প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৯, ১২:০০ এএম (ভিজিট : ৪৮২)
শেষ হয়ে গেল ২০১৯ সাল। ক্যালেন্ডার শুধু নয় আমাদের জীবন থেকেও ঝরে গেল একটি বছর। আসছে নতুন বছর। হাজারো দুঃখ-বেদনা, আশা-নিরাশা আর চাওয়া-পাওয়ার দোলাচলে ভরা ছিল চলে যাওয়া একটি বছর। সবকিছু এখনও উজ্জ্বল হয়ে আছে স্মৃতির পাতায়। বছরের একেবারে শেষের দিকে শীতের দাপট ছিল ভয়ানক। ছিল মাঝে মাঝে বর্ষাও। ফলে শীতের মাত্রা আরও বেড়েছে পারদ নামিয়ে।
বিগত বছরগুলোর তুলনায় এবারের শীত কিছুটা আগেই এলো বোধহয়। আর তীব্রতাও ছিল বেশ। বিশ^ব্যাপী আবহাওয়ার পরিবর্তন ঘটেছে উষ্ণায়নের কারণে। আমরা তাতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হব, এটা সবাই বলেছেন। উন্নয়নশীল বা উন্নত দেশগুলোর ক্ষতি হবে কম। এ নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সভা সেমিনারে দিনের পর দিন তর্ক-বিতর্ক হয়েছে, কিন্তু সমস্যা যাদের বেশি তাদের জন্য খুব বেশি কিছু করা যায়নি এখনও, তবে যুক্তি তর্কের শেষ নেই। চলছে এখনও। আবহাওয়া পরিবর্তনের জন্য অকালে বৃষ্টি হচ্ছে। মাঝেমধ্যেই দেখা পাওয়া যাচ্ছে নানা নামের ঘূর্ণিঝড়ের। এই যেমন কিছুদিন আগেই গেল। তাতে ক্ষয়ক্ষতি আমাদের তো কম হয়নি। বাঁচিয়ে দিয়েছে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট সুন্দরবন। ফেলে আসা বছরে উল্লেখযোগ্য ছিল নুসরাত হত্যার বিষয়টি। সারা বছর জুড়ে দেশের এখানে-সেখানে ধর্ষণ আর হত্যার ঘটনা কম ঘটেনি। কোনো কোনো ঘটনা নিয়ে যথেষ্ট আলোড়ন সৃষ্টি হলেও নুসরাত হত্যার ঘটনাটি সবার নজরে এসেছিল অন্য কারণে। এক্ষেত্রে নুসরাত ছিল প্রতিবাদী এক মেয়ে, সে সহজে তার হত্যাকারীদের ছেড়ে দিতে চায়নি। তার সাহসী প্রতিবাদী কণ্ঠ সাধারণ মানুষের মনে প্রতিবাদের আগুন ছড়িয়ে দিতে পেরেছিল।
ঘটনাটি ঘটেছিল ২০১৯ সালের এপ্রিলে। ফেনীর সোজাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার ঘৃণ্য লালসার শিকার হয়েছিল নুসরাত। পরে সে গিয়েছিল বিচার চাইতে সোজাগাজী থানায়। কিন্তু থানার ওসি মামলা নিলেও নুসরাতকে নানা কথা বলে হেনস্থাই শুধু করেনি বরং তার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছেড়ে দেয়। এদিকে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ নুসরাতকে তার করা মামলা তুলে নিতে চাপ দেয়। নুসরাত তাতে রাজি না হলে নুসরাতের হাত-পা বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা করে পাঁচ দুর্বৃত্ত। মারাত্মক আহত অবস্থায় নুসরাতকে ভর্তি করা হয় হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে। ১০ এপ্রিল মারা যায় নুসরাত। বিচারের পরে অক্টোবরের ২৪ তারিখে ১৬ অপরাধীকে মৃত্যুদÐে দÐিত করেন আদালত। সোজাগাজী থানার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধেও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হলে তাকেও আট বছরের সাজা দেওয়া হয়। আরও একটি আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা ছিল বুয়েটের ছাত্র আবরার ফাহাদের নির্মম মৃত্যুর ঘটনা। ঘটনাটি ঘটে ২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর রাতে বুয়েটের শেরেবাংলা হলে। বুয়েট ছাত্রলীগের কিছু নেতাকর্মী তাকে শিবির সন্দেহে নির্মম নির্যাতনের মধ্য দিয়ে মেরে ফেলে। পুলিশ পরে অভিযুক্ত খুনিদের ধরে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। বুয়েটের ছাত্রদের দাবির মুখে বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ হয়ে যায়। খুনের সঙ্গে জড়িত ২৫ জনকে বহিষ্কার করা হয় বুয়েট থেকে।
২০১৯ সালের আলোচিত ঘটনার মধ্যে বরগুনার রিফাত শরীফ হত্যাকাÐও ছিল। যা সে সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঝড় তোলে। পুলিশ তদন্ত শেষে ২৪ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দিয়েছে। বিচার শেষ হতে সময় লাগবে। ধারণা করতে পারি, এসব নৃশংস ঘটনা এই নতুন বছরে আমাদের দেশের মানুষ ও নতুন প্রজন্মকে আরও প্রতিবাদী করে তুলবে। ফলে অপরাধের মাত্রা কমে যাবে। দেশের মানুষ শান্তিতে থাকবে। ২০১৯ সালে গুজবের ছড়াছড়ি ছিল প্রচুর। বছরের মাঝামাঝি সময়ে ঘটেছে গণপিটুনিতে মৃত্যু পর্যন্ত। যার উৎস ছিল মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ফলে গুজবের শিকার হয়ে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে নিহত হলো ৪৩ জন। পদ্মা সেতু নির্মাণে মানুষের মাথা প্রয়োজনÑ এ ধরনের গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল শহর ছাড়িয়ে গ্রামাঞ্চলেও। শুধু গুজবের কারণে দেশের সাধারণ মানুষ যে হঠাৎ করে কতটা নিষ্ঠুর আর অসহিষ্ণু হয়ে উঠতে পারে এসব ঘটনা ছিল তারই প্রমাণ। আমরা কি এই নতুন বছরে এ ধরনের নির্মম নৃশংস ঘটনা যাতে আর না ঘটে সে বিষয়ে সচেতন ও সতর্ক হতে পারব?
এতসব নেতিবাচক ঘটনার পরেও আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকাÐ সম্পর্কে আশার আলো ছড়িয়েছিল ৯৯৯ হেল্প ডেস্ক। অসংখ্য মানুষ তাদের বিপদের সময়ে ৯৯৯-এ কল করে তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া এবং সাহায্য পেয়েছে। বিশেষ করে ধর্ষণ, বাল্যবিয়ে বন্ধসহ নানা ধরনের দুর্ঘটনায় যথাসময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের তাৎক্ষণিক জরুরি সেবা পেয়েছে দেশের বিভিন্ন স্থানের সাধারণ মানুষ। এই সেবা এখনও অব্যাহত রয়েছে।
২০১৯ সালে মাদকবিরোধী অভিযানও ছিল সাধারণ মানুষের মধ্যে আলোচনার বিষয়। দেশ জুড়ে মাদক ব্যবসার রমরমা অবস্থাকে সামাল দিতে পরিচালনা করা হয় শুদ্ধি অভিযান। যার মূল টার্গেট ছিল মাদক ব্যবসায়ী। অত্যন্ত কঠোরভাবে এই অভিযান চালানোর ফলে মাদক ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। জিরো টলারেন্স-এর কবলে পড়ে ধীরে ধীরে সংকুচিত হতে থাকে মাদক ব্যবসা। ক্রসফায়ারে তথা বন্দুকযুদ্ধে মারা পড়ে সূত্র মতে ৪৭২ জন মাদক কারবারি। এদের মধ্যে কক্সবাজারেই নিহত হয় ১৯৫ জন। যার মধ্যে নারী ছিল তিনজন। রোহিঙ্গা ছিল ৫০ জন। আতঙ্কে ভীতসন্ত্রস্ত শতাধিক মাদক ব্যবসায়ী আত্মসমর্পণ করে।
কিন্তু এরপরেও প্রশ্ন থাকে। মাদক ব্যবসা কি নির্মূল হলো? তবে অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, মাদকের কেনাবেচা, লেনদেন ও সরবরাহ আগের চেয়ে অনেক কমেছে। অভিজ্ঞজনদের ধারণা, এই অভিযান এ বছরেও চালু থাকলে মাদক ব্যবসা তেমনভাবে আর চালাতে সাহস পাবে না মাদক কারবারিরা।
২০১৯ সালে সারা দেশের মানুষ যা নিয়ে দীর্ঘদিন সবচেয়ে বেশি আতঙ্কে ছিল তা হলোÑ ডেঙ্গু রোগের বিস্তার। অন্যান্য সময়ের তুলনায় এ বছরে ডেঙ্গু রোগের ব্যাপকতা ছিল মারাত্মক। আগে ডেঙ্গু রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা গিয়েছিল ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনাতে। কিন্তু ২০১৯ সালে দেশের ৬৪ জেলাতেই তা ছড়িয়ে পড়েছিল।
বছরের মাঝাাঝি অথচ জুলাই মাসেই ডেঙ্গুর ব্যাপকতা বেড়ে যায়। হঠাৎ করে এভাবে ডেঙ্গু ছড়িয়ে যাবার কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখা গেছে, তখন ডেঙ্গুর প্রধান কারণ যে এডিস মশা সেই মশা মারার জন্য যে ওষুধ ব্যবহার করা হয়েছিল তার কার্যকারিতা বলতে গেলে তেমনভাবে ছিলই না। তবে এটা জানার পরেও সেই ওষুধই আবার ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে ডেঙ্গু রোগের প্রকোপ কমানো সম্ভব হয়নি, বিশেষ করে ঢাকা মহানগরীতে। এই ওষুধ ছিটানোর দায়িত্ব ছিল দুই সিটি করপোরেশনের ওপর। এবারে নিশ্চয়ই তারা সতর্ক হবে। এ পর্যন্ত এ রোগে ২৬৪ জনের মৃত্যুর হিসাব রয়েছে রোগতত্ত¡, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কাছে যার মধ্যে ১৩৩ জনের মৃত্যু ডেঙ্গুর কারণেই ঘটেছে বলে তারা নিশ্চিত করেছে।
এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের ধারণাÑ এখন থেকেই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে ২০২০ সালেও এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে। আমরা কি এখনও, এই নতুন বছরে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করব না? ২০১৯ সালের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় যে রাজাকার তালিকা প্রকাশ করে তা নিয়ে যে অনভিপ্রেত বিতর্ক আর বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছিল তা শুধু মুক্তিযোদ্ধাদেরই নয় বরং সারা দেশের মানুষের কাম্য ছিল না। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ সব গণমাধ্যমে বিতর্কের ঝড় বয়ে গেছে স্বাভাবিকভাবেই। বিভিন্ন টিভির টকশোতে এ নিয়ে নানাভাবে আলোচনা সমালোচনা হয়েছে দিনের পর দিন। শেষ পর্যন্ত উদ্ভ‚ত পরিস্থিতিকে সামাল দিতে স্বয়ং প্রধনামন্ত্রীকে, বিক্ষুব্ধ মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক বিষয় নিয়ে কথা বলে সান্ত¡না দিতে হয়েছে। পরে প্রত্যাহার করতে হয়েছে বিতর্কিত রাজাকার তালিকা।
এই কদিন আগে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেছেন, ‘স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে রাজাকারদের তালিকা নিয়ে সেটা যাচাই-বাছাই না করেই প্রকাশ করে বেআক্কেলের মতো কাজ করেছি। এই ভুলের জন্য ক্ষমা চেয়েছি। তাই বলে এই তালিকা হবে না, তা নয়। রাজাকারের তালিকা হবেই হবে। এই তালিকা ২৬ মার্চ যাচাই-বাছাই করে প্রকাশ করা হবে বলে আগেই বলা হয়েছে। মন্ত্রী এদিন আরও বলেন, এই জানুয়ারি মাসেই প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে। ইতোমধ্যে তালিকার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এখন সেই তালিকা নিয়ে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তালিকা প্রকাশের পর দুই মাস সময় দেওয়া হবে। কারও কোনো অভিযোগ থাকলে তারা জানাতে পারবেন। সেসব অভিযোগ তদন্ত করে আবার তালিকা প্রকাশ করা হবে। ২৬ মার্চের আগেই প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের ছবিসহ পরিচয়পত্র দিয়ে দেওয়া হবে।’ ফেলে আসা দিনগুলোতে আমাদের জীবনে ভুলভ্রান্তি, দুঃখ-বেদনা আর ব্যর্থতা একেবারে ছিল না, এমন নয়। তবে তার মধ্যেও সাফল্য কম ছিল না। তেমনি বর্তমান সরকারের আমলেও নানা ব্যর্থতার মধ্যেও স্বপ্নের পদ্মা সেতু নির্মাণে অগ্রগতি ছাড়াও দৃশ্যমান সাফল্য অর্জিত হয়েছে প্রায় সর্বক্ষেত্রে। সেসব সাফল্য আর দেশের কোটি কোটি মানুষের ভালোবাসা নিয়ে এই নতুন বছরে সামনের দিকে এগিয়ে যাক আমাদের অপার সম্ভাবনার স্বাধীন বাংলাদেশ।
ষ কথাসাহিত্যক ও সাংবাদিক