জুয়ার চোরাবালিতে ডুবছে স্বপ্ন, বাড়ছে অপরাধ

সালাহ উদ্দিন চৌধুরী

জাতীয়

২০ বছরের যুবক বিক্রমকে নিয়ে মায়ের স্বপ্ন ছিল আকাশছোঁয়া। অনলাইন জুয়ার চোরবালিতে ডুবে যায় সেই স্বপ্ন। মায়ের গভীর মমতা আর

2026-10-27T01:09:47+00:00
2026-10-27T01:09:47+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬,
১১ কার্তিক ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬
জাতীয়
জুয়ার চোরাবালিতে ডুবছে স্বপ্ন, বাড়ছে অপরাধ
সালাহ উদ্দিন চৌধুরী
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১:০৯ এএম 
প্রতীকী ছবি
২০ বছরের যুবক বিক্রমকে নিয়ে মায়ের স্বপ্ন ছিল আকাশছোঁয়া। অনলাইন জুয়ার চোরবালিতে ডুবে যায় সেই স্বপ্ন। মায়ের গভীর মমতা আর শাসনও ফেরাতে পারেনি বিক্রমকে। জুয়া খেলা নিয়ে ঝগড়ার পর মাকে মারধর করে রাতের আঁধারে ঘর থেকে বের করে দেয় বিক্রম। জুয়ার ক্রমাগত অর্থ হারানোর শোকে নিজেও করেন আত্মহত্যা। ঘটনাটি ঘটে গতকাল রাজধানীর বনানীতে। শুধু এক বিক্রমই নয়, চট্টগ্রামের বন্দর এলাকায় অনলাইন জুয়ায় টাকা হেরে স্ত্রীকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে মো. জাবেদ। গত ১০ আগস্ট অনলাইন জুয়ার ফাঁদে পড়ে রাজধানীর তুরাগে হাসান (২৩) নামে এক যুবক আত্মহত্যা করেন। এভাবে অনলাইন জুয়ার ফাঁদে পড়ে নিভে যাচ্ছে অনেক প্রাণ। ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে অনেক পরিবার।

আশঙ্কাজনক হারে অনলাইন জুয়া আসক্তি ছড়িয়ে পড়েছে দেশে। পরিসংখ্যান বলছে, দেশে বর্তমানে ৫০ লাখেরও বেশি মানুষ অনলাইন জুয়ায় আসক্ত হয়ে পড়েছে। তবে শুধু অনলাইন জুয়া পরিচালনাকারী কিংবা বিদেশ থেকে পরিচালিত জুয়ার অনলাইন প্ল্যাটফর্মের বাংলাদেশি এজেন্টই নয় একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারিতে রাখা হয়েছে অনলাইন জুয়ায় আসক্তদেরও।

গত কয়েক বছর ধরেই দেশের আনাচে-কানাচে ব্যাপক হারে বিস্তার লাভ করেছে অনলাইন জুয়া। অল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রাপ্তির লোভে যুব সমাজের একটি অংশ আসক্ত হয়ে পড়ছে অনলাইন জুয়াতে। জুয়ার অর্থ জোগাড় করতে জড়িয়ে পড়ছে নানা অপরাধে। বিস্তার ঘটছে মাদকের।

বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান শুরু করে। একের পর এক ধরা পড়তে থাকে অনলাইন জুয়ায় জড়িত চক্রগুলো। যার অধিকাংশই বিদেশি চক্রের বাংলাদেশি এজেন্ট।

গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযানের পাশাপাশি অনলাইন নজরদারি জোরদার করা হয়। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে নানা কৌশল অবলম্বন করছে জুয়াড়িরা। তারা ব্যাংকিং চ্যানেল বাদ দিয়ে বিকাশ ও রকেটের মতো মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) মাধ্যমে বিকল্প মাধ্যমে লেনদেন করছে। তবে সেসব মাধ্যমেও নজরদারি করছেন গোয়েন্দারা।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশে অনলাইন জুয়ার যেসব সাইট আছে তার সবই বিদেশ থেকে পরিচালিত হচ্ছে। কিন্তু এই প্ল্যাটফর্মগুলোতে টাকা জমা দেওয়া বা উত্তোলনের কাজটি সরাসরি ওয়েবসাইটের মাধ্যমে না হয়ে বাংলাদেশের এজেন্টদের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। এজেন্টরা ব্যবহারকারীদের পক্ষে অ্যাকাউন্ট খুলে দেন এবং সাইটে দেওয়া নির্দিষ্ট বিকাশ, নগদ বা রকেটের মতো মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস নম্বরে টাকা পাঠানোর নির্দেশনা দেন।

বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেফতারদের জিজ্ঞাসাবাদের সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যের বরাত দিয়ে গোয়েন্দারা জানান, এ এজেন্টরা প্রতিটি নতুন গ্রাহক সংগ্রহের জন্য যেমন কমিশন পান, তেমনই গ্রাহকদের জমা দেওয়া টাকার একটি নির্দিষ্ট অংশও তারা পান। এ ছাড়া এজেন্টরা নিয়মিত মাসিক বেতনও পেয়ে থাকেন।

এভাবে এসব এজেন্ট বিপুল অর্থ-সম্পদের মালিক হয়ে গেছেন। গত ২৬ আগস্ট রাজধানীর শাজাহানপুর থেকে এ রকমই একজন অনলাইনে জুয়া খেলার আন্তর্জাতিক পর্যায়ের একাধিক সাইটের ‘অ্যাডমিন’ ও ‘সুপার এজেন্ট’ অহিদুর রহমানকে (৪৩) আটক করে র‍্যাব (বর্তমানে এসআরবি)।

ওই সময় র‍্যাব জানায়, অহিদুর ও তার সহযোগীরা জুয়ার সাইট পরিচালনা করে আয় করা অর্থ দিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিপুল পরিমাণ জমি ও গাড়িসহ অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন। এ রকমই আরেকজন মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার গাড়াডোব গ্রামের কিয়াম উদ্দিনের ছেলে আনোয়ার (৩২)। যিনি অনলাইন ক্যাসিনো সম্রাট নামে পরিচিত। বিকাশ কর্মী থেকে অনলাইন জুয়ার মাফিয়া এজেন্ট বনে যাওয়া আনোয়ার দেশে-বিদেশে সম্পদের পাহাড় গড়েন। এর আগে আন্তর্জাতিক অনলাইন বেটিং ও অবৈধ জুয়া চক্রের বাংলাদেশ অংশের অন্যতম প্রধান সমন্বয়কারী সুমন রায়কে (২৮) গ্রেফতার করে পুলিশের অপরাধী তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এরপর গত ৩০ সেপ্টেম্বর বেনাপোল থেকে গ্রেফতার করা হয় আরেক বড় জুয়ার এজেন্ট স্নিগ্ধ সিকদারকে (৩১)। এরা দুজনও অবৈধ এই অর্থ দিয়ে বিপুল অর্থ সম্পদের মালিক হয়েছেন।

সিআইডির পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মো. ছুফি উল্লাহ জানান, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট, ফুটবলসহ বিভিন্ন খেলা এবং অনলাইন ক্যাসিনোকে কেন্দ্র করে এসব সাইটে অর্থ লেনদেন চলে। এ এজেন্টরা জুয়ার অর্থের ‘ডিপোজিট ও উইথড্র’ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নতুন জুয়া সাইটের কাস্টমার সাপোর্ট পরিচালনার দায়িত্বে থাকে। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ও ফুটবলসহ বিভিন্ন খেলা এবং অনলাইন ক্যাসিনোকে কেন্দ্র করে এসব সাইটে অর্থ লেনদেন বেড়ে যায়।

অন্যদিকে অনলাইন জুয়ার এজেন্টেদের গ্রেফতারের পাশাপাশি অনলাইন জুয়ায় আসক্তদেরও গোয়েন্দা নজরদারিতে রাখা হয়েছে। স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি), পুলিশি অপরাধী তদন্ত বিভাগসহ (সিআইডি) একাধিক সংস্থা তাদের বিষয়ে নজরদারি করছে বলে জানা যায়। সাম্প্রতিক সময়ে অনলাইন জুয়ার এজেন্টদেরও পাশাপাশি জুয়ায় আসক্তদেরও গ্রেফতার করা হয়েছে।

গত ১৩ অক্টোবর রাজধানীর আদাবরের মোহাম্মদিয়া হাউজিং সোসাইটির একটি ফ্ল্যাটে অনলাইন জুয়া খেলার সময় মো. রাকিব হোসেন (২৫) নামের যুবককে আটক করে এসআরবি-২।

গত ২০ অক্টোবর গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে আট জুয়াড়িকে গ্রেফতার করে এসআরবি-১৩। গত ১৪ অক্টোবর ব্রাহ্মণবাড়িয়া খাদেমপাড়ার একটি চায়ের দোকান থেকে অনলাইন জুয়া খেলার সময় পাঁচজনকে গ্রেফতার করে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন। এর আগে গত ১৮ সেপ্টেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অনলাইন জুয়া খেলার অভিযোগে চারজনকে গ্রেফতার করে এসআরবি-৯-এর একটি টিম। গত ২৩ সেপ্টেম্বর পাবনায় আতাইকুলা থেকে অনলাইনে জুয়া খেলার অপরাধে চারজনকে আটক করে এসআরবি।

এসআরবি সূত্রে জানা যায়, অনলাইন জুয়ার কারণে তরুণদের একটি অংশ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অর্থ হারানোর হতাশা থেকে কেউ কেউ মাদক, চুরি ও ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। যুব সমাজকে এ ধরনের অবক্ষয় থেকে রক্ষা করতে অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।


অন্যদিকে দেশে যুব সমাজের একটি অংশ অনলাইন জুয়ায় আসক্ত হয়ে পড়েছে। অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে মোটা অঙ্কের অর্থ। সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় অনলাইন জুয়া রোধে কঠোর আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। চলতি বছর পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বর্তমানে ৫০ লাখেরও বেশি মানুষ অনলাইন জুয়ায় আসক্ত। যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ২০২৭ সালের মধ্যে এই সংখ্যা দুই কোটি ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে জানানো হয়, বাংলাদেশে অনলাইন জুয়ার বাজারের আকার বর্তমানে প্রায় ৮৩০ কোটি টাকা (৬২-৬৮ মিলিয়ন ডলার)। প্রতি বছর এই বাজার ৪ দশমিক ৭ থেকে ৬ দশমিক ১ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার গত ৩০ জুন জাতীয় সংসদে ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন ২০২৬’ পাস করেছে। এই আইনের আওতায় অনলাইন জুয়া, বেটিং (বাজি ধরা), ম্যাচ ফিক্সিং, ডিজিটাল ওয়ালেট এবং প্রযুক্তিভিত্তিক সব ধরনের জুয়াকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

নতুন এই আইনে অনলাইন বা দূরবর্তী জুয়ায় জড়িত থাকার দায়ে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং এক কোটি টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। এ ছাড়া অনলাইন বেটিংয়ে অংশ নিলে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড এবং পাঁচ কোটি টাকা জরিমানা হতে পারে। পাশাপাশি জুয়ার প্রচার ও বিজ্ঞাপনকেও এই আইনে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। 

সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি  
  বিষয়:   জুয়া  স্বপ্ন  অপরাধ 


Advertisement
Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: