শিমুলদের বস্ত্রের যুদ্ধ

মুহিব্বুল্লাহ কাফি

সাহিত্য

গত সপ্তাহে মধ্যরাতে তিনজন মিলিটারি এসে কামাল মাস্টারকে ধরে ঘরে বাইরে নিয়ে যায়। বাড়ির উঠানে দক্ষিণ কোনঘেঁষা বিষণ্নবদনে দাঁড়িয়ে থাকা

2024-12-28T02:42:05+00:00
2024-12-28T03:03:35+00:00
 
  শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬,
১০ শ্রাবণ ১৪৩৩
শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬
সাহিত্য
শিমুলদের বস্ত্রের যুদ্ধ
মুহিব্বুল্লাহ কাফি
প্রকাশ: শনিবার, ২৮ ডিসেম্বর, ২০২৪, ২:৪২ এএম  আপডেট: ২৮.১২.২০২৪ ৩:০৩ এএম
শিমুলদের বস্ত্রের যুদ্ধ
গত সপ্তাহে মধ্যরাতে তিনজন মিলিটারি এসে কামাল মাস্টারকে ধরে ঘরে বাইরে নিয়ে যায়। বাড়ির উঠানে দক্ষিণ কোনঘেঁষা বিষণ্নবদনে দাঁড়িয়ে থাকা শিমুল গাছের সঙ্গেই কামাল মাস্টারকে বাঁধল মিলিটারিরা। রোকেয়া বেগম কিছু বুঝে ওঠার আগেই বিকট শব্দে বাড়ির উঠান কেঁপে উঠল। ঘুমিয়ে থাকা ঘুঘুটা শিমুল গাছের মগডাল থেকে ডানা ঝাপটিয়ে উড়াল দিল। কামাল মাস্টারের নিথর দেহ ঝুলে রইল গাছের সঙ্গে। নতজানু হয়ে। রোকেয়া বেগম আল্লাহরে বলে এক চিৎকার। বেহুঁশ হয়ে পড়ে রইলেন শিমুল গাছের নিচে। স্বামীর পায়ের কাছে।

কামাল মাস্টার শিমুল গাছটি লাগিয়েছিলেন তার স্ত্রী এ বাড়ির বউ হওয়ারও বেশ আগে। পরম যত্নে দেখভাল করতেন গাছটির। স্ত্রী বউ হয়ে বাড়ি এলেন। ছেলে জন্মাল। কামাল মাস্টার গাছের নামের সঙ্গে মিল রেখে ছেলের নাম রাখলেন শিমুল। গাছে বেঁধে বাবাকে হত্যার ঘটনায় শিমুল দুহাত মুষ্টিবদ্ধ করে দাঁতে দাঁত কামড় দিয়ে সটান দেহে দাঁড়িয়ে রইল ঘরের চৌকাঠে। ঘাড়ের রগ ফুলে উঠল ক্ষোভে, শোকে। প্রচণ্ড শীতেও চিবুক বেয়ে এক চিলতে ঘাম জড়ো হয়ে টপকে পড়ল প্রতিবাদ, প্রতিরোধ না করতে পারার ক্ষোভে। কিন্তু কিছুই করতে পারল না শিমুল। শুধু দুই চোখের দুই ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল আট বছরের শিমুলের কপল বেয়ে।

শিমুলদের আদরপুর প্রাথমিক স্কুলেই ক্যাম্প গেড়েছে পাকিস্তানি বাহিনী। কামাল মাস্টার সেই স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। একটা পা অচল থাকায় শামিল হতে পারেননি মুক্তিবাহিনীদের সঙ্গে। কিন্তু তিনি বিভিন্নভাবে, অভিন্ন হয়ে সলাপরামর্শ, সাহায্য-সহযোগিতা করতেন। সে কারণেই পাকিস্তানি বাহিনী তাকে গুলি করে হত্যা করল।

দুই.
নিশি রাত। ঝিঁঝিঁর মিহি গুঞ্জরনে রাত গভীর হচ্ছে। ঘুটঘুটে অন্ধকার নেমেছে শিমুলদের উঠানে। আজ রাত বোধহয় অমাবস্যায় সেজেছে। রোকেয়া বেগম শিমুলকে বুকে চেপে ধরে আছেন। শিমুল ঘুমাচ্ছে। কিন্তু রোকেয়া বেগমের চোখের কোণে তন্দ্রাও নেই। এই যুদ্ধের রাতে সেই শিমুল গাছের ঘুঘুটাও মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে। ঘুম নেই তার চোখেও। নেই টুঁশব্দ-ও। মাঠঘাট, পুকুরপাড় কিংবা বাড়ির উঠান, সব জায়গায় আতঙ্কের ছয়লাপ। শেষরাত্রি কিংবা ভরদুপুর আকস্মিক থেকে থেকে ভেসে আসে চিৎকার, আর্তনাদ। কখনো পিনপতন নীরবতা। কখনো আবার জমিন কেঁপে ওঠা গুলির আওয়াজ। থেমে থেমে ভেসে আসে কান্নার গোঙানির ভয়ংকর আওয়াজ। ভেসে আসে শীতের হিম ধরা দখিনা বাতাসের সঙ্গে পোড়া পোড়া গন্ধ।

