সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিদিন নিত্যনতুন উদ্বেগের সঞ্চার করছে। ‘স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই’ সাংবাদিক প্রয়াত নির্মল সেন বহু আগে একটি নিবন্ধন লিখেছিলেন। সড়ক দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু তাকে পীড়িত করেছিল। তারপর বহুদিন পার হয়ে গেছে। দিনে দিনে প্রযুক্তির অনেক উন্নতি হয়েছে। সে হিসেবে আধুনিক নিত্যনতুন গাড়ি নগরে, গ্রামে প্রবেশ করেও জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি। দুর্ভাবনা আরও বাড়ছে।
রাজনৈতিক প্রতিপত্তি বিস্তার, দুষ্কৃতকারীর ষড়যন্ত্র, ছিনতাইকারী, প্রতিপক্ষের হিংসা-বিদ্বেষ, প্রসূতি মৃত্যুর পাশাপাশি সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর খবরও আমাদের দৃষ্টিকে আচ্ছন্ন করে প্রতিদিন। যেমন-নাটোরের বড়াই গ্রামে দুটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ৩৬ জনের মর্মান্তিক মৃত্যুতে স্তব্ধ মৃত পরিবারের সদস্যরা। ইতিপূর্বে মানিকগঞ্জে দুই সচিব ও চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ, মিশুক মুনীরের মৃত্যুতে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছিল সারা দেশে। আমাদের দেশের মতো এত নিরাপত্তাহীন দেশ বিশ্বের কোথাও নেই। ফিটনেসবিহীন গাড়ি অদক্ষ চালকরা চালাতে গিয়েই এসব দুর্ঘটনাগুলো ঘটছে। তার একটি উদাহরণ; চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায় অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী।
জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিদিন বিত্তবানদের গাড়ির সংখ্যাও বেড়ে চলছে। বিআরটিএ পর্যন্ত ২১ লাখ ৫ হাজার ১৪০টি গাড়ি নিবন্ধিত করেছে। এর মধ্যে বাস ৩৩ হাজার ১৯১টি, ট্রাক ১ লাখ ৩০ হাজার ৪০৫টি। ঢাকায় নিবন্ধিত গাড়ি রয়েছে ৮ লাখ ৩৫ হাজার ৮১২টি। এক জরিপে দেখা যায় ফিটনেসবিহীন গাড়ির সংখ্যা ২ লাখ ৮৯ হাজার ৩০৪টি। ঢাকায় স্তব্ধ ফিটনেসবিহীন গাড়ি আছে ১ লাখ ৮৯ হাজার ৩০৪টি। এ ছিল বাস ও ট্রাক সংক্রান্ত সংক্ষিপ্ত এক জরিপ মাত্র। এ শহরে প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস ও বিভিন্ন ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে।
ড্রাইভিং লাইসেন্স, গাড়ির ফিটনেস সার্টিফিকেট মিলছে ‘টু পাইস’ লেনদেনের মাধ্যমে। অশিক্ষিত চালক, দুর্নীতিগ্রস্ত বিআরটিএর কর্মচারীদের যোগসাজশে সার্টিফিকেট সংগ্রহ করে বিপজ্জনক গাড়ি চালিয়ে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটাচ্ছে অহরহ। মালবাহী ট্রাক, অননুমোদিত গাড়ি দস্যুর মতো বেপরোয়াভাবে চলাফেরা করছে শহরে। জানমালের বিপুল ক্ষতি হচ্ছে। একজন শ্রমিকের আয়ের ওপর নির্ভরশীল থাকে একটি পুরো পরিবার। এই পরিবারগুলো উপার্জন সক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে শোকে পাথর হয়ে যায় যখন কোনো দুর্ঘটনা ঘটে। সরকারি আর্থিক অনুদান তাদের সন্তান-সন্ততির লেখাপড়া ও সাংসারিক ব্যয় নির্বাহের জন্য যথেষ্ট নয়। মালিকরা যেনতেনভাবে গাড়ি কিনে রাস্তায় পরিবহনটি নামিয়ে দেয়। কখনো অসৎ চালকের হাতে পড়ে বা হেলপার গাড়ির যন্ত্রাংশ বিক্রি করে নড়বড়ে গাড়িটি বেসামাল অবস্থায় রাস্তায় নামিয়ে চালায় বেপরোয়াভাবে। ফলশ্রুতিতে নিয়ন্ত্রণহীন গাড়িটির জন্য দুর্ঘটনা ঘটে যায় নিজের অজান্তে। এ ক্ষেত্রে বিআরটিএসহ বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে যথাযথ মনিটরিং একেবারেই নেই বললেই চলে। সহজ ও সুলভে ফিটনেস পরীক্ষার ব্যবস্থা চালু থাকা প্রয়োজন।
সড়ক দুর্ঘটনায় যারা প্রিয়জন হারিয়েছেন তারা জানেন সে বেদনা কতটা মর্মান্তিক, বেদনার! চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের স্ত্রীর সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর পর দীর্ঘদিন ধরে সড়ক দুর্ঘটনারোধে কাজ করে তিনি নিরাপদ সড়ক আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। তার সহযাত্রী হয়েছিলেন অনেকেই। দীর্ঘদিন আন্দোলন করার পরও সড়ক দুর্ঘটনা বন্ধ করা যায়নি বা হয়নি।
পরিবহন সেক্টরের সঙ্গে যারা জড়িত তারা সেমিনার-সিম্পোজিয়ামের মাধ্যমে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে যে করণীয় প্রস্তাব উপস্থাপন করেন সেটি কাগুজে প্রস্তাব হয়ে রয়ে যায়। বাস্তবে তার প্রতিফলন হয় না বিন্দুমাত্র। সড়ক দুর্ঘটনায় জড়িতদের শাস্তি স্বল্প সময়ের জেলবাস। আইনের ফাঁকফোকর গলিয়ে দুর্ঘটনার সঙ্গে জড়িতরা পার পেয়ে যায়। অদক্ষ চালকের জন্য অধিকাংশ ক্ষেত্রে দুর্ঘটনা ঘটে থাকে।
রোড সাইন সম্পর্কে চালকদের বিশেষ কোনো ধারণা নেই বললেই চলে। গাড়ি হাতে পেয়ে অদক্ষ চালক বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। রাস্তায় নির্দেশক বাতি অধিকাংশ স্থানে জ্বলেই না। ট্রাফিক পুলিশ দাঁড়িয়ে থাকে নির্বাক-নির্বিকার। কখনো হাত তুলে গাড়ি চলাচল বন্ধ করে, কখনোই বা ছেড়ে দেয় তা বোঝা ভার। সবাইকে এ দলে চিহ্নিত করা যাবে না। দায়িত্বশীল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিভিন্ন রাজনৈতিক চাপ ও প্রভাব-প্রতিপত্তিতে সক্রিয় থাকতে পারে না। চালকের ওভারটেক করার সময়ও দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। টার্নিং পয়েন্টে গতি স্বাভাবিক না থাকার কারণে এসব দুর্ঘটনায় নিপতিত হয় গাড়ি। সাংকেতিক হর্ন, আলো ও গতি ঠিক না থাকার কারণেও বহু দুর্ঘটনার উৎপত্তি হয়েছে। রাস্তাঘাটের বেহাল দশা আমাদের সবার জানা। গর্ত, সড়কে বাতি না থাকা, ভাঙা ব্রিজ, দুর্ঘটনার সংখ্যাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। গাড়িতে বেশি যাত্রী যত্রতত্র ওঠা-নামা করাও আরেকটি কারণ দুর্ঘটনার। বহন ক্ষমতার বাইরে গিয়ে যেখানে-সেখানে পার্কিং, পাশাপাশি দাঁড়ানো এক গাড়ি অন্য গাড়ির সঙ্গে সংঘর্ষ সৃষ্টির উপাদান হিসেবেও কাজ করে অনেক সময়।
বাস-ট্রাকের সংঘর্ষ বিপুল ক্ষয়ক্ষতির কারণ হিসেবে দেখা দেয়। ট্রাক চলাচল শুধু রাতে করলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক কমে আসবে বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। বিআরটিএর স্পিড লিমিট গাড়ির গতির নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। আশির দশক পর্যন্ত এ পদ্ধতিই চালু ছিল। রাস্তায় টহলরত পুলিশের হাতে গাড়ি ও গাড়ির চালককে নিয়ন্ত্রণ করার মতো কোনো অস্ত্র নেই। ‘স্পিড ডিটেক্টর’ দিয়ে গাড়ি চালকের অপ্রতিরোধ্য যাতায়াত নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি নিয়েও ভাবতে হবে। একজন পুলিশ নিরাপদ অবস্থানে থেকে স্পিড ডিটেক্টরের মাধ্যমে চালক ও গাড়ির গতি নির্ধারণ করতে পারবেন স্পিড ডিটেক্টরের মাধ্যমে। তা ছাড়া ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতির ব্যবস্থা থাকাও জরুরি। আইনগত দিক খতিয়ে দেখে অপরাধীকে আইনের আওতায় আনতে হবে। ট্রাকের গতি ৩০ কিলোমিটার নির্ধারণ করে গভর্নর সিল সংযুক্ত করা হলে কেউ ট্রাকের গতি বাড়ালে তাকে চিহ্নিত করা যাবে। এ ক্ষেত্রে চালককে শাস্তির আওতায় আনা যাবে। এ প্রক্রিয়ায় চালকের অবহেলায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে যেসব দুর্ঘটনা ঘটে তার কিছুটা হলেও লাঘব করা সম্ভব হবে। অপরাধী চালককে নগদ জরিমানার আওতায় আনতে হবে।
অধিকাংশ গাড়ির মালিক ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতা ও প্রভাবশালী ব্যক্তি। তাদের গাড়ি ত্রুটিযুক্ত তা প্রমাণ করা বেশ কষ্টসাধ্য। দুর্ঘটনার কারণে যে গাড়ির মালিক ও চালককে শনাক্ত করা হয় মামলাগত প্রক্রিয়া ও প্রভাব-প্রতিপত্তির কারণে সঠিকভাবে সেই মামলাও আলোর মুখ দেখে না। পথে ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ, জরিমানা আদায় ও আদায়কৃত অংশের কিছু অর্থ যারা দায়িত্ব পালন করবেন তাদের ইনটেনসিভ হিসেবে দেওয়া যায়। সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, নাগরিক, গাড়ির মালিক, চালক ও জনগণের মধ্যে মতবিনিময়ের ব্যবস্থা চালু করা জরুরি।
গাড়ির চালকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। চালকদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি, বোনাস দেওয়া ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ ও ব্যবহার নিশ্চিত না করতে পারলে আমরা যে তিমিরে আছি সেই তিমিরেই থেকে যাব। সড়ক হোক জনগণের নিরাপদ চলাচলের উপযুক্ত স্থান। আধুনিক নানা প্রযুক্তি বন্ধুর মতো আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। যন্ত্রদানব নসিমন-করিমনসহ আরও অনেক ধরনের অটোরিকশাও গ্রামেগঞ্জে চলছে। এগুলো চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও কেউ মানছে না। ফলশ্রুতিতে দুর্ঘটনা অহরহ বেড়েই চলছে। বিআরটিএর সেবামূলক কর্মসূচির সম্প্রসারণ ঘটাতে হবে। আরও জনসচেতনতা বাড়াতে হবে।
অপরাধী তারা যার কারণে দুর্ঘটনা ঘটে। রাজনৈতিক পরিচয়ে সে মুক্ত হয়ে যাবে-এটি কেউ প্রত্যাশা করে না। সরকারি গাড়ির সংখ্যা আরও বাড়াতে হবে। যেসব বিআরটিসির গাড়ি নষ্ট হয়ে সরকারি গ্যারেজে পড়ে আছে এগুলো মেরামত করে রাস্তায় বের করতে কি অনেক অর্থ ব্যয় হবে? নতুন গাড়ি আমদানি, চলাচল করার বিষয়টিকেও অগ্রাধিকার দিতে হবে। গাড়ির চালকের সুস্থতা পরীক্ষা করে গাড়ি চালানোর মতো গুরুদায়িত্ব তাকে দিতে হবে।
মালিকের দায়িত্ব যেমন আছে, তেমনি আছে নাগরিকের কর্তব্যও। নিষ্ঠা, সুব্যবহার, ভাড়া নিয়ে বিতর্ক না করার বিষয়টি গুরুত্বের দাবি রাখে। মানসিক অবস্থা ভালো ও আর্থিক নিশ্চয়তা থাকলে গাড়িচালক নির্বিঘ্নে তার দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হবে। দোষারোপ করে নয়, সামগ্রিক মান উন্নত করার বিষয়টিকে মাথায় রাখতে হবে। কেন আমরা সহিংস হব, চড়াও হব!
আমাদের নিজস্ব গন্তব্যে আমাদেরই পৌঁছাতে হবে নিরাপদে, নির্বিঘ্নে, দুশ্চিন্তামুক্ত মনে। মালিক-শ্রমিক সংগঠনের ঐক্য ও আলোচনা সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। নিরাপদ সড়ক চাই। ভবিষ্যতে পরিবহন সেক্টর, সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের ফলে এ খাতকে যুগোপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণে কার্যকর করে তুলবে তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না। আমরাও চাই আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিরাপদে বাড়ি ফিরুক।
প্রাবন্ধিক ও গবেষক
কর্মকর্তা, জাতীয় জাদুঘর