পৃথিবীতে মহান আল্লাহর ঘোষিত কিছু ঘর আছে, যেখানে বান্দা মহান আল্লাহর কুদরতি পায়ে সেজদাবনত হয়ে তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করে। আল্লাহর সঙ্গে একান্ত আলাপনে মশগুল হয়। মুমিনের হৃদয় আল্লাহর ভালোবাসায় স্নিগ্ধ ও প্রশান্ত হয়। এই ঘর আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয়। এই ঘরের নাম মসজিদ। মসজিদে মুমিন অর্জন করে ইহকালীন জীবনের শান্তি এবং পরকালীন জীবনে মুক্তির নিশ্চয়তা। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় জায়গা হলো মসজিদ আর সবচেয়ে নিকৃষ্ট জায়গা হলো বাজার’ (মুসলিম : হাদিস ১৪১৪)। আল্লাহর প্রিয় এই ঘরকে যারা ভালোবাসবে আল্লাহ তায়ালাও তাদের ভালোবাসবেন এবং পুরস্কৃত করবেন। এমন কিছু পুরস্কারের কথা এখানে তুলে ধরা হলো।
আল্লাহর সন্তুষ্টি ও আনন্দ : বান্দা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ঘরে গেলে তিনি ভীষণ আনন্দিত হন। এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বিষয়টি এভাবে বর্ণনা করেছেন, ‘কোনো মুসলমান যতক্ষণ মসজিদে নামাজ ও জিকিরে রত থাকে ততক্ষণ আল্লাহ তার প্রতি এতটা আনন্দিত হন, প্রবাসী ব্যক্তি তার পরিবারে ফিরে এলে তারা তাকে পেয়ে যেমন আনন্দিত হয়।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৮০০)
গুনাহ মাফ ও মর্যাদা বৃদ্ধি : মসজিদ আল্লাহর ঘর আর নামাজ হচ্ছে প্রভুর সঙ্গে আলাপচারিতা। মসজিদে গমনকারীদের প্রতিটি পদক্ষেপেই সওয়াব লেখা হয় এবং কেয়ামতের দিন তাদের জন্য নুরের সুসংবাদ রয়েছে। হজরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (সা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, মসজিদে নববীর পাশে কিছু জমি খালি ছিল। বনু সালমার লোকেরা মসজিদের কাছে স্থানান্তরিত হওয়ার ইচ্ছা করল। এ সংবাদ নবীজি (সা.)-এর কাছে পৌঁছলে তিনি তাদের বললেন, আমার কাছে এ মর্মে সংবাদ পৌঁছেছে যে তোমরা নাকি মসজিদে নববীর কাছাকাছি আসার ইচ্ছা পোষণ করেছ? তারা বললেন, হ্যাঁ, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমরা মসজিদের কাছাকাছি আসার ইচ্ছা পোষণ করেছি। তিনি বললেন, হে বনু সালামা! তোমরা তোমাদের ঘরেই থাকো। (ঘর থেকে মসজিদ পর্যন্ত) তোমাদের প্রতিটি পদচিহ্ন লিপিবদ্ধ করা হবে এবং সে অনুযায়ী সওয়াব দেওয়া হবে। এ কথা তিনি দুবার বলেছেন। তারা বলল, এখন আমাদের আর বাড়ি বদলানোর ইচ্ছা রইল না। (মুসলিম : ৬৬৫)
আল্লাহর দায়িত্বে আশ্রয় : মানুষ যখন আল্লাহর ঘর মসজিদের প্রতি বিশেষ ভালোবাসা রাখবে, আগ্রহভরে মসজিদে যাতায়াত করবে, আল্লাহ তাদের তাঁর রহমতের ছায়ায় আশ্রয় দেবেন। দুনিয়াতেও আল্লাহর বিশেষ রহমত পাবেন এবং পরকালেও পাবেন অফুরন্ত পুরস্কার।
আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তিন প্রকার লোকের প্রত্যেকেই মহান আল্লাহর দায়িত্বে থাকে-
১. যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে যুদ্ধের জন্য বের হয়, তার মৃত্যু পর্যন্ত আল্লাহ তার দায়িত্বশীল। অতঃপর আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন কিংবা তাকে নিরাপদে নেকি ও গনিমতসহ তার বাড়িতে ফিরিয়ে আনবেন।
২. যে ব্যক্তি আগ্রহ সহকারে মসজিদে যায়, আল্লাহ তার দায়িত্বশীল। এমনকি তার মৃত্যুর পর আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন কিংবা তাকে নিরাপদে নেকি ও গনিমতসহ তার বাড়িতে ফিরিয়ে আনবেন।
৩. যে ব্যক্তি নিজ পরিবার-পরিজনের সঙ্গে মিলিত হয়ে সালাম বিনিময় করে, আল্লাহ তার জিম্মাদার।’ (আবু দাউদ : হাদিস ২৪৯৪)
আল্লাহর আরশের ছায়া লাভ : কঠিন কেয়ামতের দিন মহান আল্লাহ তাঁর বিশেষ কিছু বান্দাকে আরশের ছায়ায় আশ্রয় দান করবেন। তাদের মধ্যে অন্যতম হবেন মসজিদে গমনকারী ব্যক্তিরা। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যেদিন আল্লাহর (রহমতের) ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া থাকবে না, সেদিন সাত ব্যক্তিকে আল্লাহ তায়ালা তাঁর নিজের (আরশের) ছায়ায় আশ্রয় দেবেন। তাদের তৃতীয় হচ্ছে সে ব্যক্তি যার অন্তর মসজিদের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছে।’ (বুখারি : হাদিস ৬৬০)
আল্লাহর প্রতিবেশিত্ব লাভ : নিয়মিত মসজিদে যাওয়া-আসার ফলে আল্লাহ তাদের বিশেষভাবে চিহ্নিত করবেন এবং প্রতিবেশী অভিধায় ভূষিত করবেন। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘কেয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা বান্দাদের ডেকে ডেকে বলবেন, আমার প্রতিবেশীরা কোথায়? আমার প্রতিবেশীরা কোথায়? তখন ফেরেশতারা জিজ্ঞেস করবেন, আপনার প্রতিবেশী কারা? তখন আল্লাহ তায়ালা বলবেন, যারা দুনিয়াতে আমার ঘরের সঙ্গে (মসজিদের সঙ্গে) সম্পর্ক রেখেছে এবং মসজিদ আবাদ করেছে।’ (হিলয়াতুল আউলিয়া : ১০/২১৩)
জান্নাতে মেহমানদারি লাভ : মসজিদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক রক্ষাকারী মুসলমান জান্নাতেও হবেন বিশেষ মেহমান। তার জন্য জান্নাতে নিয়মিত প্রস্তুত করা হয় মেহমানদারির উপাদান। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সকাল এবং সন্ধ্যায় নামাজ আদায় করতে মসজিদে যায় এবং যতবার যায় আল্লাহ তায়ালা ততবারই তার জন্য জান্নাতের মধ্যে মেহমানদারির উপকরণ প্রস্তুত করেন’ (মুসলিম : হাদিস ১৪১০)। আল্লাহ তায়ালা আমাদের মসজিদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক করার এবং তাঁর ভালোবাসা লাভের তওফিক দান করুন।
সময়ের আলো/এএ/