প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সংগৃহীত ছবিবাংলাদেশে একের পর এক সরকার পরিবর্তন হলেও রাজনৈতিক সহিংসতার দীর্ঘদিনের চিত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসেনি। ক্ষমতার পালাবদল ঘটলেও স্থানীয় পর্যায়ে আধিপত্য বিস্তার, দলীয় অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘর্ষ এবং প্রাণহানির ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য ডিপ্লোম্যাটের এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বাংলাদেশের গত দুই দশকের বেশি সময়ের রাজনৈতিক সহিংসতার চিত্র তুলে ধরে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
গত ১৮ অক্টোবর রাতে নারায়ণগঞ্জের পাইস্কা এলাকায় কয়েকজন ব্যক্তি রিপন মিয়াকে ধাওয়া করেন। একপর্যায়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার ওপর হামলা চালানো হয়। পরে পরিবারের সদস্যরা হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
রিপন ছিলেন ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সহযোগী সংগঠন যুবদলের স্থানীয় নেতা। স্থানীয় বিএনপি কর্মীদের দাবি, একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানের অতিথি তালিকায় কাদের রাখা হবে, তা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়েছিল। সময়ের সঙ্গে সেই বিরোধ আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
রিপনের মেয়ে শীলা গণমাধ্যমকে জানান, কয়েকজন ব্যক্তি তার বাবাকে ধাওয়া করে কুপিয়ে হত্যা করেছেন।
স্থানীয় বিএনপির সভাপতি এই হত্যাকাণ্ডকে রাজনৈতিক আধিপত্য ও প্রভাব বিস্তারের দ্বন্দ্বের ফল হিসেবে দেখছেন।
এ বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি চুয়াডাঙ্গায় বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে দুই ভাই নিহত হন। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, রমজানের ইফতারের পর শুরু হওয়া একটি বাগ্বিতণ্ডা একপর্যায়ে সহিংসতায় রূপ নেয়।
ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পর হাফিজুর রহমান মারা যান। তার ভাই ও স্থানীয় জামায়াত নেতা মফিজুর রহমান পরবর্তী সময়ে ১০ মার্চ ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
এই সংঘর্ষের জন্য বিএনপি ও জামায়াত পরস্পরকে দায়ী করে। নিহতদের পরিবার হত্যা মামলা করার পর পুলিশ স্থানীয় এক বিএনপি নেতা এবং দলটির স্বেচ্ছাসেবক শাখার সাবেক এক নেতাসহ তিনজনকে গ্রেফতার করে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বিএনপি ক্ষমতায় ফেরার দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে এ ঘটনা ঘটে।
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহিংসতার ধারাবাহিকতা
সাম্প্রতিক এসব হত্যাকাণ্ড বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এর পেছনে রয়েছে বাংলাদেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য, বিভিন্ন একাডেমিক গবেষণা এবং সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে গত দুই দশকের বেশি সময় ধরে রাজনৈতিক সহিংসতার একটি ধারাবাহিক চিত্র পাওয়া যায়।
এসব তথ্য-উপাত্তে দেখা যায়, প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলের মধ্যে সংঘর্ষ, একই দলের নেতাকর্মীদের অভ্যন্তরীণ বিরোধ এবং নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা সরকার পরিবর্তনের পরও থেমে থাকেনি।
স্থানীয় পর্যায়ে কোনো দলের পদ পাওয়া, ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, জমির মালিকানা কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠানের অতিথি নির্বাচন নিয়েও সংঘর্ষের সূত্রপাত হতে পারে। মূলত এসব বিরোধের পেছনে রয়েছে নির্দিষ্ট এলাকায় কর্তৃত্ব ও প্রভাব ধরে রাখার প্রতিযোগিতা।
২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে সহিংসতার পরিসংখ্যান
আসকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে রাজনৈতিক সহিংসতার ৪৬৭টি ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৯৪ জন এবং আহত হয়েছেন ৩ হাজার ৫৮৭ জন।
