দারিদ্র্য বিমোচনে ইসলামের দিকনির্দেশনা

মানসুরা আলাম

ইসলাম

দারিদ্র্য শুধু অর্থের অভাব নয়; এটি মানুষের জীবনযাত্রা, শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক মর্যাদার ওপরও গভীর প্রভাব ফেলে। একটি সমাজের

2026-10-17T05:01:42+00:00
2026-10-17T05:01:42+00:00
 
  শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬,
১ কার্তিক ১৪৩৩
শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
ইসলাম
দারিদ্র্য বিমোচনে ইসলামের দিকনির্দেশনা
মানসুরা আলাম
প্রকাশ: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ৫:০১ এএম 
ছবি : সংগৃহীত
দারিদ্র্য শুধু অর্থের অভাব নয়; এটি মানুষের জীবনযাত্রা, শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক মর্যাদার ওপরও গভীর প্রভাব ফেলে। একটি সমাজের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে দরিদ্র মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণের পাশাপাশি তাদের স্বাবলম্বী করে তোলাও জরুরি। ইসলাম এ ক্ষেত্রে শুধু ব্যক্তিগত দানশীলতার শিক্ষা দেয়নি, বরং সম্পদের সুষম বণ্টন, সামাজিক দায়িত্ববোধ, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠারও দিকনির্দেশনা দিয়েছে।

ইসলাম মানুষের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ভারসাম্য ও কল্যাণের ওপর গুরুত্বারোপ করে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা পরিপূর্ণরূপে ইসলামে প্রবেশ করো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২০৮)। ইসলামের অর্থনৈতিক শিক্ষার অন্যতম লক্ষ্য হলো এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে সম্পদ কুক্ষিগত না হয়ে মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হবে এবং অসচ্ছল মানুষও সম্মানজনক জীবনযাপনের সুযোগ পাবে।

দারিদ্র্য বিমোচনে ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা হলো জাকাত। সামর্থ্যবান মুসলমানের জন্য জাকাত আদায় করা ফরজ এবং এটি ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি। জাকাতের মাধ্যমে সমাজের সচ্ছল মানুষের সম্পদের একটি নির্ধারিত অংশ প্রাপ্য ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। ফলে দরিদ্র মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ, ঋণের বোঝা লাঘব এবং অর্থনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তাদের সম্পদে রয়েছে প্রার্থনাকারী ও বঞ্চিতের অধিকার।’ (সুরা জারিয়াত, আয়াত : ১৯)। এই নির্দেশনা সম্পদের প্রতি মানুষের দায়িত্বশীল দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলে। জাকাত যথাযথভাবে আদায় ও বণ্টন করা হলে সম্পদের বৈষম্য কমানোর পাশাপাশি দরিদ্র মানুষের জীবনমান উন্নয়নেও তা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তাদের (ধনীদের) সম্পদে জাকাত ফরজ করেছেন, যা ধনীদের কাছ থেকে নেওয়া হবে এবং গরিবদের মধ্যে বিতরণ করা হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৩৯৫)।

দারিদ্র্যের কারণে অনেক মানুষ ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। কখনো অসুস্থতা, কখনো কর্মহীনতা, আবার কখনো ব্যবসায়িক ক্ষতির কারণে তাদের পক্ষে ঋণ পরিশোধ করা কঠিন হয়ে যায়। এ পরিস্থিতিতে ইসলাম ঋণগ্রহীতার প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। কোনো ব্যক্তি সত্যিকার অর্থে অসচ্ছল হলে তাঁকে আর্থিক অবস্থার উন্নতি হওয়া পর্যন্ত সময় দিতে হবে। সামর্থ্য থাকলে ঋণের কিছু অংশ বা সম্পূর্ণ অর্থ মওকুফ করে দেওয়াকেও উৎসাহিত করা হয়েছে।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর ঋণগ্রহীতা যদি অভাবগ্রস্ত হয়, তবে সচ্ছলতা আসা পর্যন্ত তাকে অবকাশ দাও। আর যদি তোমরা (ঋণ) সদকা করে দাও, তবে তা তোমাদের জন্য আরও উত্তম, যদি তোমরা জানতে।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২৮০)।

এ ছাড়া জাকাতের নির্ধারিত খাতগুলোর মধ্যে ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিরাও রয়েছেন। ফলে যোগ্য ঋণগ্রস্ত মানুষকে জাকাতের অর্থ দিয়ে ঋণের বোঝা থেকে মুক্ত হতে সহায়তা করা যায়। (সুরা তাওবা, আয়াত : ৬০)।

ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে মানবিক আচরণ যে কতটা মহৎ, তা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি হাদিসে উঠে এসেছে। তিনি পূর্ববর্তী এক ব্যক্তির কথা বর্ণনা করেছেন, যিনি ঋণ আদায়ের সময় সচ্ছল ব্যক্তিকে অবকাশ দিতেন এবং অসচ্ছল ব্যক্তির ঋণ মাফ করে দিতেন। তাঁর এই আচরণের কারণে আল্লাহ তাঁকে ক্ষমা করে দেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৪৫১)। এই শিক্ষা ঋণদাতা ও ঋণগ্রহীতার সম্পর্ককে মানবিক করে তোলার পাশাপাশি বিপদগ্রস্ত মানুষের ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি করে।

জাকাতের পাশাপাশি নফল দান-সদকাও দারিদ্র্য বিমোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ক্ষুধার্তকে খাবার দেওয়া, অসুস্থ ব্যক্তির চিকিৎসায় সহায়তা করা, অসহায় শিক্ষার্থীর পড়াশোনার খরচ জোগানো কিংবা কর্মহীন কাউকে জীবিকা অর্জনের উপকরণ কিনে দেওয়া—সবই মানুষের কল্যাণে ব্যয় করার বিভিন্ন দৃষ্টান্ত।

ইসলাম দানকে শুধু সাময়িক সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং মানুষের প্রয়োজন ও মর্যাদার প্রতিও গুরুত্ব দিয়েছে। নিয়মিত দান-সদকার মাধ্যমে সমাজের অসচ্ছল মানুষের দুর্দশা কমানো সম্ভব। পাশাপাশি তাদের দক্ষতা অর্জন ও আয় করার সুযোগ তৈরি হলে সহায়তার সুফল দীর্ঘস্থায়ী হয়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রত্যেক মুসলিমের ওপর সদকা করা জরুরি।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১০০৮)। দান-সদকার এই শিক্ষা মানুষকে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী অন্যের পাশে দাঁড়াতে উদ্বুদ্ধ করে। এর মাধ্যমে সমাজে সহমর্মিতা, পারস্পরিক সহযোগিতা ও দায়িত্ববোধের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে।


দারিদ্র্য বিমোচনের স্থায়ী উপায়গুলোর মধ্যে অন্যতম হলো মানুষের জন্য সম্মানজনক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা। ইসলাম হালাল উপায়ে জীবিকা অর্জনকে উৎসাহিত করেছে। ব্যবসা, কৃষি, কারিগরি কাজ ও অন্যান্য বৈধ পেশার মাধ্যমে মানুষ নিজের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি পরিবারের দায়িত্ব পালন করতে পারেন। একই সঙ্গে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে অন্যের জীবিকার ব্যবস্থাও করতে পারেন।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অতঃপর নামাজ শেষ হলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান করো। আর আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করো, যাতে তোমরা সফল হতে পারো।’ (সুরা জুমা, আয়াত : ১০)।

এই আয়াত জীবিকা অন্বেষণ ও আল্লাহর স্মরণ—উভয়ের গুরুত্ব তুলে ধরে। তবে ব্যবসা ও উপার্জনের ক্ষেত্রে সততা, ন্যায়পরায়ণতা এবং মানুষের অধিকার রক্ষা করা অপরিহার্য। প্রতারণা, ওজনে কম দেওয়া কিংবা অন্যায়ভাবে সম্পদ অর্জন ইসলামের অর্থনৈতিক নীতির পরিপন্থী।

দরিদ্র মানুষকে শুধু সাহায্য দেওয়ার পরিবর্তে তাদের কর্মদক্ষতা বাড়ানো, ক্ষুদ্র ব্যবসার সুযোগ তৈরি, প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ এবং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হলে তারা দীর্ঘমেয়াদে স্বাবলম্বী হতে পারেন। এ ধরনের উদ্যোগ ব্যক্তির আত্মবিশ্বাস বাড়ায় এবং পরিবারকে দারিদ্র্যের চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে সহায়তা করে।

ইসলামের অর্থনৈতিক শিক্ষা বাস্তবায়নের জন্য ব্যক্তিগত সদিচ্ছার পাশাপাশি সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগও প্রয়োজন। জাকাতের অর্থ সঠিকভাবে প্রাপ্য ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছানো, দান-সদকার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা, ঋণগ্রস্ত মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর মাধ্যমে দারিদ্র্য মোকাবিলায় কার্যকর অগ্রগতি সম্ভব।

একই সঙ্গে দরিদ্র মানুষের আত্মমর্যাদা রক্ষা করা জরুরি। সহায়তা দেওয়ার সময় তাদের অসহায়ত্বকে প্রকাশ্যে তুলে ধরা কিংবা তাদের মর্যাদাহানি করা ইসলামের মানবিক শিক্ষার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। বরং এমন ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন, যাতে তারা নিজেদের সামর্থ্য কাজে লাগিয়ে সম্মানজনক জীবনযাপন করতে পারেন।

দারিদ্র্য বিমোচনে ইসলামের মূল শিক্ষা হলো—সম্পদশালীরা নিজেদের সম্পদের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হবেন, সমাজের অসচ্ছল মানুষের পাশে দাঁড়াবেন এবং প্রত্যেকে হালাল উপায়ে জীবিকা অর্জনের সুযোগ পাবেন। জাকাত, দান-সদকা, ঋণগ্রস্তের প্রতি সহমর্মিতা ও কর্মসংস্থানমুখী উদ্যোগের সমন্বিত প্রয়োগ দারিদ্র্য কমাতে সহায়ক হতে পারে। এসব নীতির যথাযথ চর্চার মাধ্যমে এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব, যেখানে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি মানবিক মর্যাদা, ন্যায়বিচার ও সামাজিক সংহতিও প্রতিষ্ঠিত হবে।

সময়ের আলো/এসএকে
  বিষয়:   দারিদ্র্য  ইসলাম  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
ইসলাম- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: