টঙ্গীর তুরাগ তীরে দেশ-বিদেশের লাখো মানুষের জমায়েতে আজ থেকে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ৫৮তম বিশ্ব ইজতেমা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের লোকজন ছাড়াও লাখ লাখ মানুষ উপস্থিত হয়েছেন এ ঈমানি মজমায়। ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস, ধর্মের পূর্ণাঙ্গ অনুশীলন এবং আলো-আঁধারিতে অবিরাম ইবাদতে মুখরিত কহর দরিয়ার তীর। কখনো জিকির, তেলাওয়াত ও দরুদ পাঠ বা দেশ ও জাতির মঙ্গল কামনায় কান্নাভেজা দোয়ায় কহর দরিয়ার তীরে বিরাজ করছে ব্যতিক্রমধর্মী আমলি এক আবহ।
১৯১০ সালের কথা। ভারতের উত্তরপ্রদেশের সাহারানপুর জেলার মাজাহিরুল উলুম মাদরাসার শিক্ষক মাওলানা ইলিয়াস কান্ধলবি কয়েকজন দিনমজুর মুসলমানকে ইসলামি শিক্ষায় দীক্ষিত করতে মেওয়াত অঞ্চলে একটি ইসলামি শিক্ষাকেন্দ্র চালু করেন। ভারতের হরিয়ানা ও রাজস্থানের উত্তরে জনবিরল এক অঞ্চলের নাম মেওয়াত। সেখানে পরবর্তীতে প্রায় ১০ বছর এ শিক্ষাধারা অব্যাহত ছিল।
বর্তমানে দিল্লির যে মসজিদ নিজামুদ্দিন মারকাজ নামে পরিচিত, ১৯২০ সালে সেখান থেকে তাবলিগের মূল কার্যক্রম শুরু করেছিলেন মাওলানা ইলিয়াস কান্ধলবি। ১৯২৪ সালে হজ থেকে ফিরে তিনি মেওয়াতে গিয়ে দেখেন- ধর্মীয় শিক্ষা ও আদর্শের কোনো কিছুই নেই সেখানকার সাধারণ মুসলমানদের মাঝে। এ দৃশ্য তাকে মর্মাহত করে। সিদ্ধান্ত নেন নিজেকে ধর্মপ্রচারের কাজে পুরোপুরি নিয়োগ করার। শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে দেন। নিজ চিন্তা-গবেষণা ও অভিজ্ঞতার আলোকে চালু করেন তাবলিগের নতুন এ কর্মপদ্ধতি। দিল্লিসহ ভারতের বেশ কয়েকটি এলাকায় তাবলিগের এ কার্যক্রম দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে সবশ্রেণির আলেম-উলামা ও ধর্মপ্রাণ মানুষের সমর্থনে তাবলিগের এ পদ্ধতি বিশ্বময় গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।
১৯৪৪ সালে মাওলানা ইলিয়াস কান্ধলবির ইন্তেকালের পর তার ছেলে মাওলানা ইউসুফ কান্ধলবিকে তাবলিগের আমির করা হয়। অবশ্য ঢাকায় তাবলিগ জামাতের কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৪৮ সালে। মাওলানা আবদুল আজিজের প্রচেষ্টায় তাবলিগ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। মাওলানা আবদুল আজিজ ছিলেন বাংলাদেশে তাবলিগ জামাতের প্রথম আমির। ১৯৬৫ সালে মাওলানা ইউসুফ কান্ধলবির মৃত্যুর পর দিল্লিতে মাওলানা এনামুল হাসানকে তাবলিগের আমির করা হয়। বর্তমানে ১৫০টির বেশি দেশে মাওলানা ইলিয়াস কান্ধলবি প্রবর্তিত এ তাবলিগের কার্যক্রম চলছে।
তাবলিগি এই ইজতেমার যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৪১ সালে। দিল্লির নিজামুদ্দিনের এলাকার মেওয়া নামক স্থানে। এতে প্রায় ২৫ হাজার মানুষ অংশ নেন। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টারের মতে, বর্তমানে ১৫০টির বেশি দেশে তাবলিগ জামাতের প্রায় ৮ কোটি অনুসারী রয়েছে।
বাংলাদেশে প্রথম ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয় ১৯৪৬ সালে কাকরাইল মসজিদে। এদেশে দ্বিতীয়বার ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয় ১৯৫৪ সালে লালবাগ শাহী মসজিদে। তৃতীয়বার অনুষ্ঠিত হয় ১৯৫৮ সালে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে। এরপর ১৯৬০, ৬২ ও ৬৫ সালের ইজতেমাগুলো অনুষ্ঠিত হয় ঢাকার রমনা উদ্যানে। দিন দিন এ ঈমানি কাজের পরিধি বৃদ্ধি পায়। তখনকার ইজতেমাগুলোতেও মানুষ দলে দলে যোগদান করতে শুরু করে। ফলে স্থান সংকলন না হওয়ায় বিস্তীর্ণ খোলা জায়গায় চিন্তা-ভাবনা শুরু হয়। ১৯৬৬ সালে ইজতেমার স্থান পরিবর্তন করা হয়। ঢাকা রমনার পরিবর্তে নতুন স্থান নির্ধারণ হয় টঙ্গীর পাগার মাঠে। তারপর থেকে অদ্যাবধি ১৬০ একর বিশাল ময়দানে অনুষ্ঠিত হচ্ছে মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তর এই ইজতেমা।
কাকরাইল মসজিদ বাংলাদেশের তাবলিগের প্রধান মারকাজ। সেখান থেকে পরিচালিত হয় তাবলিগের মূল কাজ। এ ছাড়াও প্রতিটি জেলা ও থানা পর্যায়ে রয়েছে তাবলিগের শাখা মারকাজ। এ মারকাজগুলো থেকে চলছে দাওয়াত ও তাবলিগের কাজ। কাকরাইল মসজিদকে বলা হয় বাংলাদেশের জিন্দা মসজিদ। কারণ এই মসজিদে সবসময়ই মুসল্লি থাকে। জিন্দা মসজিদের অস্থায়ী বাসিন্দারা সমাজ জিন্দা করার বাসনায় এখানে আসেন। দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তি, থাকার কষ্ট, ঝড়-বৃষ্টি ও তীব্র শীতের কষ্টকে জয় করে জিন্দা মসজিদে আগতরা একদিন সমাজকে আলোকিত করবে ইনশাআল্লাহ।
লেখক : মুহাদ্দিস, জামিআতুস সুফফাহ আল ইসলামিয়া গাজীপুর
সময়ের আলো/আরএস/