প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর, ২০২৬, ২:১৭ পিএম আপডেট: ০৩.১১.২০২৬ ২:১৮ পিএম
দায়িত্ব ও নেতৃত্ব একটি আমানত। গ্রাফিক : সময়ের আলো ক্ষমতা মানুষের মর্যাদা বাড়ানোর উপায় নয়, বরং দায়িত্বের পরিধি বাড়িয়ে দেয়। অথচ বাস্তবে ক্ষমতার আসনে বসে কেউ কেউ জনসেবার পরিবর্তে ব্যক্তিস্বার্থ, প্রভাব বিস্তার ও সুযোগ-সুবিধা ভোগকেই প্রাধান্য দেন। দায়িত্ব যেন ব্যক্তিগত সম্পদ, পদ যেন বিশেষ সুবিধা আদায়ের অনুমতিপত্র। অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে ক্ষমতা কোনো ব্যক্তিগত মালিকানা নয়, বরং একটি গুরুতর আমানত; যার প্রতিটি ব্যবহারের জন্য আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন, তোমরা আমানত তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দেবে এবং মানুষের মধ্যে বিচার করলে ন্যায়বিচার করবে’ (সুরা আন-নিসা, আয়াত : ৫৮)। এই নির্দেশ কেবল ব্যক্তিগত আমানত রক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; দায়িত্ব পালনে সততা, ন্যায়বিচার ও অধিকার সংরক্ষণেরও সুস্পষ্ট ভিত্তি। ফলে রাষ্ট্রীয় পদ, প্রশাসনিক ক্ষমতা কিংবা সামাজিক নেতৃত্ব কোনোটিই ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করার বৈধ অজুহাত হতে পারে না। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে’ (সহিহ বুখারি, হাদিস ৭১৩৮; সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৮২৯)। এই হাদিস ক্ষমতার ধারণাকে সুবিধা থেকে জবাবদিহির দিকে ফিরিয়ে দেয়। একজন শাসক বা কর্মকর্তা কেবল তার অধীনস্থদের কাজের জন্যই নন; বরং নিজের সিদ্ধান্ত, আচরণ ও দায়িত্ব পালনের জন্যও জবাবদিহির মুখোমুখি হবেন।
কিন্তু বাস্তবতার সংকট হলো, দায়িত্ব পালনের চেয়ে পদমর্যাদা প্রদর্শন অনেক সময় বেশি গুরুত্ব পায়। সাধারণ মানুষ সেবা পেতে দীর্ঘসূত্রতা, হয়রানি ও প্রভাবশালীদের অগ্রাধিকার দেখেন; অন্যদিকে দায়িত্বশীলদের কারও কারও আচরণে জনস্বার্থের বদলে ব্যক্তিগত সুবিধার প্রতিফলন ঘটে। তবে অভিযোগের ভিত্তিতে সবাইকে একইভাবে বিচার না করে প্রতিটি অনিয়মের নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রমাণভিত্তিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। ইসলাম ক্ষমতাবানকে জবাবদিহির ঊর্ধ্বে স্থান দেয় না; বরং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, অধিকার রক্ষা এবং দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ানোর দায়িত্ব দেয়। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমরা ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকো, আল্লাহর জন্য সাক্ষ্যদাতা হিসেবে, যদিও তা তোমাদের নিজেদের অথবা পিতা-মাতা ও আত্মীয়স্বজনের বিরুদ্ধে যায়’ (সুরা আন-নিসা, আয়াত : ১৩৫)। অর্থাৎ ব্যক্তিগত সম্পর্ক, দলীয় পরিচয় কিংবা ক্ষমতার প্রভাব ন্যায়বিচারের পথে বাধা হতে পারে না।
এই নীতির বাস্তব প্রয়োগে প্রয়োজন দায়িত্বের স্বচ্ছ বণ্টন, সরকারি অর্থ ও সম্পদের ব্যবহারের হিসাব প্রকাশ, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে যথাযথ শাস্তি। পাশাপাশি ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে কার্যকর তদারকি ও অভিযোগ জানানোর নিরাপদব্যবস্থা থাকতে হবে। শুধু নৈতিকতার আহ্বান নয়, জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানও গড়ে তুলতে হবে। ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু দায়িত্ব পালনের হিসাব এড়ানোর সুযোগ নেই। ইসলামে নেতৃত্বের মর্যাদা তার বাহ্যিক জৌলুসে নয়, মানুষের অধিকার রক্ষা ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার সক্ষমতায়। তাই ক্ষমতাকে ব্যক্তিগত সুবিধা ভোগের অধিকার হিসেবে দেখার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ক্ষমতা যখন আমানত, তখন এর অপব্যবহার শুধু প্রশাসনিক অনিয়ম নয়; এটি নৈতিক বিশ্বাসভঙ্গও।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/মহু