বিস্মৃত জুমল্যান্ড আবার কেন অস্তিত্বশীল১. সম্প্রতি পাহাড় আবার উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। হঠাৎ করেই পাহাড়ে শিক্ষার্থীদের চলমান ৮ দফার আন্দোলন সংঘাতময় পরিস্থিতিতে রূপ নেয় একদম ভিন্ন এক ইস্যুতে। এই বাস্তবতা জাতিগত সাম্প্রদায়িকতাকে উসকে দিয়েছে। এর রেশ ধরেই আবার নতুন করে সামনে এসেছে ‘জুম্মুল্যান্ড’ বিতর্ক। এবার মূলত এই শব্দটিকে সামনে এনেছে বাঙালিদের আলোচনা। সোশ্যাল মিডিয়ায় এই বিতর্কে অংশ নেওয়া বাঙালি জনগোষ্ঠী সাম্প্রতিক আন্দোলনের সমালোচনা করে বলছেন, পাহাড়ের ভিন্ন জনজাতির মানুষরা বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে জুম্মুল্যান্ড গঠন করতে চায়। অন্যদিকে আন্দোলনরত পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মানুষরা বলছে, ‘আমরা জুম্মুল্যান্ড গঠনের দাবি করিনি, আমরা আমাদের অধিকার চাই।’ নতুন করে পাহাড়িদের পক্ষ থেকে জুমল্যান্ডের দাবি সামনে না আসেনি ঠিকই। তবে একসময় তো সেই আলাপ ছিল। তবে কোন প্রেক্ষাপটে একটি স্বাধীন দেশে ‘জুম্মুল্যান্ড’ আলোচনা সামনে এলো, পাহাড়ে সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু হলো সেটি জানতে আমাদের ইতিহাসে একটু নজর ফেরানো দরকার।
২. ১৯৭০ সালের নির্বাচনে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়েই স্বাধীন বাংলাদেশে গঠিত হয় গণপরিষদ। ১৯৭২ সালের ৩১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত গণপরিষদের বৈঠকে তৎকালীন ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য আবদুর রাজ্জাক ভূঁইয়া সংবিধানের ৬নং অনুচ্ছেদ সংশোধনের প্রস্তাবে বলেন, ‘বাংলাদেশের নাগরিত্ব আইনের দ্বারা নির্ধারিত এবং নিয়ন্ত্রিত হইবে; বাংলাদেশের নাগরিক গণ বাঙালি বলিয়া পরিচিত হইবেন’ (গণপরিষদ বিতর্ক : ১৯৭২)
এ প্রস্তাবটি গ্রহণযোগ্য বলে সমর্থন দিয়ে এটি পাস করার সুপারিশ করেন সংবিধান প্রণয়নমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন। গণপরিষদের এই বৈঠকের স্পিকার ছিলেন মুহম্মদুল্লাহ। এর প্রেক্ষিতে তৎকালীন পার্বত্য চট্টগ্রামের-১ আসনের সংসদ সদস্য মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা তার বক্তব্যে বলেন, ‘মাননীয় স্পিকার সাহেব, জনাব আবদুর রাজ্জাক ভূঁইয়া সংশোধনী প্রস্তাব এনেছেন যে বাংলাদেশের নাগরিকগণ বাঙালি বলিয়া পরিচিত হইবে। মাননীয় স্পিকার সাহেব এই ব্যাপারে আমার বক্তব্য হলো, সংবিধান বিলে আছে, ‘বাংলাদেশের নাগরিত্ব আইনের দ্বারা নির্ধারিত এবং নিয়ন্ত্রিত হইব।’ এর সঙ্গে সুনির্দিষ্টভাবে বাংলাদেশের নাগরিকদের বাঙালি বলে পরিচিত করার জন্য আবদুর রাজ্জাক ভূঁইয়ার প্রস্তাবে আমার একটু আপত্তি আছে যে, বাংলাদেশের নাগরিত্বের যে সংজ্ঞা, তাতে করে ভালোভাবে বিবেচনা করে তা যথোপযুক্তভাবে গ্রহণ করা উচিত বলে আমি মনে করি।
আমি যে অঞ্চল থেকে এসেছি সেই পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীরা যুগ যুগ ধরে বাংলাদেশে বাস করে আসছে। বাংলাদেশের বাংলা ভাষায় বাঙালিদের সঙ্গে আমরা লেখাপড়া শিখেছি। বাংলাদেশের সঙ্গে আমরা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বাংলাদেশের কোটি কোটি জনগণের সঙ্গে আমরা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সবদিক দিয়েই আমরা একসঙ্গে একযোগে বসবাস করে আসছি। কিন্তু আমি একজন চাকমা। আমার বাপ-দাদা চৌদ্দ পুরুষ-কেউ বলেননি আমি বাঙালি। আমার সদস্য-সদস্যা ভাইবোনদের কাছে আমার আবেদন, আমি জানি না আজ আমাদের এই সংবিধানে আমাদের কেন বাঙালি বলে পরিচিত করতে চায়...স্পিকার তখন প্রশ্ন তোলেন, আপনি বাঙালি হতে চান না? জবাবে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা বলেন, মাননীয় স্পিকার সাহেব, আমাদিগকে বাঙালি জাতি বলে কখনো বলা হয়নি। আজ যদি এই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের সংবিধানের জন্য এই সংশোধনী পাস হয়ে যায়, তা হলে আমাদের এই চাকমা জাতির অস্তিত্ব লোপ পেয়ে যাবে। আমরা বাংলাদেশের নাগরিক আমরা আমাদিগকে বাংলাদেশি বলে মনে করি এবং বিশ্বাস করি। কিন্তু বাঙালি বলে নয়।
তারপর স্পিকার তাকে বলেন, আপনি বসুন। (গণপরিষদ বিতর্ক : ১৯৭২, সূত্র : শান্তিবাহিনীর গেরিলা জীবন-গোলাম মোর্তজা) বক্তব্য শেষ করার আগেই বসিয়ে দেওয়া হয় তাকে। ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ভেতর থেকে দুর্গম পার্বত্যাঞ্চল থেকে আসা মাত্র একজন প্রতিনিধি এমএন লারমার বক্তব্যও পুরোটি শোনেনি স্পিকার। এই গণপরিষদে তিনজন ছাড়া সবাই ছিলেন আওয়ামী লীগের সদস্য। ফলে হ্যাঁ-না ভোটে গ্রহণ করা হয় এই প্রস্তাব। এর প্রতিবাদ জানিয়ে গণপরিষদ বর্জন করে চলে যান এমএন লারমা। পরে সেই বিলটি পাস হয় পরিষদে। যার মধ্য দিয়ে শুরু হয় নতুন অসন্তোষ।
তৎকালীন রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দাবি-দাওয়া নিয়ে দেখা করতে গেলে এমএন লারমাকে শেখ মুজিবও বলেন, ‘তোরা সব বাঙালি হয়ে যা...’ । তখন এমএন লারমাদের পক্ষ থেকে স্বায়ত্তশাসনসহ পাহাড়ি জনগোষ্ঠী তাদের অধিকার সুরক্ষার জন্য ৪ দফা দাবি তোলেন। কিন্তু সেসব দাবি-দাওয়া গুরুত্ব পায়নি সরকারের কাছে। নানাভাবে প্রত্যাখিত হয়ে এমএন লারমা মনে করেন তাদের মুখের ভাষা বোঝার আগ্রহ নেই শাসকদের। তখনই ভেতরে ভেতরে শুরু হয় শান্তিবাহিনী গঠন করার কাজ। স্বাধীনতার আগে পাহাড়ি ছাত্রদের নিয়ে যে সংগঠনটি ছিল সেটিই ১৯৭২ সালে জনসংহতি সমিতি নামে রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। আর ১৯৭৩ সালে শান্তিবাহিনী গঠন করা হয় এর গোপন সামরিক শাখা হিসেবে। প্রকাশ্য এবং আন্ডারগ্রাউন্ড এই দুই ধারার রাজনীতিকেই এগিয়ে নিয়ে যায় জনসংহতি সমিতি। এর পেছনের অন্যতম কারণ ছিল নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে দাবি প্রতিষ্ঠা না হলে সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা হবে। ১৯৭৫ সালের প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর এমএন লারমাসহ জনসংহতি সমিতির নেতারা আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যায় এবং ১৯৭৭ সালের দিকে শুরু সশস্ত্র সংগ্রাম। পাহাড়ে শুরু হয় গেরিলা যুদ্ধ। আর এই লড়াইয়ের ভেতর দিয়েই জুম্মুজাতীয়তা বাদ এবং জুম্মুল্যান্ডের ধারণাও সামনে আসে।
এরপর একাধিকবার সরকারের সঙ্গে আলোচনা হলেও তা ভেস্তে যায়। অবশেষে ১৯৯৭ সালে শান্তিচুক্তির মধ্য দিয়ে শেষ হয় এই কথিত জুম্মুল্যান্ডের বিদ্রোহ পর্ব। এই পুরো সময়টিকে রাষ্ট্রদ্রোহ, অধিকার আদায়ের সংগ্রাম, বহির্বিশ্বের চক্রান্ত ইত্যাদি নানা রকম সংজ্ঞা কিংবা দৃষ্টিকোণ দিয়ে বিচার করা হলেও যে সত্যকে অস্বীকার করার উপায় নেই, তা হলো বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠনের শুরুতেই বহু ভাষাভাষি, বহুজাতির রাষ্ট্র গঠনের বৈচিত্র্যকে অনুধাবন করতে না পারার ব্যর্থতা।
৩. ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তি হওয়ার পর প্রথম যে পদক্ষেপটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল তা হলো পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা। কিন্তু সেই উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছে বারবার। চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়া নিয়ে পাহাড়ে মানুষের ভেতর ক্ষোভ রয়েছে। এই ক্ষোভ থাকাটা অন্যায্য নয়। কারণ পূর্ণাঙ্গ চুক্তি বাস্তবায়ন করার দাবি তো তাদের হক।
এবার আন্দোলনও সে দাবির ছায়াতেই শুরু হয়েছিল। তার আগে বলে রাখা ভালো, অনেকেই বলেন সরকার পরিবর্তন হওয়ার পর দেশ অস্থিতিশীল করতে পাহাড়ে আন্দোলন শুরু করা হয়েছে। কিন্তু পাহাড়ে হুট করে কোনো আন্দোলন শুরু হয়নি। বিভিন্ন ইস্যুতে নানা বঞ্চনা-নিপীড়নের জবাবে বিভিন্ন সময়েই পাহাড়ে বিক্ষোভ, আন্দোলন, প্রতিবাদ কর্মসূচি চলতে থাকে।
সম্প্রতি সারা দেশের কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে গড়ে ওঠা সরকার পতন আন্দোলনেও পাহাড়ি শিক্ষার্থীরা অংশ নেয়। আমরা দেখেছি আমাদের পাশে থেকেই পাহাড়ি ছাত্ররা লড়েছে ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে। তারাও এই পরিবর্তন চেয়েছে। সেই আন্দোলনের স্পিরিট সমতল থেকে পাহাড়েও লাগে। সরকার পতনের পর যখন বেশ জোরেশোরে রাষ্ট্র সংস্কারের দাবি উঠেছে, স্বাভাবিকভাবেই পাহাড়ের মানুষও চাইছে নতুন বাংলাদেশে সংস্কারের এই যাত্রায় এবার তাদের অধিকার দাবি-দাওয়াও আমলে নেওয়া হোক।
স্বাধীনতা যুদ্ধের পর নতুন দেশ গঠনের সময়েই যে ভুল হয়েছিল এবং এর দায় দশকের পর দশক বইতে হয়েছে এবারও যেন তেমনটা না হয়। পাহাড়ের ছাত্ররা যে আন্দোলন শুরু করেছিলেন তার প্ল্যাটফর্মের নাম দেন ‘সংঘাত ও বৈষম্যবিরোধী পাহাড়ি ছাত্র আন্দোলন’। তারা তুলে ধরেন ৮ দফা দাবি। পাহাড়ে নামে স্মরণকালের অন্যতম বড় জনস্রোত। এই ৮ দফার ভেতর চাকরিতে পাহাড়িদের ৫ শতাংশ কোটা পুনর্বহাল, আদিবাসী হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি, পার্বত্য শান্তিচুক্তি অনুযায়ী ভূমি সমস্যার সমাধান, শিক্ষা সংকট নিরসন এবং নিজ নিজ জাতিগোষ্ঠীর মাতৃভাষা শিক্ষা অন্যতম। কিন্তু সেখানে কোথাও জুমল্যান্ড গড়ার কথা, স্বাধীনতার কথা, বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার কথা নেই। অথচ সোশ্যাল মিডিয়াজুড়ে সেই আলাপই এবার ভেসে বেড়াচ্ছে। অনেকেই বলছেন এটি বিচ্ছিন্ন হওয়ার ষড়যন্ত্র।
আন্দোলন-কর্মসূচি যখন তুঙ্গে তখন খাগড়াছড়িতে মোটরসাইকেল চুরির অভিযোগে মামুন নামে এক যুবককে ধরে মারধর করা হয়, পরে তার মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাঙালি-পাহাড়ি সংঘর্ষ শুরু হয়। সোজা কথা সেটা জাতিগত সংঘাতে রূপ নেয়। অথচ নিহত মামুনের মৃত্যু নিয়ে পরে পাওয়া গেল ভিন্ন কথা। মোটরসাইকেল চুরি করে পালানোর সময় বিদ্যুতের খুঁটির ধাক্কায় মামুনের মৃত্যু হয়েছে বলে নিশ্চিত করে বিবৃত দিয়েছেন খাগড়াছড়ির রিজিওন কমান্ডার এবং থানার ওসি। কিন্তু সত্য যেটিই হোক সংঘাতই যেন পাহাড়ের একমাত্র সত্য, একমাত্র নিয়তি। ফলে একটি নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনেও প্রাণ ঝরল। একই সঙ্গে সারা দেশ থেকে শুরু হলো বিচ্ছিন্নতাবাদীর নানা অপপ্রচারও। জুম্মুল্যান্ডের মানচিত্র, লোগো, মুদ্রা ইত্যাদি নেট দুনিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়া হলো। আসাম, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়ার বিভিন্ন বাহিনীর ট্রেনিং ও অস্ত্র মহড়ার ভিডিও, টিকটকারদের অস্ত্রসহ ফানি ভিডিওকে জুমল্যান্ড তৈরির সংগ্রাম বলে প্রচার চালানো হলো। আর এগুলো ঘিরে সমতলের পাহাড় না চেনা মানুষরা রীতিমতো অনলাইন যুদ্ধ শুরু করে দিল। ফলে আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া বিষাক্ত হয়ে উঠছে নানা জাতিগত বিদ্বেষী বার্তা দিয়ে। যা কেবল দূরত্বই বাড়াচ্ছে, ঘৃণা বাড়াচ্ছে, অবিশ্বাস বাড়াচ্ছে।
যাদের নামে এই অপপ্রচার চলল সেই পাহাড়িরা বারবার বলছে আমরা বাংলাদেশি, আমরা এই দেশেরই নাগরিক, এটি দেশ বিচ্ছিন্ন করার সংগ্রাম না, জুমল্যান্ড করার সংগ্রাম না। এমনকি সংঘাতে নিহত শহিদদের স্মরণে তারা জাতীয় সংগীত গাইলেন। যারা শুনছেনে-দেখেছেন সেই ভিডিওটি তারা জানেন কি দরদ আর আবেগ নিয়ে এই পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মানুষরাও গাইল-‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি।’ এই দরদের ভাষা আবেগ যদি অনুধাবন না করতে পারি তা হলে বাস্তব মানচিত্রে জুমল্যান্ডের অস্তিত্ব না থাকলেও মানুষের মনের ভেতর ঠিকই একটা জুম্মুল্যান্ড তৈরি হয়ে যাবে। নতুন প্রজন্মের তরুণরা যে জুমল্যান্ডকে মুছে ফেলতে চাইছে আমরা কি তাদের হৃদয়ে সেই ছবি এঁকে দিতে চাইছি জোর করে? প্রশ্নটা থাকল।
তথ্যচিত্র নির্মাতা ও অ্যাক্টিভিস্ট
সময়ের আলো/আরএস/