তারাবির সারাংশ-২: নারীর মর্যাদা, অধিকার ও অলৌকিক তিন ঘটনা

রায়হান রাশেদ

ইসলামের আলো

সুরা বাকারার ২০৪ থেকে সুরা আলে ইমরানের ৯১ নম্বর আয়াত পর্যন্ত পড়া হবে আজকের তারাবিতে। দ্বিতীয় পারার শেষার্ধ ও তৃতীয়

2025-03-02T17:18:13+00:00
2025-03-02T21:42:51+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬,
১৮ আষাঢ় ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬
ইসলামের আলো
তারাবির সারাংশ-২: নারীর মর্যাদা, অধিকার ও অলৌকিক তিন ঘটনা
রায়হান রাশেদ
প্রকাশ: রোববার, ২ মার্চ, ২০২৫, ৫:১৮ পিএম  আপডেট: ০২.০৩.২০২৫ ৯:৪২ পিএম
তারাবির সারাংশ-২: নারীর মর্যাদা, অধিকার ও অলৌকিক তিন ঘটনা
সুরা বাকারার ২০৪ থেকে সুরা আলে ইমরানের ৯১ নম্বর আয়াত পর্যন্ত পড়া হবে আজকের তারাবিতে। দ্বিতীয় পারার শেষার্ধ ও তৃতীয় পারার পুরো অংশ পড়া হবে। মুমিন ও মুনাফিকের কথা, এতিমদের সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, মদ, জুয়া, আল্লাহর মহত্ত্ব, সুদ, স্ত্রীর অধিকার, ইসা (আ.)-এর জন্ম, রাত ও দিনের বিবর্তন, জীবন ও মৃত্যুর রহস্য, মাতৃগর্ভে মানুষের আকার-আকