আতঙ্ক নয়, সতর্কতা জরুরি

মুসাহিদ উদ্দিন আহমদ

সম্পাদকীয়

২০১৯ সালের শেষ ডিসেম্বরে চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহর থেকে করোনাভাইরাসে মৃত্যুর শুরু। এরপর ইতালি, ফ্রান্স, স্পেন, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি

2024-01-08T03:03:00+00:00
2024-01-08T03:03:00+00:00
 
  শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬,
১৯ আষাঢ় ১৪৩৩
শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬
সম্পাদকীয়
আতঙ্ক নয়, সতর্কতা জরুরি
করোনাভাইরাস উপধরন জেএন.১
মুসাহিদ উদ্দিন আহমদ
প্রকাশ: সোমবার, ৮ জানুয়ারি, ২০২৪, ৩:০৩ এএম 
আতঙ্ক নয়, সতর্কতা জরুরি
২০১৯ সালের শেষ ডিসেম্বরে চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহর থেকে করোনাভাইরাসে মৃত্যুর শুরু। এরপর ইতালি, ফ্রান্স, স্পেন, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরবসহ সারা বিশ্বের প্রায় সর্বত্র ছড়িয়েছে এই করোনাভাইরাস কোভিড-১৯। ২০২০ সালের ৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম করোনা আক্রান্ত একজনকে শনাক্ত করা হয়। তিনি ইতালি থেকে বাংলাদেশে এসেছিলেন। এরপর তিনি তার পরিবারের সদস্যদের আক্রান্ত করেন। সেখানে তাদের প্রতিবেশী, এলাকার লোকজনের মধ্যে সংক্রমিত হতে শুরু করে। আক্রান্ত রোগীর আইসোলেশনে না থাকা এবং নিরাপদ সামাজিক দূরত্ব বজায় না রাখার পরিণতি করোনাভাইরাসের মতো একটি সংক্রামক ব্যাধির বিস্তারে কী ভয়ংকর ভূমিকা রাখে তা আজ হাড়ে হাড়ে অনুভব করা গেছে। তারপর প্রায় তিনটি বছর এই প্রাণঘাতী মরণ ভাইরাস জনজীবনকে কীভাবে তছনছ করে দিয়েছে তা বিশ্ববাসী দেখেছে।

কয়েক দিন প্রায় নিষ্ক্রিয় হয়ে থেকে বিশ্বজুড়ে আবার শুরু হয়েছে করোনাভাইরাসের নতুন এক ভ্যারিয়েন্ট জেএন.১ এর সংক্রমণ। দীর্ঘ সময় করোনা সংক্রমণের হার ১ শতাংশের আশপাশে থাকার পর হঠাৎ করে এ হার ২ শতাংশের বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তবে করোনার নতুন ধরনের ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণে কারও মৃত্যুর খবর পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য মতে, দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরুর পর থেকে আজ পর্যন্ত ৩ বছর ৯ মাস ১০ দিনে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ২০ লাখ ৪৬ হাজার ১৭০ জন এবং করোনায় মৃতের সংখ্যা ২৯ হাজার ৪৭৭ জন। শনাক্ত ও মৃত্যু পর্যালোচনায় মোট মৃত্যুহার ১ দশমিক ৪৪ শতাংশ। ২০২০ সালের ৮ মার্চ প্রথমবারের মতো তিনজনের করোনা সংক্রমণের তথ্য জানায় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট। সরকারি হিসেবে এখন পর্যন্ত করোনা সংক্রমণের হার ১৩ দশমিক ১০ শতাংশ। দেশে করোনা আক্রান্তের পর সেরে উঠেছেন ২০ লাখ ১৩ হাজার ৮৫৮ জন মানুষ। লকডাউন, সাধারণ ছুটি এবং প্রতিষেধক টিকা দানের পর থেকে করোনার সংক্রমণ কমে যেতে থাকে। কিন্তু ক্রমাগত জিনবিন্যাস বদলের কারণে সংক্রমণ সক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশ্বজুড়ে নতুন করে আক্রান্তের ঊর্ধ্বগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে বলে বিশ্বব্যাংক উদ্বেগ প্রকাশ করে। সেই সঙ্গে বাড়ে মৃত্যুহারও। ইতিমধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনে সংক্রমণ ছড়িয়েছে এবং ভারতের গোয়া এবং কেরালাসহ বেশ কয়েকটি রাজ্যে ২১ জনের শনাক্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

করোনাভাইরাসের নতুন উপধরন আগের সব ভ্যারিয়েন্টের চেয়ে বেশি সংক্রামক হয়ে উঠতে পারে বলে বিশ্বের বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। ওয়ার্ল্ডওমিটারের তথ্যানুসারে, ২০২৩ সালের ১৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিশ্বে করোনা আক্রান্ত হয়েছেন ৬৯ কোটি ৯৭ লাখ ৩৯ হাজার ৩৭৪ জন। সুস্থ হয়েছেন ৬৬ কোটি ৯৪ লাখ ৭১ হাজার ২৮৮ জন এবং মৃত্যুবরণ করেছেন ৬৯ লাখ ৫৭ হাজার ৬০১ জন। গত ১৫ ডিসেম্বর করোনাভাইরাসের নতুন ধরনটি জেএন.১ শনাক্ত হয় চীনে এবং এরই মধ্যে সেখানে অন্তত সাতজন আক্রান্তের সন্ধান মেলে। কোভিডের এ উপধরনের দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ভয়াবহতার আতঙ্ক রয়েছে বিশ্বজুড়ে, যাকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ‘আগ্রহের ধরন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। করোনাভাইরাসের এই উপধরন বিএ.২.৮৬ এর আগেও যুক্তরাষ্ট্রে শনাক্ত হয় যাকে জেএন.১ বলে ধারণা করা হতো। তবে এই দুই নামের উপধরনের মধ্যে সামান্য কিছু তফাৎ রয়েছে বলে মতামত সেখানকার রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ সেন্টারের। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়সহ ঢাকার বেশ কয়েকটি বড় হাসপাতালে সরকারি ব্যবস্থাপনায় সুশৃঙ্খলভাবে টিকা দান কর্মসূচি পরিচালিত হওয়ায় ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে আসতে শুরু করে। টিকা নেওয়ার দুই মাস পর দ্বিতীয় ডোজ টিকা দেওয়া শুরু করা হয়। দ্বিতীয় ডোজ টিকা দেওয়ার বেশ কয়েক দিন বিরতির পর ষাটোর্ধ্ব বয়সের মানুষের মধ্যে বুস্টার ডোজ টিকা দেওয়া আরম্ভ করে বাংলাদেশ। পরে বুস্টার ডোজের আওতায়ও আনা হয় সর্বস্তরের জনগণকে। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট বলছে, করোনা টিকার প্রথম ডোজ নেওয়ার এক সপ্তাহ পর অ্যান্টিবডি তৈরি শুরু হয় আর তিন সপ্তাহ পর ডিটেক্টবল হয়। আর দ্বিতীয় ডোজ নেওয়ার এক সপ্তাহ পরই মোটামুটি অ্যান্টিবডি শুরু হবে। করোনা টিকার দুটি ডোজ নিলে ৭০-৯০ শতাংশ অ্যান্টিবডি তৈরি হতে পারে। তবে তা বেশি দিন স্থায়ী হয় না। তখন হয়তো কয়েক মাস পর আবার টিকা নিতে হয়।

চীনের উহান শহরে প্রথম সার্স-কোভিড-২ বা করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হয়ে দ্রুততম সময়ে তা সারা বিশে^ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার কারণে ডব্লিউএইচও এটিকে ‘ভ্যারিয়েন্ট অব ইন্টারেস্ট’ হিসেবে অবহিত করে। শীতকালে করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি থাকায় ধারণা করা হচ্ছে, অমিক্রনের আরেক উপধরন বিএ.২.৮৬ এর তুলনায় জেএন.১ করোনাভাইরাসের স্পাইক প্রোটিনের অতিরিক্ত পরিবর্তনের কারণে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া অব্যাহত থাকতে পারে যদিও বিএ.২.৮৬ থেকেই জেএন.১ এর উৎপত্তি। শীতের মৌসুমে যেহেতু যেকোনো ধরনের ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি সেহেতু এসব সংক্রণের পাশাপাশি করোনাভাইরাসের নতুন ভ্যারিয়েন্ট ও সংক্রমণ বেড়ে যেতে পারে। বিগত বছরে আদি ভাইরাসের শত শত ভ্যারিয়েন্টের সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে যত ধরনের করোনাবিরোধী টিকা ব্যবহৃত হচ্ছে তা শুধু আদি করোনাভাইরাসের স্পাইক প্রোটিনকে অকার্যকর করার ক্ষমতাসম্পন্ন অ্যান্টিবডি সৃষ্টি করে। তাই করোনাভাইরাসের বিভিন্ন ভ্যারিয়েন্টের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী বিশেষ গুণসম্পন্ন টিকার নতুন ভার্সন থাকা দরকার। ভাইরাসের ব্রেক-থ্রু সংক্রমণ ঘটায় বুস্টার ডোজ টিকা নেওয়ার পরেও অনেক মানুষ করোনাভাইরাসের শিকার হতে হয়। তবে সেই সংক্রমণ ততটা ভয়াবহ রূপ নিতে দেখা যাওয়ার কথা নয়। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে মেনে চলতে হবে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে মাস্ক পরা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটিকে অবহেলা করা সহজে বিপদ ডেকে আনে। মুখে মাস্ক থাকলে করোনা আক্রান্ত রোগীর নিশ্বাসের সঙ্গে বেরুনো ড্রপলেট মাস্ক ও মুখের মাঝখানে আর্দ্র বাতাসের সংস্পর্শে এসে বাইরে দ্রুতগতিতে না ছড়িয়ে কাছাকাছি মাটিতে গিয়ে পড়ে। ফলে কাছের মানুষের সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা কম থাকে। মাস্ক শুধু একজনের জন্য নিরাপদ নয়, তা আশপাশে দশজনকেও নিরাপদ রাখে। হাঁচি-কাশির সময় নাক-মুখ রুমালে ঢেকে রাখাও করোভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে দেয়। মানুষকে ঘরে-বাইরে সাবধানে থাকতে হবে। মানুষের মধ্যে থাকলে ৩-৬ ফুট সামাজিক দূরত্ব রাখতে হবে। ভিটামিন-ডি পেতে গায়ে রোদ লাগাতে হবে। কারও সঙ্গে করমর্দন বা কোলাকুলি বন্ধ রাখতে হবে। আনন্দানুষ্ঠানের নামে অহেতুক জনসমাগম বর্জন করতে হবে। করোনা লক্ষণ দেখা দিলে আইসোলেশনে চলে যেতে হবে। সাবান পানি দিয়ে বারবার হাত ধুতে হবে। আর চিকিৎসকের পরামর্শ মতো ওষুধ সেবন করতে হবে। 

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্য দেশে এখন কোভিড, নন-কোভিড হাসপাতালগুলো সেভাবে প্রস্তুত নয়। করোনা বিস্তার লাভের সময় রাজধানীতে এবং দেশের অন্যান্য শহরের হাসপাতালে খোলা বিশেষ করোনা ইউনিটে ব্যবহৃত আইসিইউ, এইচভিইউ শয্যা, ভেন্টিলেটর, অক্সিজেন কনসেনট্রেটরসহ অন্যান্য সরঞ্জামগুলোকে ব্যবহার উপযোগী করে তোলা দরকার। বুস্টার ডোজ গ্রহণ যাদের বাকি আছেন তাদের বুস্টার ডোজ টিকা নিতে হবে। 

বয়স্ক মানুষ যেহেতু করোনাভাইরাস আক্রান্তে অধিক নাজুক অবস্থায় থাকেন, তাই তাদের চতুর্থ ডোজ টিকা গ্রহণ করতে হবে। যদিও শুধু টিকা করোনা সংক্রমণ থেকে কাউকে শতভাগ নিশ্চয়তা দেবে না, তাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে সর্বাত্মক সতর্কতা অবলম্বন করেই করোনাভাইরাস সংক্রমণ থেকে মুক্তি পেতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এখন পর্যন্ত জেএন.১ উপধরনকে ‘ভ্যারিয়েন্ট অব ইন্টারেস্ট’ হিসেবে অবহিত করেছে। তবে এটাকে ‘ভ্যারিয়েন্ট অব কনসার্ন’ বলা হলেই বিশেষ উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠবে। অন্যভাবে বিশ্লেষণ করলে করোনাভাইরাসের উপধরন জেএন.১ আপাতদৃৃষ্টিতে তত মারাত্মক নয় বলে অনুমান করা হলেও বেশি মানুষ আক্রান্ত হতে শুরু করলে মৃত্যুও বাড়তে থাকবে। তাই করোনার নতুন উপধরনের সিকোয়েন্সিংয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরের নজরদারি অব্যাহত রাখতে হবে যাতে করোনাভাইরাস উপধরন জেএন.১ এর গতিবিধি বিবেচনায় নিয়ে এর সংক্রমণ রোধ এবং দ্রুততম সময়ে চিকিৎসা নিষ্পন্ন করা যায়।

সময়ের আলো/আরএস/ 



Loading...
Loading...
সম্পাদকীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: