প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীর। ছবি : সংগৃহীত জাপানের সঙ্গে সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র উন্মোচন, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং জাপানি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীর। তিনি বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের প্রতি আন্তর্জাতিক মহলের আগ্রহ রয়েছে। পারস্পরিক স্বার্থ ও আস্থার ভিত্তিতে জাপানের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করার সুযোগ তৈরি হয়েছে এই সফরের মাধ্যমে।
সোমবার টোকিওতে বাংলাদেশ দূতাবাসে প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। সফরের প্রথম দিনের কর্মসূচির বিবরণ তুলে ধরে তিনি জানান, দীর্ঘ যাত্রা শেষে টোকিও পৌঁছেও প্রধানমন্ত্রী বিশ্রাম না নিয়ে দেশের স্বার্থে সফরের কর্মসূচিগুলো কীভাবে সর্বোচ্চ কার্যকর করা যায়, তা নিয়ে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় আলোচনা করেন। এরপর সামান্য খাবার গ্রহণ করে ধারাবাহিক কর্মসূচিতে অংশ নেন তিনি।
হুমায়ুন কবীর বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কর্মস্পৃহা ও দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মানসিকতা সফরের প্রথম দিনেই স্পষ্ট হয়েছে। শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় থেকে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে ঐতিহাসিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। পরবর্তী সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জাপান সফরও এ সম্পর্ক উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছে। তারেক রহমানের বর্তমান সফরের লক্ষ্য সেই সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া।
সফরের প্রথম দিনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ লীগের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী তারো আসোর নেতৃত্বে ওই প্রতিনিধিদলে দেশটির লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির জ্যেষ্ঠ নেতারা ও অন্য প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ক জোরদার, জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং প্রযুক্তি হস্তান্তর নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানান, তারো আসোর সঙ্গে আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের উন্নয়ন এবং দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে তাঁর অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর আহ্বান জানান। এ সময় তারো আসোকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণও জানান প্রধানমন্ত্রী।
জাপানি বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়েও সফরের প্রথম দিনে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয়। প্রধানমন্ত্রী মারুবেনি করপোরেশনের চেয়ারম্যান ও জাপান-বাংলাদেশ কমিটি ফর কমার্শিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশনের সভাপতি মাসুমি কাকিনোকির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বৈঠকে দুই দেশের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানো, বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং সদ্য স্বাক্ষরিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা হয়।
হুমায়ুন কবীর বলেন, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি, জ্বালানি, উন্নত উৎপাদনশিল্প, সার উৎপাদন এবং শিল্পকারখানা আধুনিকায়নের মতো খাতে জাপানি বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানির আধুনিকায়ন এবং দ্বিতীয় সার কারখানা স্থাপনে সহযোগিতার সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশে বিনিয়োগের নতুন সুযোগ কাজে লাগিয়ে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও সম্প্রসারণে প্রধানমন্ত্রী গুরুত্ব দিয়েছেন।
বাংলাদেশের অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রকল্পে জাপানের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) প্রেসিডেন্ট ড. তানাকা আকিহিকোর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বৈঠকে চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা এবং সহযোগিতা অব্যাহত রাখার বিষয়ে আলোচনা হয়।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানান, প্রধানমন্ত্রী প্রযুক্তি উদ্ভাবন, কৃষির আধুনিকায়ন, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প এবং লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতে জাপানি বিনিয়োগের সম্ভাবনা তুলে ধরেন। পাশাপাশি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও সক্ষমতা বাড়াতে জাপানের সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জানান। জাইকার প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশের উন্নয়ন কার্যক্রমে সংস্থাটির সহযোগিতা অব্যাহত রাখার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন বলেও জানান তিনি।
এদিকে, নিপ্পন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সাসাকাওয়ার আয়োজিত নৈশভোজে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের প্রতি আগ্রহী সাসাকাওয়া এর আগে বাংলাদেশ সফর করেছেন বলে জানান হুমায়ুন কবীর। তার মতে, প্রধানমন্ত্রীর এ সফরের মধ্য দিয়ে জাপানের সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ছে। আগামী দিনগুলোতে আরও গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক ও কর্মসূচি রয়েছে, যেগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশে বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্র উন্মোচিত হওয়ার আশা করা হচ্ছে।
হুমায়ুন কবীর বলেন, বাংলাদেশ এখন পারস্পরিক আস্থা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে চায়। দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে বিনিয়োগ ও ব্যবসার শক্তিশালী গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই সরকারের লক্ষ্য। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ ও জাপানের সম্পর্ক আরও গভীর হবে এবং দুই দেশের জনগণের জন্য নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে সরকার আশাবাদী।
সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমান, উপ-প্রেস সচিব শাহাদাত স্বাধীন, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের সদস্যরা এবং টোকিওতে বাংলাদেশ দূতাবাসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সময়ের আলো/জেডি