ঠাকুরগাঁও হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে উপচে পড়া ভিড়, গাছতলায়ও চলছে চিকিৎসা

ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি

সারাদেশ

ঠাকুরগাঁও ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের ৪৫ শয্যার শিশু ওয়ার্ডে রোগী ভর্তি রয়েছে ২১৫ জন। শয্যা ছাড়িয়ে ওয়ার্ডের মেঝে ও বারান্দায়

2026-11-06T13:16:59+00:00
2026-11-06T13:19:28+00:00
 
  শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬,
২২ কার্তিক ১৪৩৩
শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬
সারাদেশ
ঠাকুরগাঁও হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে উপচে পড়া ভিড়, গাছতলায়ও চলছে চিকিৎসা
ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি
প্রকাশ: শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৬, ১:১৬ পিএম  আপডেট: ০৬.১১.২০২৬ ১:১৯ পিএম
গাছতলায় খোলা আকাশের নিচে শিশুদের রেখে চিকিৎসা করাচ্ছেন অভিভাবকেরা। ছবি : সময়ের আলো
ঠাকুরগাঁও ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের ৪৫ শয্যার শিশু ওয়ার্ডে রোগী ভর্তি রয়েছে ২১৫ জন। শয্যা ছাড়িয়ে ওয়ার্ডের মেঝে ও বারান্দায় ঠাঁই হয়েছে শিশুদের। এতেও জায়গা না হওয়ায় হাসপাতালের সামনের গাছতলায় খোলা আকাশের নিচে শিশুদের রেখে চিকিৎসা করাচ্ছেন অভিভাবকেরা। অতিরিক্ত রোগীর চাপে ওয়ার্ডে তৈরি হয়েছে অস্বাস্থ্যকর ও অস্বস্তিকর পরিবেশ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিশুদ্ধ পানির সংকট, অপরিচ্ছন্ন শৌচাগার এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী বাইরে থেকে কেনার অভিযোগ।

বুধবার (৪ নভেম্বর) হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি ছিল ২১৫ শিশু। সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালের মূল ফটকের সামনের গাছের নিচে বিছানা পেতে অসুস্থ শিশুদের নিয়ে অবস্থান করছেন কয়েকজন অভিভাবক। কারও শিশুর হাতে চলছে স্যালাইন, কেউ অপেক্ষা করছেন চিকিৎসক কিংবা ওষুধ দেওয়ার জন্য। চিকিৎসার প্রয়োজনে শুধু স্যালাইন ও ইনজেকশন দেওয়ার সময় শিশুদের ওয়ার্ডের ভেতরে নেওয়া হচ্ছে।

হাসপাতালের শিশু বিভাগের সিনিয়র স্টাফ নার্স তাজনেহার জানান, শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি হওয়া রোগীদের অধিকাংশই শ্বাসকষ্ট, জ্বর, সর্দি-কাশি ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত।

পঞ্চগড় থেকে ১৭ মাস বয়সী নাতিকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন বিউটি বেগম। জন্ম থেকেই বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছে শিশুটি। এবার টাইফয়েড ও জ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। বিউটি বেগম বলেন, ওয়ার্ডের ভেতরে প্রচণ্ড গরম ও ভিড়। একটি বিছানায় দুই থেকে তিনটি শিশুকে রাখা হচ্ছে। কান্নাকাটি করায় শিশুরা ভেতরে থাকতে চায় না। তাই বেশির ভাগ সময় নাতিকে বাইরে খোলা বাতাসে রাখতে হয়।

হাসপাতালের পরিবেশ নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি। তার অভিযোগ, রোগীর তুলনায় শৌচাগার কম। নারী-পুরুষকে একই শৌচাগার ব্যবহার করতে হচ্ছে। বিশুদ্ধ পানির সংকটও রয়েছে। রাস্তার পাশের টিউবওয়েল থেকে পানি সংগ্রহ করতে গেলেও অনেক সময় তা ব্যবহার করা যায় না। তখন হোটেল থেকে পানি কিনে আনতে হয়।

পঞ্চগড়ের জগদল সর্দারপাড়ার হোসেন আলীও তার অসুস্থ শিশুকে নিয়ে ভর্তি হয়েছেন হাসপাতালে। তিনি বলেন, একটি বিছানায় দুই থেকে তিনজন রোগীকে রাখা হচ্ছে। ভেতরে শোয়ার তো দূরের কথা, বসার জায়গাও পাওয়া যায় না। প্রচণ্ড গরম ও ভিড়ে শিশুরা সেখানে থাকতে চায় না।

বালিয়াডাঙ্গীর বড়পলাশবাড়ীর আবু বকর জানান, জ্বর নিয়ে তার শিশু দুই দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি। কিন্তু হাসপাতাল থেকে কোনো ওষুধ পাননি। প্রয়োজনীয় সব ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হয়েছে। ওয়ার্ডে ফ্যান থাকলেও গরমের কারণে শিশুটি কান্নাকাটি করছে।

একই অভিযোগ করেন ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার ঢেপটিগুড়া গ্রামের কৃষক শরিফুল্লাহ। তিনি নাতিকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছেন। তার ভাষ্য, ভর্তি হওয়ার পর থেকে হাসপাতাল থেকে কোনো ওষুধ পাননি। ইতোমধ্যে ৭০০ টাকার ওষুধ বাইরে থেকে কিনেছেন। ব্যবস্থাপত্রে আরও ওষুধ দেওয়া হয়েছে, সেগুলোও বাইরে থেকে কিনতে হবে।

ভূল্লী উপজেলার লাউথুতী গ্রামের রুমা তার দুই বছর বয়সী ছেলে রুহুল আমিনকে নিয়ে পাঁচ দিন ধরে হাসপাতালে রয়েছেন। শিশুটির ১০ থেকে ১২ দিন ধরে জ্বর। রুমা বলেন, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর থেকে বিনা মূল্যে কোনো ওষুধ পাননি। হাসপাতালে আসার আগে ১ হাজার ৩০০ টাকার ওষুধ কিনেছিলেন। চিকিৎসকেরা সেগুলো বাদ দেওয়ার পর নতুন করে ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকার ওষুধ কিনতে হয়েছে।

একই ধরনের অভিযোগ করেন আর্নিতা আক্তার। জ্বর থেকে তার সন্তানের টাইফয়েড হয়েছে। চার-পাঁচ দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে শিশুটি। তিনি বলেন, পাঁচ দিনে প্রায় ৭ থেকে ৮ হাজার টাকার বেশি ওষুধ কিনতে হয়েছে। হাসপাতালে খাওয়ার পানিও পাওয়া যাচ্ছে না। টিউবওয়েলের হাতল বাঁধা থাকায় পানি তোলার উপায় নেই। শৌচাগারের অবস্থাও নাজুক। দুটি শৌচাগারের একটিতে ময়লা জমে বন্ধ রয়েছে। অন্যটি সবাইকে ব্যবহার করতে হচ্ছে।

মো. নূর হোসেনের অভিযোগ, ঠান্ডা ও বুকে কফ জমার সমস্যা নিয়ে তার শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। কিন্তু কোনো ওষুধ দেওয়া হয়নি। বাইরে থেকে নতুন মেডিকেল টেপ কিনে আনার পর সেটি রেখে তাকে প্রায় শেষ হয়ে যাওয়া পুরোনো টেপ দেওয়া হয়েছে।


নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিশুর বাবা জানান, ২ নভেম্বর দিবাগত রাত ১টার দিকে ১৫ মাস বয়সী মেয়েকে হাসপাতালে ভর্তি করেন তিনি। ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী দুটি ক্যানুলা কিনে আনলেও একটি শিশুর শরীরে পরানোর পর অন্যটি ও নতুন টেপ নিজেদের কাছে রেখে দেওয়া হয় বলে তার অভিযোগ। পরে টেপ চাইলে নেই বলে জানানো হয়। ইনজেকশনসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রীও বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। শৌচাগার ও ওয়াশরুমের পরিবেশও অত্যন্ত নোংরা বলে অভিযোগ করেন তিনি।

মোহাম্মদ মিলনের অভিযোগ, স্যালাইন সেট, ক্যানুলা, টেপ ও সিরিঞ্জসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রী রোগীদের নিজেদের টাকায় কিনতে হচ্ছে। হাসপাতাল থেকে কোনো ওষুধ বা চিকিৎসাসামগ্রী দেওয়া হচ্ছে না।

এদিকে শিশু ওয়ার্ডের পাশাপাশি হাসপাতালের শৌচাগার ও পানি সরবরাহের ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। গণপূর্ত বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. কামাল হোসেন বলেন, হাসপাতালের দুটি শৌচাগারে সমস্যা রয়েছে। বাকি চারটি চালু আছে। সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে আগামী এক সপ্তাহ পর্যবেক্ষণ ও ফলোআপ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ফিরোজ জামান জুয়েল বলেন, সমস্যাগুলো সমাধানে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। গণপূর্ত বিভাগের প্রকৌশলী ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগকে বিষয়গুলো জানানো হয়েছে। শৌচাগার ও পানির ব্যবস্থাপনা ঠিক করতে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করা হবে।

চিকিৎসাসামগ্রী সরবরাহ না পাওয়া এবং ক্যানুলা নিয়ে অভিভাবকদের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, বিষয়টি হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট সুপারভাইজারকে জানানো হবে। ওষুধের বিষয়ে স্টোরকেও ডাকা হবে। পরিচ্ছন্নতার জন্য সুইপারদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হবে।

হাসপাতালে রোগীর অতিরিক্ত চাপের বিষয়টি স্বীকার করে তত্ত্বাবধায়ক বলেন, ৪৫ শয্যার শিশু ওয়ার্ডে কখনো ২৫০ জনের মতো রোগী ভর্তি থাকেন। শিশুদের সঙ্গে মা-বাবাও অবস্থান করেন। ফলে ওয়ার্ডে মানুষের চাপ আরও বেড়ে যায়।

সময়ের আলো/জোই
  বিষয়:   ঠাকুরগাঁও  ঠাকুরগাঁও জেনারেল হাসপাতাল  শিশু ওয়ার্ড  শিশু রোগী  হাসপাতালের দুর্ভোগ  স্বাস্থ্যসেবা  ওষুধ সংকট  বিশুদ্ধ পানির সংকট  হাসপাতাল অব্যবস্থাপনা  স্বাস্থ্য খাত  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: