দেশে দুর্ঘটনা ও আঘাতে প্রতিদিন গড়ে ২৬৮ জনের মৃত্যু হচ্ছে, স্থায়ী প্রতিবন্ধিতার শিকার হচ্ছেন ৩৮০ জন। আহত হচ্ছেন ৪৫ হাজারের বেশি মানুষ। স্বাস্থ্য অধিদফতরের এক জরিপে এমন চিত্র উঠে এসেছে। অথচ গুরুতর আহত ব্যক্তিদের জরুরি চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই।
দুর্ঘটনা ও আঘাতের শিকার মানুষের জীবন রক্ষা, দ্রুত চিকিৎসা এবং পুনর্বাসন সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে শনিবার (১৭ অক্টোবর) পালিত হচ্ছে বিশ্ব ট্রমা দিবস।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আঘাতজনিত মৃত্যু ও প্রতিবন্ধিতার ঝুঁকি কমাতে কার্যকর ট্রমা সেন্টার, সমন্বিত জরুরি চিকিৎসাব্যবস্থা, অ্যাম্বুল্যান্স সেবা ও পুনর্বাসনকেন্দ্র গড়ে তোলা জরুরি। পাশাপাশি সড়কের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইন প্রয়োগ, হেলমেটের মান উন্নয়ন, গতিসীমা কার্যকর করা এবং মহাসড়কে নিরাপদ অবকাঠামো নির্মাণ প্রয়োজন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা দিতে সড়কের পাশে নির্মিত ২৪টি ট্রমা সেন্টার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জরুরি সেবা সম্প্রসারণেও কাজ চলছে।
২০২৪ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশ স্বাস্থ্য ও দুর্ঘটনা জরিপটি যৌথভাবে পরিচালনা করে স্বাস্থ্য অধিদফতরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি এবং সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি)। দেশের ৬৪ জেলার শহর ও গ্রামের ১ লাখ ১০ হাজার পরিবারের ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৭০০ সদস্যের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
জরিপ অনুযায়ী, দেশে বছরে দুর্ঘটনা ও আঘাতজনিত কারণে প্রায় ৯৮ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। প্রধান চারটি কারণ সড়ক দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা, পানিতে ডোবা ও পড়ে যাওয়া। এর মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় বছরে ২৪ হাজার ২৩৩ জন, আত্মহত্যায় ২০ হাজার ৫০৫ জন, পানিতে ডুবে ১৮ হাজার ২৬৮ জন এবং পড়ে গিয়ে ১৪ হাজার ২৬৮ জন মারা যান।
সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের দ্রুত চিকিৎসা দিতে গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কের পাশে ২৪টি ট্রমা সেন্টার নির্মাণ করা হয়েছে। ২০০৪-০৫ অর্থবছরে ১০টি এবং ২০১০ সালে আরও ১৪টি সেন্টার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব অবকাঠামো নির্মাণে অন্তত ১৪০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। তবে চিকিৎসক, নার্স, যন্ত্রপাতি ও প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে অধিকাংশ কেন্দ্র দীর্ঘদিন ধরে কার্যক্রমহীন।
জরিপে দেখা গেছে, দেশে প্রতিদিন গড়ে ৩৮০ জন স্থায়ী প্রতিবন্ধিতার শিকার হচ্ছেন। তাদের মধ্যে পড়ে গিয়ে প্রতিদিন গড়ে ১৫৯ জন এবং সড়ক দুর্ঘটনায় ১০৪ জন স্থায়ীভাবে প্রতিবন্ধী হচ্ছেন। এ ছাড়া ভোঁতা বস্তুর আঘাত, ধারালো বস্তু ও যন্ত্রপাতির আঘাত, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া, সহিংসতা, প্রাণী ও কীটপতঙ্গের কামড় এবং পুড়ে যাওয়ার কারণেও অনেকে স্থায়ী প্রতিবন্ধিতার শিকার হচ্ছেন।
পড়ে গিয়ে আহত ব্যক্তিদের বড় একটি অংশ বয়স্ক। তাদের ক্ষেত্রে সময়মতো চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের অভাব স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। অন্যদিকে, সড়ক দুর্ঘটনায় কর্মক্ষমতা হারালে উপার্জনক্ষম ব্যক্তির পাশাপাশি তার পরিবারও আর্থিক সংকটে পড়ে।
জরিপ অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন গড়ে ৪৫ হাজার ৪০৮ জন দুর্ঘটনা ও আঘাতের শিকার হন। তাদের ৯১ দশমিক ৬ শতাংশের আঘাত মাঝারি, ৬ দশমিক ৩ শতাংশের গুরুতর এবং ১ দশমিক ৩ শতাংশের মারাত্মক। গুরুতর আহত ব্যক্তিদের দ্রুত উদ্ধার, কার্যকর অ্যাম্বুল্যান্স, অস্ত্রোপচার ও নিবিড় পরিচর্যার সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে অনেকের জীবন বাঁচানো সম্ভব। শারীরিক চিকিৎসার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনও জরুরি।
সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের দ্রুত উদ্ধার ও চিকিৎসার জন্য সরকার ৬০টি ‘পোস্ট-ক্র্যাশ রেসপন্স অ্যাম্বুল্যান্স’ দিয়েছে। ঢাকা মহানগরে দুর্ঘটনা-পরবর্তী সেবায় ব্যবহার করা হচ্ছে ৪০টি মোটরসাইকেল অ্যাম্বুল্যান্স। এ ছাড়া, হাইওয়ে পুলিশের জন্য রয়েছে ৮০টি প্যাট্রল মোটরসাইকেল।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ৫০০ কিলোমিটার মহাসড়কের তিনটি করিডোরে ৬০টি বেসিক লাইফ সাপোর্ট অ্যাম্বুল্যান্স মোতায়েনের পরিকল্পনা রয়েছে। করিডোরগুলো হলো জয়দেবপুর-রাজশাহী, জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ এবং হাটিকুমরুল-বগুড়া-রংপুর।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু অ্যাম্বুল্যান্স বাড়ালেই হবে না; দুর্ঘটনাস্থল থেকে দ্রুত উদ্ধার, হাসপাতালে পৌঁছানো এবং হাসপাতালগুলোর মধ্যে সমন্বিত চিকিৎসাব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।
সড়ক পরিবহন, রেলপথ ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, ‘২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনতে সরকার, বেসরকারি সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী, পরিবহনমালিক ও শ্রমিক সংগঠনসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।’
সময়ের আলো/মহু