কবিতার অভিমানী রাজকুমার

গাউসুর রহমান

সাহিত্য

তিনি বাংলা কবিতার প্রমিথিউস। নাম হেলাল হাফিজ। চলে গেছেন না ফেরার দেশে। লিখেছেন প্রেম ও দ্রোহের সব জ্বালাময়ী কবিতা, হৃদয়-তাপিত

2024-12-20T01:48:14+00:00
2024-12-20T01:48:14+00:00
 
  শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬,
১০ শ্রাবণ ১৪৩৩
শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬
সাহিত্য
কবিতার অভিমানী রাজকুমার
হেলাল হাফিজ
গাউসুর রহমান
প্রকাশ: শুক্রবার, ২০ ডিসেম্বর, ২০২৪, ১:৪৮ এএম 
কবিতার অভিমানী রাজকুমার
তিনি বাংলা কবিতার প্রমিথিউস। নাম হেলাল হাফিজ। চলে গেছেন না ফেরার দেশে। লিখেছেন প্রেম ও দ্রোহের সব জ্বালাময়ী কবিতা, হৃদয়-তাপিত কবিতা। অন্যরকম একটা স্পর্ধা নিয়েই কবিতা লিখেছেন স্বল্পপ্রজ এই কবি। যাপিত জীবনেও ছিলেন কবি, কবিতাগন্ধী। জীবনেও কবিতায় ছিলেন নিজের মতো করে অন্যরকম।

জীবনকে অবলোকনের ভিন্নতর এক দৃষ্টি ছিল হেলাল হাফিজের। তিনি ছিলেন গভীর জীবনবোধে আলোড়িত। কবিতায় হেলাল হাফিজের আবেগ পরিশুদ্ধ হয়েছে হৃদয়াবেগ ও মননক্রিয়ার যৌথায়নে। আর তাই রক্তাক্ত হৃদয়ব্যঞ্জনাই তাঁর কবিতার প্রাণশক্তি। অবিভাজ্য ব্যক্তিসত্তাই তাঁর কবিতার নিউক্লিয়াস। শব্দের দেহ ও আত্মার মধ্যে যে বিচ্ছেদন প্রক্রিয়া চলে-এ প্রক্রিয়াই তিনি শব্দকে কবিতাময় করে তুলেছেন।

সৌন্দর্য চেতনার হাত ধরেই হেলাল হাফিজের নন্দন-তৃষ্ণা। আর নন্দন-তৃষ্ণার হাত ধরে তাঁর কবিতায় নানা রঙের খেলা চলেছে চিত্রশিল্পীর প্রবণতায়। কখনো এই রং প্রেমকে করেছে রঙিন, কখনো এই রং জীবনের লীলাবৈচিত্র্যকে করেছে নতুন গন্তব্যের পথিক। আবার কখনোবা এই রংও স্বপ্ন ও কল্পনার সহযাত্রী। কখনো এই রঙ রয়েছে গ্লানিভরা জীবনে রোমান্টিক উল্লাস। আবার কখনোবা এই রং হয়েছে প্রগাঢ় প্রেমানুভূতির তীব্র বহিঃপ্রকাশ। রং তাঁর কবিতায় আত্মসত্তার সঙ্গে মিলিয়ে দিয়েছে প্রেমিকসত্তাকে। আবার কখনোবা এই রং যৌবন-লালিত্যে হয়েছে লীলাময়। এই রং তাঁর হৃদয়রাজ্যকে করেছে রঙিলা। চিত্তদ্রাবী ও মনোহারি নানা রঙের খেলায় হেলাল হাফিজ চিত্ত মরুভূমির তৃষ্ণা মিটিয়েছেন। এই রং তাঁর অন্তর-রাজ্যের রানীর প্রেমকে করেছে রঙিলা, দিয়েছে কল্পলোকের সৌন্দর্যের সাতনরী হার। 

হেলাল হাফিজ তাঁর প্রেমের কবিতায় সুন্দর ল্যান্ডস্কেপ ফুটিয়ে তুলেছেন বিভিন্ন রঙের ব্যবহারের মাধ্যমে। মানব-মানবীর হৃদয় সম্পর্কের রহস্য উদঘাটনে এবং রসসম্ভোগে এই রঙের ব্যবহার বিশেষভাবে তাৎপর্যমণ্ডিত। প্রেম যে কাব্যের স্থায়ীভাব, সেটি মনে রেখেই প্রেমের কবিতায় নানা রঙের দ্বারস্থ হয়েছেন হেলাল হাফিজ। বিষাদীর্ণ এক অস্থির পৃথিবীর অধিবাসী ছিলেন এই কবি। তাঁর কবিতায় জায়গা করে নিয়েছে ব্যক্তি-মানুষের রক্তিম চেতনা, মর্মমূলের অপ্রতিরোধ, অন্তর্ঘাত, বিরহ, নৈঃস্বপ্ন ও বিচ্ছিন্নতার গাঢ়বদ্ধ বেদনার রক্তোছেল সংরাগ, হৃদয়ের অনেক অন্তঃশীল প্রসঙ্গ, অনুষঙ্গ, পাওয়া, না-পাওয়া যোগসূত্রের প্রাণময় উন্মোচন। পাশাপাশি নিহিলবাদী সত্তাসংক্ষোভ আত্মা রোধে দ্বিধারক্তিম হয়েছেন কবি। প্রেম যখন তমসায় বিস্তৃত, তখন কবি আশার কণিকা কিংবা আলোর কণিকা প্রত্যক্ষ করেন না। এভাবে যে আত্মস্বরূপ উন্মোচিত হেলাল হাফিজের কবিতার-সে জন্যই তিনি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন এমন এক আত্মসামগ্র; যা অস্তিত্বের বিপুল বিস্তারে বিশ্বাসী। তাঁর কবিতা এ পথ ধরেই আয় করেছে যথোচিত সংবেদ। 

আত্ম-অনুভূত অভিজ্ঞতায় প্রস্বরঘনিম হেলাল হাফিজের কবিতা। অন্তঃসহায় অনাত্মজীবন এবং সমষ্টি জীবন-এই ধরনের স্থাপনা ও স্ফূর্তি হচ্ছে তাঁর কবিতা। এটি তাঁর কবিতার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে সত্য। ফলে তিনি হয়েছেন বিরহ-শাসিত। ব্যক্তি অস্তিত্বের মানবীয় প্রান্তিক পরিস্থিতি অতিক্রম করে তাঁর কবিতা অস্তিত্বের চৈতন্যময় শুদ্ধতায় উত্তীর্ণ হয়েছে। 

হেলাল হাফিজের কবিতায় থাকে কখনো কাহিনির আভাস, আবার কখনো থাকে কাহিনির বিস্তার। তাঁর কবিতায় তিনি গাঢ় চৈতন্যের সাহায্যে নতুনতর বোধি জ্বেলে দেন। হেলাল হাফিজের কবিতায় তাই শোনা যায় গাঢ় বেদনার গোপন কণ্ঠস্বর। হেলাল হাফিজ কঠিন ও কঠোর বাস্তবতার খররৌদ্রে ও স্বরচিত মগ্নতায় আচ্ছন্ন থেকে আপ্লুত হয়েছেন কবিতার জন্য। হৃদয়-বেদনাকে, জীবনের অভ্যাস ঘটনাকে তিনি কিছুটা চাপ দিয়ে নিজের আবেগ, অনুভূতি ও মননে জাগরিত করার পর নির্যাসটুকু কবিতায় রূপান্তর করেন।

কবি লেখেন-
‘এখন যৌবন যার, যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়,
এখন যৌবন যার, মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।’
নানা  বিচ্ছিন্নতা সত্ত্বেও মানুষের দ্রোহী ও সংগ্রামী চেতনা, স্বাধীনতা ও স্বাধিকার চেতনা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, দেশপ্রেমিক মানুষকে একটি সুতোয় গেঁথে ফেলেন হেলাল হাফিজ তাঁর কবিতায়। কালচক্রে প্রোথিত মানব জীবনলীলার নিত্যতা, মানবীয় সারোৎসারের অভিশ্রুতি কবিতার পরিচর্যায় নানা কৌণিক দূরত্ব নিয়ে হাজির হয়েছে তাঁর কবিতায়। 

হেলাল হাফিজের কবিতায় ভাবনা ও প্রতিক্রিয়ার মৌলিকতার একাত্মতা আছে। কবি অনুভূতিকে চিত্রে রূপান্তর করেন এবং অন্তর্গত সত্তাকে চিত্রময় করেন। তাঁর কবিতায় আছে পুনর্নির্মিত আবেগ-যা নির্জন স্মৃতিপথে জাগ্রত করে রূপ দিতে হয়। কবি তাঁর জীবন-অস্তিত্বকে কবিতার মধ্য দিয়ে পূর্ণায়ত করেন। তিনি তাঁর আবেগধর্মে চিন্ময় ও মন্ময় করে তুলেছেন কবিতার ভূগোল। জীবন-অভিজ্ঞতা-অবচেতনলোকের মেলবন্ধনে তাঁর কবিতার সমগ্রতল তাই জীবনমুখর। 

হেলাল হাফিজ চির বিরহের কবি। তিনি জীবনের বিচিত্র অনুভূতিপুঞ্জকে নিজের স্বভাবে ধারণ করেন সত্তার সমগ্রতায়। তাঁর কবিতায় আবেগের বহু-বর্ণিল সফেনতা কোনোভাবেই দ্বিধার চিরুনি ব্যবহার করে না। একটিমাত্র কাব্যগ্রন্থ, ‘যে জলে আগুন জ্বলে’র মধ্যে কবিতাকে তিনি যেমন স্বচিন্তিত বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল করেছেন, তেমনি করেছেন স্বতঃস্ফূর্ত। দ্রোহ ও প্রেমকে তিনি নিয়ে এসেছেন একই সমতলে। 
হেলাল হাফিজকে বলা যায় কবিতার অভিমানী রাজপুত্র। ১৯৮৬ সালে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ও তুঙ্গীয় জনপ্রিয় কাব্যগ্রন্থ ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ প্রকাশিত হয়। ২০১২ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর দ্বিতীয কাব্যগ্রন্থ ‘কবিতা একাত্তর’। ২০১৯ সালে প্রকাশিত হয় ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদো না’ কাব্যগ্রন্থ। তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থটি ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলোর সঙ্গে কিছু কবিতা যোগ করে প্রকাশিত হয়। 

অন্তর্গত বিষাদ হেলাল হাফিজের কবিতার সাধারণ লক্ষণ। তাঁর কবিত্ব সত্তাকে গোপনে, গহনে রেখে তাই জীবনের অজস্র কঠিন, কঠোর অভিজ্ঞতাকে কবিতায় তুলে এনেছেন। নিজের মধ্যে রচনা করেছেন নীরব, নির্জন এক কবিতা-পৃথিবী।

চেতনার অন্তর্গূঢ় তাৎপর্য বহনে সক্ষম হেলাল হাফিজের কবিতা। নিঃসঙ্গ এই কবির কবিতা ব্যঞ্জনপুষ্ট। মানবিক প্রেরণায় প্রাণময় এই কবির কবিতা তাঁর সত্তায় আলোকরশ্মির মতো কম্পমান। প্রগাঢ়তম উপলব্ধিকে হেলাল হাফিজ তাঁর পাঠকের বোধের আয়ত্বে যখন আনেন, তখন পাঠক অনুধাবন করতে সক্ষম হন যে,  তাঁদের অনুভূতি নতুন চেহারায় জারিত হয়েছে। তাঁর কবিতার শব্দ এবং চিত্রকল্প, রূপকল্প একে অন্যকে অভিষিক্ত করে। পাঠক সহজেই লক্ষ্য করেন তাঁর কবিতার ঐশ্বর্যরে বৈচিত্র্য। 
হেলাল হাফিজের কবিতায় বিষাদ ও বিভ্রমের জ্বালা আছে। সেই তীব্র জ্বালা তিনি তুলে নিয়েছেন মনের মন্দিরায়। জীবনবেদের সর্বদাহী উৎসারণ রয়েছে তাঁর কবিতায়। বলাই বাহুল্য কবিতায় হেলাল হাফিজের প্রেম বিরহশাসিত। হেলাল হাফিজ আত্মআবিষ্কারের প্রয়োজনে নিজের মনের অনেক গভীরে নেমে যান। মাটি খুঁড়ে পৌঁছে যান সেই গহনে, যেখানে থরে থরে সাজানো আছে অভিজ্ঞতা, যেখানে ভাব বা চিন্তার সঙ্গে ভাষার, ভাষার সঙ্গে ছন্দের, ছন্দের সঙ্গে অর্থের একটি সাযুজ্য আবিষ্কার-সেখানে কঠিন কোনো ব্যাপার নয়।

হেলাল হাফিজের কবিতা পাঠ করলে বেশ বুঝতে পারা যায় যে, ব্যক্তিজীবন ও সমাজ জীবনের যৌথ অভিজ্ঞতার যুগ্মায়ন তাঁর কবিতা। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের অভিঘাত কবির চিন্তা-চেতনার জগতে হেনেছে আঘাত। এরই প্রত্যক্ষ ফল তাঁর বিখ্যাত ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ কবিতাটি। হেলাল হাফিজের কবিতা দিন-রাত্রির ভাবনাবিন্দুর রক্তাক্ত নীল প্রবাহ। যন্ত্রণাক্ষুব্ধ বিধ্বস্ত জীবন অভীপ্সার ব্যক্তির আত্মউন্মোচন, আত্ম-দহন, আত্ম আবিষ্কারের বেদনায় বেদনাময় অস্তিত্ব প্রবাহকে কবিতায় ভাষিক কাঠামো দিয়েছেন কবি। হেলাল হাফিজের মৌল প্রবণতা হলো কবিতাকে চৈতন্যগত পরিপ্রেক্ষিতে স্থাপন করা। এই চৈতন্য জীবনসমগ্রতারই একটি সমন্বিত উপলব্ধির দ্যোতক। হেলাল হাফিজ জানেন যে, বোধের সামগ্রিকতা একটি পূর্ণ উপলব্ধিতে নির্মাণ করে। বোধের করতলে মজ্জাগত স্বয়ংসম্পূর্ণতায়, পূর্ণতায় কবিতায় যা প্রকাশ পায়, তা সমষ্টিগত চৈতন্যকে শানিত করলেও এর স্বাতন্ত্র্য-আবিষ্কারও স্বাভাবিকভাবে সম্ভব। 

কবিতার অভিমানী রাজপুত্র অভিমানেই বিরহে, নৈঃসঙ্গে পুরো একটি জীবনযাপন করেছেন। কবিতাকে তিনি চৈতন্যশাসিত হয়েই নিজের জীবনের সঙ্গে বেঁধে নিয়েছেন। ওপারে ভালো থাকুন প্রিয় কবি হেলাল হাফিজ, প্রিয় হেলাল ভাই। বাংলা কবিতার পাঠক আপনাকে ভুলবে না কোনো দিন।

সময়ের আলো/আরএস/ 



Loading...
Loading...
সাহিত্য- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: