শ্রমিকের ঘামের মূল্য ও মর্যাদা রক্ষা

মুফতি আনিসুর রহমান রিজভি

ইসলাম

একটি সমাজের সমৃদ্ধি ও রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অগ্রগতির নেপথ্যে যাদের নিরলস শ্রম জড়িয়ে আছে তারা হলেন শ্রমজীবী মানুষ। তাদের ঘামে গড়ে

2026-11-04T10:44:33+00:00
2026-11-04T10:44:33+00:00
 
  বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬,
২০ কার্তিক ১৪৩৩
বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬
ইসলাম
শ্রমিকের ঘামের মূল্য ও মর্যাদা রক্ষা
মুফতি আনিসুর রহমান রিজভি
প্রকাশ: বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৬, ১০:৪৪ এএম 
গ্রাফিক সময়ের আলো
একটি সমাজের সমৃদ্ধি ও রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অগ্রগতির নেপথ্যে যাদের নিরলস শ্রম জড়িয়ে আছে তারা হলেন শ্রমজীবী মানুষ। তাদের ঘামে গড়ে ওঠে অট্টালিকা, সচল থাকে শিল্প-কারখানা, উৎপাদিত হয় খাদ্য এবং এগিয়ে যায় সভ্যতার চাকা। ইসলাম শ্রমিকের অধিকারকে নিছক সামাজিক দাবি হিসেবে বিবেচনা করে না; বরং এটিকে ন্যায়বিচার, আমানতদারি ও মানবিক দায়িত্বের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। শ্রমিকের মর্যাদা রক্ষা, ন্যায্য পারিশ্রমিক নির্ধারণ, যথাসময়ে মজুরি পরিশোধ এবং শোষণ-নির্যাতন প্রতিরোধে কুরআন ও সুন্নাহ দিয়েছে সুস্পষ্ট নির্দেশনা। ইসলামের শিক্ষা হলো শ্রমিকের শ্রম গ্রহণ করলে তার ন্যায্য অধিকারও যথাযথভাবে আদায় করতে হবে। নিম্নে এ বিষয়ে ইসলামের ১০টি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা তুলে ধরা হলো—

শ্রমের মর্যাদা ও হালাল উপার্জনের গুরুত্ব : ইসলাম হালাল উপার্জনের জন্য শ্রম ও কর্মপ্রচেষ্টাকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে। কোনো বৈধ পেশাই ছোট নয়; বরং সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে সম্পাদিত প্রতিটি কাজই সম্মানের দাবিদার। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর মানুষ তা-ই পায়, যার জন্য সে চেষ্টা-সাধনা করে’ (সুরা নাজম, আয়াত : ৩৯)। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কেউ নিজের হাতের উপার্জনের চেয়ে উত্তম খাদ্য কখনো খায়নি’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২০৭২)। এ শিক্ষা প্রমাণ করে, শ্রমের মাধ্যমে অর্জিত জীবিকা অত্যন্ত সম্মানজনক। তাই শ্রমিকের পেশাকে অবজ্ঞা করা কিংবা তার শ্রমকে তুচ্ছজ্ঞান করা ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গির পরিপন্থী। সমাজে শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে হলে সর্বপ্রথম শ্রমজীবী মানুষের প্রতি সম্মানজনক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে হবে।

শ্রমিকের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি রক্ষা করা : শ্রমিক ও মালিকের সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত স্বচ্ছতা, পারস্পরিক সম্মতি ও ন্যায়সংগত চুক্তি। কাজের ধরন, সময়, দায়িত্ব এবং পারিশ্রমিক শুরুতেই নির্ধারণ করা জরুরি। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা অঙ্গীকারগুলো পূর্ণ করো’ (সুরা মায়েদা, আয়াত : ১)। এই নির্দেশনার আলোকে শ্রমিকের সঙ্গে সম্পাদিত বৈধ চুক্তি যথাযথভাবে পালন করা মালিকের দায়িত্ব। কাজ আদায় করে পারিশ্রমিক কমিয়ে দেওয়া, অযৌক্তিক শর্ত আরোপ কিংবা একতরফাভাবে চুক্তি পরিবর্তন করা অন্যায়। চুক্তি রক্ষা শুধু ব্যবসায়িক শিষ্টাচার নয়; এটি একজন মুমিনের নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব।

ঘাম শুকানোর আগেই মজুরি পরিশোধ : শ্রমিকের পারিশ্রমিক যথাসময়ে পরিশোধ করা ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তার মজুরি দিয়ে দাও’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২৪৪৩)। এই হাদিসে শ্রমিকের পাওনা দ্রুত পরিশোধের প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। একজন শ্রমিকের উপার্জনের ওপর নির্ভর করে তার পরিবারের খাদ্য, চিকিৎসা, বাসস্থান ও সন্তানদের শিক্ষার ব্যয়। তাই সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও বেতন আটকে রাখা কিংবা অযথা বিলম্ব করা তার প্রতি জুলুমের শামিল। মনে রাখতে হবে, শ্রমিকের মজুরি কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি তার অর্জিত অধিকার।

পারিশ্রমিক আত্মসাৎ গুরুতর অপরাধ : ইসলাম অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ ভোগ করাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৮৮)। শ্রমিকের কাছ থেকে পূর্ণ কাজ আদায় করে তার মজুরি না দেওয়া, পাওনা অস্বীকার করা কিংবা অজুহাত দেখিয়ে পারিশ্রমিক আত্মসাৎ করা এই নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত। হাদিসে কুদসিতে রাসুলুল্লাহ (সা.) বর্ণনা করেছেন আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘কেয়ামতের দিন তিনি তিন শ্রেণির ব্যক্তির প্রতিপক্ষ হবেন। তাদের একজন হলো, যেকোনো শ্রমিককে নিয়োগ করে তার কাছ থেকে পূর্ণ কাজ আদায় করে, অথচ তার মজুরি পরিশোধ করে না’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২২২৭)। আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রতিপক্ষ হওয়ার এই ঘোষণা শ্রমিকের পাওনা আত্মসাতের ভয়াবহতা স্পষ্ট করে। সুতরাং শ্রমিকের মজুরি আত্মসাৎ করা শুধু আর্থিক অনিয়ম নয়; এটি আল্লাহর কাছে জবাবদিহির বিষয়।

শ্রম অনুপাতে ন্যায্য পারিশ্রমিক নির্ধারণ : শ্রমিকের কাজের ধরন, দক্ষতা, দায়িত্ব, সময় ও শ্রমের পরিমাণ বিবেচনায় ন্যায্য পারিশ্রমিক নির্ধারণ করা উচিত। শ্রমিকের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে অস্বাভাবিক কম মজুরি নির্ধারণ করা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা মানুষকে তাদের প্রাপ্য বস্তু কম দিয়ো না’ (সুরা আরাফ, আয়াত : ৮৫)। এই নির্দেশনা শ্রমিকের প্রাপ্য অধিকার যথাযথভাবে বুঝিয়ে দেওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরে। পারিশ্রমিক এমনভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন, যাতে শ্রমিক তার শ্রমের ন্যায্যমূল্য পান এবং মালিকও বৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন। অর্থনৈতিক ক্ষমতার অসমতা যেন শ্রমিক শোষণের হাতিয়ার না হয়, সে ব্যাপারে সচেতন থাকা জরুরি।

অধিকার আদায়ে বৈষম্য পরিহার : ইসলাম মানুষের মধ্যে জাতি, বর্ণ, ভাষা, শ্রেণি কিংবা সামাজিক অবস্থানের ভিত্তিতে অন্যায় বৈষম্য সমর্থন করে না। প্রত্যেক শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন, তোমরা আমানতগুলো তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দেবে এবং মানুষের মধ্যে বিচার করলে ন্যায়বিচারের সঙ্গে বিচার করবে’ (সুরা নিসা, আয়াত : ৫৮)। এই নির্দেশনার আলোকে শ্রমিকের ধর্মীয় পরিচয়, সামাজিক অবস্থান কিংবা ব্যক্তিগত অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে তার পাওনা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রত্যেকের শ্রম, দায়িত্ব ও চুক্তি অনুযায়ী ন্যায্য পারিশ্রমিক ও কর্মক্ষেত্রে সম্মান নিশ্চিত করা জরুরি।

শ্রমিকের ঘামেই সচল থাকে অর্থনীতির চাকা, আর তাদের শ্রমেই নির্মিত হয় উন্নয়নের ভিত্তি। অথচ সেই শ্রমিকই যদি তার ন্যায্য পারিশ্রমিক থেকে বঞ্চিত হন, তা হলে উন্নয়নের সব আয়োজনই মানবিক মূল্যবোধের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। ইসলাম শ্রমিকের অধিকারকে দয়া বা অনুগ্রহের বিষয় বানায়নি; বরং ন্যায়বিচার ও আমানতদারির অপরিহার্য অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে।

মালিক, ব্যবসায়ী, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্ণধার, ঠিকাদার ও নিয়োগকর্তা— সবার মনে রাখা উচিত, শ্রমিকের পারিশ্রমিক তার অর্জিত অধিকার। নির্ধারিত সময়ে সেই পাওনা বুঝিয়ে দেওয়া কেবল পেশাগত দায়িত্ব নয়, বরং ধর্মীয় কর্তব্যও। একইভাবে শ্রমিকদেরও সততা, নিষ্ঠা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে অর্পিত কাজ সম্পন্ন করতে হবে। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বিশ্বস্ততা ও ন্যায়সংগত আচরণের মাধ্যমেই গড়ে উঠতে পারে একটি সুন্দর কর্মসংস্কৃতি।

লেখক : এমফিল গবেষক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা
  বিষয়:   ইসলাম  শ্রমিক  পারিশ্রমিক  ঘামের মূল্য  মর্যাদা  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
ইসলাম- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: