ছবি : সংগৃহীত ওমরা পালনে কি কোনো প্যাকেজ নিতে হবে না? প্যাকেজ ছাড়াও কি ওমরা করা যাবে? সৌদি আরব সরকারের ডিজিটাল সেবা ‘নুসুক’-এর মাধ্যমে ট্রাভেল এজেন্সির সহায়তা ছাড়াই ওমরার প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন বাংলাদেশিরা। নিজেরাই অনলাইনে ভিসার আবেদন, আবাসন ও পরিবহনের মতো প্রয়োজনীয় সেবা বেছে নিতে পারবেন।
তবে এজেন্সি ছাড়াই ওমরার আয়োজন করা আর কোনো প্যাকেজ বা সেবা ছাড়াই সৌদি আরবে যাওয়া এক বিষয় নয়। নুসুকের মাধ্যমে প্রয়োজন অনুযায়ী সেবা বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকলেও ভিসা ও ভ্রমণের নির্ধারিত শর্ত পূরণ করতে হবে।
গত ৩ অক্টোবর ঢাকায় সৌদি দূতাবাসে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশিদের জন্য এ সুযোগের কথা জানান ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত ঈসা বিন ইউসুফ আল-দুহাইলান।
নুসুক কী, কী সুবিধা পাওয়া যাবে
নুসুক হলো সৌদি আরবের হজ ও ওমরা মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত একটি ডিজিটাল সেবা। এর মাধ্যমে বিদেশি মুসলিমরা ওমরার ভিসা, আবাসন, পরিবহনসহ ভ্রমণের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সেবা অনলাইনে নিতে পারেন।
২০২৫ সালের ২০ আগস্ট আন্তর্জাতিক ওমরাযাত্রীদের জন্য ‘নুসুক ওমরা’ নামে সরাসরি অনলাইনে আবেদন ও সেবা বুকিংয়ের ব্যবস্থা চালু করে সৌদি আরব। এর ফলে অনুমোদিত ট্রাভেল এজেন্সির মধ্যস্থতা ছাড়াই নিজেরা ভ্রমণের পরিকল্পনা ও বুকিং করতে পারেন যাত্রীরা।
নুসুকের ওয়েবসাইটে বিভিন্ন ধরনের প্যাকেজ রয়েছে। পূর্ণাঙ্গ প্যাকেজে ওমরার ভিসা, বিমান টিকিট, মক্কা ও মদিনায় আবাসন, খাবার, দুই শহরের মধ্যে যাতায়াত এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। আবার কেউ চাইলে নিজের প্রয়োজন ও সামর্থ্য অনুযায়ী সেবা বেছে নিতে পারেন। আবাসনের মান, অবস্থানের সময় ও পরিবহনের ধরন অনুযায়ী খরচও ভিন্ন হয়।
যেভাবে আবেদন করবেন
যদি আপনি নুসুকের মাধ্যমে সেবা নিতে চান, তাহলে প্রথমে আপনাকে ‘নুসুক ওমরা’ ওয়েবসাইটে গিয়ে অ্যাকাউন্ট খুলতে হবে। নিবন্ধনের সময় বসবাসের দেশ, জাতীয়তা, ই-মেইল ঠিকানা ও পাসপোর্টের তথ্য দিতে হবে। তথ্য যাচাইয়ের পর সংশ্লিষ্ট দেশের জন্য যেসব প্যাকেজ ও সেবা উন্মুক্ত রয়েছে, সেগুলো দেখা যাবে।
এরপর পছন্দের প্যাকেজ বা প্রয়োজনীয় সেবা নির্বাচন করে আবাসনের কক্ষ, অতিরিক্ত সুবিধা, ফ্লাইট ও পরিবহনের ব্যবস্থা ঠিক করতে হবে। সকল তথ্য যাচাই করার পর বুকিং ও অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। এসব সেবা দেয় সৌদি সরকারের অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানগুলো। তাই বুকিংয়ের আগে সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন, প্যাকেজে অন্তর্ভুক্ত সুবিধা এবং বুকিং বাতিল বা অর্থ ফেরতের শর্ত জেনে নেওয়া জরুরি।
এখানে একটি বিষয় আপনাকে মনে রাখতে হবে—নুসুক ওমরা ওয়েবসাইটে ভিসা ও ভ্রমণসংক্রান্ত সেবা বুকিং এবং নুসুক মোবাইল অ্যাপে ওমরা পালনের অনুমতি নেওয়া আলাদা বিষয়। ভ্রমণের ব্যবস্থা সম্পন্ন করার পাশাপাশি ওমরা পালনের জন্য অ্যাপের মাধ্যমে নির্ধারিত অনুমতিও নিতে হবে।
২৪ ঘণ্টায় ই-ভিসা পাওয়ার সুযোগ
নুসুকের মাধ্যমে আপনি আবেদন করে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ই-ভিসা নিতে পারবেন। এমন সুযোগের কথাই জানিয়েছেন সৌদি রাষ্ট্রদূত। সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা এসপিএও ২০২৩ সালে জানিয়েছিল, ওমরার ভিসা ২৪ ঘণ্টার কম সময়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে প্রত্যেক আবেদনকারী নির্দিষ্ট ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ভিসা পাবেন। আবেদনকারীর যোগ্যতা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের ওপর ভিসা পাওয়ার সময় নির্ভর করতে পারে।
৯৬ ঘণ্টার স্টপওভার ভিসায়ও ওমরা
অন্য কোনো দেশে যাওয়ার পথে সৌদি আরবে যাত্রাবিরতি করতে চাইলে যাত্রীদের জন্য রয়েছে ৯৬ ঘণ্টার স্টপওভার বা ট্রানজিট ভিসার সুযোগ। এ ভিসায় সর্বোচ্চ চার দিন সৌদি আরবে অবস্থান করা যায়। এই সময়ের মধ্যে মক্কায় ওমরা পালন এবং মদিনায় মসজিদে নববী জিয়ারত করা সম্ভব। তবে এ ক্ষেত্রেও ওমরা পালনের আগে নুসুক অ্যাপের মাধ্যমে অনুমতি নিতে হবে।
সৌদি আরবের সরকারি পর্যটন ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, সৌদিয়া ও ফ্লাইনাসের ফ্লাইটে ভ্রমণকারীরা বিশেষ স্টপওভার ভিসার সুবিধা নিতে পারেন। অন্য এয়ারলাইনসের ক্ষেত্রে সাধারণ ট্রানজিট ভিসার নিয়ম প্রযোজ্য হতে পারে। তাই টিকিট কেনার আগে সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনস ও ভিসার শর্ত যাচাই করে নেওয়া প্রয়োজন।
ওমরার পাশাপাশি ঘুরে দেখা যাবে দর্শনীয় স্থান
ওমরা পালনের পাশাপাশি সৌদি আরবের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক স্থান ঘুরে দেখার সুযোগও রয়েছে। মক্কা ও মদিনার ধর্মীয় স্থানগুলোর বাইরে দেশটির বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা, জাদুঘর ও দর্শনীয় স্থান ভ্রমণ করতে পারেন যাত্রীরা। নুসুকের মাধ্যমে বিভিন্ন ভ্রমণ ও জিয়ারত প্যাকেজ সম্পর্কেও তথ্য পাওয়া যায়। তবে কোনো স্থানে প্রবেশের জন্য আলাদা বুকিং বা অনুমতির প্রয়োজন আছে কি না, তা আগে জেনে নেওয়া ভালো।
বাংলাদেশিদের যা জানা প্রয়োজন
নুসুকের মাধ্যমে সরাসরি ওমরা পালনের সুযোগের কথা সৌদি রাষ্ট্রদূত জানালেও আবেদন করার আগে কয়েকটি বিষয় যাচাই করা জরুরি। ওয়েবসাইটে বাংলাদেশকে বসবাসের দেশ ও জাতীয়তা হিসেবে নির্বাচন করা যাচ্ছে কি না এবং বাংলাদেশি আবেদনকারীদের জন্য কোন কোন প্যাকেজ ও সেবা উন্মুক্ত রয়েছে, তা দেখে নিতে হবে। কারণ নিবন্ধনের পর তথ্য যাচাই করে সংশ্লিষ্ট দেশের জন্য অনুমোদিত প্যাকেজ দেখানো হয়।
ওমরার পরিকল্পনা করার সময় পাসপোর্টের মেয়াদ, ভিসার ধরন, বিমান টিকিট, হোটেল বুকিং, যাতায়াত ও স্বাস্থ্যবিমার শর্ত আগেই জেনে নেওয়া উচিত। প্যাকেজ বা আলাদা সেবা নেওয়ার আগে মোট খরচ এবং এর মধ্যে কী কী সুবিধা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
সব মিলিয়ে, নুসুকের মাধ্যমে এজেন্সির মধ্যস্থতা ছাড়াই ওমরার প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এতে যাত্রীরা নিজেরাই প্রয়োজনীয় সেবা বেছে নিয়ে ভ্রমণের আয়োজন করতে পারবেন। তবে এজেন্সি ছাড়াই আবেদন করা গেলেও ভিসা, আবাসন, যাতায়াত ও ওমরা পালনের অনুমতির মতো প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে হবে।
সময়ের আলো/এসএকে