খুলনার বাসিন্দা তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা নাহিদা আক্তার (ছন্মনাম)। তিন দিন ধরে তার ঠিকভাবে টয়লেট হচ্ছে না। গতকাল শুক্রবার দুপুরে এই সমস্যা তুলে ধরে ফেসবুকের ওষুধ গ্রুপ ‘সি গ্রেড’ ফার্মাসিস্ট তথ্যকেন্দ্রে একটি পেস্ট দেন। দুই ঘণ্টার ব্যবধানে ওই গ্রুপে ৬৮ জন ব্যক্তি নাহিদাকে বিভিন্ন ধরনের ট্যাবলেট খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। আবার কেউ এ সমস্যা সমাধানে ডিল্যাক ল্যাকটোলোজ ওরাল সলিউশন, কেউ বা গ্লিসারিন সাপোজিটর, কেউ এভোল্যাক ২০ মিলি গ্রাম পানির সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়ার পরামর্শ দেন। কেউ ‘শতভাগ পাশর্^প্রতিক্রিয়াহীন ও বিফলে মূল্য ফেরত’ ওষুধ ঘরে বসে অর্ডার করলেই হাতে পৌঁছে যাবে এমন মন্তব্য করেছেন ওই পোস্টের নিচে।
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, এই পরামর্শদাতাদের কেউ চিকিৎসক নন। এদের কেউ অনলাইনভিত্তিক ওষুধের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত, কেউ বা রিপ্রেজেন্টেটিভ, আবার কেউ ওষুধের দোকানের কর্মচারী। শুধু এই একটি গ্রুপ নয়। অনলাইনে এমন অসংখ্য গ্রুপ রয়েছে। ফেসবুক-ইউটিউবসহ নানা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চকটদার বিজ্ঞাপন দিয়ে এরা দেশজুড়ে গড়ে তুলেছে অনলাইনভিত্তিক অনুমোদনহীন ওষুধের বাণিজ্য। ট্রেড লাইসেন্স ছাড়াই অনলাইনে নামকরা কোম্পানি থেকে শুরু করে অখ্যাত কোম্পানির বিভিন্ন ধরনের যৌন উত্তেজক নিষিদ্ধ ট্যাবলেট, মেয়াদোত্তীর্ণ ও নিম্নমানের ওষুধসহ ভেজাল ওষুধের জমজমাট বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। গ্রুপে গিয়ে ওষুধের নাম লিখে অর্ডার করলেই বাসা-বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। মানুষদের আকৃষ্ট করতে এসব গ্রুপে দেওয়া হয় বিশেষ মূল্যছাড়ের লোভনীয় অফার। ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের নির্ধারিত তালিকার বাইরে থাকা অনেক অনুমোদনহীন ওষুধও বিক্রি করা হচ্ছে। এসব ওষুধ কিনে অনেকে প্রতারিত হওয়ার অভিযোগ করেছেন।
ঔষধ প্রশাসন অধিদফতর জানায়, দেশে অনলাইনে ওষুধ কেনাবেচার নির্দিষ্ট কোনো নিয়ম নেই। দোকানে ওষুধ বিক্রি করতে ঔষধ প্রশাসন অধিদফতর থেকে ড্রাগ লাইসেন্স নিতে হয়। আর ‘ওষুধ ও কসমেটিকস আইন-২০২৩’ অনুসারে লাইসেন্স ছাড়া অনলাইনে বিজ্ঞাপন আকারে ওষুধের প্রচার করলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এর জন্য জেল-জরিমানার বিধান রয়েছে। বাস্তবে অনলাইনে ওষুধের বাণিজ্যে মানা হয় না এসব নিয়ম-কানুন।
সংস্থাটির তথ্য মতে, দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় ওই সময় মানুষের ঘরে ওষুধ পৌঁছে দিতে ১৪টি প্রতিষ্ঠানকে অনলাইনভিত্তিক ওষুধ বিক্রির লাইসেন্স দিয়েছিল অধিদফতর। কিন্তু অনলাইনে ওষুধের সঙ্গে মাদক বিক্রির অভিযোগ পাওয়ায় অধিদফতর থেকে অনলাইনভিত্তিক ওষুধ কেনাবেচা বন্ধ করে দেওয়া হয়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, অলনাইন ফার্মেসিগুলোয় ভেজাল, মেয়াদোত্তীর্ণ ও নিম্নমানের ওষুধ বিক্রি হওয়ায় রোগীরা নতুন করে জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। অনেক রোগী লিভার, কিডনি, মস্তিষ্ক, অস্থিমজ্জা ক্ষতিসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। ফলে অনলাইনভিত্তিক ওষুধ বিক্রি বন্ধে কঠোর নজদারির পরামর্শ দেন তারা।
সময়ের আলোর পক্ষ থেকে বেশ কটি অনলাইনভিত্তিক ওষুধ বিক্রি গ্রুপের ওপর নজর রাখা হয়। এর মধ্যে পাইকারি মেডিসিন নামে একটি গ্রুপ আছে। ফেসবুকে ঠিকানা দেওয়া আছে সিলেট। ওই গ্রুপের মেসেজে গিয়ে মহিলাদের গর্ভপাতের ওষুধ মিফেপ্রিস্টোন ২০০ এমজি ট্যাবলেট চাইলে ১০ মিনিট পর জানতে চাওয়া হয়, কয় বক্স লাগবে এবং ঠিকানা দিলে ওষুধ পৌঁছে দেওয়া হবে। পরে মেসেজে গিয়ে ফোন করা হলে নূর নামে এক ব্যক্তি রিসিভ করেন। আপনাদের দোকান কোথায় জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের কোনো দোকান নেই। তবে আমরা ফেসবুকে ওষুধ বিক্রি করি। যার ওষুধ প্রয়োজন-ঠিকানা ও সার্ভিস চার্জ দিলে আমরা পৌঁছে দিই।
অনলাইনে ব্যবসার অনুমোদন আছে কি না কিংবা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া গর্ভপাতের ওষুধ বিক্রি করা যায় কি না, প্রশ্ন করলে উত্তরে পরিচয় জানতে চাওয়া হয়। সাংবাদিক পরিচয় দিলে বলা হয়, ওই ওষুধ তাদের কাছে নেই।
একইভাবে সরকার ঔষধালয় ও অনলাইন মেডিসিন বাজার এই দুটি গ্রুপে বিক্রি করা হয় নিষিদ্ধ যৌন উত্তেজক ওষুধ স্পেশাল জিংসেন পাউডার। ওষুধটি চেয়ে মেসেজ করলে বলা হয়-বিকাশে এডভান্স করে ইনবক্সে ঠিকানা দিন। সময়মতো পৌঁছে যাবে। পরে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে কেউ কথা বলতে রাজি হননি।
অনলাইনে ব্যথামুক্ত স্বাস্থ্যের জন্য মরিঙ্গ গেইন নামে ভেষজ ওষুধ কেনেন শহীদুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি। এই নামে কোনো ভেষজ ওষুধ ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের তালিকায় নেই। শহীদুল ইসলাম সময়ের আলোকে জানান, ফেসবুক গ্রুপে চটকদার বিজ্ঞাপন দেখে অর্ডার দিই। দাম বলা হয় ৬৫০ টাকা। ৫০ শতাংশ এডভান্স করি। কিন্তু ওষুধ পাঠানো হয়নি। পরে গ্রুপে যে নাম্বার দেওয়া রয়েছে সেখানে যোগাযোগ করা হলে ওই নাম্বার বন্ধ পাওয়া যায়।
সময়ের আলোর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাজধানীসহ সারা দেশে অনুমোদনহীন শতাধিক অনলাইন গ্রুপ রয়েছে। এর মধ্যে পুরান ঢাকায় আজিজুর রহমান নামে এক ব্যক্তি ‘সততা মেডিসিন কর্নার’ নামে অনলাইনে ওষুধের বাণিজ্য করছিলেন। গত বছর ৭ জুলাই র্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্স না থাকায় জরিমানা করা হয়। বর্তমানে ওই প্রতিষ্ঠান ‘হেলথ ওএস’ নাম দিয়ে অনলাইনে ওষুধ বিক্রি করছে। এ ছাড়াও বাংলাদেশ মেডিসিন মার্কেট, আলিফ অনলাইন মেডিসিন কর্নার, আরোগ্য, মা মেডিসিন কর্নার, অনলাইন মেডিসিন কর্নার, নিউ মেডিসিন কর্নার, বেশি ওষুধে বেশি ক্ষতি একটি ওষুধেই হোমিওপ্যাথি, ওষুধপত্র, ভারতীয় চিকিৎসা ও ওষুধপত্র, ওষুধ ডটকম, আমরা মিটফোর্ড ওষুধ ব্যবসায়ী, লাজ ফার্মা, অনলাইন ঔষধ-স্বাস্থ্য ও পরামর্শ, ই-এসেনসিয়ালস, ঔষধ কোম্পানির প্রতিনিধিগণ (ফারিয়া), হেলথ ওএস লিমিটেড, ঝিনাইদহ মিটফোর্ড মেডিসিন হল, মেডিসিন ডিলার, মেডিসিন পয়েন্ট, চরপাড়া ওষুধ ব্যবসায়ী, নোহা হারবাল হোমিও ফার্মেসি বায়োনিড ফার্মাসিউটিক্যালস, অনলাইন ঔষধ বাজারসহ (হোম ডেলিভারি) অনলাইনে আরও অনেক ওষুধ বিক্রির গ্রুপ রয়েছে।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করে সময়ের আলোকে বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে অনেকে অনলাইনে ওষুধের ব্যবসা করছেন। কিন্তু তাদের অনুমোদন নেই। ফলে এসব ওষুধ কেনার ক্ষেত্রে নিম্নমান, মেয়াদোত্তীর্ণ, নকল ও ভেজাল যাছাই করার সুযোগ নেই। অনেক ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ ওষুধও বিক্রি করা হচ্ছে। ফলে রোগীর উপকার না হয়ে ক্ষতি হচ্ছে।
প্রখ্যাত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ এবং ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ সময়ের আলোকে বলেন, একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী মুনাফা লাভে বিভিন্ন ধরনের ভেজাল ও মানহীন ওষুধ তৈরি করছে। এসব ওষুধ সেবন করে রোগীরা কিডনি জটিলতা, লিভার সমস্যা, ক্যানসারসহ জটিল রোগসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। অনলাইনে ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ বিক্রি নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
সময়ের আলো/আরএস/