শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। ছবি : সংগৃহীত ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামরিক ইতিহাসে এক ঘটনাবহুল ও তাৎপর্যপূর্ণ দিন। দীর্ঘ অস্থিরতা, সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, পাল্টাপাল্টি অভ্যুত্থান এবং ক্ষমতার টানাপোড়েনের মধ্যে ওইদিন ঢাকার রাজপথে নেমে এসেছিল হাজার হাজার মানুষ। সেনাসদস্যদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের মিছিল, স্লোগান, ফুলেল শুভেচ্ছা ও উচ্ছ্বাসে বদলে গিয়েছিল রাজধানীর পরিবেশ। ওই মহান বিপ্লবে আধিপত্যবাদী শক্তির সব ষড়যন্ত্র নস্যাৎ হয়ে গিয়েছিল। সুসংহত হয়েছিল দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব। এই ঘটনাকে কেউ সিপাহি-জনতার বিপ্লব, কেউ অভ্যুত্থান, আবার কেউ জাতীয় ইতিহাসের এক বিতর্কিত মোড় হিসেবে দেখেন। ৭ নভেম্বরের দিনটি জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে জাতির ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে আছে।
পঁচাত্তরের পটপরিবর্তনের পর ৩, ৪ ও ৫ নভেম্বর বাংলাদেশ ছিল কার্যত সরকারবিহীন। এ সময় কুচক্রীরা সেনাবাহিনী প্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে ক্যান্টনমেন্টে তার বাসভবনে বন্দি করে রেখেছিল। কিন্তু ৬ নভেম্বর রাতে সংঘটিত সিপাহি-জনতার বিপ্লবে নস্যাৎ হয়ে যায় সব ষড়যন্ত্র। চার দিন বন্দি থাকার পর মুক্তি পান জিয়া। রেডিওতে ভেসে আসে তার কণ্ঠ— ‘আমি জিয়া বলছি।’ ভাষণে তিনি দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ এবং কঠোর পরিশ্রম করার আহ্বান জানান। সেদিন জাতীয় ঐক্য ও সংহতির যে দৃশ্য জীবন্ত হয়ে উঠেছিল, তা এককথায় অভূতপূর্ব।
ঘটনার পরদিন, ৮ নভেম্বর ১৯৭৫ সালের সংবাদপত্রের পাতায় সে দিনটির বর্ণনা জীবন্ত সাক্ষী হয়ে আছে। সেদিনের সংবাদপত্রে চোখ রাখলে দেখা যায়, সেদিনের উত্তাল পরিস্থিতি, রাজপথে মানুষের উপস্থিতি, সেনাসদস্যদের উল্লাস, জিয়াউর রহমানের মুক্তি এবং রাষ্ট্রক্ষমতার নতুন বিন্যাস কীভাবে সংবাদ ও সম্পাদকীয়তে উঠে এসেছিল। বিশেষ করে দৈনিক বাংলা, দৈনিক ইত্তেফাক ও দৈনিক সংবাদের প্রতিবেদনগুলো শুধু একটি দিনের ঘটনাপ্রবাহ নয়; বরং সে সময়ের রাজনৈতিক আবহ, মানুষের প্রত্যাশা এবং সংবাদপত্রের ভাষ্য বোঝারও গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থান থেকে ৭ নভেম্বরের পালাবদল
৭ নভেম্বরের ঘটনা বুঝতে হলে তার আগের কয়েক দিনের রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতির দিকে ফিরে তাকাতে হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে দেশে বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটে। খন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। এরপর সেনাবাহিনীর ভেতরে নানা অসন্তোষ, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও পাল্টাপাল্টি অবস্থান তৈরি হতে থাকে।
৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর একটি অংশ অভ্যুত্থান ঘটায়। এ সময় সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে তার সেনানিবাসের বাসভবনে বন্দি করা হয়। খালেদ মোশাররফ নিজে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব নেন। একই দিন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়। তারা হলেন— সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও এএইচএম কামারুজ্জামান।
৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ে বিভক্তি ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমদও ক্ষমতা ধরে রাখতে পারেননি। ৬ নভেম্বর বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। অন্যদিকে সেনানিবাসে জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করার তৎপরতা চলছিল।
এই পরিস্থিতিতে ৬ নভেম্বর রাত থেকে ৭ নভেম্বরের ভোরে সেনাবাহিনীর সাধারণ সদস্যদের একটি অংশ বিদ্রোহে অংশ নেয়। এ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিল জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সামরিক সংগঠন বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার তৎপরতা। অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু তাহেরের ভূমিকা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে আলোচিত। সেনাবাহিনীর ভেতরে বৈষম্য, পদমর্যাদাভিত্তিক সুবিধা ও অফিসারদের কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে সৈনিকদের সংগঠিত করার চেষ্টা চলছিল।
একপর্যায়ে বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন জিয়াউর রহমান। সেনানিবাসের পরিস্থিতি পাল্টে যায়। সামরিক বাহিনীর একাংশের বিদ্রোহের সঙ্গে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ যুক্ত হওয়ায় ঘটনাটি নতুন মাত্রা পায়। রেডিও বাংলাদেশ থেকে প্রচারিত হয় সিপাহি বিপ্লব সফল হওয়ার ঘোষণা। এরপর জিয়াউর রহমানের কণ্ঠে ভেসে আসে, ‘আমি জিয়া বলছি।’
সেই সময়ের সংবাদপত্রের বর্ণনা অনুযায়ী, রাতের উৎকণ্ঠা কাটিয়ে ভোর হওয়ার আগেই ঢাকার বিভিন্ন এলাকার মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। সেনাবাহিনীর গাড়ি, ট্যাঙ্ক ও সামরিক যান চলাচল করতে থাকে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে। সৈনিকদের সঙ্গে সাধারণ মানুষও এসব গাড়িতে উঠে মিছিল ও স্লোগাননে অংশ নেয়। তবে এই উল্লাসের পাশাপাশি গোলাগুলির শব্দ এবং সামরিক পরিস্থিতির অনিশ্চয়তাও ছিল
ঘটনার রাজনৈতিক দিকটি ছিল আরও জটিল। কারণ এটি শুধু একজন সেনাপ্রধানকে মুক্ত করার অভিযান ছিল না; এর মধ্য দিয়ে সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব, রাষ্ট্রক্ষমতার ভারসাম্য এবং দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নতুনভাবে নির্ধারিত হতে শুরু করে।
ইত্তেফাকের পাতায় উৎকণ্ঠা থেকে উল্লাসের ঢাকা
৮ নভেম্বর ১৯৭৫ সালের দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিবেদন ছিল সেদিনের ঢাকার পরিস্থিতির অন্যতম জীবন্ত বর্ণনা। ‘প্রাণবন্যার উচ্ছল নগরী’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে আগের রাতের উৎকণ্ঠা এবং পরদিনের উল্লাসকে পাশাপাশি তুলে ধরা হয়।
প্রতিবেদনের শুরুতেই বলা হয়, তখনও আকাশে অন্ধকার। গোলাগুলির শব্দে কেঁপে উঠছিল ঢাকার রাত। নগরবাসীর কাছে প্রতিটি মুহূর্ত যেন দীর্ঘ সময়ের মতো মনে হচ্ছিল। বিনিদ্র ও আতঙ্কিত মানুষ ১৯৭১ সালের মার্চের সেই ভয়াবহ দিনগুলোর কথা স্মরণ করছিলেন। এমন সময় রেডিও বাংলাদেশের ঢাকা কেন্দ্র থেকে ঘোষকের কণ্ঠে ভেসে আসে ‘সিপাহি বিপ্লব জিন্দাবাদ’ স্লোগান।
এরপর ঘোষণা করা হয়, সিপাহি বিপ্লব সফল হয়েছে। প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের হাত থেকে জেনারেল জিয়াকে মুক্ত করা হয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন।
ইত্তেফাকের প্রতিবেদনে বলা হয়, ঘোষণার মধ্য দিয়ে চার দিনের অস্বস্তিকর পরিস্থিতির অবসান ঘটে। ভোরের আলো ফোটার আগেই মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। প্রচণ্ড গুলির শব্দের মধ্যেও মানুষের মধ্যে ছিল উৎসাহ ও সাহসিকতা। সেনাবাহিনীর গাড়ি, ট্যাঙ্ক ও সামরিক যান চলাচল করতে থাকে রাজধানীর সড়কগুলোতে। এরপর শুরু হয় একের পর এক মিছিল।
সৈনিকদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের আলিঙ্গন, শুভেচ্ছা বিনিময় এবং স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে নগরী। প্রতিবেদনে বলা হয়, সেনাবাহিনী যেন জনগণের সেনাবাহিনীতে পরিণত হয়েছে। সামরিক বাহিনীর গাড়ির পাশাপাশি বাস ও ট্রাকেও সাধারণ মানুষ উঠে পড়ে। তাদের কণ্ঠে ছিল একই স্লোগান ও উচ্ছ্বাস।
ইত্তেফাকের এই প্রতিবেদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রাখার জন্য জনগণের সহযোগিতা কামনা করা হয়েছে। অর্থাৎ ঘটনাটিকে শুধু সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন হিসেবে নয়; বরং জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার আকাঙ্ক্ষার সঙ্গেও যুক্ত করে উপস্থাপন করা হয়েছিল।
একই দিনের সম্পাদকীয়র শিরোনাম ছিল ‘স্বাধীনতা, আমার স্বাধীনতা’। সম্পাদকীয়তে ৭ নভেম্বরের সৈনিক-জনতার অভ্যুত্থানকে জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার ঘোষণা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। এতে বলা হয়, বাংলাদেশের মানুষ শুধু স্বাধীনতা অর্জন করতেই জানে না, প্রয়োজনে তা রক্ষা করতেও জানে। পাশাপাশি দেশের শ্রমিক, মেহনতি মানুষ, বুদ্ধিজীবী, সশস্ত্র বাহিনীসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
দৈনিক বাংলার প্রধান শিরোনাম : ‘জিয়ার নেতৃত্বে সিপাহি জনতার বিপ্লব’
৮ নভেম্বরের দৈনিক বাংলার প্রথম পাতার প্রধান শিরোনাম ছিল ‘জিয়ার নেতৃত্বে সিপাহি জনতার বিপ্লব’। পত্রিকাটি ঘটনাটিকে সরাসরি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে সংঘটিত সফল বিপ্লব হিসেবে তুলে ধরে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে সিপাহি ও জনতার ঐক্যবদ্ধ বিপ্লব সফল হয়েছে। বৃহস্পতিবার গভীর রাত থেকে শুরু হওয়া এই পরিবর্তন শুক্রবার সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে পূর্ণতা পায়। জিয়াউর রহমানের মুক্তির খবর এবং বেতারে তার কণ্ঠ শুনে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসে।
‘আনন্দে উদ্বেল মানুষের ঢল নেমেছিল’ শিরোনামের আরেকটি প্রতিবেদনে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার চিত্র তুলে ধরা হয়। রায়েরবাজার, জিগাতলা, ধানমন্ডি, নিউমার্কেট, এলিফ্যান্ট রোড ও শাহবাগ এলাকায় ভোর থেকেই মানুষের উপস্থিতির কথা উল্লেখ করা হয়। ছাত্র-যুবক, বৃদ্ধ, নারী ও শিশুরাও ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন। সামরিক বাহিনীর খোলা গাড়ি, হাফ ট্রাক, জিপ ও ট্যাঙ্কে সৈনিকদের সঙ্গে সাধারণ মানুষকে দেখা যায়।
পত্রিকাটির বর্ণনায়, মানুষের মুখে মুখে ছিল ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’, ‘সিপাহি-জনতা ভাই ভাই’ এবং ‘জেনারেল জিয়া জিন্দাবাদ’ স্লোগান। সামরিক বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের এই মেলবন্ধনকে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের পর ঢাকার রাজপথে বিরল দৃশ্য হিসেবে তুলে ধরা হয়।
দৈনিক বাংলার প্রথম পাতায় ‘আমি জিয়া বলছি’ শিরোনামে জিয়াউর রহমানের বেতার ভাষণও প্রকাশ করা হয়। এর মধ্য দিয়ে তার মুক্তি এবং নতুন পরিস্থিতিতে নেতৃত্ব গ্রহণের বিষয়টি পাঠকের সামনে তুলে ধরা হয়।
পত্রিকাটির সম্পাদকীয়র শিরোনাম ছিল ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’। সম্পাদকীয়তে ৭ নভেম্বরকে জাতীয় জীবনের ঐতিহাসিক ও অভূতপূর্ব বিপ্লব হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এতে বলা হয়, স্বাধীনতাযুদ্ধের বীর নায়ক মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে সিপাহি-জনতার সম্মিলিত বিপ্লব সফল হয়েছে। সশস্ত্র বাহিনী ও জনগণের ইচ্ছায় তিনি সেনাবাহিনী প্রধানের দায়িত্বের পাশাপাশি সাময়িকভাবে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।
সম্পাদকীয়তে শুধু সেনাবাহিনী নয়; নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বাংলাদেশ রাইফেলস, পুলিশ ও আনসার বাহিনীর সদস্যদেরও এই ঐতিহাসিক অভিযাত্রার অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। সিপাহি ও জনতার ঐক্যকে তুলনাহীন আখ্যা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার ঐক্যের সঙ্গে এর তুলনা করা হয়।
দৈনিক বাংলার প্রথম পাতায় আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিরোনাম ছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য— ‘রাষ্ট্রপতি নিজেই প্রধান সামরিক কর্মকর্তা’, ‘উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা হবে’, ‘সম্ভব হলে ৭৭-এর ফেব্রুয়ারির আগে নির্বাচন’, ‘এক্ষণে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্দলীয় ব্যক্তির প্রয়োজন : মোশতাক’ এবং ‘রাজনৈতিক কারণে আটক ব্যক্তিদের মুক্তি দেওয়া হবে’।
এসব শিরোনাম থেকে বোঝা যায়, পত্রিকাটি শুধু রাজপথের উল্লাস তুলে ধরেনি; নতুন রাষ্ট্রীয় প্রশাসন, নির্বাচন এবং রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তির মতো বিষয়েও গুরুত্ব দিয়েছিল। অর্থাৎ ৭ নভেম্বরের পর রাষ্ট্র কীভাবে পরিচালিত হবে, সে প্রশ্নও তখন সংবাদপত্রের আলোচনায় উঠে এসেছিল।
দৈনিক সংবাদে সামরিক আইন প্রশাসনের নতুন কাঠামো
৮ নভেম্বর দৈনিক সংবাদের প্রথম পাতায় প্রধান শিরোনাম ছিল ‘সামরিক আইন প্রশাসন কাঠামো গঠিত’। এর সঙ্গে উল্লেখ করা হয়, রাষ্ট্রপতি প্রধান প্রশাসক, বাহিনী প্রধান উপপ্রশাসক এবং চারজন আঞ্চলিক প্রশাসক দায়িত্ব পালন করবেন।
এই সংবাদটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে শুধু সেনানিবাসের নেতৃত্বে পরিবর্তন আসেনি, সামরিক আইন প্রশাসনের কাঠামোও নতুনভাবে সাজানো হচ্ছিল। রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমের অধীনে নতুন প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
দৈনিক সংবাদের প্রথম পাতায় আরও ছিল ‘দেশপ্রেমিক জনগণের প্রতি জিয়ার অভিনন্দন’, ‘কাল সারা দেশে যোগাযোগব্যবস্থা স্বাভাবিক ছিল’, ‘রাজধানীর পথে পথে লাখো জনতার আনন্দ মিছিল’ এবং ‘তাহের ঠাকুর ও শাহ মোয়াজ্জেম মুক্তি পেয়েছেন’ শিরোনামের খবর।
বিশেষ করে ‘রাজধানীর পথে পথে লাখো জনতার আনন্দ মিছিল’ প্রতিবেদনটি সেদিনের জনমনের একটি চিত্র তুলে ধরে। পত্রিকাটির বর্ণনায়, বৃহস্পতিবার গভীর রাত থেকে শুক্রবার প্রায় সারা দিন সেনাবাহিনী ও সাধারণ মানুষ একসঙ্গে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে অবস্থান করেন। ফুল, মালা ও শুভেচ্ছা দিয়ে সাধারণ মানুষ সৈনিকদের বরণ করে নেন। কোথাও মিষ্টি বিতরণ, কোথাও আলিঙ্গন, আবার কোথাও গান-বাজনা ও আনন্দ মিছিলের আয়োজন করা হয়।
ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত, শিল্প-কারখানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মানুষও মিছিলে অংশ নেন। এভাবে ৭ নভেম্বরের ঘটনাকে দৈনিক সংবাদও একটি ব্যাপক জনসম্পৃক্ত রাজনৈতিক পরিবর্তন হিসেবে উপস্থাপন করে।
পত্রিকাটির সম্পাদকীয় ‘মুক্তিসংগ্রামের অগ্রনায়কের অগ্রণী ভূমিকা’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়। এতে জিয়াউর রহমানকে জাতির সংকটকালে এগিয়ে আসা একজন নেতা হিসেবে বর্ণনা করা হয়। সম্পাদকীয়তে তার নেতৃত্ব, দৃঢ়তা ও সময়োপযোগী পদক্ষেপের প্রশংসা করা হয়। পাশাপাশি দেশের অস্থিরতা দূর করে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের মধ্যে ঐক্য ফিরিয়ে আনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়।
সম্পাদকীয়তে খন্দকার মোশতাক আহমদের বক্তব্যের প্রসঙ্গও আসে। সেখানে গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার প্রত্যাশা প্রকাশ করা হয়। মোশতাকের ক্ষমতা হস্তান্তরের সিদ্ধান্তকে ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। একই সঙ্গে শ্রমিক, মেহনতি মানুষ, বুদ্ধিজীবী ও সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ অবজারভারে রাষ্ট্রপতি সায়েমের নতুন দায়িত্ব
৮ নভেম্বর ১৯৭৫ সালের The Bangladesh Observer-এর প্রথম পাতার খবরেও ৭ নভেম্বরের ক্ষমতার পরিবর্তন গুরুত্ব পায়। পত্রিকাটির প্রধান সংবাদে রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমের নতুন দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়টি তুলে ধরা হয়। আগের দিন রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়া সায়েম নতুন পরিস্থিতিতে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের (CMLA) দায়িত্বও গ্রহণ করেন।
প্রতিবেদনে রাষ্ট্রের নতুন ক্ষমতা কাঠামো, জিয়াউর রহমানের সেনাপ্রধান হিসেবে অবস্থান এবং সামরিক প্রশাসনের পরিবর্তনের বিষয়টি গুরুত্ব পায়। এতে স্পষ্ট হয়, ৭ নভেম্বরের পর দেশে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে।
বাংলা দৈনিকগুলোর প্রতিবেদনে যেখানে সৈনিক ও সাধারণ মানুষের উচ্ছ্বাস, জিয়াউর রহমানের মুক্তি এবং সিপাহি-জনতার ঐক্য বেশি গুরুত্ব পেয়েছিল, সেখানে অবজারভারের প্রতিবেদনে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাঠামোগত পরিবর্তনের দিকটি বেশি সামনে আসে।
ফরাসি পত্রিকা লে মঁদে : ক্ষমতা দখলের নতুন অধ্যায়
ফ্রান্সের প্রভাবশালী দৈনিক Le Monde ৮ নভেম্বর ১৯৭৫ সংখ্যায় বাংলাদেশের ঘটনাকে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তুলে ধরে। পত্রিকাটির শিরোনাম ছিল, ‘ÔLe général Ziaur
Rahman, ancien chef d’état-major s’empare du pouvoir’— অর্থাৎ সাবেক সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান ক্ষমতা গ্রহণ করেছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানে সেনাপ্রধানের পদ হারানো জিয়াউর রহমান ৭ নভেম্বরের পাল্টা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আবার ক্ষমতার কেন্দ্রে ফিরে আসেন। রেডিও বাংলাদেশের ঘোষণার বরাত দিয়ে বলা হয়, তিনি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ও সশস্ত্র বাহিনীর নেতৃত্বের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।
জিয়াউর রহমানের বেতার ভাষণের বক্তব্যও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়। সেখানে তিনি বলেন, দেশের জনগণ, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বাংলাদেশ রাইফেলস, পুলিশ ও আনসারসহ বিভিন্ন পক্ষের অনুরোধে তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।
লে মঁদের প্রতিবেদনের বিশেষ দিক ছিল, তারা ঘটনাটিকে শুধু জনতার বিপ্লব হিসেবে দেখেনি; বরং সেনাবাহিনীর উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে দীর্ঘদিনের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং পাল্টা অভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে।
ওয়াশিংটন পোস্টে আবারও ক্ষমতার পালাবদল
যুক্তরাষ্ট্রের দৈনিক The Washington Post-ও ৮ নভেম্বর ১৯৭৫ সংখ্যায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সংবাদটির শিরোনাম ছিল ÔPower
Shifts in Dacca Again : Ousted General Stages ComebackÕ— অর্থাৎ ঢাকায় আবারও ক্ষমতার পরিবর্তন, ক্ষমতাচ্যুত জেনারেলের প্রত্যাবর্তন।
শিরোনাম থেকেই বোঝা যায়, পত্রিকাটি ঘটনাটিকে মূলত সামরিক ক্ষমতার পালাবদল হিসেবে দেখেছিল। ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত জিয়াউর রহমান কীভাবে চার দিনের মাথায় আবার সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে ফিরে এলেন, সেটিই ছিল তাদের প্রতিবেদনের মূল বিষয়।
