সংগৃহীত ছবিনতুন জাতীয় বেতন-কাঠামো বাস্তবায়নের আগেই বেতন নির্ধারণের বিভিন্ন নিয়ম নিয়ে জটিলতা দেখা দিয়েছে। কোথাও নিচের গ্রেডের কর্মচারী বেশি মূল বেতন পাচ্ছেন, কোথাও পদোন্নতি বা উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার পর মূল বেতন বাড়লেও বাড়িভাড়া ভাতা কমে মোট আয় কমার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার যোগ্যতা ও সময় নির্ধারণের নিয়ম নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
আগামী ১ নভেম্বর চার মাসের বকেয়সহ নতুন কাঠামোর বর্ধিত বেতন দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। তবে আইবাস++ ব্যবস্থার জটিলতা এবং বেতন নির্ধারণের নিয়মে অসংগতির কারণে অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন নির্ধারণের কাজ এখনো শেষ হয়নি। ফলে নির্ধারিত সময়ে বর্ধিত বেতন না পেয়ে আপাতত পুরোনো কাঠামোয় বেতন পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অর্থ বিভাগের সূত্র জানায়, দেশে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী, ৮ লাখ পেনশনভোগী ও ৬ লাখ এমপিওভুক্ত শিক্ষক রয়েছেন। তাদের সবাই এখনো নতুন কাঠামোয় বেতন নির্ধারণ করতে পারেননি। যাদের বেতন নির্ধারণের কাজ শেষ হয়নি, তারা আপাতত পুরোনো কাঠামোয় বেতন পাবেন। নতুন কাঠামো অনুযায়ী বকেয়া অর্থ পরে পরিশোধ করা হবে।
নতুন কাঠামোর বিভিন্ন জটিলতা নিরসনে অর্থসচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদারের কাছে আবেদন করা হলেও গত সোমবার পর্যন্ত সেগুলোর সুরাহা হয়নি। অর্থ বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়সহ কয়েকটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগে এ ধরনের সমস্যা রয়েছে।
বেতন নির্ধারণে উল্টে যাচ্ছে গ্রেডের ক্রম
নতুন বেতন-কাঠামোর প্রজ্ঞাপন ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দেওয়া হিসাব বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বেতন নির্ধারণের পদ্ধতিতে গ্রেডভিত্তিক বেতনের স্বাভাবিক ক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নতুন কাঠামোয় ১১তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ২৫ হাজার টাকা এবং ১২তম গ্রেডের ২৪ হাজার ৩০০ টাকা। অর্থাৎ প্রারম্ভিক বেতনে ১১তম গ্রেড এগিয়ে ৭০০ টাকা।
কর্মচারীদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ১১তম গ্রেডের একজন কর্মচারীর ২০১৫ সালের প্রারম্ভিক মূল বেতন ছিল ১২ হাজার ৫০০ টাকা। গত ৩০ জুন তার মূল বেতন দাঁড়ায় ২৩ হাজার ৬৬০ টাকা। অর্থাৎ পুরোনো কাঠামোয় মূল বেতন বেড়েছিল ১১ হাজার ১৬০ টাকা। নতুন কাঠামোর ২৫ হাজার টাকা প্রারম্ভিক বেতনের সঙ্গে এই বৃদ্ধি যোগ করলে হয় ৩৬ হাজার ১৬০ টাকা। নতুন কাঠামোয় ওই অঙ্কের ধাপ না থাকায় পরবর্তী ধাপ অনুযায়ী তার বেতন নির্ধারণ হচ্ছে ৩৭ হাজার টাকা।
অন্যদিকে, ১২তম গ্রেডের একজন কর্মচারীর ২০১৫ সালের প্রারম্ভিক মূল বেতন ছিল ১১ হাজার ৩০০ টাকা। গত ৩০ জুন তার মূল বেতন ছিল ২৩ হাজার ৫৮০ টাকা। পুরোনো কাঠামোয় তার মূল বেতন বেড়েছিল ১২ হাজার ২৮০ টাকা। নতুন কাঠামোর ২৪ হাজার ৩০০ টাকা প্রারম্ভিক বেতনের সঙ্গে এই বৃদ্ধি যোগ করলে হয় ৩৬ হাজার ৫৮০ টাকা। পরবর্তী ধাপ অনুযায়ী তার বেতন নির্ধারণ হচ্ছে ৩৭ হাজার ৭০০ টাকা।
ফলে নতুন কাঠামোয় ১১তম গ্রেডের কর্মচারীর মূল বেতন দাঁড়াচ্ছে ৩৭ হাজার টাকা, আর ১২তম গ্রেডের কর্মচারীর ৩৭ হাজার ৭০০ টাকা। অর্থাৎ প্রারম্ভিক বেতনে এগিয়ে থাকা ১১তম গ্রেডের কর্মচারী বেতন নির্ধারণের পর ১২তম গ্রেডের কর্মচারীর চেয়ে ৭০০ টাকা কম মূল বেতন পাচ্ছেন।
পর্যায়ক্রমে সুবিধা কার্যকর হলেও থাকছে ব্যবধান
কর্মচারীদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, নতুন কাঠামোর সুবিধা ধাপে ধাপে কার্যকর হলেও দুই গ্রেডের বেতনের ব্যবধান দূর হচ্ছে না। বরং বিভিন্ন পর্যায়ে এই ব্যবধান বজায় থাকছে।
১ জুলাই ২০২৬ থেকে প্রথম পর্যায়ে ৫০ শতাংশ সুবিধা কার্যকর হলে ১১তম গ্রেডের মূল বেতন দাঁড়াবে ৩১ হাজার ২৩০ টাকা এবং ১২তম গ্রেডের ৩১ হাজার ৫৯০ টাকা। এতে ১২তম গ্রেডের কর্মচারী ৩৬০ টাকা বেশি পাবেন।
একইভাবে, ১ জানুয়ারি ২০২৭ থেকে ৭৫ শতাংশ সুবিধা কার্যকর হলে ১১তম গ্রেডের মূল বেতন হবে ৩৫ হাজার ১৫ টাকা এবং ১২তম গ্রেডের ৩৫ হাজার ৫৯৫ টাকা। তখন দুই গ্রেডের ব্যবধান দাঁড়াবে ৫৮০ টাকা। আর ১ জুলাই ২০২৭ থেকে শতভাগ সুবিধা কার্যকর হলে ১১তম গ্রেডের বেতন হবে ৪০ হাজার ৮০০ টাকা এবং ১২তম গ্রেডের ৪১ হাজার ৬০০ টাকা। সে ক্ষেত্রে ব্যবধান বেড়ে হবে ৮০০ টাকা।
নতুন প্রজ্ঞাপনের অনুচ্ছেদ ৫ ও ৯ অনুযায়ী, ১ জুলাই ২০২৬ তারিখে বেতন নির্ধারণ করে নতুন নির্ধারিত বেতন ও বর্তমান বেতনের পার্থক্যের ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে ৫০, ৭৫ ও ১০০ শতাংশ সুবিধা কার্যকরের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কর্মচারীদের অভিযোগ, এই পদ্ধতিতে বেতন নির্ধারণের সময়ই গ্রেডভিত্তিক বেতনের স্বাভাবিক ক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
পদোন্নতি পেলেও কমতে পারে মোট আয়
নতুন কাঠামোয় আরেকটি অসংগতি দেখা দিয়েছে বাড়িভাড়া ভাতার হিসাবে। কর্মচারীদের দেওয়া একটি হিসাব অনুযায়ী, দশম গ্রেডের একজন কর্মকর্তা ১০ বছর চাকরি পূর্ণ করার পর নবম গ্রেডে পদোন্নতি বা প্রথম উচ্চতর গ্রেড পেলে তার মূল বেতন ৪৯ হাজার ৭০০ টাকা থেকে বেড়ে ৫১ হাজার টাকা হবে। অর্থাৎ মূল বেতন বাড়বে ১ হাজার ৩০০ টাকা।
কিন্তু গ্রেড পরিবর্তনের সঙ্গে বাড়িভাড়া ভাতার হার কমে যাওয়ায় মোট আয় কমে যেতে পারে। দশম গ্রেডে ৪৯ হাজার ৭০০ টাকা মূল বেতনের ওপর ৫০ শতাংশ হারে বাড়িভাড়া ভাতা হয় ২৪ হাজার ৮৫০ টাকা। নবম গ্রেডে ৫১ হাজার টাকা মূল বেতনের ওপর ৪৫ শতাংশ হারে বাড়িভাড়া ভাতা হয় ২২ হাজার ৯৫০ টাকা।
অর্থাৎ পদোন্নতি বা উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার পর মূল বেতন ১ হাজার ৩০০ টাকা বাড়লেও বাড়িভাড়া ভাতা কমবে ১ হাজার ৯০০ টাকা। ফলে মূল বেতন ও বাড়িভাড়া ভাতা মিলিয়ে মাসিক আয় ৬০০ টাকা কমে যেতে পারে। কর্মচারীদের আশঙ্কা, একই ধরনের সমস্যা অন্য গ্রেডেও দেখা দিতে পারে।
উচ্চতর গ্রেডে জ্যেষ্ঠতা নিয়ে উদ্বেগ
উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার যোগ্যতা ও সময় নির্ধারণের নিয়ম নিয়েও আপত্তি জানিয়েছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তাদের অভিযোগ, ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে যাদের চাকরির বয়স আট বছর পূর্ণ হয়েছে এবং যাদের ১০ বছর পূর্ণ হয়েছে, তারা উভয়েই ১ জুলাই থেকে প্রথম উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার যোগ্য হতে পারেন।
এতে একই গ্রেডের জ্যেষ্ঠ ও জুনিয়র কর্মকর্তার বেতন সমান হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আবার বেতন নির্ধারণের ধাপের কারণে কোনো কোনো ক্ষেত্রে জুনিয়র কর্মকর্তার বেতন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার চেয়েও বেশি হতে পারে।
কর্মচারীদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সময়ের ব্যবধান থেকেও ভবিষ্যতে বেতনবৈষম্য তৈরি হতে পারে। দুবার উচ্চতর গ্রেড পেতে একজন জুনিয়র কর্মকর্তার ১৪ বছর লাগলেও একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার ক্ষেত্রে লাগতে পারে ১৬ বছর। তাদের মতে, উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার যোগ্যতা ও সময় নির্ধারণের নিয়ম স্পষ্ট না হলে এ ধরনের অসংগতি দূর করা কঠিন হবে।
আইবাস++-এর জটিলতায় শেষ হয়নি বেতন নির্ধারণ
নতুন কাঠামোয় বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে আইবাস++ ব্যবস্থার জটিলতাও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তাদের দাবি, এ কাজে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের যথাযথভাবে কাজে লাগানো হয়নি। অভিজ্ঞ জনবলের ঘাটতি ও নতুন কর্মকর্তাদের অনভিজ্ঞতার কারণে অনেকের বেতন নির্ধারণের কাজ এখনো শেষ হয়নি।
আইবাস++ সরকারের সমন্বিত আর্থিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি। সরকারের বাজেট ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণ, বিল তৈরি, অর্থ পরিশোধ এবং সরকারি আয়-ব্যয়ের হিসাব রাখার কাজে এই ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়।
গত ১৭ সেপ্টেম্বর নতুন জাতীয় বেতন-কাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারি হয়। ৫ অক্টোবর থেকে বেতন নির্ধারণের কাজ শুরু হলেও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী এখনো তা শেষ করতে পারেননি। তাদের অভিযোগ, বেতন নির্ধারণের নিয়ম প্রয়োগ করতে গিয়ে গ্রেডের স্বাভাবিক ক্রম, উচ্চতর গ্রেড এবং বাড়িভাড়া ভাতার হিসাব নিয়ে অসংগতি দেখা দিয়েছে।
সমাধানের আশ্বাস, তবে নির্দিষ্ট সময়সীমা নিয়ে অনিশ্চয়তা
নতুন কাঠামোর জটিলতা নিয়ে জানতে চাইলে অর্থসচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে অর্থ বিভাগের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, প্রজ্ঞাপন তৈরি ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জানাশোনার ঘাটতির কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সমস্যাগুলোর সমাধানে তারা কাজ করছেন এবং অতীতের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের পরামর্শ নিচ্ছেন।
আগামী ১ নভেম্বর থেকে বর্ধিত বেতন দেওয়ার পরিকল্পনা থাকায় দ্রুত অসংগতিগুলো দূর করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তাদের দাবি, অর্থ বিভাগ বেতন নির্ধারণের নিয়ম, গ্রেডের ক্রম, উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার যোগ্যতা ও বাড়িভাড়া ভাতার হিসাব পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সংশোধন আনুক।
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মতে, নিয়মগুলো স্পষ্ট করে অসংগতি দূর করা গেলে জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতির আর্থিক সুবিধা নিয়ে বিরোধ কমবে। একই সঙ্গে নির্ধারিত সময়ে সবার বেতন নির্ধারণ এবং বকেয়া অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়াও সহজ হবে। তবে ১ নভেম্বরের আগে সব সমস্যার সমাধান না হলে অনেকের বর্ধিত বেতন পেতে অপেক্ষা করতে হতে পারে।
সময়ের আলো/কেএইচও