দ্বাদশ জাতীয় সংবাদ নির্বাচনের মাঠে বিরোধী দল হিসেবে বিএনপি অংশগ্রহণ না করলেও আওয়ামী লীগ সমর্থিত নৌকা ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে একাধিক সংঘর্ষ ঘটেছে। এসব ঘটনায় ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজনের প্রাণহানি, আহত ও একাধিক ভোটকেন্দ্র পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
এবারের নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে বিএনপি না থাকলেও এ সহিংসতা ও সংঘাতের নেপথ্য কারণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে জনমনে। ভোটের দিন ও আগে-পরে এ সহিংসতা আরও বাড়বে কি না-এমন প্রশ্নও নাগরিকদের। তবে অপরাধ বিশ্লেষক ও বিশিষ্ট নাগরিকরা বলছেন, আমাদের দেশে সব সময় নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে গিয়ে ক্ষমতাকেন্দ্রিক অন্তর্দ্বন্দ্ব ঘটে থাকে। এবারের নির্বাচনও তার ব্যতিক্রম নয়। ফলে নির্বাচনের আগে-পরে সহিংসতা ও সংঘাত অব্যাহত থাকতে পারে। পাশাপাশি নির্বাচন প্রতিহত করতে চাওয়া গোষ্ঠীগুলোর ইন্ধন রয়েছেও বলে মত অনেকের। নির্বাচনে নাশকতার পরিকল্পনার অভিযোগে মাগুরায় এক ছাত্রদল নেতাকে গ্রেফতারের তথ্য জানিয়েছে পুলিশ। তবে বিএনপির অভিযোগ, নির্বাচনি মাঠে বিএনপিকে না পেয়ে আওয়ামী লীগ নিজেরা নিজেরাই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে।
গণমাধ্যমের তথ্যে দেখা গেছে, নির্বাচনি প্রচার শুরুর পর গত ১৮ ডিসেম্বর থেকে গত ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত ১৮ দিনে নির্বাচনি সংঘাতে দেশে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে মোট ১৫৬টি জায়গায় নির্বাচনি সহিংসতা ঘটেছে। একই সময়ে ৫৮৯টি আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ আমলে নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের কারণ দর্শানোর নোটিস দিয়েছে নির্বাচনি অনুসন্ধান কমিটিগুলো। নির্বাচনি সহিংসতার অভিযোগে তিন দিনে এক উপজেলা চেয়ারম্যান ও জনপ্রতিনিধিসহ ৫০ জনকে গ্রেফতার করেছে র্যাব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক সময়ের আলোকে বলেন, এবারের নির্বাচনে নৌকা ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা আওয়ামী লীগ সমর্থক হলেও তাদের মধ্যে ক্ষমতাকেন্দ্রিক অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণে সংঘাত ও সহিংসতা ঘটছে। পাশাপাশি নির্বাচন প্রতিহত করতে চাওয়া গোষ্ঠীগুলোর ইন্ধনও বড় কারণ। এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জড়িতদের গ্রেফতার করে দ্রুত আইনের আওতায় আনলে এ ধরনের ঘটনা কম ঘটবে এবং ভবিষ্যতেও এড়ানো যাবে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার সময়ের আলোকে বলেন, এমপি হলে বহু ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকায় প্রার্থীদের মধ্যে এ ধরনের অশুভ প্রতিযোগিতা চলে।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের পরে সহিংসতা-সংঘাত নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে ঘটার আশঙ্কা কম। কেননা তখন যে প্রার্থীই বিজয়ী হবেন, তিনি আওয়ামী লীগের হওয়ায় বিষয়টি কেন্দ্র থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হবে।
অপরাধ বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক সময়ের আলোকে বলেন, বিএনপিসহ আন্দোলনকারী দলগুলো নির্বাচনে না গেলেও এলাকায় নিয়ন্ত্রণকারী ব্যক্তিরা নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করতে গিয়ে সংঘাত-সহিংসতা ঘটাচ্ছে। তিনি বলেন, অতীতেও কোনো বিশেষ প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের ওপর সহিংসতাসহ নারীদের ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। ভবিষ্যতেও এ ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে।
গণমাধ্যমের তথ্যে দেখা গেছে, নির্বাচনের দুদিন আগে ফেনী ও রাজশাহীতে একাধিক ভোটকেন্দ্রে আগুনের ঘটনা ঘটেছে। ভোরে ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার চরদরবেশ ইউনিয়নের চরসাহাভিকারী উচ্চ বিদ্যালয়ে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। এ ছাড়া গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে রাজশাহীর দুটি কেন্দ্রে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। নওগাঁ-৫ আসনে নৌকা প্রতীকের ৬টি নির্বাচনি ক্যাম্পে ভাঙচুর ও আগুন দেওয়া হয়। কুমিল্লায় বিএনপি-পুলিশ সংঘর্ষে বিএনপির একজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। ভোলায় বিএনপি-পুলিশ সংঘর্ষে পাঁচজন আহত হয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট তথ্যে আরও দেখা গেছে, গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম-১৫ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের ওপর হামলায় তিনজন আহত হয়। জামালপুর-৪ আসনে আওয়ামী লীগ এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে ১০ জন আহত। নাটোর-৩ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থীর এক নির্বাচনি এজেন্টের ওপর হামলা ও হাতুড়িপেটা করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। চট্টগ্রাম-১২ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীর প্রচারপত্র বিতরণের সময় দুই কর্মীকে ছুরিকাঘাত ও হামলা করে পাঁচজন আহত হয়। খুলনা-৩ আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর নির্বাচনি অফিসের এক নিরাপত্তাকর্মীর গায়ে কেরোসিন দিয়ে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে।
বিশিষ্ট নাগরিকরা যাই বলুন, সংঘাত-সহিংসতার জন্য পরস্পরকে দুষছে রাজনৈতিক দলগুলো।জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের প্রধান সমন্বয়ক ও এনপিপি চেয়ারম্যান ফরিদুজ্জামান ফরহাদ শুক্রবার দুপুরে এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, নির্বাচনি মাঠে বিএনপিকে না পেয়ে এখন আওয়ামী লীগ নিজেরা নিজেরাই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে। অন্যদিকে নির্বাচনের দিন বিএনপি-জামায়াত সারা দেশে সন্ত্রাস ও সহিংসতা করতে পারে বলে আশঙ্কা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের।
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন শুক্রবার নির্বাচনের নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয়ে কাকরাইল উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলে এক ব্রিফিংয়ে বলেন, মাগুরায় ছাত্রদলের একজন নেতাকে গ্রেফতারের পর সহিংসতা ও নাশকতার পরিকল্পনার বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে। তারা একটা পরিকল্পনা করেছিল-বিকট আওয়াজ করে ককটেল চার্জ করে মানুষের মনে ভীতি সঞ্চার করবে। তবে এ ধরনের নাশকতার চেষ্টা করলে ফল ভালো হবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়ে পুলিশপ্রধান ৯৯৯ নম্বরে অথবা সংশ্লিষ্ট থানায় যোগাযোগ করতে বলেন। এ ছাড়া নির্বাচনে নাশকতাকারীদের সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য দিলে ২০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছে পুলিশ সদর দফতর।
র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন গত বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, নির্বাচনি সহিংসতার অভিযোগে বৃহস্পতিবারের আগ পর্যন্ত ৭২ ঘণ্টায় এক উপজেলা চেয়ারম্যান ও জনপ্রতিনিধিসহ ৫০ জনকে গ্রেফতার করেছে সংস্থাটি।
সময়ের আলো/আরএস/