এখানে বাংলাদেশের সংবাদপত্রের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের দৃষ্টিভঙ্গির একটি পার্থক্য লক্ষ করা যায়। দেশের কয়েকটি পত্রিকায় ৭ নভেম্বরের ঘটনা ‘সিপাহি-জনতার বিপ্লব’ হিসেবে বর্ণিত হলেও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, পাল্টা অভ্যুত্থান ও ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস বেশি গুরুত্ব পেয়েছিল।
ইতিহাসের একটি ব্যাখ্যায় ৭ নভেম্বরকে সামরিক অভ্যুত্থান ও ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের অংশ হিসেবে দেখা হয়। এই ব্যাখ্যায় জাসদের সৈনিক সংগঠনের ভূমিকা, আবু তাহেরের রাজনৈতিক লক্ষ্য এবং পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তাহেরের দূরত্বকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
ঘটনার পরবর্তী পরিণতিও ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। ৭ নভেম্বরের পর জিয়াউর রহমান সামরিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসেন। তবে তিনি তখনই রাষ্ট্রপতি হননি। বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধান ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্বে ছিলেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৭৬ সালে আবু তাহেরকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৭৬ সালের ২১ জুলাই সামরিক আদালতের বিচারে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এই পরিণতি ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের ভেতরের রাজনৈতিক দ্বন্দ্বকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
ফলে ৭ নভেম্বরকে শুধু একটি পক্ষের বর্ণনায় সীমাবদ্ধ রাখলে ইতিহাসের পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না; বরং ওইদিনের সামরিক বিদ্রোহ, জনসম্পৃক্ততা, রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর ভূমিকা, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব এবং পরবর্তী রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তন— সবকিছু মিলিয়েই ঘটনাটি মূল্যায়ন করতে হয়।
পরদিনের সংবাদপত্র : একটি সময়ের জীবন্ত দলিল
১৯৭৫ সালের ৮ নভেম্বরের সংবাদপত্রগুলোর পাতা পর্যালোচনা করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে— ৭ নভেম্বরের ঘটনা তখনকার মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। চার দিনের অনিশ্চয়তা, সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ সংঘাত এবং রাষ্ট্রক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগের পর রাজধানীর রাজপথে মানুষের উপস্থিতি সংবাদপত্রগুলোর প্রতিবেদনে বিশেষভাবে জায়গা পেয়েছিল।
ইত্তেফাকের ‘প্রাণবন্যার উচ্ছল নগরী’, দৈনিক বাংলার ‘জিয়ার নেতৃত্বে সিপাহি জনতার বিপ্লব’ এবং ‘আনন্দে উদ্বেল মানুষের ঢল নেমেছিল’ কিংবা দৈনিক সংবাদের ‘সামরিক আইন প্রশাসন কাঠামো গঠিত’ ও ‘রাজধানীর পথে পথে জনতার আনন্দ মিছিল’— এসব শিরোনাম শুধু খবরের শিরোনাম ছিল না। এগুলো ছিল একটি উত্তাল সময়ের রাজনৈতিক ভাষ্য।
সম্পাদকীয়গুলোতেও স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, জাতীয় ঐক্য, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও শান্তি প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা উঠে এসেছিল। বিশেষ করে তিনটি পত্রিকাই কোনো না কোনোভাবে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বকে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরেছিল। একই সঙ্গে জনগণ ও সশস্ত্র বাহিনীর ঐক্যের বিষয়টি ছিল তাদের প্রতিবেদনের অন্যতম প্রধান উপজীব্য।
সময়ের আলো/আতা