গ্রাফিক : সময়ের আলোপড়াশোনা, বিনোদন, ছবি আঁকা কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ, কন্যাশিশুর বেড়ে ওঠার সঙ্গে এখন জড়িয়ে আছে ডিজিটাল প্রযুক্তি। স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন গেম ও বিভিন্ন শিক্ষামূলক অ্যাপ তাদের সামনে খুলে দিচ্ছে নতুন সম্ভাবনার দরজা। কিন্তু এই ভার্চুয়াল জগৎ সব সময় নিরাপদ নয়। অনলাইন হয়রানি, সাইবার বুলিং, ব্যক্তিগত ছবি ছড়িয়ে দেওয়া, ভুয়া পরিচয়ে বন্ধুত্ব এবং অপরিচিত ব্যক্তির প্রলোভন কন্যাশিশুর নিরাপত্তার জন্য তৈরি করছে নানা ঝুঁকি। তাই প্রশ্ন উঠছে, ডিজিটাল দুনিয়ায় কতটা নিরাপদ আমাদের মেয়েরা?
অনলাইন হয়রানির অদৃশ্য ক্ষত
বাস্তব জীবনের মতো অনলাইনেও মেয়েদের নানা ধরনের হয়রানির শিকার হতে হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য, চেহারা বা পোশাক নিয়ে বিদ্রুপ, অনুমতি ছাড়া ছবি প্রকাশ, ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলে অপমান করা বা ব্যক্তিগত কথোপকথনের স্ক্রিনশট ছড়িয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা তাদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। অনেক সময় সহপাঠী বা পরিচিতদের কাছ থেকেও সাইবার বুলিংয়ের শিকার হতে হয়। আবার অনলাইনে অপরিচিত কেউ বন্ধুত্বের প্রস্তাব দিয়ে ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি বা ভিডিও চাইতে পারে। কখনো উপহার দেওয়ার প্রলোভন, কখনো আবেগের সম্পর্ক তৈরির মাধ্যমে শিশুকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে থাকে। একপর্যায়ে ব্যক্তিগত ছবি প্রকাশের ভয় দেখিয়ে অর্থ দাবি বা আরও ছবি পাঠাতে বাধ্য করার মতো ঘটনাও ঘটতে পারে।
শিশুরা অনেক সময় বুঝতে পারে না, অনলাইনে পরিচিত হওয়া মানেই কাউকে বিশ্বাস করা নয়। পরিচিত কারও অ্যাকাউন্ট থেকেও প্রতারণামূলক বার্তা আসতে পারে। ফলে প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি ডিজিটাল ঝুঁকি সম্পর্কেও ধারণা থাকা জরুরি।
নিষেধ নয়, প্রয়োজন সচেতনতা
সন্তানের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অনেক অভিভাবক স্মার্টফোন বা ইন্টারনেট ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে চান। কিন্তু প্রযুক্তি থেকে দূরে রাখাই সবসময় সমাধান নয়। কারণ ডিজিটাল দক্ষতা এখন শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ কর্মজীবনেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বরং শিশু যেন নিরাপদে প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে, সেই সক্ষমতা তৈরি করাই বেশি কার্যকর।
প্রথমেই তাকে বোঝাতে হবে, নিজের পুরো নাম, বাসার ঠিকানা, স্কুলের নাম, ফোন নম্বর, পাসওয়ার্ড কিংবা দৈনন্দিন চলাফেরার তথ্য অনলাইনে প্রকাশ করা উচিত নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টের গোপনীয়তা বা প্রাইভেসি সেটিংস ঠিক রাখা, শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
একইভাবে কেউ ব্যক্তিগত ছবি চাইলে, অস্বস্তিকর বার্তা পাঠালে কিংবা গোপন রাখার শর্তে কোনো কিছু করতে বললে শিশুকে ‘না’ বলতে শেখাতে হবে।
বিশ্বাসের জায়গা তৈরি করুন
অনলাইন নিরাপত্তার ক্ষেত্রে অভিভাবকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলতে হবে, সে কোন অ্যাপ ব্যবহার করছে, অনলাইনে কাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে এবং কোনো অভিজ্ঞতায় অস্বস্তি বোধ করছে কি না, তা জানতে হবে। তবে এই আলোচনা যেন জেরা বা নজরদারির মতো না হয়। শিশু যাতে নির্ভয়ে নিজের সমস্যার কথা বলতে পারে, সেই পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন।
কন্যাশিশু অনলাইনে হয়রানির শিকার হলে তাকে দোষারোপ করা বা ফোন কেড়ে নেওয়ার হুমকি দেওয়া উচিত নয়। এতে সে ভবিষ্যতে সমস্যার কথা গোপন করতে পারে। বরং তার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে এবং বোঝাতে হবে, কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্য সে দায়ী নয়। হয়রানির শিকার হলে সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট ব্লক ও রিপোর্ট করা, প্রমাণ হিসেবে বার্তা বা স্ক্রিনশট সংরক্ষণ করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিশ্বস্ত অভিভাবক, শিক্ষক বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাহায্য নেওয়া উচিত। গুরুতর হুমকি, ব্ল্যাকমেইল বা ব্যক্তিগত ছবি ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটলে দেরি না করে আইনগত সহায়তা নিতে হবে।
আত্মবিশ্বাসী হোক
কন্যাশিশুর ডিজিটাল নিরাপত্তা শুধু পরিবারের দায়িত্ব নয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও অনলাইন শিষ্টাচার, সাইবার বুলিং প্রতিরোধ, ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা এবং অভিযোগ জানানোর উপায় সম্পর্কে নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোরও শিশুদের উপযোগী নিরাপত্তাব্যবস্থা ও সহজ অভিযোগ জানানোর সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।
মেয়েদের নিরাপত্তার নামে তাদের স্বাধীনতা সীমিত না করে ঝুঁকি বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তৈরি করতে হবে। প্রযুক্তির জগৎ থেকে দূরে সরিয়ে রাখা নয় বরং সেই জগতে নিরাপদে চলার শিক্ষা দেওয়াই হোক লক্ষ। কারণ, ডিজিটাল দুনিয়ায় কন্যাশিশুর প্রকৃত নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে তখনই, যখন সে নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হবে, বিপদের সংকেত চিনতে পারবে এবং প্রয়োজন মুহূর্তে নির্ভয়ে সাহায্য চাইতে পারবে। প্রযুক্তির ব্যবহার শেখানোর পাশাপাশি অনলাইন ঝুঁকি চেনা, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত রাখা এবং বিপদে পড়লে বড়দের সাহায্য নেওয়ার শিক্ষাটি শেখাতে হবে।
সময়ের আলো/জেডআই