১১ দলীয় ঐক্যের লং মার্চ। ছবি : সময়ের আলো কোলাজ বিএনপি সরকার গঠনের পর থেকে বিভিন্ন দাবি আদায়ে লংমার্চ ও আন্দোলন কর্মসূচি পালন করে আসছে ১১ দলীয় ঐক্য। শনিবার (৩১ অক্টোবর) ঢাকা থেকে খুলনায় লংমার্চের প্রস্তুতিও নিচ্ছে জোটটি। এর আগে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-রংপুর মহাসড়কেও লং মার্চ কর্মসূচি পালন করেছে তারা। তবে রাজপথের এই আন্দোলনের পরিবর্তে সংসদে আলোচনা করে সমস্যার সমাধানের পরামর্শ দিচ্ছে বিএনপি। দলটির নেতাদের মতে, দাবি-দাওয়া থাকলে তা আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তির পথ খোঁজা উচিৎ; রাজপথের কর্মসূচি দিয়ে নির্বাচিত সরকারকে চাপে ফেলার চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়।
গত ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা-চট্টগ্রাম এবং ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা-রংপুর মহাসড়কে লংমার্চ করে ১১ দলীয় ঐক্য। এবার ৩১ অক্টোবর ঢাকা থেকে খুলনামুখী লংমার্চের প্রস্তুতি চলছে। ১১ দলীয় ঐক্যের প্রধান সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ জানিয়েছেন, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। কর্মসূচি আরও জোরদার করার পাশাপাশি জনগণকে সংগঠিত করার কথাও বলেছেন তিনি।
বিরোধীদের দাবিতে রাজনৈতিক চাপ
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন ও জুলাই জাতীয় সনদ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারসহ সাত দফা দাবিকে সামনে রেখে ঢাকা-খুলনা লং মার্চ ঘোষণা ১১–দলীয় ঐক্যের। সাত দফা দাবির বাকি বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, গ্যাস ও সারের সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, দুর্নীতি–চাঁদাবাজি ও দখলদারি বন্ধ এবং প্রশাসনের সর্বস্তরে দলীয়করণ বন্ধ করা।
১১ দলের নেতাদের অভিযোগ, গণভোটের রায় উপেক্ষা করে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। এ অবস্থানের প্রতিবাদ জানাতেই ধারাবাহিকভাবে রাজপথে কর্মসূচি পালন করছেন তারা।
আন্দোলনের পাশাপাশি বিভিন্ন ইস্যুতে রাজপথে সক্রিয় রয়েছে ১১ দলীয় ঐক্যের অন্যতম শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টিও। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, জননিরাপত্তাহীনতা, হত্যাকাণ্ড, চাঁদাবাজি ও লুটপাটের প্রতিবাদে শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) রাজধানীর শাহবাগে গণবিক্ষোভের আয়োজন করে দলটি।
ওই কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকার নতুন করে ভারতকে করিডোর দেওয়ার চেষ্টা করছে; কোনোভাবেই তা হতে দেওয়া হবে না। বিএনপির প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগও করেন তিনি।
সরকার গঠনের প্রথম দিন থেকেই বিএনপি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করছে উল্লেখ করে নাহিদ বলেন, সংবিধান সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন ছিল গণভোটের অন্যতম প্রতিশ্রুতি।
একই কর্মসূচিতে এনসিপির সদস্য সচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, নির্বাচনের পর দেশ তো ঠিক হয়নি, বিএনপি নিজেরাও ঠিক হতে পারেনি। গ্যাসের দাম এবং সরকারের বিভিন্ন খাতের ব্যর্থতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। স্বরাষ্ট্র ও জ্বালানিমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেন আখতার।
বিএনপি দিচ্ছে আলোচনার পরামর্শ
অন্যদিকে, সরকারের এক বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিরোধী জোটের এমন আন্দোলন-কর্মসূচি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিএনপি। দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর মতে, কোনো দাবি থাকলে সংসদে আলোচনা করেই সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব। বিরোধী দলে থাকা রাজনৈতিক নেতাদের আচরণ ফ্যাসিস্টদের মতো হলে তা দুঃখজনক বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রিজভী বলেন, কোনো কর্মসূচি যদি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয় এবং নির্বাচিত সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য আয়োজন করা হয়, তাহলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। তার ভাষ্য, সরকার দেশের অর্থনীতি গুছিয়ে তোলা ও সামাজিক অবস্থার উন্নয়নে কাজ করছে। এ অবস্থায় সরকারের প্রতিও সবার দায়িত্বশীল আচরণ করা উচিত। বিরোধী দলের উচিত অযথা রাজপথ উত্তপ্ত না করে গঠনমূলক সমালোচনা করা।
তিনি আরও বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্য জরুরি। এমন পরিস্থিতিতে রাজপথের কর্মসূচি রাজনৈতিক ঐকমত্য নষ্ট করতে পারে। গণতন্ত্রের বিকাশ ও চর্চার জন্য সংসদে আলোচনার পথ অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
শুধু বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব নন, সরকারের ভেতর থেকেও এসেছে আলোচনার প্রস্তাব। সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলের মতামত ও প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছিল সরকার।
গত ২৭ সেপ্টেম্বর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ আশ্বস্ত করেছেন, বিরোধী দল কমিটির আলোচনায় অংশ নিলে তাদের প্রস্তাব ও মতামতও সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়ায় বিবেচনা করা হবে।
সরকারদলীয় চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনিও বিরোধী দলকে সংসদে আলোচনার আহ্বান জানিয়েছেন। গত ২৫ অক্টোবর জাতীয় সংসদের এলডি হলে আসন্ন কপ সম্মেলন নিয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, রাজপথে লংমার্চ ও মিছিল না করে সংসদে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা উচিত। লংমার্চ করে যদি সব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হতো, তাহলে সবার আগে প্রধানমন্ত্রীই সেই উদ্যোগ নিতেন।
নূরুল ইসলাম মনি বলেন, দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ বের করা প্রয়োজন। সংসদই জনগণের প্রতিনিধিদের মতামত তুলে ধরা এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনার উপযুক্ত জায়গা। একই সঙ্গে সরকারের সমালোচনা না করে বৈশ্বিক সমস্যা সমাধানে পাশে থাকার আহ্বান জানান তিনি।
তবে ১১ দলীয় জোটের নেতারা বলছেন, সংসদে আলোচনার পাশাপাশি জনগণের দাবি আদায়ে রাজপথের কর্মসূচিও চালিয়ে যাবেন তারা। জোটের প্রধান সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদের ভাষ্য, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।
সময়ের আলো/জেডি