বিশ্বজুড়ে এখন ওয়েব সিরিজের জয়জয়কার। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের দেশেও এগিয়ে চলেছে ওটিটি (ওভার দ্য টপ) কনটেন্টগুলো। একের পর এক কাজ দিয়ে দর্শক মাতিয়ে রেখেছেন দেশের নির্মাতা ও অভিনয়শিল্পীরা। শুধু দেশে নয়, দেশের বাইরের দর্শকরাও মেতে উঠেছে আমাদের দেশের কনটেন্টে। বলা যায়, ভারতীয় ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোতে দাপট দেখাচ্ছে বাংলাদেশিরা।
প্রথম দিকে ভারতের হইচই ও আড্ডা টাইমসে বাংলাদেশের বেশ কিছু কনটেন্ট প্রচার হয়েছে। সৈয়দ আহমেদ শাওকী পরিচালিত ও চঞ্চল চৌধুরী অভিনীত ‘তকদির’ মুক্তির পর আমাদের কনটেন্টগুলোর কদর বেড়ে যায়। এরপর ভারতের ওটিটি প্ল্যাটফর্ম হইচই ও জি ফাইভে ধারাবাহিকভাবে মুক্তি পেয়েছে ওয়েব সিরিজ ‘মহানগর’, ‘মাইনকার চিপায়’, ‘বলি’, ‘দৌড়’, ‘কষ্টনীড়’, ‘হোয়াট দ্য ফ্রাই’, ‘লেডিস অ্যান্ড জেন্টলম্যান’। কনটেন্টগুলো ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। গত মাসে হইচই-তে মুক্তি পাওয়া সৈয়দ আহমেদ শাওকী পরিচালিত ‘কারাগার’ যেন সবকিছুকে ছাপিয়ে যাচ্ছে। মুক্তি পাওয়ার পর থেকে দুই দেশের দর্শকের কাছ থেকে প্রশংসিত হয়েছে ওয়েব সিরিজটি। এতে চঞ্চল চৌধুরীর অভিনয় নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় চলছে আলোচনা। অনেক ভারতীয় দর্শক মনে করছেন, বাংলাদেশি প্রতিটি কনটেন্টে গল্প বলার মধ্যে ভিন্নতা রয়েছে। কেউ কেউ আবার বলছেন, কালার গ্রেডিং, ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরসহ যাবতীয় পোস্ট প্রোডাকশনের কাজে এগিয়ে গেছে বাংলাদেশ। শুধু দর্শক নয়, ভারতের নির্মাতা ও কলাকুশলীরাও বাংলাদেশের কনটেন্টগুলোর প্রশংসায় মেতে উঠেছেন।
‘কারাগার’ দেখে ভূয়সী প্রশংসা করেন ওপার বাংলার গুণী পরিচালক সৃজিত মুখার্জি। চঞ্চলের অভিনয়ে মুগ্ধ হয়ে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারজয়ী এই নির্মাতা ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘পরবর্তী প্রজন্মকে অভিনয় শেখানোর জন্য চঞ্চল চৌধুরীর চোখ অভিনয় শেখার প্রতিষ্ঠানে সংরক্ষণ করা উচিত। এমন স্ট্যাটাসে চঞ্চল চৌধুরী কমেন্ট করে ধন্যবাদ দিয়ে লেখেন, ‘এত বড় মূল্যায়ন! কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা দাদা।’ জবাবে সৃজিত লেখেন, ‘আপনার মতো শিল্পীর মূল্যায়ন করার দৃষ্টতা আমার নেই। শুধু সাধারণ দর্শক হিসেবে আমার মনে হলো আপনি আমাদের গোটা উপমহাদেশের গর্ব।’
পশ্চিমবঙ্গের অভিনেতা অনির্বাণ ভট্টাচার্যের মুখে শোনা গেছে বাংলাদেশি কনটেন্টের উত্থানের কথা। তিনি বলেছেন, ‘প্রতিটি দেশেই এমন একটা সময় আসে, এমন নির্মাতা-শিল্পী আসেন, যারা সিনেমার গতিপথ বদলে দেন। যেমন যুক্তরাষ্ট্রে ফ্রান্সিস ফোর্ড কপোলা, মার্টিন স্করসিস সবাই একই সময়ে আবির্ভূত হলেন এবং আমেরিকান সিনেমা বদলে গেল।’ বাংলাদেশেও সেই জোয়ার এসেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশও এই সময়টার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘ অন্ধকার সময় পেরিয়ে তারা এগিয়ে আসছে। আশফাক নিপুণ (মহানগর), শাওকী (কারাগার), সুমন যিনি ‘হাওয়া’ বানিয়েছেন; তাদের মাধ্যমে সিনেমার গতিপথ পাল্টে যাবে।’
তার মতে, কলকাতা এই জায়গা থেকে পিছিয়ে রয়েছে। সেখানেও বাংলাদেশের মতো কোনো উত্থান ঘটবে বলে প্রত্যাশা তার। এর আগেও বাংলাদেশি কনটেন্টগুলোর প্রশংসা করতে দেখা গেছে অনির্বাণকে। ‘মহানগর’ ওয়েব সিরিজে মোশাররফ করিমের অভিনয়ের প্রশংসা করেছিল ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো।
এদিকে ২০২১ সালে হইচই থেকে রিলিজ করা কনটেন্টগুলোর মধ্যে দুই বাংলার সেরা তারকা নির্বাচিত হন চঞ্চল চৌধুরী এবং মোশাররফ করিম। চঞ্চল চৌধুরী ‘তকদির’ এবং ‘বলি’ সিরিজে অভিনয়ের জন্য ব্রেক থ্রু পারফরম্যান্স অব দ্য ইয়ার অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন। অন্যদিকে মোশাররফ করিম ‘মহানগর’ সিরিজে ওসি হারুন চরিত্রে দুর্দান্ত অভিনয়ের স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন সিরিজ স্টার অব দ্য ইয়ার অ্যাওয়ার্ড। ‘মহানগর’ সিরিজের জন্য বাংলাদেশের সেরা পরিচালক নির্বাচিত হন আশফাক নিপুণ। এ ছাড়া বেস্ট সাপোর্টিং অ্যাক্টর ফিমেল বাংলাদেশ অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন জাকিয়া বারী মম, ‘মহানগর’ সিরিজে এসিপি শাহানা চরিত্রে অভিনয়ের জন্য। এ ছাড়া ‘রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনো খেতে আসেননি’ সিরিজে অভিনয়ের জন্য আউটস্ট্যান্ডিং ফার্স্ট অ্যাপিয়ারেন্স অন হইচই অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন আজমেরী হক বাঁধন।
দেশ-বিদেশে ওয়েব সিরিজের জয়জয়কার প্রসঙ্গে চঞ্চল চৌধুরী বলেন, ‘ওটিটি প্রোডাকশনগুলোর যেমন বাজেট থাকে তেমন কনটেন্ট ভ্যারিয়েশন থাকে। যত্ন করে বানানো হয়। নিজস্ব গল্প ও আন্তর্জাতিক মানের নির্মাণ আমাদের ওয়েব সিরিজকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে।’
ওয়েব সিরিজে দেশি নির্মাতা ও অভিনয়শিল্পীদের জয়জয়কার প্রসঙ্গে নির্মাতা আশফাক নিপুণ বলেন, ‘ওটিটির ভবিষ্যৎ অনেক উজ্জ্বল সেটা এখন মানুষ বুঝতে পারছে। ওয়েব সিরিজ যখন প্রথম দিকে এসেছিল তখন মিডিয়ার একটা বড় অংশ ব্যাপক রকম এর বিরোধিতা করেছিল। কয়েকটি ওয়েব সিরিজ নিয়ে পাল্টাপাল্টি অবস্থানে চলে গিয়েছিল সবাই। কোনো নির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই নির্মাতা, অভিনয়শিল্পী, প্রযোজক ও সাংবাদিকদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল।’
বিষয়টি খোলাসা করে এই নির্মাতা বলেন, ‘তাদের ভাষ্য ছিল এভাবে তো চলে না, এ রকম কেন হবে? তখন আমরা বলেছিলাম এই বিভাজনটা তৈরি না করে এই মাধ্যমটাকে একটু সময় দেন। সময় দিলে দেখবেন ভালো কাজ তৈরি হবে। প্রথম দিকেই যদি বিরোধিতা করেন তাহলে তো নতুন মাধ্যমের দর্শক তৈরি করার আগেই বিভাজন তৈরি করে দেওয়া হয়। সেই নেগেটিভ দিকটা কাটিয়ে উঠতে পেরেছি, সেটাই আমার কাছে বড় প্রাপ্তি। বাইরের লোকজন কাজ দেখে কী বলছে তার চেয়ে বড় বিষয় ঘরের মানুষ কতটুকু সন্তুষ্ট। আমি খুব খুশি ‘তকদির’, ‘মহানগর’, ‘কারাগার’সহ সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু ওয়েব সিরিজ দিয়ে ওই সময় যে নেগেটিভ মনোভাব ছিল আমাদের মিডিয়ার লোকজনের তাদের মনোভাবটা পরিবর্তন হয়েছে। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আমাদের ওয়েব সিরিজগুলো দেশের বাইরেও প্রশংসিত হচ্ছে সেটাই সবচেয়ে বড় অর্জন।’
এই সময়ের আলোচিত নির্মাতা সৈয়দ আহমেদ শাওকী বলেন, ‘আমাদের দেশের কনটেন্ট নিয়ে যখন বাইরের দেশে আলোচনা হয় তখন খুব ভালোলাগা কাজ করে। আমার কাছে মনে হয়, বাংলাদেশের কনটেন্ট এত ভালো বলছে কারণ কেউ এতটা প্রত্যাশা করেনি। এখন আমাদের চ্যালেঞ্জ এই ধারাটা ধরে রাখা। তারপরও আমি বলব আমরা একেবারে শিশু অবস্থায় আছি। শিশুদের যেমন পরিচর্যার পাশাপাশি উৎসাহ দেওয়া প্রয়োজন, তেমনি আমাদের নির্মাতা ও শিল্পীদেরকেও উৎসাহ দেওয়া উচিত। তাহলে আরও ভালো কাজ উপহার দেওয়া যাবে দর্শকদের।’
ভিন্ন ধরনের গল্পের কনটেন্ট দিয়ে আগামীতে দেশীয় নির্মাতা ও কলাকুশলীরা বিশ্বে সুনাম অর্জন করবেন- এমনটাই প্রত্যাশা সবাই।
/এসকে