নতুন ছকে গ্রাম সরকার

রফিকুল ইসলাম সবুজ

জাতীয়

গ্রামের উন্নয়ন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, স্থানীয় বিরোধ মীমাংসা এবং সরকারি সেবার তদারকিতে তৃণমূলের মানুষের অংশগ্রহণ বাড়াতে আবারও ‘গ্রাম সরকার’ গঠনের উদ্যোগ

2026-10-25T00:23:37+00:00
2026-10-25T00:23:37+00:00
 
  রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬,
৯ কার্তিক ১৪৩৩
রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬
জাতীয়
নতুন ছকে গ্রাম সরকার
রফিকুল ইসলাম সবুজ
প্রকাশ: রোববার, ২৫ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:২৩ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
গ্রামের উন্নয়ন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, স্থানীয় বিরোধ মীমাংসা এবং সরকারি সেবার তদারকিতে তৃণমূলের মানুষের অংশগ্রহণ বাড়াতে আবারও ‘গ্রাম সরকার’ গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে ‘গ্রাম সরকার আইন ২০২৬’-এর খসড়া তৈরি করে জনসাধারণের মতামত চেয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। 

আগামী ১৭ নভেম্বরের মধ্যে খসড়া আইনটির বিষয়ে মতামত পাঠাতে পারবেন নাগরিকরা। স্থানীয় সরকার বিভাগেরর ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখিত ই-মেইল ঠিকানায় মতামত পাঠাতে হবে। নাগরিকদের মতামত পাওয়ার পর আইনের খসড়া চূড়ান্ত করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠাবে এলজিআরডি মন্ত্রণালয়।

প্রস্তাবিত আইনে দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদের ওয়ার্ডে একটি করে গ্রাম সরকার গঠনের কথা বলা হয়েছে। এতে থাকবেন একজন গ্রাম সরকারপ্রধান, একজন উপদেষ্টা ও ১৫ জন সদস্য— সব মিলিয়ে মোট ১৭ জন। পাঁচ বছর মেয়াদি গ্রাম সরকারের সদস্য নির্বাচনে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ভোটারদের অংশগ্রহণে ‘হ্যাঁ’-‘না’ ভোটের বিধান রাখা হয়েছে।

খসড়া আইনের ৪ ধারা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের নির্বাচিত ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য পদাধিকারবলে গ্রাম সরকারপ্রধান হবেন। ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত আসনের নারী সদস্য হবেন উপদেষ্টা। তার আঞ্চলিক নির্বাচনি এলাকার আওতাধীন সব গ্রাম সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন তিনি। বাকি ১৫ জন সদস্য মনোনীত হবেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা থেকে। তাদের মধ্যে থাকবেন দুজন গণ্যমান্য ব্যক্তি বা সমাজসেবক, দুজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্য (একজন পুরুষ ও একজন নারী) এবং দুজন কৃষক। 

এ ছাড়া থাকবেন একজন নিকাহ রেজিস্ট্রার, একজন সমবায় সমিতির সদস্য, একজন পল্লী চিকিৎসক, একজন শিক্ষক, একজন ব্যবসায়ী, একজন পেশাজীবী, একজন শ্রমিক, একজন যুব প্রতিনিধি এবং একজন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্য। তবে কোনো শ্রেণির প্রতিনিধি পাওয়া না গেলে সেই পদে  গণ্যমান্য ব্যক্তি বা সমাজসেবক মনোনীত করে শূন্যতা পূরণের বিধান রাখা হয়েছে। সদস্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ভোটার তালিকায় নাম রয়েছে এমন ভোটারদের কমপক্ষে ১০ শতাংশের উপস্থিতি থাকতে হবে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অথবা তার ক্ষমতাপ্রাপ্ত কমিটির তত্ত্বাবধানে ‘হ্যাঁ’-‘না’ ভোটের মাধ্যমে সদস্য নির্বাচনের কথা বলা হয়েছে।

প্রথম গ্রাম সরকার গঠনের তারিখ সরকার সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে নির্ধারণ করবে। পরবর্তী সময়ে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগের ১৮০ দিনের মধ্যে নতুন কমিটি গঠনের বিধান রয়েছে। কোনো গ্রাম সরকার বাতিল হলে আদেশ জারির পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নতুন কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে। প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার দিন থেকে পাঁচ বছর হবে কমিটির মেয়াদ।

আইনের খসড়া অনুযায়ী গ্রাম সরকার শুধু উন্নয়নকাজে পরামর্শ দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, গ্রামের শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা, স্থানীয় বিরোধ মীমাংসা, নারী ও শিশু নির্যাতনসহ বিভিন্ন অপরাধ প্রতিরোধে সচেতনতা সৃষ্টি, কৃষি উপকরণ সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং শিক্ষা-স্বাস্থ্য ও স্যানিটেশন কার্যক্রমে সহায়তার দায়িত্বও পালন করবে। গ্রামের রাস্তাঘাট ও কালভার্ট উন্নয়নে অগ্রাধিকারভিত্তিক পরিকল্পনা তৈরি, চলমান প্রকল্পের অগ্রগতি ও আর্থিক বিষয় পর্যালোচনা করবে কমিটি। গ্রাম সরকারের লিখিত সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আইনানুগভাবে গ্রহণ করতে পারবে।

কৃষি খাতেও গ্রাম সরকারের ভূমিকা রাখার প্রস্তাব রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে সার, উন্নতমানের বীজ ও কীটনাশক সরবরাহ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। এসব উপকরণের সংকট দেখা দিলে দ্রুত ইউনিয়ন পরিষদ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। শিক্ষার্থীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে সহায়তা, পরিবার পরিকল্পনা, পুষ্টি, টিকাদান ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচির বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ এবং বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত ল্যাট্রিন ব্যবস্থাপনায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সহায়তার দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া সমবায় সমিতি গঠন, ক্ষুদ্র শিল্প স্থাপন, হাঁস-মুরগির খামার, মৎস্য চাষ ও পশুপালনে মানুষকে উৎসাহিত করা, বৃক্ষরোপণ, খাল খনন, পরিবেশ ও প্রাণী সংরক্ষণ এবং গ্রামাঞ্চলে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

১৭ ধারা অনুযায়ী, প্রতি দুই মাসে অন্তত একবার গ্রাম সরকারের সভা হবে। বিশেষ সভা আহ্বানের ক্ষমতা থাকবে গ্রাম সরকারপ্রধানের। তবে অন্তত আটজন সদস্যের আবেদনের ভিত্তিতেও বিশেষ সভা ডাকা যাবে। সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে গ্রাম সরকারপ্রধান, উপদেষ্টা ও সদস্যদের ভোটাধিকার থাকবে। সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে। ভোট সমান হলে সভাপতির নির্ণায়ক ভোট দেওয়ার বিধান রয়েছে। সভার কোরাম পূরণে মোট সদস্যের অন্তত এক-তৃতীয়াংশের উপস্থিতি প্রয়োজন হবে।


অন্যদিকে প্রতি ছয় মাসে অন্তত একবার ওয়ার্ডের সাধারণ সভা আয়োজন করতে হবে। এ সভায় সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ভোটার তালিকায় নাম থাকা ভোটারদের কমপক্ষে ১০ শতাংশের উপস্থিতি প্রয়োজন। চলমান উন্নয়নকাজের অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং গ্রাম সরকারের কার্যাবলির বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে। সাধারণ সভায় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানকে আমন্ত্রণ জানানোর বিধানও রয়েছে।

গ্রাম সরকারের নির্দিষ্ট কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বিভিন্ন বিষয়ে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। এসব কমিটিতে গ্রাম সরকারের সদস্যদের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষ যোগ্যতা রয়েছে এমন ভোটারদেরও অন্তর্ভুক্ত করা যাবে। গ্রাম সরকারের দাফতরিক কাজ ও কার্যক্রম পরিচালনায় অর্থের জোগান কীভাবে হবে, তারও বিধান রাখা হয়েছে খসড়ায়। জন্ম-মৃত্যু, বিয়ে ও বিয়ে বিচ্ছেদসংক্রান্ত তথ্যসহ ইউনিয়ন পরিষদের কার্যাবলিতে সহায়তার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, কলম, কালি ও রেজিস্টার কেনার ব্যয় নির্বাহে ইউনিয়ন পরিষদ প্রতি বছর নিজস্ব আয়ের একটি অংশ গ্রাম সরকারকে দেবে।

এ ছাড়া প্রতিটি গ্রাম সরকারের নামে ‘গ্রাম সরকার তহবিল’ থাকবে। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে পাওয়া অর্থ এবং অন্য উৎস থেকে পাওয়া অর্থ এই তহবিলে জমা হবে। তবে ইউনিয়ন পরিষদের আয়ের কত অংশ গ্রাম সরকারকে দেওয়া হবে, সে বিষয়ে খসড়ায় নির্দিষ্ট হার উল্লেখ নেই। তহবিলের ব্যবহার ও কার্যক্রমে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পরিদর্শন ও তদন্তের বিধানও রাখা হয়েছে। উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান, মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান, পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষ এবং ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান গ্রাম সরকারের কার্যক্রম পরিদর্শন করতে পারবেন। প্রয়োজনে জেলা প্রশাসক তদন্তের নির্দেশ দিতে পারবেন এবং তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে পারবেন।

গ্রাম সরকার দায়িত্ব পালনে অক্ষম হলে, প্রশাসনিক ও আর্থিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে, জনস্বার্থবিরোধী কাজ করলে কিংবা ক্ষমতার সীমা লঙ্ঘন বা অপব্যবহার করলে জেলা প্রশাসক তদন্তের পর কমিটি বাতিল করতে পারবেন। তবে বাতিলের আদেশ দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট গ্রাম সরকারকে কারণ দর্শানোর সুযোগ দিতে হবে। কমিটি বাতিল হলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে গঠিত একটি অ্যাডহক কমিটি দায়িত্ব পালন করবে। ওয়ার্ডের ভোটার তালিকায় নাম রয়েছে এমন ভোটারদের সমন্বয়ে এই অন্তর্বর্তী কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে। বাতিলের পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নতুন গ্রাম সরকার গঠনের বিধানও রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ভোটার তালিকায় নাম না থাকলে, বাংলাদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগ করলে বা হারালে, নির্দিষ্ট অপরাধে দণ্ডিত হলে কিংবা সংশ্লিষ্ট এলাকার বাইরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করলে কেউ সদস্য হওয়ার যোগ্য হবেন না। ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ মেয়াদোত্তীর্ণ অবস্থায় অনাদায়ী থাকলেও সদস্য হওয়ার অযোগ্যতার বিধান রাখা হয়েছে। দায়িত্ব পালনে অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি বা অসদাচরণের অভিযোগ প্রমাণিত হলে যথাযথ তদন্তের পর সদস্যকে অপসারণ করা যাবে।

সময়ের আলো/এসএকে
  বিষয়:   নতুন ছক  গ্রাম সরকার  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: