চলো বন্ধু ঘুরে আসি

মোখলেসুর রহমান

সম্পাদকীয়

পর্যটনের মৌলিক ডেফিনেশনটা হলো, জীবনধর্মী সব ধরনের কর্মকাণ্ডই পর্যটন। যেখানে মানুষ আছে সেখানে পর্যটন আছে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক দিক দিয়ে খুব

2024-04-06T05:16:51+00:00
2024-04-06T05:16:51+00:00
 
  শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬,
১৯ আষাঢ় ১৪৩৩
শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬
সম্পাদকীয়
চলো বন্ধু ঘুরে আসি
উৎসবের পর্যটন ও অর্থনীতি
মোখলেসুর রহমান
প্রকাশ: শনিবার, ৬ এপ্রিল, ২০২৪, ৫:১৬ এএম 
চলো বন্ধু ঘুরে আসি
পর্যটনের মৌলিক ডেফিনেশনটা হলো, জীবনধর্মী সব ধরনের কর্মকাণ্ডই পর্যটন। যেখানে মানুষ আছে সেখানে পর্যটন আছে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক দিক দিয়ে খুব বেশি উন্নত না হলেও আমাদের দেশের ভেতর পর্যটন ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে। বছরের বিভিন্ন সময়ে মানুষজন পর্যটনে গেলেও বিভিন্ন উৎসবের সময় এই পর্যটন বেড়ে যায়। যেকোনো ক্ষেত্রেই যেমন অর্থনীতি আছে ঠিক সেভাবেই উৎসবের ক্ষেত্রেও আলদা এক অর্থনীতি আমরা নিজেদের দেশে দেখতে পাই। 

আমরা লক্ষ করছি, বাংলাদেশে গত দুই দশকে উৎসবের অর্থনীতি ব্যাপকভাবে বেড়ে এখন একটি বেশ সম্প্রসারিত অর্থনীতিতে পরিণত হতে পেরেছে। এদেশে ধর্মীয় দিবস, জাতীয় দিবস এবং কিছু আন্তর্জাতিক দিবসকে কেন্দ্র করে মানুষ নানা ধরনের উৎসবে মেতে উঠছে। এটি হয়তো মানুষের নিত্যদিনের জীবনের পীড়ন থেকে মুক্তিলাভের জন্য এই উৎসবমুখরতা মানুষের মধ্যে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, এই উৎসবমুখরতার সঙ্গে একটি বড় পরিমাণ অর্থনৈতিক অবস্থা নতুন করে আমাদের সমাজে সৃষ্টি হয়েছে। এই উৎসবমুখরতাকে কেন্দ্র করে যে উৎসবের অর্থনীতি, পর্যটন তার মধ্যে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই আমরা একে বলতে পারি উৎসবের পর্যটন অর্থনীতি। উৎসবের পর্যটন অর্থনীতির মধ্যে অন্তত কতগুলো বিষয় জড়িয়ে আছে। যেমন- এই উৎসবের পর্যটনকে কেন্দ্র করে পরিবহন, একোমডেশন বা পর্যটকদের জন্য আবাসন, পর্যটকদের জন্য খাবার, পর্যটকদের জন্য বিনোদন; এসব বিষয় মুখ্য।

এই চারটি প্রধান বিষয় উৎসবের পর্যটন অর্থনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এখন এই বিষয়গুলোকে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যদি অ্যাড্রেস করতে হয়, তাহলে যা করা দরকার সেটি কেবল নিরাপত্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না বরং এখানে নিরাপত্তার চাইতেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই যে মানুষ বা পর্যটকরা বিভিন্ন জায়গায় বা গন্তব্যে বা পর্যটনে যাচ্ছেন, সেই গন্তব্যগুলোর ক্যারিং ক্যাপাসিটি নির্ধারণ করে, সেই ক্যারিং ক্যাপাসিটির বাইরে মানুষকে জায়গাগুলোতে যেতে না দেওয়া। তাতে করে আমাদের বাংলাদেশের ভেতরের অনেক গন্তব্য ইতিমধ্যে হুমকির মধ্যে পড়েছে এবং নতুন করে আরও কিছু গন্তব্য হুমকির মুখে পড়তে পারে বা পড়বে বলা চলে। সুতরাং আমাদের এই গন্তব্যগুলোকে রক্ষা করে রাখাটা অত্যন্ত প্রয়োজন। এটি হলো প্রথম বিষয়। 

দ্বিতীয় হলো, পর্যটকরা যেসব গন্তব্যে যাচ্ছে, তার স্থানীয় সরকার ও স্থানীয় জনগণ এবং স্বাগত জনগোষ্ঠী- এই তিন ধরনের মানুষকে পর্যটনের স্টেক হোল্ডার ছাড়াও এদের পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করার কাজটা হবে সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এই দুটি দায়িত্ব রক্ষা করার পরে আসবে তৃতীয় বিষয়। তৃতীয় বিষয়টি হলো, পর্যটকদের জন্য নিরাপত্তা। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে দেখা যায় আমরা প্রথম দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাদ দিয়ে কেবল নিরাপত্তার বিষয়টিই শুনতে পাই। নিরাপত্তার জন্য ট্যুরিস্ট পুলিশ যেখানে রয়েছে, সেখানে তারা তাদের নিজেদের সাধ্যমতো প্রস্তুতি নেয় বা নিচ্ছে। তাছাড়া জেলা পুলিশসহ অন্যান্য পুলিশকেও সেখানে নানাভাবে কাজের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। কিন্তু এতে করে পর্যটক যারা আছেন, তাদের ভোগান্তির পরিমাণও কমে না আর আমরা আমাদের যেসব পর্যটন গন্তব্য আছে সেগুলোকেও সঠিক পন্থায় রক্ষা করতে সক্ষম হচ্ছি না। 

এ বিষয়ে আমার বক্তব্য হলো, উৎসবের অর্থনীতিতে যখন পর্যটন বিষয়টি এসে যুক্ত হয় তখন পর্যটকদের এই যে নানা স্থানে গমনাগমন, এগুলোকে একটি সুস্থ ধারার গমনাগমন প্রক্রিয়ায় পরিণত করতে হবে।  আমরা যদি প্রত্যেকটি গন্তব্যের ক্যারিং ক্যাপাসিটি নির্ধারণ করে দিয়ে সেই ক্যারিং ক্যাপাসিটির মধ্যে পর্যটকদের সব গমনাগমনকে সেখানে সীমাবদ্ধ করে রাখতে পারি তবে দেখা যাবে পর্যটকরা কেবল একটি বা দুটি গন্তব্যে না গিয়ে সারা দেশের সব গন্তব্যে ছড়িয়ে পড়বে।

একটি বা দুটি গন্তব্যে যাওয়ার কারণে যেটা হয়, সেখানে উৎসবের যে আনন্দ থাকে সেটি ফিকে হয়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ আমরা যদি বলি, কক্সবাজারে একসঙ্গে দুই লাখ মানুষ গেলে আমাদের টেলিভিশন চ্যানেল ও সংবাদপত্রগুলোতে বড় একটি হেডলাইনের সংবাদ হয়। কিন্তু তাতে করে কক্সবাজারের কোনো লাভ হয় না। কক্সবাজারে ট্যুরিজমের যারা সেবা সরবরাহকারী হিসেবে আছেন, তাদেরও কোনো লাভ হয় না। তাছাড়া আমাদের পর্যটকদেরও কোনো লাভ হয় না। সবারই বরং ক্ষতি হয়। তবে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের। তাই এই বিষয়গুলো আমাদের দৃষ্টিতে আনার যথেষ্ট প্রয়োজনীয়তা আছে বলে আমি মনে করি। এটা কেবল আমাদের বাংলাদেশে নয় বরং পৃথিবীর অনেক জায়গাতেই পর্যটকদের এই যে অধিক পরিমাণে গমনাগমন, যাকে ওভার ট্যুরিজম বা অধিক পর্যটন বলা হচ্ছে, এই জায়গাটিকে অন্ততপক্ষে আমাদের দেশে উৎসবের পর্যটন অর্থনীতিকে যথাযথভাবে অ্যাড্রেস করার জন্য এই বিষয়গুলোর প্রতি সরকারের বিশেষ নজর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা আছে বলে আমি মনে করি। 

আমরা বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে পর্যটনকে এবং বিশেষ করে উৎসবের পর্যটনকে বাদ দিয়ে দিই। এটি আমাদের একটি বড় ভুল। বাংলাদেশ সরকারের প্রকল্প স্মার্ট বাংলাদেশ থেকেও অনেকে বাদ দিয়ে দেন পর্যটনকে। পর্যটনকে বাদ দিয়ে স্মার্ট বাংলাদেশ কেন, এখন আর কোনো কিছুই কল্পনা করা সম্ভব নয়। এই সত্যটা হয়তো আমরা বুঝতে পারছি না বা বুঝতে দেরি হচ্ছে অথবা এই সত্যটার স্বরূপ আমরা উদঘাটন করতে পারছি না। আমরা ভাবছি পর্যটন এখানে কাজে লাগবে কি না বা এটার সঙ্গে পর্যটন যাবে কি না। বিষয়টা কিন্তু আদৌ সেরকম না। পর্যটন যেখানে থাকবে না, সেরকম কোনো জিনিস আমাদের সোসাইটিতে থাকবেও না আবার জোর করে আনলেও থাকবে না। এ কারণে পর্যটনকে বাদ দিয়ে কোনো বিষয় ভাবার সুযোগই নেই। এমনকি সব উন্নয়ন ভাবনাও এখন পর্যটনকেন্দ্রিক হতে হবে। এটা ছাড়া উন্নয়নও টেকসই হবে না। তাই স্মার্ট বাংলাদেশকে আমরা যেভাবেই দেখি না কেন, পর্যটনকে বাদ দিয়ে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কোনো সুযোগ নেই এবং এটা হওয়া উচিতও নয়। 

পর্যটনকে বিভিন্ন জায়গা থেকে বাদ দেওয়ার মধ্যে আরেকটি প্রবণতা হলো অর্থনীতি থেকে পর্যটনকে বাদ দিয়ে দেওয়া। পৃথিবীতে পর্যটন অর্থনীতি নামে আলাদা একটা অর্থনীতি তৈরি হয়েছে। এই অর্থনীতি একই সঙ্গে যেমন একটি ইন্ডিপেন্ডেন্ট অর্থনীতি তেমনি এই অর্থনীতির সঙ্গে আমাদের মাইক্রো ইকোনমিকস ও ম্যাক্রো ইকোনমিকস এই দুটি প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। জীবনের সবকিছুর সঙ্গেই যেহেতু অর্থনীতি জড়িত, তাই পর্যটনের সঙ্গেও অর্থনীতি জড়িত। পর্যটন ছাড়া তো একটি জনগোষ্ঠীর মাঝে অর্থনীতি তৈরি হবে না। আপনি মাইক্রো ইকোনমিকসেই দেখেন আর ম্যাক্রো ইকোনমিকসেই দেখেন, প্রত্যেকটি জায়গাতেই আপনাকে ট্যুরিজমকে যুক্ত করতে হবে। এখন আর অন্য কথা বলার কোনো সুযোগ নেই। এখন কথা হলো, এই ইকোনমিকে যদি টেকসই করতে হয়, যদি এই ইকোনমিকে জনবান্ধব করতে হয়, জনগণের অর্থনীতি যদি আপনি তৈরি করতে চান তাহলে সেখানে পর্যটনকে যুক্ত করার কোনো বিকল্প নেই। পর্যটন প্রত্যেকটি কাজে অর্থনীতির সঙ্গে জড়িত। 

সমাজ একটি গতিশীল জিনিস। এটি সময়ের সঙ্গে তার আঙ্গিক ও কলেবর বদলায়। আমরা সমাজের ভেতর বসবাস করি এবং সমাজের কতগুলো নিজস্ব নিয়ম আছে। এসব বিষয় এসেছে ইন্ডিজেনাস নলেজ থেকে। ট্যুরিজমেরও একেবারে উৎসস্থল হলো ইন্ডিজেনাস নলেজ। সেই নলেজগুলোকে যদি আপনি বাঁচিয়ে রাখতে চান, টিকিয়ে রাখতে চান তাহলেও আপনাকে পর্যটনকে ব্যবহার করতে হবে। না হলে সোসাইটিটাও কিন্তু টেকসই হবে না। সোসাইটির মানুষের যে কর্মকাণ্ড, এই কর্মকাণ্ডগুলোও টেকসই হবে না। আমি যদি একটি বিষয় দিই উদাহরণ হিসেবে, যেমন আমাদের কৃষি, আমাদের মতো দেশে কৃষি একটি বড় বিষয়। আমাদের সমাজও এখনও কৃষিভিত্তিক সমাজ। আমাদের অর্থনীতিও এখনও কৃষিভিত্তিক। এখনও আমরা শিল্পভিত্তিক অর্থনীতিতে যাইনি। আমার কৃষি ততক্ষণ পর্যন্ত পরিপূর্ণতা লাভ করবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না আমি কৃষির সঙ্গে কৃষিপর্যটনকে যুক্ত করছি। আবার আমার যে রুরাল কমিউনিটি, এটিও কখনোই রুরাল কমিউনিটি হিসেবে পরিপূর্ণতা লাভ করবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না ওখানে আমি রুরাল ট্যুরিজমকে যুক্ত করছি। এখন আবার রুরাল ট্যুরিজমের মাঝে ছয় রকমের ট্যুরিজম হয়। কৃষি পর্যটন, খাদ্য পর্যটন, সাংস্কৃতিক পর্যটন, স্বাস্থ্য পর্যটন, জীবনধারা পর্যটন এবং জলাভূমি পর্যটন। আমি যদি আমার একটা রুরাল এরিয়াকে ডেভেলপ করার চেষ্টা করি তবে যেভাবে আমি ডেভেলপ করতে পারব, সেটা আমাদের ইন্ডিভিজুয়ালি যে প্রকল্প আছে সেগুলো দিয়ে কোনো কিছুই করতে পারা যাবে না।  আমি একজনকে ভ্যাকসিনেশন করব, তাকে তখন কেবল ভ্যাকসিনেশন করলেই হবে না-তাকে খাদ্যে আনতে হবে, স্বাস্থ্যে আনতে হবে, তাকে শিক্ষায় আনতে হবে। 

এর প্রত্যেকটি জিনিস ট্যুরিজমের প্রত্যেকটি জায়গাকে ইন্টিগ্রেট করতে পারে। সে সমন্বয় করতে পারে এবং এর একটি সমন্বিত ডেভেলপমেন্টের রূপও দিতে পারে। ট্যুরিজম ছাড়া এসবকে আপনি একটি টেকসই জায়গায় আনতে পারবেন না। দেশের মানুষ ও অর্থনীতির উন্নতির জন্য পর্যটনকে, বিশেষ করে উৎসবের পর্যটনকে এবং উৎসবের পর্যটন অর্থনীতিকে গুরুত্ব দেওয়া আমাদের জন্য অবশ্যকর্তব্য।

সভাপতি, বাংলাদেশ ট্যুরিজম ফাউন্ডেশন

সময়ের আলো/আরএস/ 


Loading...
Loading...
সম্পাদকীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: