ই-পেপার মঙ্গলবার ১৬ জুলাই ২০২৪
মঙ্গলবার ১৬ জুলাই ২০২৪

ভারত-কানাডার সম্পর্ক কি সংস্কারযোগ্য
প্রকাশ: শনিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৩, ১২:২৯ পিএম  (ভিজিট : ৮০৩)
ভারত ও কানাডার মধ্যে সম্পর্ক বেশ কিছু দিন ধরেই উত্তাল। কিন্তু এই সপ্তাহে এসে সেই অবস্থার আরও অবনতি হলো। সোমবার কানাডিয়ান প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায় একজন কানাডিয়ান শিখকে হত্যার জন্য ভারতকে অভিযুক্ত করার পর ভারত সরাসরি এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। দুই দেশের এই মুখোমুখি অবস্থানে কূটনৈতিক দ্বন্দ্ব শিগগিরই শিথিল হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এই বিষয়ে নিজ নিজ দেশের মন্তব্য তুলে ধরেছেন ভারতের বারখা দত্ত এবং কানাডার ডেভিড মসক্রপ।

বারখা দত্ত : ভারত ও কানাডা সম্পর্ক এখন ভাঙনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। এ জন্য ট্রুডোকেই সব দায়ভার নিতে হবে। নিজ দেশের চরমপন্থি কার্যক্রম থেকে চোখ ফেরানোর অভ্যাস কানাডিয়ান প্রধানমন্ত্রীর আছে, তবে খালিস্তানের পক্ষের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা যারা শিখদের জন্য একটি পৃথক আবাসভূমি দেখতে চান তাদের সমর্থন দিয়ে ট্রুডো এখন নিজেকে ভারতে সবচেয়ে অপছন্দের বিশ্ব নেতার তালিকায় এনেছেন।
তার দাবি, স্বঘোষিত খালিস্তান টাইগার ফোর্সের নেতা এবং ভারতের চিহ্নিত সন্ত্রাসী হরদীপ সিং নিজ্জার হত্যার পেছনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভারত সরকার কাজ করেছে। এই বক্তব্যের কারণে তার সুনাম অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

নিজ্জার ভারতে একাধিক অপরাধের জন্য ওয়ান্টেড ছিল। ২০১৬ সালে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তার গ্রেফতারের জন্য ইন্টারপোলের কাছে একটি রেড নোটিস দাখিল করে। ১৮ জুন, তিনি একটি শিখ মন্দিরের পার্কিং লটে অজ্ঞাত আততায়ীর দ্বারা গুলিবিদ্ধ হন। সেই সময়ে কিছু কানাডিয়ান সাংবাদিক খালিস্তানি গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে আন্তঃসংযোগের দিকে ইঙ্গিত করেছিলেন। গ্লোবাল খালিস্তান নেটওয়ার্কের একজন বিশেষজ্ঞ টেরি মিলুস্কি আমাকে বলেছেন, ‘এটি আন্তঃসম্প্রদায়ের মধ্যে ঝামেলার ফসল’।

এখন প্রায় ৪ মাস পর ট্রুডো নিজ্জারের মৃত্যুকে হত্যা বলে দাবি করছেন। ভারতীয়দের কাছে এই দাবি এবং প্রশ্ন উত্থাপনের সময় দুটোই সন্দেহজনক। আসন্ন নির্বাচনের আগে এমন মিথ্যা দাবি তুলে ট্রুডো কোন স্বার্থ হাসিল করতে চাইছেন তা নিয়ে অনেক ধরনের যুক্তি উঠে আসছে। ভারতীয়দের সংশয় মূলত ট্রুডোর পুরোনো ট্র্যাক রেকর্ডের ওপর ভিত্তি করে। তার নজরদারির মধ্যেই ভারতীয়দের বিরুদ্ধে সহিংসতার প্রকাশ্য প্ররোচনা বেড়েছে। শিখ চরমপন্থিরা প্রাক্তন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকা- উদযাপন উপলক্ষে ফ্লোট প্যারেড করেছে, ভারতীয় কূটনীতিকদের বিরুদ্ধে সহিংসতার আহ্বান জানিয়ে ‘কিল ইন্ডিয়া’ পোস্টার লাগিয়েছে এবং হিন্দু মন্দির ভাঙচুর করেছে। এমনকি জঙ্গিদের সমর্থন করে এমন অনুষ্ঠানে ট্রুডো যোগ দিয়েছেন এবং সফল অংশগ্রহণ করেছেন।

ভারতীয় কূটনীতিকরা বারবার তাদের আপত্তি জানিয়েছেন। সেই সঙ্গে ভারতীয় জনগণও এই বিষয়টি নজরে এনেছে। তাদের এই বাড়াবাড়ি মোটেও ভালো লাগেনি।

ট্রুডো যখন নয়াদিল্লিতে সাম্প্রতিক গ্রুপ অব ২০-এর মিটিংয়ে ছিলেন, তখন নিজ্জারের আইনজীবী গুরপতবন্ত পান্নুন ভারতের শীর্ষ নেতৃত্বের ‘রাজনৈতিক মৃত্যু’ হয়েছে বলে উল্লেখ করেন। এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, ‘আমরা তোমাদের ধরতে আসছি’। অন্য একটি ভিডিওতে তিনি কানাডার হিন্দুদের ‘ফিরে যাওয়ার’ দাবি জানান।

ট্রুডোর প্রতি ভারতের ক্ষোভের শুরুটা তার পিতা পিয়েরে ট্রুডোর থেকে, যিনি ১৯৬৮ থেকে ১৯৭৯ সাল এবং পরে ১৯৮০ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত কানাডার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ১৯৮২ সালে ট্রুডো তালউইন্দার সিং পারমারকে ভারতের কাছে হস্তান্তরের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এই পারমার ১৯৮৫ সালে এয়ার ইন্ডিয়ার একটি ফ্লাইটে বোমা স্থাপনকারী সন্ত্রাসী সংগঠনের প্রধান হন। বোমাটি মাঝআকাশে বিস্ফোরিত হয়, এতে ৩২৯ জন নিহত হয়, যাদের মধ্যে ২৬৮ জন কানাডিয়ান নাগরিক ছিলেন।

২০১৬ সালে, জাস্টিন ট্রুডোর প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরপরই, একটি প্যারোল বোর্ড বোমা হামলার জন্য দোষী সাব্যস্ত হওয়া একমাত্র ব্যক্তিকে মুক্তি দেয়। তখন তিনি ৯ বছরের কারাদণ্ডের মাত্র দুই-তৃতীয়াংশ শাস্তি ভোগ করেছিলেন।

২০১৮ সালে ট্রুডো যখন ভারত সফরে আসেন, তখন পাঞ্জাব রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী অমরিন্দর সিং তাকে ওয়ান্টেড সন্ত্রাসীদের একটি তালিকা দেন, যার মধ্যে নিজ্জার অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু ঠিক বাবার মতো তিনিও কিছুই করেননি।

কানাডার প্রধানমন্ত্রী নিজ্জার হত্যার বিষয়ে কোনো প্রমাণ জনসম্মুখে আনেননি। তাই ভারতে এটিকে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হবে না। বেশিরভাগ মানুষ এই অভিযোগগুলোকে ভারতের আন্তর্জাতিক খ্যাতি নষ্ট করার বিনিময়ে তার জনপ্রিয়তা হ্রাস ঠেকানোর একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখেন। তবে এই ক্ষতি মেরামত করা কঠিন হবে।

ডেভিড মসক্রপ : কয়েক বছর ধরে, ভারত ও কানাডা ধীরে ধীরে পারস্পরিক স্বার্থে তাদের সম্পর্ক জোরদার করেছে। তারই জের ধরে ২০২২ সালের মধ্যে  ট্রুডো সরকার তার ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটিজি চালু করে, যার লক্ষ্য ছিল ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, আঞ্চলিক সহযোগিতা, সমন্বিত জলবায়ু কর্ম এবং স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা।

এই কৌশলের অংশ হিসেবে, অটোয়া ভারতের সঙ্গে একটি মুক্তবাণিজ্য চুক্তিতে পৌঁছানোর প্রচেষ্টা পুনরায় শুরু করতে চেয়েছিল যা ২০১৭ সালে স্থগিত হয়ে গিয়েছিল। গত বছরের বিভিন্ন রিপোর্ট ইঙ্গিত দেয় যে দুটি দেশ একটি চুক্তি সিল করার খুব কাছাকাছি ছিল।

তারপরে জুন মাসে ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার সারেতে একটি শিখ মন্দিরের পার্কিং লটে কানাডিয়ান এবং শিখ কর্মী হরদীপ সিং নিজ্জারকে গুলি করা হয়। সোমবার, প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো হাউস অব কমন্সে বলেন যে কানাডিয়ান গোয়েন্দাদের কাছে ‘ভারত সরকারের এজেন্টদের মধ্যে একটি সম্ভাব্য যোগসূত্রের বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ রয়েছে’। সংক্ষেপে কানাডা তার মাটিতে একজন কানাডিয়ান নাগরিককে বিচার বহির্ভূত হত্যার জন্য ভারতকে অভিযুক্ত করেছে।

হত্যা এবং পরবর্তী অভিযোগ ভারত-কানাডিয়ান সম্পর্কের দ্রুত এবং গুরুতর অবনতি ঘটিয়েছে। কানাডায় ভারতীয় কূটনীতিক এবং বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান পবন কুমার রাইকে বহিষ্কার করেছে। কানাডার একজন কূটনীতিককে বহিষ্কার করে ভারতও তার জবাব দিয়েছে। বুধবার, নয়াদিল্লি কানাডায় ভারতীয়দের ‘ক্রমবর্ধমান ভারতবিরোধী কার্যকলাপ, রাজনৈতিকভাবে ঘৃণিত অপরাধ এবং অপরাধমূলক সহিংসতাকে প্রত্যাখ্যান করার’ কারণে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কানাডাকে কট্টরপন্থি ও সন্ত্রাসবাদী শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ করেছেন। তবে কানাডা ঠিক করে রেখেছে যে মত প্রকাশের স্বাধীনতা, অন্যান্য সাংবিধানিক অধিকার এবং আইনের শাসনকে সম্মান করে তারা শিখ প্রবাসী সম্প্রদায়ের সঙ্গে ভিন্ন আচরণ করবে না।

তদুপরি কানাডা হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভারতীয় জনতা পার্টির সমর্থিত মোদির প্রধানমন্ত্রিত্বের অধীনে ভারতের সংখ্যালঘুবিরোধী দলগুলোর অত্যাচারের খবরে ক্রমশ ক্লান্ত হয়ে পড়ছে। জুন মাসে নিজ্জার হত্যার সময় ট্রুডোর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জোডি থমাস সতর্ক করেছিলেন যে ভারত কানাডার গণতন্ত্রে বিদেশি হস্তক্ষেপের শীর্ষস্থানীয় উৎস। মোটকথা, মোদি বিদেশে ভারতীয় অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতে চান। এটা অসহনীয়। এর নামে খুন আরও বেশি খারাপ।

ভারতের সঙ্গে কানাডার সম্পর্ক ‘সংস্কার অযোগ্য’ বলে দাবি করা প্রতিবেদনগুলো সম্ভবত অতিরঞ্জিত। ২০২২ সালে ভারত কানাডার ১০ম বৃহত্তম ব্যবসায়িক অংশীদার ছিল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের থেকে বেশ পিছিয়ে কিন্তু ক্রমবর্ধমান। এটি কানাডার অভিবাসীদের শীর্ষ উৎসও। দ্বিতীয় স্থানে থাকা চীনের তুলনায় প্রায় চারগুণ বেশি।

সম্পর্ক নিম্ন পর্যায়ে আছে ঠিকই কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্বার্থ সম্ভবত সময়ের সঙ্গে উন্নতি করতে বাধ্য করবে। চীনকে দমিয়ে রাখতে পশ্চিমের ভূ-রাজনৈতিক লক্ষ্যের জন্য ভারত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেনসহ কানাডার শীর্ষ মিত্ররা ভারতের সঙ্গে তাদের নিজেদের সম্পর্ককে বিঘ্নিত করার সম্ভাবনা কম। এমনকি তারা কথিত হত্যাকাণ্ডের জন্য কানাডার ক্ষোভের পরও খুব একটা মুখ খোলেননি। 

প্রকৃতপক্ষে, তারা নিঃসন্দেহে জিনিসগুলোকে মসৃণ করার জন্য পর্দার আড়ালে থেকে কাজ করবেন। ইতিমধ্যে, যদিও নিজ্জার হত্যাকাণ্ডের তদন্ত এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভারত-কানাডিয়ান সম্পর্কের আরও অবনতি হতে পারে। আর এমনটাই হওয়া উচিত। এমনকি বাস্তববাদী বিদেশি নীতিগুলোকে একপাশে রাখা দরকার যখন রাষ্ট্রগুলো দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন করে।

সময়ের আলো/জেডআই




https://www.shomoyeralo.com/ad/1698385080Google-News-Update.jpg

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: কমলেশ রায়, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক গাজী আহমেদ উল্লাহ
নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।

ফোন : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : +৮৮-০২-৯৬৩২৩৭৫ | ই-মেইল : shomoyeralo@gmail.com
close