রোকেয়া বেগম এই গভীর রাতে টের পেলেন দরজার ওপাশে কারোর চলাফেরা। তিনি আঁতকে ওঠেন বটে কিন্তু বিচলিতহলেন না। কারণ, এই ভয়াল যুদ্ধের রাতে তার ঘরে শুধু যে মিলিটারি হানা দেয় এমন না। আসে মুক্তিবাহিনীও। তাই রোকেয়া বেগম সাহসিনীর মতো হাঁক ছাড়লেন, কে, কে ঔখানে? দরজায় দুতিনটে কড়া নড়ে ক্ষীণস্বরে জবাব এলো দরজার ওপাশ থেকে। ভাবি আমি রফিক। মুক্তিযোদ্ধা রফিক। সেও আদরপুর প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক ছিল।

রোকেয়া বেগম বিছানা থেকে উঠলেন। দেশলাই দিয়ে কুপিতে আগুন দিলেন। মৃদু আলোয় দরজা খুলতেই পাঁচজন মুক্তি তড়িঘড়ি করে ঢুকে পড়লেন। দরজা লাগিয়ে দিলেন রোকেয়া বেগম। রফিক শীতে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, ভাবি পেটে খুব ক্ষিধা। কী আছে তাড়াতাড়ি দাও। সূর্য ওঠার আর বেশি সময় নাই। ভাই, তেমন কিছুই নাই। কয়টা পান্তাভাত আছে সানকিতে। কথাটা বলে মুখটা শুকিয়ে নিলেন রোকেয়া বেগম। তাই দাও। বলে মাটিতেই বসে পড়ল তারা। রোকেয়া বেগম সানকি থেকে পান্তাভাত দিলেন। শীতের রাত। পান্তাভাতে হাত দিতেই আঙুল শক্ত হয়ে আসে। খুব কষ্টে মুষ্টিবদ্ধ করে কাঁচামরিচ দিয়েই সাবাড় করতে লাগল তারা। রোকেয়া বেগম বললেন, কালকে কী তোমরা আসবা? তা হলে আগে থেকে কিছু একটা ব্যবস্থা করে রাখব। রফিক কাঁচামরিচে কামড় দিয়ে বলল, বলতে পারি না, আসতেও পারি নাও আসতে পারি। খানা শেষ। তারা যেই বের হবে তখনি ঘুম ভেঙে যায় শিমুলের।
শিমুল কুপির নিভু নিভু আলোয় দেখল শীতে রফিক খটখট করে কাঁপছে। পরনে পাতলা সুতি গেঞ্জি। গেঞ্জির দুই-তিনটে ছিদ্র বুকের ওপর হা করে তাকিয়ে আছে শিমুলের দিকে। পুরোনো লুঙ্গি। নাকেমুখে গামছা পেঁচিয়ে বন্দুক কাঁধে দাঁড়িয়ে আছে। কারও আবার শরীর ফোঁটা ও তালিযুক্ত চাদর দিয়ে মোড়ানো। সবাই শীতে দাঁত কামড়িয়ে গরম ধোঁয়া ছাড়ছে। তারা চলে গেল। শিমুল মায়ের কাছে জানতে চায়, মা তাদের কি একটাও ভালো কাপড় নাই? রোকেয়া বেগম শিমুলের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, বাবা তারা মুক্তিযোদ্ধা। নিজের, পরিবারের জান বাজি রেখে যুদ্ধে নেমেছে। এ দেশ স্বাধীন করবে বলে। খেয়ে না খেয়ে, পরে না পরেই যুদ্ধ করছে। তাদের কি আর পৌষ-মাঘ আছে। আছে শুধু একটাই স্বপ্ন-দেশ স্বাধীন করা। বাকি রাতটা শিমুলেরও নির্ঘুম কাটল। ভাবতে ভাবতে। তারা এই দেশ স্বাধীন করবে কিন্তু এই শীতে একটাও ভালো কাপড় নাই।

তিন.
ভোর হলো। কুয়াশা ভেদ করে সূর্যের আলোকরশ্মি ধীরে ধীরে ছড়াতে লাগল। শীতের মিষ্টি রোদ গায়ে মেখে শিমুল গেলো বন্ধু সাহেদ ও লিটনের কাছে। তারা সহপাঠী। শিমুলরা আদরপুর প্রাথমিক স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র। কিন্তু ওই স্কুল এখন পাকিস্তানি বাহিনীদের ক্যাম্প। তিন-চারজন একসঙ্গে হওয়া নিষেধ। তাই তারা আড়ালে সলাপরামর্শ করার জন্য বসল। শিমুল বলল, আমরা ছোট বলে আমাদের যুদ্ধে যাওয়া নিষেধ। কিন্তু আমরাও এ দেশ স্বাধীন করার জন্য কিছু করতে চাই। কিন্তু সেটা কীভাবে করব? বলল লিটন। শিমুল বলল, গতরাতে রফিক স্যারসহ পাঁচজন মুক্তি আমাদের বাসায় আসছিল। কিন্তু এই শীতেও তাদের পরনে তেমন কোনো কাপড় নাই। তারা শীতে কাঁপছিল।
সাহেদ বিস্ময়ান্বিত হয়ে বলল, এই হাড় কাঁপা শীতেও তাদের কোনো কাপড় নাই! হুম, তাই ভাবছি আমরা তাদের কিছু কাপড় দেবো। বলল শিমুল। লিটন বলল, কিন্তু আমরা এতো কাপড় কোথায় পাবো? শিমুল বলল, আমার মাথায় একটা বুদ্ধি আছে। সাহেদ বলল, তুই কী বলছিস আমাদের ঘরের কাপড় মুক্তিবাহিনীদের দেবো।

লিটন বলল, সেগুলো আর কয়জনের হবে? শিমুল বলল, শুধু আমাদের ঘরের কাপড়-ই না। যোগাড় করতে হবে অন্যত্র থেকেও। কিন্তু সেটা কীভাব, কে-ই বা আমাদের তাদের বস্ত্র দেবেন? একসঙ্গে বলে উঠল সাহেদ-লিটন। শিমুল বলল, দেখ, এটা কোনো ব্যাপারই না। যদি আমরা একটু সাহস করি। একটু ঝুঁকি নিই। মুক্তিবাহিনীর জন্য। দেশের জন্য। প্রথমে আমাদের ঘরের অতিরিক্ত কাপড় সংগ্রহ করব। যেমন মিলিটারিরা আমার বাবাকে শহিদ করে দিয়েছে। তাই আমার বাবার শার্ট-প্যান্ট, গেঞ্জি লুঙ্গি; সবই আমি দিয়ে দেবো। তোদের বাবা-ভাইদের অতিরিক্ত কিছু জামাকাপড় নিয়ে আসবি। তা না হয় আনলাম। কিন্তু অন্যদের থেকে কীভাবে নেবো? বলল লিটন। শিমুল বলল, যাদের মিলিটারিরা শহিদ করে দিয়েছে তাদের বাড়িতে যাবো। হরিদাশ দাদুর মতো যারা ভারতে চলে গেছে তাদের বাড়িতেও যাবো এবং জামাকাপড় সংগ্রহ করব। যেই কথা সেই কাজ। শিমুলরা নিজেদের ঘরের জামাকাপড় একত্র করল এবং চুপিসারে আশপাশের ঘরবাড়িতে গিয়েও কিছু কাপড় সংগ্রহ করল। মুক্তিবাহিনীর কথা বলতেই তারা খুশি খুশি জামাকাপড় দিয়ে দিয়েছেন। অনেকে তো নিজেদের শুকনো খাবার গুড়মুড়িও দিয়েছেন। সন্ধ্যে নামবে নামবে। এমন সময় আরও কিছু জামাকাপড় সংগ্রহ করল সিমুলরা। ওইসব ঘরবাড়ি থেকে যারা ভারতে চলে গেছেন।

শিমুলদের ঘরে বেশ কিছু জামাকাপড় ও কিছু শুকনো খাবার একত্র হলো। সেগুলোকে দুটি গাঁটরিতে রেখে গিঁট দিয়ে রাখল শিমুল। এদের এমন কাজ দেখে রোকেয়া বেগমের চোখে পানি এসে গেলো। তিনি চোখ মুছতে মুছতে বললেন, তোমরা তাদের সাহায্য করছ যারা এ দেশ স্বাধীন করার জন্য বুকচিতিয়ে লড়ে যাচ্ছে। তোমরাও তাদের মতো মুক্তিযোদ্ধা।

সময়ের আলো/আরএস/ 




Loading...
Loading...
সাহিত্য- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: