শিশুরা সবসময় তার পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের অনুকরণ করে। তারা কী করছে, কীভাবে করছে-এগুলো দেখে দেখে শিশুরা সেটি শিখতে চেষ্টা করে। শিশুরা সবসময়ই অনুকরণপ্রিয়। তাই তাদের সঙ্গে পরিবারের সদস্য, বাবা-মায়ের আচরণ মার্জিত, সুন্দর ও শিক্ষণীয় হতে হবে। শিশুদের সঙ্গে এমন কোনো আচরণ করা যাবে না, অথবা এমন কোনো কথা বলা যাবে না যা তাদের চিন্তার জায়গাটাতে নাড়া দেয় অথবা তাদের কচি মনে খারাপ ধারণা তৈরি করে। এমনটা হলে অভিভাবকের প্রতি শিশুরা আস্থাহীন হয়ে পড়ে। আর এভাবেই সন্তানের সঙ্গে অভিভাবকদের দূরত্ব সৃষ্টি হয়। এ দূরত্ব সন্তানকে বিপথগামী করে ফেলে।
তবে সন্তান লালন-পালন করার প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত নিয়মের বেড়াজালে নিজেও আটকে যাওয়া উচিত নয়। শিশুকেও আটকানোর চেষ্টা করা উচিত নয়। শিশুকে শিশুর মতো বেড়ে উঠতে দেওয়া উচিত। শুধু খেয়াল রাখতে হবে তার চারপাশে কারা আছে। কাদের কথা সে বেশি শুনছে। কারও দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে কি না। আপনি যদি সত্যিকার অর্থে মা অথবা বাবার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে থাকেন অর্থাৎ অভিভাবক হিসেবে আপনার দায়িত্ববোধ সম্পর্কে সচেতন থাকেন তবে অবশ্যই আপনার সন্তানের আচরণ পরিবর্তন আপনার নজরে আসবেই। তখন লাগাম টানতে সহজ হবে বৈকি। আপনার সন্তান আপনার শরীরের অংশ। আপনি না চাইলে সে কখনোই আপনার সঙ্গে এমন কোনো আচরণ করবে না যাতে আপনি কঠিন সময়ে উপনীত হন। যদি সন্তান এমন কিছু করে থাকে তা হলে নিজের সঙ্গে কথা বলেন। ভেবে বের করেন কি এমন করেছেন অথবা কি এমন চিন্তা করেছেন যাতে করে আজকে সন্তান আপনার বিরুদ্ধাচরণ করছে। সন্তানের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক সুন্দর ও স্বচ্ছ রাখার কিছু আচরণ আয়ত্ত করে নিতে পারেন।
সন্তানের কাছে কোনোকিছু গোপন রাখবেন না। আপনার ইচ্ছা, অনিচ্ছা, ভালো লাগা, মন্দ লাগা, আপনার চাহিদা-সবকিছু নিয়ে সন্তানের সঙ্গে কথা বলেন। একটা কথা সবসময় মাথায় রাখবেন আপনার সন্তান আপনার শত্রু নয়। যদি কখনো মনে হয় সে আপনাকে শত্রুর মতোই দেখছে অথবা আপনি তার কাছ থেকে এমন কোনো আচরণের শিকার হচ্ছেন, যা আপনার জন্য মনোকষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে তা হলে সব অভিমান ভুলে তাকে কাছে ডাকেন। তার সঙ্গে খোলাখুলি কথা বলেন। পাশে বসিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে মনে করিয়ে দেন সে আপনার সন্তান। কতটা যত্নে আপনি তাকে বড় করেছেন। ছোটবেলার কিছু স্মৃতি তার সামনে ছবির মতো তুলে ধরেন।
সন্তান ভুল করবেই। আমরাই কি কম ভুল করি বলেন। আর সে তো প্রতিটা বয়সে একটা করে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। তার ভুলগুলো সম্পর্কে তার সঙ্গে কথা বলেন। প্রতিনিয়ত পোক করেন। দেখবেন একসময় সে বুঝবে যে তার কাজ সঠিক নয়। তবে সন্তান লালন-পালনে সবচেয়ে বড় যুদ্ধ হচ্ছে-আপনার নিজের আচরণ। আপনি যদি সন্তানের সামনে অন্যের সমালোচনা, দোষ নিয়ে কথা বলেন-তা হলে সন্তানের বুঝের জায়গা পোক্ত হলে আপনাকে সে মানতে চাইবে না। কারণ তখন তার বোঝার জায়গাটা স্বচ্ছ হবে যে, অন্যের সমালোচনা করতে হয় না। কিন্তু তার অভিভাবক তার সামনে এসবকিছু করেছে।
সন্তান জন্মের পরই আপনার দায়িত্ব শুরু হয়ে যায়। সুতরাং সন্তান নেওয়ার আগে চিন্তা করবেন লালন-পালন করতে পারবেন কি না। বিষয়টা কিন্তু সহজ নয়। ভীষণ কঠিন দায়িত্ব এই সন্তান লালন পালন। সন্তানের সামনে কখনো কোনোকিছু নিয়ে হা-হুতাশ,আফসোস করবেন না। ছোটবেলা থেকেই তাকে শেখাবেন, জীবনে যা কিছু ঘটে তা মেনে নিতে হবে। তবে মনেপ্রাণে সবসময় ভালো চিন্তা করতে হবে। তা হলে নিজের জীবনে ভালো কিছু হবে ইনশাআল্লাহ। এতে করে ছোটবেলা থেকেই সে একটা পজিটিভ মানসিকতা নিয়ে বেড়ে উঠবে। মনে রাখবেন, একবার সন্তানের অভিভাবক হয়ে গেলেন তো প্রতিনিয়ত শোধরানোর কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখতে হবে। আপনার চলন-বলন সবকিছু আপনার সন্তান ফলো করবে। আপনি মুখে বলবেন একটা আর আচরণে প্রকাশ করবেন আরেকটা এতে করে আপনার সন্তানের ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে পরবে। কারণ তারা মুখ ফুটে বলবে না কিছু, নিজেদের মতো কিছু একটা বানিয়ে ওই পথে চলবে। যে পথে সত্য-মিথ্যা পাশাপাশি চলছে। একসময় সত্য সরে গিয়ে মিথ্যা তার সঙ্গী হয়ে যাবে।
প্রতিটি সন্তানেরই নিজের ইচ্ছা-অনিচ্ছা থাকে, এর প্রতি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। সন্তানের ইচ্ছার বিষয় যদি যথাযথ বলে মনে না হয়, তা হলে সন্তানকে বোঝানোর চেষ্টা করতে হবে। সন্তান যেন বাবা-মায়ের আড়ালে কিছু করার চেষ্টা না করে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। সবসময় নিজের মতো ও পছন্দ সন্ধানের উপরে চাপিয়ে দেবেন না।
নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রমে অংশগ্রহণ : শিশুদের জন্য আনুষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু হয় প্রাথমিক স্তর থেকেই। প্রাথমিক স্তরে একজন শিক্ষার্থীর জন্য পাঠ্যক্রম নির্দিষ্ট থাকে। বর্তমান মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে সব বিষয়েই সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতি প্রচলিত আছে। এ স্তরে একজন শিক্ষার্থীর জ্ঞানার্জনের জন্য পাঠ্যক্রমের অন্তর্গত বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকতে হয়। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের জন্য পাঠ্যবইয়ের লেখা তথ্য ও ভাবনাগুলো ভালোভাবে বুঝতে হবে। এরপর নিজের মেধা ও চিন্তাশক্তিকে কাজে লাগিয়ে উদ্দীপ্তভাবে ব্যবহার করতে হবে। তা হলেই প্রত্যাশিত ফলাফল ও জ্ঞান অর্জিত হবে।
শিক্ষার্থীদের সুপ্ত চিন্তাশক্তিকে জাগ্রত করার জন্য প্রথমেই যা দরকার তা হলো তাকে নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রমে অংশগ্রহণ। নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রমে অংশগ্রহণ ব্যতীত কোনোক্রমেই মেধা ও চিন্তাশক্তিকে জাগ্রত করা যায় না। শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনায় মুখ্য ভূমিকা পালন করেন শিক্ষক। পরিবর্তিত শিক্ষাক্রমে শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে থাকে। আর এ প্রশিক্ষণের মাধ্যমেই একজন শিক্ষক শিক্ষাদান সম্পর্কে দক্ষতা অর্জন করে। এ দক্ষতার। করে শিক্ষার্থীদের শুনেই শিক্ষকরা পাঠ্যবইয়ের লেখা তথ্য ও ভাবনাগুলো ডিজিটাল কন্টেন্টের মাধ্যমে বিভিন্নভাবে বিশ্লেষণ করে। মেধা ও চিন্তাশক্তিকে জাগ্রত করে তোলে। আর এ কারণেই একজন শিক্ষার্থীকে শ্রেণিকক্ষে অধিক মনোযোগী থাকতে হয় যাতে পাঠ্যবইয়ের লিখিত তথ্য ভালোভাবে বুঝতে পারে। বাস্তবতা হলো-শিক্ষার্থীরা প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ার প্রতি গুরুত্ব না দিয়ে বিভিন্ন কোচিং সেন্টার বা প্রাইভেট শিক্ষকদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কোচিং সেন্টার বা শিক্ষক সংশ্লিষ্ট বিষয়ে শিক্ষাদানে উপযুক্ত কি না, তার দ্বারা ছেলেমেয়ের মেধার প্রকৃত উন্নয়ন হবে কি না সে সম্পর্কে যথেষ্ট চিন্তা না করে অভিভাবক ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। এ কারণে শিক্ষার্থীরা প্রকৃত মেধা অর্জন থেকে পিছিয়ে পড়ছে। এ ক্ষেত্রে অভিভাবককে অধিক সচেতন হতে হবে। শিক্ষার্থীর শিক্ষা কার্যক্রমে কোনো অগতি হচ্ছে কি না অভিভাবক তা খেয়াল রাখবেন।
প্রযুক্তি ব্যবহারে সতর্কতা অবলম্বন : বর্তমান যুগ প্রযুক্তির। বলতে গেলে এখন সবকিছুই প্রযুক্তিনির্ভর। তাই প্রযুক্তি সর্ম্পকে জানা এবং এর ব্যবহার সম্পর্কে প্রত্যেক নাগরিকের সুস্পষ্ট ধারণা থাকা দরকার। প্রযুক্তির ভালোর সঙ্গে সঙ্গে এর খারাপ দিকও আছে। বর্তমান যুগে মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট, ফেসবুকে আসক্তি নেই এমন উঠতি বয়সি ছেলেমেয়ে খুঁজে পাওয়া যাবে না। প্রযুক্তির অপব্যবহারের ফলে তরুণ সমাজ বিভিন্ন নেশায় জড়িয়ে পড়ছে। এতে সমাজে বিভিন্ন অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে, তরুণদের মধ্যে সৃষ্টি হচ্ছে নানা ধরনের অপরাধ প্রবণতা। অভিভাবকদের এদিকটা খেয়াল রাখতে হবে যেন প্রযুক্তির অপব্যবহারের ফলে সন্তান বিপথগামী না হয়। শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত মোবাইল থাকা উচিত নয়। তারা প্রয়োজনে বাবা-মার মোবাইল ব্যবহার করবে এবং বাড়িতে এমন জায়গা থেকে মোবাইল ব্যবহার করবে যেখানে পরিবারের সবার অবাধে যাতায়াত আছে। কোনো শিক্ষার্থী বাসায় যেন দরজা বন্ধ করে মোবাইল ব্যবহার না করে অভিভাবক সেদিকে খেয়াল রাখবেন। একইভাবে দরজা বন্ধ করে নিজ রুমে কম্পিউটার/ল্যাপটপ ব্যবহারও নিরুৎসাহিত করতে হবে।
কখনোই সন্তানকে অতিরিক্ত শাসন করা উচিত নয়। কারণ অতিরিক্ত শাসন তাকে আপনার থেকে দূরে ঠেলে দেবে। আর সে আপনার কাছে সবকিছু লুকানোর চেষ্টা করবে, যা হয়তো আপনার সন্তানকে নিয়ে যেতে পারে কঠিন পরিণতির দিকে। তাই সন্তানের যেকোনো ধরনের ব্যর্থতায় তাকে বকাবকি বা সমালোচনা না করে কীভাবে ব্যর্থতা সারিয়ে তোলা যায় সেই দিকে খেয়াল রাখতে হবে। সন্তানকে লেখাপড়া, খেলাধুলা এবং সহ-পাঠ্যক্রমিক শিক্ষায় সমান উৎসাহিত করতে হবে। তবেই সে দৃঢ় আত্মপ্রত্যয় নিয়ে সেই বিশেষ বিষয়ে বা ক্ষেত্রে সাফল্যের পথে ধাপে ধাপে এগিয়ে যাবে।
শৃঙ্খলা মেনে চলতে শিক্ষাদান : সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই নিয়ম-শৃঙ্খলা মেনে চলতে উৎসাহ দিন। শৃঙ্খলা মানে হচ্ছে জীবনকে গুছিয়ে চলা, যা জীবনকে সুন্দর ও পরিপাটি করে তুলে। সন্তানকে শিশুকাল থেকেই নীতিগত শিক্ষা দিন। কখনোই সন্তানকে অন্যায় করতে উৎসাহ দেওয়া উচিত নয়। কারণ অন্যায়ের পরিণতি সবসময় খারাপ হয়।
শিশুরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। কাজেই আদর্শ সমাজ ও উন্নত পরিবেশে শিশুদের গড়ে তুলতে হবে। শিশুরা কেমন করে উন্নত চরিত্র ও আদর্শের অধিকারী হতে পারে, সে বিষয়ে আমাদের মনোযোগী হতে হবে।
শিশুদের আদর্শবাদী করে গড়ে তুলতে না পারলে আদর্শ সমাজ বিনির্মাণ সম্ভব হবে না। শিশুদের চরিত্র গঠনে অভিভাবকদের সদা সচেতন থাকা প্রয়োজন। নরম কাদা-মাটিসদৃশ শিশুরা শৈশবে যে পরিবেশে বেড়ে ওঠে, তার প্রভাব তার জীবনে স্থায়ী হয়ে যায়। এ কারণে পরিবার হচ্ছে শিশুর প্রথম বিদ্যালয়। মা-বাবাকে নিজেদের ব্যক্তিত্ব দিয়ে এবং ধর্মীয় নির্দেশনার মাধ্যমে সন্তানদের প্রতিপালন করতে হবে।
সময়ের আলো/আরএস/