ডিজিটাল বাংলাদেশ। বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে এই শব্দের সঙ্গে পরিচিত নয় এমন মানুষের সংখ্যা অনেক কম। প্রান্তিক পর্যায়ে মোবাইল ও কেবল ইন্টারনেট ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে তথ্যের যেই অসীম ভান্ডার আমরা অর্জন করেছি, সেই সঙ্গে আমাদের ব্যক্তিগত জীবনকেও উন্মুক্ত করে দিয়েছি বিশ্বের সামনে। আর এ কারণেই বর্তমান সময়ে বিশ্বজুড়ে আলোচিত যেই ইস্যু, নিয়ে ভাববার সময় এসেছে আমাদের। অনলাইনে ব্যক্তিগত তথ্য রক্ষার যেই লড়াইয়ে ইউরোপ-আমেরিকার নাগরিকরা রয়েছেন, তাদের মতোই আমাদেরও লড়াই করার সময় এসেছে।
অনলাইনে শক্তিশালী কোনো পক্ষ আপনার ওপর নজরদারি রাখতে চাইলে তা থেকে রক্ষা পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। পেগাসাস কাহিনির পর বিষয়টি অধিকাংশের কাছেই বেশ স্পষ্ট। কিন্তু সর্বসাধারণের ক্ষেত্রে এ ধরনের কষ্টসাধ্য ও ব্যয়বহুল নজরদারি কেউ রাখতে চায় না। কিন্তু তারপরও প্রায়ই আপনার ব্যক্তিগত তথ্য চুরি হয়ে যাচ্ছে, ফাঁস হচ্ছে বিভিন্ন স্থানে। এটি কীভাবে সম্ভব হচ্ছে?
আপনি কি কখনও ভেবে দেখেছেন, আপনার পাসওয়ার্ড হয়তো কোন হ্যাকার বা সাইবার অপরাধী জেনে ফেলেছে এবং নিয়মিত আপনার ওপর নজর রাখছে। আর যখন আপনি এমন কিছু করবেন যা নিয়ে আপনাকে ব্ল্যাকমেইল করা যায়, তখন সে আপনার অ্যাকাউন্টের তথ্যগুলো ব্যবহার করবে। তার আগ পর্যন্ত হয়তো আপনি টেরই পাবেন না, আপনার সব কাজের তথ্য তাদের কাছে রয়েছে!
স¤প্রতি বছরগুলোয় সাইবার হ্যাকিং এবং পাসওয়ার্ড সংগ্রহ নিয়ে অনেক তথ্য একাধিকবার এসেছে। ‘হেভ আইবিন পনড’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ টরি হান্ট নর্ড ভিপিএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, যেকোনো স্থানে সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলতে গেলে আমি সবাইকে প্রশ্ন করি, যদি আপনাকে কোনো ওয়েবসাইট সাধারণ সংখ্যা ও অক্ষর দিয়ে পাসওয়ার্ড না দিতে বলে এবং অক্ষরের ক্ষেত্রে ‘আপারকেস-লোয়ারকেসের’ (ছোট-বড় অক্ষরের) মিশ্রণ ব্যবহার করতে বলে আপনি তখন পাসওয়ার্ড কি দেবেন? অধিকাংশ ক্ষেত্রে এমন প্রশ্ন করার পর অনেকেই উদ্বিগ্ন থাকেন এবং কেউ না কেউ উত্তর দেন- ‘আমি প্রথম অক্ষরটি ক্যাপিটাল লেটার করে পাসওয়ার্ড তৈরি করব।’ অধিকাংশরা এ সময় অনুধাবন করে জটিল পাসওয়ার্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে তারাও সাধারণত এই কাজটি করে। অর্থাৎ পাসওয়ার্ড তৈরির একটি প্যাটার্ন রয়েছে অধিকাংশের মধ্যে। আর এ কারণেই হ্যাকাররা শুধু অনুমান করেও অনেক সময় পাসওয়ার্ড সংগ্রহ করে নিতে পারে কয়েকবার চেষ্টা করে।
পাসওয়ার্ডের আরও কিছু প্যাটার্ন আছে। যেমন হয়তো আপনার সন্তানের নামে আপনি পাসওয়ার্ড দিচ্ছেন, অথবা আপনার প্রেমিকা বা স্ত্রীর নামে দিচ্ছেন। হয়তো দিচ্ছেন আপনার কর্মক্ষেত্রের নামে বা আপনার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামে। অনেকে পাসওয়ার্ডের জন্য ফোন নম্বরের কয়েকটি ডিজিট ব্যবহার করেন। অনেকে জন্ম সাল ব্যবহার করেন। এমন অসংখ্য প্যাটার্ন রয়েছে পাসওয়ার্ডের যা আমরা সাধারণ ব্যবহার করে থাকি। আর এ কারণেই আমাদের পাসওয়ার্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রে এই প্যাটার্নগুলো থেকে ভিন্নভাবে চিন্তা করা উচিত।
আর পাসওয়ার্ড হ্যাক করা ছাড়াও আপনার তথ্য হাতিয়ে নিচ্ছে অনেক প্রতিষ্ঠান। আর নিজের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার জন্য ভিপিএন সার্ভিস ব্যবহার করা উচিত প্রত্যেকের। আর এ ক্ষেত্রেও বিনামূল্যে পাওয়া ভিপিএন সার্ভিস ব্যবহার না করার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের। এ ক্ষেত্রে তথ্য নিরাপত্তার বদলে আরও বেশি অনিরাপদ হয়ে উঠতে পারে আপনার ডিভাইস।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ‘পাসওয়ার্ড ম্যানেজার’। আপনি পাসওয়ার্ড কোনো সুনির্দিষ্টভাবে ম্যানেজ না করে একই পাসওয়ার্ড সব ক্ষেত্রে ব্যবহার করলে, নিশ্চিতভাবেই একদিন আপনার কোনো না কোনো অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড লিক হবে এবং তখন আপনার বাকি অ্যাকাউন্টগুলোর কর্তৃত্বও হ্যাকাররা নিয়ে নিতে সক্ষম হবে। বিষয়টি আপনার জন্য আর্থিক ও সামাজিক উভয়ভাবেই ক্ষতির কারণ হবে।
আরেকটি বিষয় হলো- আপনি পাবলিক ডোমেইনে কতটুকু শেয়ার করবেন। পাবলিক ডোমেইন বলতে বোঝানো হচ্ছে, আপনার ব্যক্তিগত ওয়েবসাইট বা অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে আপনার প্রোফাইল এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। কেননা আপনার স্ত্রী, সন্তানের নাম, আপনার কর্মস্থলের নাম, আপনার পছন্দ-অপছন্দ সবই শেয়ার করছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। আর এর ফলে আপনার পাসওয়ার্ডের কেন্দ্রে কোনো কোনো ব্যক্তি প্রতিষ্ঠান থাকতে পারে তা বেশ সহজেই অনুমান করে ফেলতে পারে চতুর হ্যাকাররা। তাই অনলাইনে আপনার যত কম ব্যক্তিগত তথ্য প্রদান করা যায়, ততই শ্রেয়।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ টরি হান্ট বলেন, আসলে খুব কম সময়ই হ্যাকিং হয় কঠিন কোডিং বা কোনো ওয়েবসাইটের নিরাপত্তা বলয় ভেদ করে। হ্যাকিং মানেই অনেক কোডিং, অনেকক্ষণ ধরে হুডি পরে অন্ধকার ঘরে ল্যাপটপে কোডিং করছে এমন একটি দৃশ্য আমাদের চোখের সামনে ভেসে আসে গণমাধ্যমে এমন ছবি বেশি থাকার কারণে। চলচ্চিত্রগুলোতেও এমনটা দেখানো হয়। কিন্তু বাস্তবতা একেবারের ভিন্ন। অধিকাংশ সময় হ্যাকিং হয় দুর্বল পাসওয়ার্ড থেকে। যা দৈনিক হচ্ছে। আর এ ক্ষেত্রে হ্যাক করছে শিশু-কিশোর বা কোনো যুবক। আর অনেক ক্ষেত্রেই তারা হ্যাকিংয়ের মজা পাওয়ার জন্য কাজটি করে। আর এ কারণেই একটু সতর্ক থাকলে এটি থেকে বাঁচা সম্ভব। আর ডাটা সেন্টার হ্যাক করে পাসওয়ার্ড চুরি করলে তার সংবাদ সর্বদাই গণমাধ্যমে আসে। এমন ঘটনা বছরে কয়েকবার হয়তো ঘটে।
তবে অনলাইনে কেউ যদি মনে করে, ‘আমার লুকিয়ে রাখার মতো কিছু নেই’, তাহলে সে ভুল করছে। প্রত্যেকেরই লুকিয়ে রাখার মতো কিছু বিষয় রয়েছে। যা তারা কখনই প্রকাশ করতে চায় না। আর এ কারণেই অনলাইনে বিচরণের ক্ষেত্রে সতর্ক হওয়াটা খুবই জরুরি। আর এ কারণেই ভিপিএন ব্যবহার জরুরি। কেননা ভিপিএন ব্যবহার না করলে আপনার আইপি অ্যাড্রেস সব ওয়েবসাইটের কাছে উন্মুক্ত হয়ে যাচ্ছে। আর আপনি কোন কোন ওয়েব সাইট নিয়মিত ভিজিট করেন, অথবা কি কি সার্চ করেন গুগলে তার সবকিছু কী আপনি সবাইকে জানাতে চাইবেন? খুব সম্ভবত না। কিন্তু আপনি যখন একই আইপি অ্যাড্রেস থেকে কাজগুলো করছেন, তখন বিষয়টি জানা সহজ। আর কোনো ধূর্ত হ্যাকার চাইলে তা সবার সামনে আপনার পরিচয়ে উন্মুক্তও করে দিতে পারে।
ব্যাংক থেকে শুরু করে অনেক প্রতিষ্ঠানই বর্তমানে নিয়মিত বিরতিতে পাসওয়ার্ড পরিবর্তনের জন্য তার গ্রাহককে বাধ্য করে। কিন্তু এর মাধ্যমে নতুন নতুন সমস্যাও তৈরি হচ্ছে। যখন অনেক ওয়েবসাইট বা অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করছেন আপনি, তখন এত পাসওয়ার্ড বারবার পরিবর্তন ও মনে রাখা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। ফলে কঠিন পাসওয়ার্ডের পরিবর্তে সহজ পাসওয়ার্ড ব্যবহার করছেন অনেকেই।
তবে এ ক্ষেত্রে বিকল্প হিসেবে ফিঙ্গার প্রিন্ট পাসওয়ার্ডকে ভবিষ্যতে জনপ্রিয় নিরাপত্তা প্রদান মাধ্যম হিসেবে মনে করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রেও সমালোচনা রয়েছে। যদি ‘জেমস বন্ড’ স্টাইলে আপনার পানি খাওয়ার গ্লাস থেকে ফিঙ্গার প্রিন্ট নিয়ে অন্য কেউ ব্যবহার করে! নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের ভাষ্যমতে, চলচ্চিত্রে যেভাবে দেখানো হয়, আসলে সেভাবে কাজটি করা প্রায় অসম্ভব। প্রথমত গ্লাস থেকে সম্পূর্ণ ফিঙ্গার প্রিন্ট পাওয়ার সম্ভাবনা কম। আর সেটি পাওয়া গেলেও তার অনুকরণে ফিঙ্গার প্রিন্ট তৈরি বেশ জটিল। আর অধিকাংশ সিস্টেমে ৩-৪ বার ফিঙ্গার প্রিন্ট ব্যবহারের চেষ্টা শেষে তা অটো লক হয়ে যায়। আর চেষ্টা করা যায় না। আর ডিজিটালি ফিঙ্গার প্রিন্টের সিগনাল বা কোড তৈরিও সহজ নয়। আর এ কারণেই পেপালের মতো অর্থ সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠানগুলো পাসওয়ার্ডের পাশাপাশি ব্যবহার করছে ফিঙ্গার প্রিন্ট।
তবে পাসওয়ার্ড বা নিরাপত্তা ব্যবস্থা যাই হোক না কেন, সচেতনতা ছাড়া অনলাইন জগতে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা সম্ভব নয়। আর এ কারণেই অনলাইনে যেকোনো তথ্য প্রদানের আগে ভেবে নিন, ‘কতটুকু জানাতে চাচ্ছেন?’
/জেডও/