প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার সময় সব ধর্মের মানুষ একসঙ্গে লড়াই করেছে। এখন দেশের উন্নয়ন ও গঠনের কাজেও সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসতে হবে। পারস্পরিক সহযোগিতা ও সম্মিলিত পরিশ্রমের মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) দুপুর ১২টার দিকে শারদীয় দুর্গোৎসবের মহানবমীতে রংপুর নগরীর ঐতিহ্যবাহী রাধা গোবিন্দ মন্দির (ধর্মসভা) পরিদর্শন করে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় পূজামণ্ডপে উপস্থিত পুণ্যার্থী ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন এবং শুভেচ্ছা জানান।
এর আগে পাগলাপীরে এক পথসভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ আমাদের সবার দেশ।’ সব ধর্মের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে একটি সুন্দর ও প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর সফরকে ঘিরে রংপুর নগরী ও সৈয়দপুর-রংপুর মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। তারাগঞ্জ, পাগলাপীরসহ বিভিন্ন এলাকায় সড়কের দুই পাশে দাঁড়িয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ তাঁকে শুভেচ্ছা জানান। মোটর শোভাযাত্রায় যাওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রীও হাত নেড়ে তাঁদের অভিবাদনের জবাব দেন। সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর এটি তাঁর প্রথম রংপুর সফর।
মঙ্গলবার দুপুরে ধর্মসভা রাধা গোবিন্দ মন্দিরের পূজামণ্ডপে পৌঁছালে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান মন্দির কমিটির সভাপতি ভবতোষ সরকার বাচ্চু, সাধারণ সম্পাদক খোকন সরকার, বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদের রংপুর জেলা শাখার সভাপতি রামজীবন কুণ্ডু, মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক প্রশান্ত কুমার রায় এবং মহানগর নাগরিক কমিটির সদস্যসচিব পলাশ কান্তি নাগসহ সংশ্লিষ্ট নেতারা।
মন্দিরে প্রবেশের পর প্রধানমন্ত্রী পূজারি ও ভক্তদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দুর্গোৎসবের শুভেচ্ছা জানান। তাকে একনজর দেখতে মন্দির এলাকায় ভিড় করেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে মন্দির প্রাঙ্গণে উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যায়। এ সময় ভক্তদের অনুরোধে তাদের সঙ্গে সেলফিও তোলেন তিনি।
রংপুর নগরীর প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় কেন্দ্রগুলোর একটি ধর্মসভা রাধা গোবিন্দ মন্দির। দুর্গাপূজা উপলক্ষে প্রতিবছর এখানে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি নানা সাংস্কৃতিক আয়োজন হয়। মহানবমীতে প্রধানমন্ত্রীকে কাছে পেয়ে ভক্তদের মধ্যে বাড়তি উৎসাহ দেখা যায়।
রংপুরে যাওয়ার পথে পাগলাপীরে সড়কের দুই পাশে সমবেত মানুষের উদ্দেশে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ আমাদের সবার দেশ। দেশকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। এটাই হোক আমাদের প্রত্যাশা।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানসহ সব ধর্মের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চায় তার সরকার। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সব ধর্মের মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, দেশ গড়ার কাজেও সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসতে হবে।
সমবেত মানুষের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন রাখেন, ‘আমরা সব ধর্মের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে দেশ গড়ে তুলতে চাই। আপনারা কি আমার সঙ্গে আছেন?’ এ সময় উপস্থিত জনতা হাত তুলে সমর্থন জানান।
আরও পড়ুন
তিনি আরও বলেন, পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সহযোগিতা বজায় রেখে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশকে একটি সুন্দর দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের সব নাগরিককে উন্নয়ন ও অগ্রগতির কাজে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
পাগলাপীরের পথসভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর দেশের মানুষ বিএনপিকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। সরকার গঠনের পর থেকেই খেটে খাওয়া মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করা হয়েছে। পাশাপাশি ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ইমাম-মুয়াজ্জিনসহ বিভিন্ন ধর্মীয় নেতার জন্য মাসিক ভাতার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের পাশে দাঁড়াতে সরকার কাজ করছে। কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ ও বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের কল্যাণে নেওয়া উদ্যোগগুলো অব্যাহত থাকবে।
মঙ্গলবার সকাল ৯টার দিকে ঢাকার তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে সামরিক বিমানে সৈয়দপুরের উদ্দেশে রওনা হন প্রধানমন্ত্রী। সকাল ৯টা ৫০ মিনিটে তিনি সৈয়দপুর বিমানবন্দরে পৌঁছান।
সেখানে তাঁকে স্বাগত জানান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট মাহফুজ উন নবী চৌধুরী ডন, রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান সামু, বিভাগীয় কমিশনার জাহাঙ্গীর আলম, জেলা প্রশাসক ইশরাত জাহান ও পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোজাম্মেল হকসহ প্রশাসন ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে মোটর শোভাযাত্রায় রংপুরের উদ্দেশে যাত্রা করেন প্রধানমন্ত্রী। পথে তারাগঞ্জ ও পাগলাপীরসহ বিভিন্ন স্থানে সড়কের দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ তাকে শুভেচ্ছা জানান।
প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গীদের মধ্যে ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক এ জেড এম জাহিদ হোসেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকার এবং বিএনপির বিশেষ সম্পাদক বেলায়েত হোসেন মৃধাসহ অন্যরা।
প্রধানমন্ত্রীর সফর উপলক্ষে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, মন্দির কমিটি ও স্থানীয় বিএনপির পক্ষ থেকে প্রস্তুতি নেওয়া হয়।
মহানবমী উপলক্ষে একই দিনে রংপুরের পাশাপাশি রাজশাহী ও চট্টগ্রামের পূজামণ্ডপ পরিদর্শনের কর্মসূচি রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। রংপুরের ধর্মসভা রাধা গোবিন্দ মন্দির পরিদর্শন শেষে তাঁর রাজশাহীর ধর্মসভা মন্দিরে যাওয়ার কথা রয়েছে। পরে চট্টগ্রামের রহমতগঞ্জের জে এম সেন হলের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন শেষে রাতে ঢাকায় ফেরার কর্মসূচি রয়েছে।
বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদের রংপুর মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক প্রশান্ত কুমার রায়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ বছর রংপুর জেলায় ৯৬৪টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বুধবার (২১ অক্টোবর) বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব শেষ হবে।
প্রধানমন্ত্রীর রংপুর সফরে মন্দির পরিদর্শন ও পূজারি-ভক্তদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের পাশাপাশি পাগলাপীরের পথসভায় দেওয়া বক্তব্যে ধর্মীয় সম্প্রীতি, পারস্পরিক সহাবস্থান এবং সম্মিলিতভাবে দেশ গড়ার বার্তা গুরুত্ব পায়। সব ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণে একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তারেক রহমান।