এর মধ্যে বিএনপির নেতাকর্মীদের নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ছিল ১১২টি। এসব ঘটনায় ১৮ জন নিহত এবং ১ হাজার ২১৫ জন আহত হন।
এই পরিসংখ্যানে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এবং নির্বাচিত সরকারের আমলের ঘটনাগুলোও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে গত কয়েক বছরে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। দীর্ঘ ১৫ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে। ওই আন্দোলনে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর মূলত অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। পরে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে দেশে নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়।
তবে রাজনৈতিক ব্যবস্থায় এত পরিবর্তনের পরও স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতা ও আধিপত্যের দ্বন্দ্ব থামেনি। ফলে রাজনৈতিক সহিংসতাকে শুধু একটি নির্দিষ্ট সরকারের ব্যর্থতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি বিভিন্ন সরকারের আমলেই টিকে থাকা একটি দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা।
২০০২ সাল থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করলেও একই প্রবণতা দেখা যায়। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংঘর্ষ, ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতা নিয়মিত ঘটেছে।
এই বাস্তবতা থেকে বোঝা যায়, সমস্যাটি কেবল বিএনপি ও আওয়ামী লীগের পারস্পরিক বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
বিএনপি সরকারের আমলেও দলীয় কোন্দলে প্রাণহানি
২০০২ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় ছিল। ওই সময়ে আসকের তথ্য অনুযায়ী, বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ২৮৪টি ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় ৫৫ জন নিহত হন। একই সময়ে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ বিরোধে ৩৭ জনের মৃত্যু হয়।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক জাহানের ২০১৪ সালের গবেষণাপত্র ‘পলিটিক্যাল পার্টিজ ইন বাংলাদেশ’- এ আসকের এসব পরিসংখ্যান উল্লেখ করা হয়েছে।
এ সময় বর্তমানে বিরোধী দলে থাকা জামায়াতে ইসলামী বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের অংশীদার ছিল। দলটির দুজন নেতা মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
তবে রাজনৈতিক জোটে একসঙ্গে থাকলেও বিএনপি ও জামায়াতের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ বন্ধ হয়নি। রওনক জাহানের গবেষণায় উদ্ধৃত আসকের তথ্য অনুযায়ী, ২০০২ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে ১৩৪টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে প্রাণ হারান আটজন।
অন্যদিকে একই সময়ে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের মধ্যে ৪২টি সংঘর্ষে সাতজন নিহত হন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে সংঘর্ষ কমলেও নিপীড়ন বন্ধ হয়নি
২০০৭ ও ২০০৮ সালে সামরিক বাহিনীর সমর্থনে পরিচালিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংঘর্ষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
ওই দুই বছরে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের আটটি ঘটনা নথিভুক্ত হয়। এতে দুজন নিহত হন। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষের একটি ঘটনা নথিভুক্ত হলেও এতে কোনো প্রাণহানি ঘটেনি।
প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও সংঘর্ষ কমে ৩২টিতে দাঁড়ায়। এসব ঘটনায় সাতজন নিহত হন। সবগুলো সংঘর্ষই ছিল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে।
তুলনামূলকভাবে দেখা যায়, ২০০২ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সংঘর্ষে ১১৮ জনের মৃত্যু হয়েছিল। কিন্তু ২০০৭ ও ২০০৮ সালে রাজনৈতিক সহিংসতায় মোট প্রাণহানি নেমে আসে মাত্র নয়জনে।
তবে রাজনৈতিক সংঘর্ষের সংখ্যা কমে যাওয়াকে রাজনৈতিক নিপীড়ন বন্ধ হওয়ার প্রমাণ হিসেবে দেখা যায় না।
তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার জরুরি আইনের অধীনে পরিচালিত হচ্ছিল। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে বেআইনি গ্রেপ্তার, নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা উঠে আসে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডও সীমিত করা হয়েছিল।
অর্থাৎ, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংঘর্ষের সুযোগ তৈরি করে এমন পরিস্থিতি ও কর্মকাণ্ডের ওপরই বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফেরার পর দলীয় কোন্দল বৃদ্ধি
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর দলটির অভ্যন্তরীণ সহিংসতা বাড়তে থাকে।
২০০৯ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ৭৯৯টি ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় ৯৭ জন নিহত হন।
একই সময়ে বিএনপির অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষের ঘটনা ছিল ২২৯টি এবং প্রাণহানির সংখ্যা ছিল ২১।
এই পরিসংখ্যানের উদ্দেশ্য কোনো সরকারের আমলে কোন দল বেশি সহিংস ছিল, তা নির্ধারণ করা নয়। বরং জাতীয় ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরেও কীভাবে নিয়মিত প্রাণঘাতী সংঘর্ষ ঘটতে পারে, সেটি তুলে ধরা।
জাতীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক সংঘাতে ব্যাপক প্রাণহানি
স্থানীয় পর্যায়ের বিরোধ নিয়মিত সংঘর্ষের জন্ম দিলেও জাতীয় রাজনৈতিক সংকটের সময় সহিংসতা আরও ভয়াবহ রূপ নেয়।
২০১৩ সালে বাংলাদেশ একটি বিতর্কিত জাতীয় নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় আসক রাজনৈতিক সহিংসতায় ৫০৭ জনের মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত করে।
সংস্থাটির বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, হরতালকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে ১৮৫ জন নিহত হন। এ ছাড়া ২৫ নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া অবরোধ কর্মসূচিতে আরও ৮৫ জন প্রাণ হারান।
ওই বছর আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে জামায়াত এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ বিশেষভাবে প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে।
আসকের মূল বার্ষিক হিসাব অনুযায়ী, জামায়াত, তাদের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির এবং পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষে ৩৭ জন নিহত হন। পাশাপাশি জামায়াত ও পুলিশের সংঘর্ষে পৃথকভাবে আরও ১১ জনের মৃত্যুর তথ্য রয়েছে।
এ ছাড়া বিভিন্ন সংঘর্ষে প্রাণহানির পরিসংখ্যান ছিল নিম্নরূপ
আওয়ামী লীগ, জামায়াত ও শিবিরের সংঘর্ষে ১৩ জন নিহত।
আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের সংঘর্ষে ৯ জন নিহত।
শিবির ও পুলিশের সংঘর্ষে ৯ জন নিহত।
আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষে পাঁচজন নিহত।
সব মিলিয়ে ২০১৩ সালে জামায়াত বা শিবির সংশ্লিষ্ট সংঘাতের বিভিন্ন শ্রেণিতে ৯৬ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়।
তবে এসব পরিসংখ্যান কেবল সংঘর্ষে কোন কোন পক্ষ জড়িত ছিল, তা নির্দেশ করে। নির্দিষ্টভাবে কোন পক্ষের কারণে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, তা নিশ্চিত করে না।
পরবর্তী বছরগুলোতে জামায়াত ও শিবিরের নাম উল্লেখ থাকা সংঘর্ষের সংখ্যা কমে আসে।
২০১৫ সালে দল দুটির সংশ্লিষ্টতার উল্লেখ থাকা নয়টি ঘটনায় তিনজন নিহত হন। ২০১৬ সালে এ ধরনের দুটি ঘটনা নথিভুক্ত হয়, যাতে একজনের মৃত্যু ঘটে।
২০১৭ সালের তালিকায় শিবির ও পুলিশের মধ্যে একটি সংঘর্ষের ঘটনা ছিল। এতে তিনজন আহত হন। তবে ২০১৮ ও ২০১৯ সালের তালিকায় জামায়াত বা শিবিরের নাম আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়নি।
তাই এসব বছরে দল দুটির ভূমিকা কতটা ছিল, তা শুধু বার্ষিক পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন।
নিজেদের দলের মধ্যকার সংঘর্ষেও প্রাণহানি
জাতীয় পর্যায়ে বড় ধরনের রাজনৈতিক সংঘাত না থাকলেও একই দলের নেতাকর্মী কিংবা রাজনৈতিক মিত্রদের মধ্যে বিরোধ থেকে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।
২০১৭ সালে আসক রাজনৈতিক সহিংসতায় ৫২ জনের মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত করে। এর মধ্যে শুধু আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষের ঘটনাতেই ২৯ জন নিহত হন।
এই হিসাবে আওয়ামী লীগের ছাত্র ও যুব সংগঠনগুলোর অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষের পৃথক পরিসংখ্যান অন্তর্ভুক্ত ছিল না।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনও রাজনৈতিক সহিংসতা ও প্রাণহানির অন্যতম বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২০১৬ সালে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে ১৪৭ জন নিহত হওয়ার তথ্য নথিভুক্ত করে আসক। ওই বছর রাজনৈতিক সহিংসতায় মোট ১৭৭ জনের মৃত্যুর মধ্যে অধিকাংশই ছিল স্থানীয় নির্বাচনকেন্দ্রিক।
একই ধরনের চিত্র দেখা যায় ২০২১ সালেও। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ঘিরে সংঘর্ষে সারা দেশে ১৫৭ জনের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে ১১৩ জন নিহত হন।
এসব পরিসংখ্যান থেকে নির্দিষ্ট হত্যাকাণ্ডের জন্য কোন পক্ষ দায়ী, তা নির্ধারণ করা যায় না। তবে এগুলো প্রমাণ করে, সহিংসতা শুধু জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই ঘটে না। স্থানীয় পর্যায়ের পদ-পদবি ও ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নিয়েও ব্যাপক প্রাণহানি হতে পারে।
সহিংসতার পেছনে আধিপত্য ও অর্থনৈতিক স্বার্থ
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সহিংসতার কারণ বুঝতে বিভিন্ন গবেষণাও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়।
ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের একটি গবেষণায় ২০০৮ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করা হয়।
গবেষণায় ২০০৮ থেকে ২০১২ সালের ঘটনাগুলোর কারণ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লড়াই ছিল সহিংসতার সবচেয়ে বড় কারণ।
এ ছাড়া ঠিকাদারি কাজ, সম্পত্তি, জমি এবং চাকরি নিয়ে বিরোধও রাজনৈতিক সংঘর্ষের অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে আসে।
এই গবেষণার তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি আসকের পরিসংখ্যান থেকে আলাদা। তাই দুটি উৎসের সংখ্যাকে সরাসরি তুলনা করা সম্ভব নয়। তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সহিংসতার পেছনে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা কারণগুলো বুঝতে গবেষণাটি গুরুত্বপূর্ণ।
রাজনৈতিক দলগুলো একদিকে যেমন নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং জনগণের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ তৈরি করে, অন্যদিকে স্থানীয় নেতাদের জন্য রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগের পথও খুলে দেয়।
এই যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া, ব্যবসা পরিচালনা কিংবা নিজেদের স্বার্থ রক্ষার সুযোগ তৈরি হয়। ফলে দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব শুধু নির্বাচনে জয়ী হওয়ার প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ থাকে না। এর সঙ্গে অর্থনৈতিক লাভ ও ক্ষমতার নানা হিসাবও যুক্ত হয়ে যায়।
গণঅভ্যুত্থানের পরও স্থানীয় আধিপত্যের দ্বন্দ্ব অব্যাহত
২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী ও রাজনৈতিক নেতারা একটি নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং ‘নতুন বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা তৈরি করেছিলেন।
কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পরও স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতা, ব্যবসা ও অর্থনৈতিক সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ বন্ধ হয়নি।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, সব সরকারের আমলের সহিংসতা একই ধরনের কিংবা সব রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে একইভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।
বিশেষ করে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের সময় সংঘটিত আন্দোলন ও সহিংসতাকে সাধারণ রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষের সঙ্গে এক করে দেখার সুযোগ নেই। দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপটের ঘটনা।
জাতিসংঘের তদন্তে তৎকালীন সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে মানুষের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ উঠে আসে।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারেন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আন্দোলনকারীদের সহিংসভাবে দমন করা ছিল তৎকালীন সরকারের নীতি।
অন্যদিকে, ২০২৪ সালের জন্য আসকের সাধারণ রাজনৈতিক সহিংসতার তালিকায় ১০০ জনের মৃত্যুর তথ্য রয়েছে। তবে এই সংখ্যা পুরো গণঅভ্যুত্থানে নিহত ব্যক্তিদের মোট সংখ্যা নয়।
আসক আন্দোলন চলাকালে নিহতদের আলাদা হিসাবে নথিভুক্ত করেছিল। ফলে সাধারণ রাজনৈতিক সংঘর্ষের বার্ষিক পরিসংখ্যান দিয়ে গণঅভ্যুত্থানের সময়কার আন্দোলন এবং রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের পূর্ণাঙ্গ চিত্র বোঝা সম্ভব নয়।
আন্দোলনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটার পর স্থানীয় পর্যায়ে আগে দলটির নিয়ন্ত্রণে থাকা বিভিন্ন পদ, ব্যবসা ও প্রভাবশালী নেটওয়ার্কের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন প্রতিযোগিতা শুরু হয়।
চট্টগ্রামেও এ ধরনের বিরোধের ঘটনা সামনে আসে। ২০২৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর চান্দগাঁও এলাকায় বিএনপির প্রতিদ্বন্দ্বী দুটি গ্রুপের সংঘর্ষে জুবায়ের উদ্দিন বাবু নামে একজনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, একটি কৃত্রিম ঘাসের টার্ফ বা খেলার মাঠের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ চলছিল।
এ ছাড়া চট্টগ্রামে হত্যাকাণ্ড, হামলা, সংঘর্ষ ও জমি দখলের ১৫টি ঘটনা পর্যালোচনা করে দৈনিক প্রথম আলো। তাদের অনুসন্ধানে দেখা যায়, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অবৈধ আয়ের বিভিন্ন উৎসের নিয়ন্ত্রণও এক পক্ষ থেকে অন্য পক্ষের হাতে চলে গেছে।
এসব বিরোধের মধ্যে ছিল পরিবহন খাত, বাজার, জমি এবং রেলওয়ের ঠিকাদারি কাজের নিয়ন্ত্রণ।
আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা বিভিন্ন নেটওয়ার্ক দখলের অভিযোগ ওঠে বিএনপি নেতা ও দলটির সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এসব ঘটনা ঘটেছিল মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে, যখন বিএনপি এখনো জাতীয় ক্ষমতায় ফেরেনি।
ক্ষমতায় ফেরার আগেই বিএনপির অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ
বিএনপি ক্ষমতায় ফেরার আগেই দলটির অভ্যন্তরীণ বিরোধ রাজনৈতিক সহিংসতার বড় কারণ হয়ে উঠেছিল।
আসকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে বিএনপির বিভিন্ন উপদলের মধ্যে ১৯২টি সংঘর্ষের ঘটনা নথিভুক্ত হয়। এসব ঘটনায় ৪০ জন নিহত হন। এ ছাড়া দলটির সহযোগী সংগঠন যুবদলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে আরও আটজন প্রাণ হারান।
সার্বিকভাবে ওই বছর রাজনৈতিক সহিংসতার ৪০১টি ঘটনায় ১০২ জন নিহত হওয়ার তথ্য নথিভুক্ত করে সংস্থাটি।
অন্যদিকে, শেখ হাসিনার পতন ঘটানো গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে গঠিত হয় ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি)। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আধিপত্যের বাইরে নতুন বিকল্প তৈরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল দলটি।
তবে সহিংসতার পরিসংখ্যানে দলটির সংশ্লিষ্টতার তথ্যও উঠে এসেছে।
২০২৫ সালে এনসিপি-সংশ্লিষ্ট সংঘাতের নয়টি ঘটনায় ১৭১ জন আহত এবং পাঁচজন নিহত হন। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দলটিকে ঘিরে আরও ২৯টি সংঘর্ষের ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়। এসব ঘটনায় ২২০ জন আহত হন। এর বেশির ভাগ সংঘর্ষই ছিল বিএনপির সঙ্গে।
এদিকে বিএনপি ক্ষমতায় ফেরার আগেই দলটির অভ্যন্তরে সংঘর্ষ ও আধিপত্য বিস্তারের লড়াই তীব্র হয়ে ওঠে। আওয়ামী লীগ-সমর্থিত ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ব্যবসা-বাণিজ্য ও স্থানীয় প্রভাব নিজেদের দখলে নেওয়ার প্রতিযোগিতায় বিভিন্ন গ্রুপ জড়িয়ে পড়ে।
এর ফলে এমন অনেক পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যাদের সদস্যরা একসময় নিজেদের রাজনৈতিক মিত্রদেরই আপনজন মনে করতেন।
এর একটি উদাহরণ চুয়াডাঙ্গার বিএনপির সাবেক স্থানীয় সাংগঠনিক সম্পাদক রফিকুল ইসলামের মৃত্যু।
২০২৫ সালের ৮ মার্চ বিএনপির অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষে তিনি নিহত হন। তার একটি ছোট দোকান ছিল এবং স্ত্রী নাহিদা খাতুন স্থানীয় একটি ক্লিনিকে চাকরি করতেন।
স্বামীর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নাহিদা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ ৩৬ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেন।
নাহিদার ভাষ্য অনুযায়ী, তার স্বামী দীর্ঘদিন মামলার কারণে বাড়িতে ফিরতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত নিজ দলের নেতাকর্মীদের হাতেই তাঁকে প্রাণ দিতে হয়েছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
বিএনপি ও জামায়াতের সংঘর্ষ বাড়ছে
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের আগে ও পরে বিএনপি এবং জামায়াতের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও বেড়েছে।
আসকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দল দুটির মধ্যে ৩৩টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় তিনজন নিহত এবং ৫২০ জন আহত হন।
অন্যদিকে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে ১৩৭টি সংঘর্ষের ঘটনা নথিভুক্ত করে সংস্থাটি। এসব ঘটনায় ১০ জন নিহত এবং ১ হাজার ৫৪ জন আহত হন।
তুলনামূলকভাবে কম সময়ের মধ্যে সংঘর্ষ ও হতাহতের সংখ্যা বেড়ে যাওয়াকে উদ্বেগজনক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
একই সময়ে আসকের তালিকায় ‘দুর্বৃত্তদের হামলা ও গুলি’ শিরোনামের একটি পৃথক শ্রেণিতে ৫১ জনের মৃত্যুর তথ্য রয়েছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি ক্ষমতায় ফেরার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব সরাসরি দলটির সরকারের ওপর বর্তায়।
দলটির শীর্ষ নেতারাও চাঁদাবাজি ও জমি দখলের মতো কর্মকাণ্ড বন্ধ করার প্রয়োজনীয়তার কথা স্বীকার করেছেন।
অক্টোবরে সংসদীয় দলের এক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চাঁদাবাজি ও জমি দখলের বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা দেন। একই সঙ্গে তিনি জানান, এসব ঘটনায় সংসদ সদস্যদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।
পুলিশের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, রাজনৈতিক পরিচয় কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে রাখে না। চট্টগ্রামের পুলিশ কমিশনার জানিয়েছেন, অপরাধে জড়িত ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে মামলা করা এবং গ্রেপ্তার অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
তবে দৈনিক প্রথম আলোর অনুসন্ধানে এমন কিছু ঘটনা পাওয়া গেছে, যেখানে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে দলীয় পদ থেকে বহিষ্কার কিংবা সংশ্লিষ্ট কমিটি বিলুপ্ত করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক সহিংসতার চক্র কেন ভাঙছে না?
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সহিংসতার ধারাবাহিকতা ব্যাখ্যা করতে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এম. মনিরুজ্জামানের গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ।
২০০৯ সালে সাউথ এশিয়ান সার্ভেতে প্রকাশিত তার ‘পার্টি পলিটিক্স অ্যান্ড পলিটিক্যাল ভায়োলেন্স ইন বাংলাদেশ : ইস্যুজ, ম্যানিফেস্টেশন অ্যান্ড কনসিকুয়েন্সেস’ শীর্ষক গবেষণায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক সহিংসতাকে একটি পুনরাবৃত্ত চক্র হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ ও বৈরিতা বাড়তে থাকলে পারস্পরিক সমঝোতার সুযোগ কমে যায়।
ক্ষমতাসীন সরকার বিরোধী দলকে নিয়ন্ত্রণ করতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবহার করে। এর প্রতিক্রিয়ায় বিরোধী দল আরও জোরালো আন্দোলন ও প্রতিবাদ কর্মসূচিতে যায়।
এভাবে সহিংসতা একদিকে রাজনৈতিক সংঘাতের পরিণতি হিসেবে দেখা দেয়, অন্যদিকে একই সহিংসতা ভবিষ্যতে নতুন সংঘাতের ক্ষেত্র তৈরি করে।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যেও বলপ্রয়োগের প্রবণতা তৈরি হতে পারে। তারা রাজনৈতিক দাবি আদায়ের জন্য সহিংসতাকে স্বাভাবিক বা গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি হিসেবে বিবেচনা করতে শেখে।
ছাত্র ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যেও এই প্রবণতার পুনরাবৃত্তি ঘটে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র এবং রাজপথে সংঘর্ষের মাধ্যমে তা ছড়িয়ে পড়ে।
মনিরুজ্জামানের মতে, এ ধরনের পরিস্থিতি গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য প্রয়োজনীয় সহনশীলতা, জবাবদিহি এবং ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাবোধকে দুর্বল করে দেয়।
সরকার পরিবর্তন হলেও কেন বদলাচ্ছে না সহিংসতার চিত্র?
বাংলাদেশের গত দুই দশকের রাজনৈতিক সহিংসতার তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সংঘর্ষের ধরন ও মাত্রায় পরিবর্তন এসেছে। জাতীয় রাজনৈতিক সংকট ও নির্বাচনের সময় প্রাণহানি সাধারণত বেড়ে যায়। অন্যদিকে, রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত থাকলে দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্ব সহিংসতার বড় কারণ হয়ে ওঠে।
অন্তর্বর্তী সরকারসহ বিভিন্ন সরকারের আমলে একই ধরনের সংঘর্ষ অব্যাহত থাকার অর্থ হলো, শুধু জাতীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব বা ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটলেই স্থানীয় পর্যায়ের পদ-পদবি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের অবসান হয় না।
বিএনপি ক্ষমতায় ফেরার পরও দলটির অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও সহিংসতার ঘটনা সামনে এসেছে। দলীয় বহিষ্কার, কমিটি বাতিল এবং পুলিশের গ্রেপ্তার অভিযান থেকে বোঝা যায়, কিছু ঘটনার পর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
তবে রাজনৈতিক পালাবদলের পরও যখন হত্যাকাণ্ড ও সংঘর্ষ অব্যাহত থাকে, তখন সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সহিংসতা শুধু সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো সাময়িক সমস্যা নয়। বরং স্থানীয় ক্ষমতা, অর্থনৈতিক সুবিধা, দলীয় আধিপত্য এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি দীর্ঘস্থায়ী সংকট। এই চক্র ভাঙতে হলে কেবল জাতীয় নেতৃত্বের পরিবর্তন নয়, স্থানীয় পর্যায়ে জবাবদিহি ও আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করাও জরুরি।
সূত্র : দ্য ডিপ্লোম্যাট
সময়ের আলো/ইউএমএইচ