ছবি : সংগৃহীত পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে ব্যবসা-বাণিজ্যের মূল উদ্দেশ্য হিসেবে মুনাফা অর্জন কিংবা শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেওয়াকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। তবে ইসলামি জীবনদর্শনে ব্যবসার ধারণা শুধু লাভ-ক্ষতির অঙ্কে সীমাবদ্ধ নয়। এখানে ব্যবসা কেবল অর্থ উপার্জনের মাধ্যম নয়, বরং মানুষের প্রয়োজন পূরণ, সমাজের সেবা এবং সামগ্রিক কল্যাণে ভূমিকা রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। তবুও কেন ব্যবসায় বরকত হচ্ছে না, তা খুঁজে বের কর প্রয়োজন।
অনেক ব্যবসায়ীই অভিযোগ করে বলেন, ‘বেচা-বিক্রি ঠিকই হচ্ছে, ব্যবসা তো মন্দা যাচ্ছে না। প্রতিদিনই ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে ভালো একটা অংশ লাভ আসছে। কিন্তু দিন শেষে লাভের সেই টাকা কোথায় যাচ্ছে, বুঝতে পারি না।’
ব্যবসার আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে গিয়ে হিমশিম খান অনেকে ব্যবসায়ীই। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, এর পেছনের কারণ কী? কখনো কি এর কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছেন? আসুন আজ আমরা এর পেছনের কারণ খুঁজে বের করি। দেখি কোরআনে ব্যবসা নিয়ে আল্লাহ তাআলা কী বলেছেন?
ব্যবসায় সততা ও মানুষের অধিকার রক্ষার বিষয়ে পবিত্র কোরআনে খুব কঠোর সতর্কতা রয়েছে। কোরআনে একটি সুরা আছে, যার নাম মুতাফফিফিন। এই নামের অর্থই হলো ‘যারা মাপে কম দেয়।’ সুরার শুরুতেই অসাধু ব্যক্তিদের নিয়ে কঠিন পরিণতির কথা বলা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘وَيْلٌ لِّلْمُطَفِّفِينَ الَّذِينَ إِذَا اكْتَالُوا عَلَى النَّاسِ يَسْتَوْفُونَ وَإِذَا كَالُوهُمْ أَو وَّزَنُوهُمْ يُخْسِرُونَ’
অর্থ: ‘ধ্বংস তাদের জন্য অবধারিত, যারা মাপে কম দেয়। মানুষের কাছ থেকে মেপে নেওয়ার সময় পূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করে, আর যখন তাদের মেপে বা ওজন করে দেয়, তখন কম দেয়।’ (সুরা মুতাফফিফিন, আয়াত : ১-৩)
এই আয়াতগুলোর শিক্ষা কেবল দাঁড়িপাল্লায় কম ওজন দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এর মূল বার্তা হলো, নিজের পাওনা পুরোপুরি বুঝে নেওয়া, অথচ অন্যকে তার ন্যায্য পাওনা বুঝিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে কার্পণ্য করা একধরনের অসততা। ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবন ও পেশাগত দায়িত্ব—সব ক্ষেত্রেই এই শিক্ষা প্রাসঙ্গিক।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্যবসার ধরনও বদলেছে, কিন্তু মাপে কম দেওয়ার প্রবণতা এখনো রয়ে গেছে। শুধু দাঁড়িপাল্লায় কম ওজন দেওয়াই নয়, পণ্যের ত্রুটি গোপন করে ক্রেতার কাছে হস্তান্তর করা, প্রতিশ্রুত মানের চেয়ে নিম্নমানের পণ্য সরবরাহ করা, গ্রাহককে ভুল তথ্য দেওয়া কিংবা সেবার নামে প্রতারণা করাও একই অসততার ভিন্ন রূপ। এমনকি অফিসের নির্ধারিত সময়ে কাজ না করা, দায়িত্বে অবহেলা করা কিংবা কাজের বিনিময়ে যথাযথ সেবা না দেওয়ার মধ্যেও অন্যের অধিকার নষ্ট করার বিষয়টি জড়িয়ে আছে।
এ ধরনের অসততা ব্যবসার প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করে। সাময়িকভাবে এতে মুনাফা বাড়লেও দীর্ঘ মেয়াদে ব্যবসার সুনাম ও বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সবচেয়ে বড় কথা, অন্যের অধিকার নষ্ট করে অর্জন করা অর্থে প্রকৃত কল্যাণ আর বরকত খুঁজে পাওয়া যায় না। তাই ব্যবসায় কেবল অর্থের হিসাব রাখলেই চলে না, থাকতে হয় আমানতদারি ও নৈতিকতা।
পরিমাণে ও ওজনে কম দেওয়ার পরিণতি সম্পর্কেও নবীজি (সা.) সতর্ক করেছেন। ইবনে মাজাহর ৫০১৯ নম্বর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, কোনো জাতি পরিমাণে ও ওজনে কম দিতে শুরু করলে তারা দুর্ভিক্ষ, খাদ্যসংকট এবং শাসকগোষ্ঠীর অত্যাচারের শিকার হয়।
ব্যবসায় বরকত ধরে রাখতে যা করবেন
পরিবর্তনের শুরুটা হতে পারে নিজের থেকে। ক্রেতার সঙ্গে প্রতিটি লেনদেনে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে, পণ্যের প্রকৃত মান ক্রেতাকে জানাতে হবে, প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হবে এবং গ্রাহককে তার ন্যায্য পাওনা বুঝিয়ে দিতে হবে। একইভাবে কর্মক্ষেত্রে নিজের দায়িত্বও যথাযথভাবে পালন করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে একটি সহজ নীতি অনুসরণ করাই যায়—আপনি নিজে যেভাবে পণ্য কিনতে চান, অন্যের কাছে সেভাবেই পণ্য বিক্রি করুন। নিজের জন্য যে মানের সেবা প্রত্যাশা করেন, গ্রাহককেও সেই মানের সেবা দিন। অন্যের কাছে সৎ হওয়ার আগে নিজের বিবেকের কাছে সৎ হোন।
ব্যবসার সফলতা কেবল কত টাকা আয় হলো, তা দিয়ে বিচার করা যায় না। এই বিষয়টা নিজের মন-মগজে গেঁথে নিতে হবে। সেই আয়ে কতটা সততা রয়েছে, কত মানুষের অধিকার রক্ষা হয়েছে এবং সমাজের কতটা কল্যাণ হয়েছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, মুনাফা বাড়ানোই ব্যবসার একমাত্র লক্ষ্য হতে পারে না। মানুষের আস্থা অর্জন, ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা এবং হালাল উপার্জনের মাধ্যমে জীবনে বরকত অর্জন করাই আমাদের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত।
সময়ের আলো/এসএকে