আপনি যখন আশপাশে নেই, তখন কী করছে আপনার সন্তান? সম্ভবত ইউটিউব, টিকটক, ইনস্টাগ্রাম বা স্ন্যাপচ্যাটে সময় কাটাচ্ছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক সমীক্ষা অনুযায়ী ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সি কিশোরদের প্রায় অর্ধেকই সবসময় অনলাইনে থাকে। ১২ ডিসেম্বর প্রকাশিত এই জরিপে দেখা গেছে, গত দুই বছরেও এই প্রবণতা একইরকম ছিল।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি অত্যধিক উদ্বেগের বিষয়। তথ্য অনুযায়ী ৯০ শতাংশ কিশোর-কিশোরীই ইউটিউব ব্যবহার করে। টিকটক এবং ইনস্টাগ্রামে সক্রিয় প্রায় ৬০ শতাংশ আর স্ন্যাপচ্যাট ব্যবহার করে ৫৫ শতাংশ। ফেসবুক ব্যবহার করছে ৩২ শতাংশ এবং হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহারকারীর হার ২৩ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সবসময় অনলাইনে থাকার কারণে তরুণরা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য সময় বের করতে পারছে না। উপরন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত সময় ব্যয় তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
ডিসেম্বরের ছুটির সময়ে তারা আরও বেশি সময় অনলাইনে কাটাতে পারে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় অভিভাবকরা যেসব পদক্ষেপ নিতে পারেন : কিশোর-কিশোরীরা অনলাইনে কতটুকু সময় ব্যয় করবে তা নির্ধারণের নির্দিষ্ট কোনো নিয়ম নেই। কারণ এটি অনেকটাই নির্ভর করে তারা সেই সময় কীভাবে ব্যয় করছে তার ওপর। আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান মনোবিজ্ঞানী ড. মিচ প্রিনস্টিন বলেন, যেসব শিশু পাঁচ ঘণ্টা ধরে অনলাইনে থেকে খবর পড়ছে বা বন্ধুদের সঙ্গে সরাসরি বার্তা আদান-প্রদান করছে তাদের ঝুঁকি অনেক কম। অন্যদিকে এমন শিশু যারা মাত্র দশ মিনিট অনলাইনে থেকেও নিজেদের ক্ষতি করার এবং তা বাবা-মায়ের কাছ থেকে গোপন রাখার পরামর্শ পাচ্ছে, তাদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি অনেক বেশি। তাই সময়ের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কী ধরনের কনটেন্ট তারা দেখছে এবং অনলাইনে তাদের অভিজ্ঞতা কেমন। অভিভাবকদের উচিত সন্তানের অনলাইন কার্যক্রমে নজর দেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দিকনির্দেশনা দেওয়া।
প্রিন্সটন সাইকোথেরাপি সেন্টারের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট মেলিসা গ্রিনবার্গ পরামর্শ দেন, অভিভাবকদের উচিত প্রথমে জানতে চাওয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে তাদের সন্তান কেমন অনুভব করছে।
গ্রিনবার্গের মতে, অভিভাবকরা এ ধরনের প্রশ্ন করতে পারেন-তারা কি বারবার চেক করছে অন্যরা তাদের পোস্টে কী প্রতিক্রিয়া দিচ্ছে বা কত লাইক বা মন্তব্য আসছে? এটি কি তাদের নিজেদের সম্পর্কে নেতিবাচক অনুভূতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে? তারা কি অতিরিক্ত সময় ধরে অনলাইন থেকে নেতিবাচক বিষয়গুলোই খুঁজে দেখছে বা অন্যদের সঙ্গে নিজেদের তুলনা করছে?
তিনি আরও বলেন, কিশোর-কিশোরীরা যেসব অনলাইন গ্রুপে যুক্ত আছে সেগুলো নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর কি না তা বোঝাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। যেসব কিশোর-কিশোরী ভিন্ন লিঙ্গের পরিচয় বহন করে এবং স্কুলে বন্ধু বা গোষ্ঠী খুঁজে পায় না, তারা অনলাইনে এমন একটি সম্প্রদায় খুঁজে পেতে পারে যেখানে তারা নিজেদের পরিচয় খুঁজে পায় এবং অন্যদের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। এটি তাদের আত্মবিশ্বাস এবং অন্তর্ভুক্তির অনুভূতি বাড়াতে সাহায্য করে। তিনি বলেন, আমি এমন কিশোর-কিশোরীদের সঙ্গেও কাজ করেছি, যারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো নির্দিষ্ট শিল্পী বা বই সিরিজের ভক্তদের সঙ্গে একটি গ্রুপে যুক্ত হয়েছে। এটি তাদের একটি গোষ্ঠীর অংশ হওয়ার অনুভূতি দিতে পারে। অভিভাবকদের উচিত সন্তানের অনলাইন অভিজ্ঞতার মান নিয়ে সচেতন থাকা এবং এটি তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতিতে সহায়ক কি না তা মূল্যায়ন করা। অভিভাবকরা সন্তানদের সঙ্গে কথা বলে অনলাইনে সময় কাটানোর জন্য উপযুক্ত সীমা ঠিক করতে পারেন। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ জীবনদক্ষতা শেখানোর সুযোগ।
মেলিসা গ্রিনবার্গ বলেন, যদি অভিভাবকরা এই আলোচনায় তাদের সন্তানদের যুক্ত করেন, এটি ভবিষ্যতে বিভিন্ন আচরণ যেমন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, টিভি দেখা বা অন্য অভ্যাস নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করবে। গ্রিনবার্গ জানান, তার এক রোগী প্রতিদিন এক ঘণ্টার জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সে বুঝতে পেরেছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত থাকা উপকারী হলেও অতিরিক্ত স্ক্রলিং কমানো প্রয়োজন।
এই সময়টা আর কীভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে?
স্কুলে অভিভাবকদের সঙ্গে আলোচনা করার সময় আমি পরামর্শ দিই সন্তানদের অনলাইনে সময় ব্যবহারের ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখতে। তাদের যথেষ্ট ঘুম এবং শারীরিক কার্যক্রম নিশ্চিত করতে হবে। ফোন দূরে রেখে পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়া এবং পরিবারের সদস্য ও বন্ধুদের সঙ্গে ফোনমুক্ত সময় কাটানো খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
ড. মিচ প্রিনস্টিন বলেন, সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো প্রয়োজনীয় কাজ থেকে সময় কেড়ে নেওয়া। ঘুম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি শুধু পরের দিনের মনোযোগ এবং আবেগের ওপর প্রভাব ফেলে না, কিশোর বয়সে মস্তিষ্কের বৃদ্ধি ও পুনর্গঠনের ক্ষেত্রেও বড় ভূমিকা রাখে। প্রিনস্টিন পরামর্শ দেন, কিশোরদের সপ্তাহের রাতগুলোতে ৯টার মধ্যে ফোন বন্ধ করে রাখা উচিত। সন্তানদের খেলাধুলা বা সহশিক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত করা যেতে পারে, যা তাদের শারীরিক ব্যায়ামের সুযোগ দেবে এবং ফোন থেকে দূরে রাখবে। বাস্কেটবল বা বেস বল খেলার সময় ইনস্টাগ্রাম চেক করা সম্ভব নয়।
তাদের শেখাতে হবে কীভাবে তারা মনোযোগ ধরে রাখবে। মানব মস্তিষ্ক মাল্টিটাস্কিং বা একই সঙ্গে অনেকগুলো কাজ পূর্ণ সক্ষমতায় করতে পারে না। তাই যদি তারা টিকটক দেখে আর একসঙ্গে পড়াশোনা বা অন্য কাজ করার চেষ্টা করে তা হলে তারা পুরো মনোযোগ দিতে পারবে না। অনলাইন দুনিয়া থেকে বের হয়ে কিশোর-কিশোরীদের বাস্তব অফলাইন জীবনেও বন্ধুত্ব ও সম্পর্ক গড়ে তোলার গড়ে তুলতে হবে। প্রিনস্টিন বলেন, কৈশোরে আমরা সম্পর্ক গড়ার দক্ষতা শিখি, যা ভবিষ্যতে পেশাগত জীবনে কাজে লাগে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত সময় কাটানো এই শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করতে পারে। কারণ অনলাইন কথোপকথনে সম্পর্কের মৌখিক এবং অমৌখিক বার্তা ও সূক্ষ্মতা থাকে না। তাই কিশোরদের বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করার সময় ফোন দূরে রাখার জন্য উৎসাহিত করুন। একইভাবে পরিবারের সবার ফোন বন্ধ রেখে একসঙ্গে খাওয়া, খেলা বা হাঁটাহাঁটির মতো ফোনমুক্ত সময় কাটানো উচিত।
প্রিনস্টিন বলেন, আমাদের সন্তানরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশি সময় কাটাতে চায় যদি তারা দেখে আমরা একই কাজ করছি। তাই পরিবারের সবার জন্য একটি ফোনমুক্ত সময়সূচি তৈরি করা যেতে পারে। অনেক কিশোর-কিশোরীই তাদের জীবনের বড় অংশ অনলাইনে ব্যয় করছে। অভিভাবকরা যদি জানতে চান তাদের সন্তান অনলাইনে কী করছে, তবে সেটা ভারসাম্য তৈরি করতে সাহায্য করতে পারে। সন্তানের প্রয়োজন অনুযায়ী সময় ব্যবস্থাপনার কথা এখনই আলোচনা করার ভালো সময়।
সময়ের আলো/আরএস/