ষষ্ঠীপূজার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা। ফুল, ধূপ ও আগরবাতির সৌরভে মুখর হয়ে উঠেছে মণ্ডপগুলো।
আজ শনিবার মহাসপ্তমী পূজা। এদিন সকালে নবপত্রিকা প্রবেশ ও স্থাপন, সপ্তমীর কল্পারম্ভ এবং সপ্তমীবিহিত পূজার আয়োজন করা হবে। পঞ্জিকা অনুযায়ী রোববারও সপ্তমী তিথি থাকবে। ফলে সোমবার অনুষ্ঠিত হবে মহাষ্টমী পূজা।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, ত্রেতাযুগে স্ত্রী সীতাকে উদ্ধারে রাবণের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাওয়ার আগে ভগবান রাম দেবী দুর্গার অকালবোধন করেছিলেন। শরৎকালে দেবীকে আহ্বান করে পূজা করার ঐতিহ্য থেকেই শারদীয় দুর্গাপূজার প্রচলন। দেবীর নিদ্রা ভাঙিয়ে পূজার জন্য জাগ্রত করার আনুষ্ঠানিকতাকে বলা হয় বোধন।
ষষ্ঠীপূজার মধ্য দিয়ে শুরু হয় দুর্গাপূজার মূল পর্ব। এদিন বিভিন্ন মণ্ডপে বিল্ববৃক্ষের নিচে ঘট স্থাপন করে দেবীর কল্পারম্ভ ও ষষ্ঠীবিহিত পূজা করা হয়। ভক্তরা দেবীর চরণে পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন করে অশুভ শক্তির বিনাশ ও শুভ শক্তির প্রতিষ্ঠার প্রার্থনা করেন। সন্ধ্যায় বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে পূজার আনুষ্ঠানিকতা এগিয়ে নেওয়া হয়।
মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক শুভাশীষ কুমার বিশ্বাস বলেন, সংকল্প ও আরম্ভ— এই দুইয়ের সমন্বয়ে কল্পারম্ভ। এর মাধ্যমে নির্ধারিত নিয়ম মেনে দেবীর পূজা করার প্রতিজ্ঞা করা হয়। এ সময় অশুভ শক্তির বিনাশ, শান্তি ও শুভ শক্তির প্রতিষ্ঠার জন্য দেবীর কাছে প্রার্থনা করা হয়। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবী দুর্গা তার চার সন্তান গণেশ, কার্তিক, লক্ষ্মী ও সরস্বতীকে নিয়ে পিতৃগৃহে মর্ত্যে আসেন। ষষ্ঠীতে বেলগাছের নিচে নিদ্রিত দেবীকে বোধনের মাধ্যমে জাগিয়ে তোলা হয়।
এদিকে শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে শুক্রবার রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক বাণী দিয়েছেন। হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি শুভেচ্ছা জানিয়ে রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে বলেন, দুর্গাপূজার অন্তর্নিহিত শিক্ষা হলো অশুভ শক্তির বিনাশ এবং সত্য, সুন্দর ও কল্যাণের জয়। প্রতিটি ধর্মই মানুষকে সত্য, ন্যায়, সংযম ও মানবকল্যাণের শিক্ষা দেয়। শারদীয় দুর্গোৎসবের সব কর্মসূচির সফলতাও কামনা করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বাণীতে বাংলাদেশসহ বিশ্বের হিন্দু সম্প্রদায়কে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার। ধর্ম যার যার, নিরাপত্তা পাবার অধিকার সবার।’ তার ভাষ্য, জগতের মঙ্গল কামনায় দেবী দুর্গা স্বর্গলোক থেকে মর্ত্যে আসেন। অশুভ শক্তির বিনাশ এবং সত্য ও সুন্দরের আরাধনা দুর্গোৎসবের তাৎপর্যকে অনন্য মাত্রা দিয়েছে। ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন দৃঢ় হয়।
সরেজমিন দেখা গেছে, রাজধানীর বিভিন্ন মণ্ডপে পূজার প্রস্তুতি ও আনুষ্ঠানিকতা ঘিরে ভক্তদের উপস্থিতি বাড়ছে। ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে ভোর থেকেই পূজার আয়োজন নিয়ে ব্যস্ততা দেখা যায়। ফুল, ধূপ ও আগরবাতির সৌরভের পাশাপাশি মণ্ডপগুলো সাজানো হয়েছে নানা রঙের আলোকসজ্জায়।
দুর্গাপূজা ঘিরে নেওয়া হয়েছে নিরাপত্তাব্যবস্থা। মণ্ডপগুলোতে পুলিশ ও আনসার-ভিডিপি সদস্যদের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি কোথাও কোথাও র্যাব, বিজিবি ও সেনাসদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। সাদা পোশাকে গোয়েন্দা সদস্যদেরও সতর্ক অবস্থানে দেখা গেছে। অনেক মণ্ডপে আর্চওয়ে ও মেটাল ডিটেক্টরের মাধ্যমে দর্শনার্থীদের তল্লাশি করা হচ্ছে। পাশাপাশি নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবকরাও দায়িত্ব পালন করছেন।
মহাসপ্তমীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আচার নবপত্রিকা স্থাপন। নবপত্রিকা বলতে নয়টি উদ্ভিদকে একত্র করে পূজার জন্য প্রস্তুত করাকে বোঝায়। কলা, কচু, হলুদ, জয়ন্তী, বেল, ডালিম, অশোক, মান ও ধান— এই ৯টি উদ্ভিদ পাতাসহ একটি কলাগাছের সঙ্গে একত্র করে শ্বেত অপরাজিতা লতা দিয়ে বাঁধা হয়।
এরপর লালপাড় সাদা শাড়ি পরিয়ে বধূর আকৃতি দেওয়া হয়। প্রচলিত ভাষায় এর নাম ‘কলাবউ’। নবপত্রিকাকে দেবী দুর্গার নয়টি বিশেষ রূপের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। নবপত্রিকা স্থাপনের পর দর্পণে প্রতিফলিত প্রতিমার প্রতিবিম্বে বিভিন্ন উপচারে দেবীকে মহাস্নান করানো হয়।
আয়োজকরা জানান, সোমবার মহাষ্টমীতে অষ্টমী ও নবমী তিথির সন্ধিক্ষণে অনুষ্ঠিত হবে বিশেষ ধর্মীয় আচার সন্ধিপূজা। এরপর মহানবমীতে পূজার্চনা ও ভোগ নিবেদন করা হবে। উৎসবের শেষ দিন বিজয়া দশমীতে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানাবেন ভক্তরা। এদিন শোভাযাত্রার মাধ্যমে প্রতিমা নির্ধারিত নদী, পুকুর বা অন্য জলাশয়ে নিয়ে বিসর্জন দেওয়া হবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএক