বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্রের সূচনা হয় আশির দশকের গোড়ার দিকে। শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুর পর তার কন্যা শেখ হাসিনা বিদেশ থেকে ফিরে এসে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি মনোনীত হন। একইভাবে জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর খালেদা জিয়া বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের চেয়ারপারসন মনোনীত হন।
এই দুটি মনোনয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশে পরিবারভিত্তিক রাজনীতি চর্চার ক্ষেত্র তৈরি হয়। তারপর দল দুটির যতবারই কাউন্সিল হয়েছে কখনোই সভাপতি পদে পরিবর্তন আসেনি। তার মানে দলের সর্ব ক্ষমতা শেখ ও জিয়া পরিবারের হাতেই থেকে গেছে। জিয়াউর রহমানের পর হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ক্ষমতা দখল করে এবং জাতীয় পার্টি নামে একটি দল প্রতিষ্ঠা করে। এরশাদের মৃত্যুর পর তার স্ত্রী রওশন এরশাদ ও ভাই জিএম কাদেরের মধ্যে জাতীয় পার্টির কর্তৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। শেষ পর্যন্ত জিএম কাদের দলের চেয়ারম্যান পদে অধিষ্ঠিত হন।
লক্ষ করার বিষয় হলো শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমান কিংবা এরশাদ-তাদের কেউ-ই পরিবারকেন্দ্রিক রাজনীতির উত্তরাধিকারী ছিলেন না। কিন্তু পরবর্তী সময়ে উত্তরাধিকার সূত্রে রাজনীতি চর্চা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। এ রাজনীতি শুধু কেন্দ্রীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি। মাঠ পর্যায়েও এই প্রভাব ও চর্চা বৃদ্ধি পেতে দেখা গেছে। সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় সরকার পদ্ধতি প্রবর্তিত হলে গণতন্ত্র চর্চা ক্রমশ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। নব্বই পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতিতে সর্বস্তরে এই ব্যবস্থা ঝেঁকে বসে। বাকশাল পরবর্তী বাংলাদেশে জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্র চালু করলেও দলের ভেতরে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। দলের ভেতরে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে প্রবল বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে পরিবারতন্ত্র।
এই প্রভাবমুক্ত হওয়ার ফলে বাংলাদেশে বামপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে কিছুটা গণতান্ত্রিক চর্চা দেখতে পাওয়া যায়। একই কারণে ইসলামি দলগুলোর ভেতরেও গণতন্ত্রের চর্চা আছে। বামপন্থি ও ইসলামি দলগুলোতে পরিবারতন্ত্রের প্রভাবমুক্ত গণতন্ত্রের চর্চা হয় বলেই দলের শীর্ষ পদে প্রায়ই পরিবর্তন হতে দেখা গেছে। এসব দলের ভেতর কখনো এক ব্যক্তির শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়নি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টি কখনো এক ব্যক্তির শাসন থেকে বের হয়ে আসতে পারেনি। এ কথা সত্য যে, দলের ভেতরে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত থাকলে দলীয় সরকার কখনো গণতান্ত্রিক হতে পারে না।
আওয়ামী লীগ দলের ভেতরে শেখ হাসিনাকেন্দ্রিক একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিল বলেই দলটি দেশে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা কায়েম করতে পারেনি। আর এ কারণেই একনায়ক শেখ হাসিনা সহজেই ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠতে পেরেছিলেন। আর এ কারণেই ফ্যাসিস্ট একনায়ক শেখ হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগকে ছাত্র-জনতা প্রত্যাখ্যান করেছে। এই প্রত্যাখ্যানের মাধ্যমে ছাত্র-জনতা রাজনৈতিক দলগুলোকে যে বার্তা দিয়েছে তা হলো প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে নিজেদের মধ্যে গণতন্ত্র চর্চা করতে হবে। নব্বই পরবর্তী প্রায় সাড়ে তিন দশকের রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্রের ব্যাপকতা লক্ষ করা গেছে জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় পর্যায়ের সব নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নের মধ্যে। দেখা গেছে জাতীয় সংসদের কোনো আসন শূন্য হলে সেই আসনের উপনির্বাচনে সাবেক সংসদ সদস্যের স্ত্রী কিংবা পুত্রকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। সাবেক সংসদ সদস্যের স্ত্রী কিংবা পুত্র রাজনৈতিকভাবে অভিজ্ঞ ও দলীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলে তিনি মনোনয়ন পেতেই পারেন। কিন্তু তারা যদি রাজনৈতিকভাবে অনভিজ্ঞ ও দলীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ না হয়ে থাকেন তা হলে শুধু আবেগের বশে মনোনয়ন দেওয়াটা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া হতে পারে না। এতে একদিকে দলের ভেতরে গণতান্ত্রিক চর্চা বাধাগ্রস্ত হয় অন্যদিকে দলের অভিজ্ঞ ও ত্যাগী নেতাকর্মীরা বঞ্চিত হন। তার চেয়েও বড় কথা হলো এর মাধ্যমে পরিবারতন্ত্র কায়েম হয়। রাজতন্ত্রের মিনিয়েচার হিসেবে পরিবারতন্ত্র গণতন্ত্রের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে।
শুধু নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন নয়, পরিবারতন্ত্রের প্রভাবে দলের সাংগঠনিক কাঠামোতেও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা যায় না। অনেক সময়ে দেখা যায়, সরকারদলীয় সংসদ সদস্য তার সংসদীয় আসনের গুরুত্বপূর্ণ দলীয় পদগুলোতে পরিবারের সদস্য ও নিকটাত্মীয়দের বসিয়ে দেন। সংসদ সদস্য তার সংসদীয় আসনের একনায়কে পরিণত হন। তিনি পার্লামেন্টের সদস্য হিসেবে কেন্দ্রীয় সরকারে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য নির্বাচিত হলেও স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় পুরোপুরি হস্তক্ষেপ করেন।
দীর্ঘ সাড়ে তিন দশক ধরে প্রচলিত এই রাজনীতি সাম্য, ন্যায়নীতি ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছে। এ কারণে ছাত্র-জনতার আকাক্সক্ষা অনুযায়ী রাষ্ট্র সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু করেছে বর্তমান সরকার। রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সত্যিকার অর্থে জনগণের প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হলে শুধু ব্যক্তির পরিবর্তন যথেষ্ট নয়। ব্যবস্থা বা নীতিমালা পরিবর্তন করা হলেই কেবল তা থেকে সুফল মিলতে পারে। পূর্ববর্তী দলীয় সরকারগুলো যে ব্যবস্থা কায়েম করেছিল তাতে জনকল্যাণের চেয়ে সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের রুটি-হালুয়ার ব্যবস্থা হয়েছিল বেশি।
অন্তর্বর্তী সরকারের পরে যে দলীয় সরকার ক্ষমতায় আসবে তারা যেন সেই একই ব্যবস্থা কায়েম করতে না পারে বর্তমান সরকারকে সে লক্ষ্যে কাজ করতে হবে। আর এ জন্য সিস্টেম পরিবর্তনের দাবি উঠেছে। জনগণ আর আগের ব্যবস্থায় ফিরে যেতে চায় না। অন্তর্বর্তী সরকারকে সেই জনআকাক্সক্ষা পূরণ করতে হবে। সংবিধান সংশোধন, পরিবর্তন বা পুনর্লিখন-যেটিই করা হোক না কেন রাষ্ট্রের মূলনীতিকে অক্ষুণ্ন রেখেই তা করতে হবে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুধু প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সংস্কার কাজ করতে হবে। দেখতে দেখতে প্রায় তিন মাস অতিবাহিত হচ্ছে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার। এখন জনগণ সরকারের কাজের মূল্যায়ন করতে শুরু করেছে। মনে রাখা দরকার, এ দেশের জনগণ দারুণভাবে রাজনীতি সচেতন।
সরকারের কর্মকাণ্ডকে নানাভাবে বিশ্লেষণ করার সক্ষমতা কম-বেশি সবারই আছে। দলীয় সরকারের সর্বগ্রাসী থাবা থেকে মুক্ত হয়ে আবার দেশের মানুষ দলীয়করণের শিকার হতে চায় না। পরিবারকেন্দ্রিক রাজনীতির ব্যাপক আগ্রাসন থেকে মুক্ত হতে চায়। প্রতিটি রাজনৈতিক দল যেন দক্ষ, অভিজ্ঞ ও ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করতে পারে, তাদেরকে দেশ ও জনগণের কল্যাণে কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে পারে সে জন্য এই সরকারকে পরিবারতন্ত্রের লাগাম টেনে ধরতে হবে। এ লক্ষ্যে নিবন্ধনভুক্ত সব রাজনৈতিক দলের কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সব কমিটির সব নির্বাচন গোপন ব্যালটের মাধ্যমে করার বিধান জারি করতে পারে নির্বাচন কমিশন। এতে দলের ভেতরে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হবে। গোপন ব্যালটে নির্বাচিত নেতাকর্মীরা অনেকাংশেই লেজুড়বৃত্তি ও তোষামোদের রাজনীতি থেকে মুক্ত থাকতে পারেন। জনকল্যাণ ও নিজের পার্টিকে সঠিক পথে পরিচালনার কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখতে পারেন। অতীতে মাঠ পর্যায়ের দলীয় রাজনীতির বাস্তবতা থেকে দেশের সাধারণ মানুষ যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে তা মোটেও সুখকর নয়। এক দলের নেতাকর্মীর কাছে বিশেষত সরকারি দলের নেতাকর্মীর কাছে অন্য দলের সমর্থকরা কোনোরকম সহানুভূতি, এমনকি ন্যায্য অধিকার পর্যন্ত পায়নি।
রাজনৈতিক দলগুলো এ ধরনের রাজনীতি চর্চায় আর যেন ফিরে যেতে না পারে সে জন্য অন্তর্বর্তী সরকারকে কিছু ব্যবস্থার পরিবর্তন করতে হবে। দলীয় সরকার এসেও যেন সরকারি সহায়তা সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে সমানভাবে বণ্টন করতে বাধ্য হয় সে ব্যবস্থা করতে হবে। কাজটি কঠিন। তবে বর্তমান সরকার এ ব্যাপারে একটি সঠিক পদ্ধতি প্রণয়ন করতে সক্ষম হবে বলে বিশ্বাস করে সাধারণ মানুষ।
গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় আর একটি উল্লেখযোগ্য কাজ হতে পারে প্রতিটি ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করে দেওয়া। দার্শনিক প্লেটো গণতন্ত্রকে মূর্খের শাসন বলেছিলেন। কারণ একমাত্র গণতন্ত্রেই একজন জ্ঞানী ব্যক্তি দুজন মূর্খের কাছে হেরে যায়। তবু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাই এখন বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। এখন গণতন্ত্রকে প্রত্যাখ্যান করার উপায় নেই। তবে বর্তমান বাস্তবতায় গণতন্ত্রের গুণগত উৎকর্ষের জন্য নেতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রার্থীর যোগ্যতা নির্ধারণ করে দেওয়াটা জরুরি হয়ে পড়েছে। কালো টাকা ও পেশিশক্তির বলে অনেক অযোগ্য ব্যক্তিকে নেতা নির্বাচিত হতে দেখা যায়। বয়স, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাসহ আরও কিছু মানদণ্ডে নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা নির্ধারণ করে দেওয়া হলে কালো টাকা ও পেশিশক্তির দৌরাত্ম্য কমে যাবে। একই সঙ্গে কমে যাবে পরিবারতন্ত্রের প্রভাব।
গণতন্ত্রকে সুসংগঠিত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্য এ জাতীয় আরও কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায় কি না-বর্তমান সরকার সেদিকে মনোযোগী হবেন বলে আশা করে দেশের মানুষ। দীর্ঘ সংগ্রাম এবং ছাত্র-জনতার আত্মাহুতির মধ্য দিয়ে এ সরকার যাত্রা শুরু করেছে। সর্বস্তরের মানুষের সমঅধিকার ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা এই সরকারের অন্যতম দায়িত্ব। এ সরকার ব্যর্থ হলে ব্যর্থ হবে ছাত্র-জনতার আত্মদান। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, পরিবারতন্ত্রমুক্ত, কালো টাকা ও পেশিশক্তিমুক্ত একটি অবাধ, স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের ওপর নির্ভর করছে এই সরকারের সফলতা।
পিএইচডি গবেষক
ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
সময়ের আলো/আরএস/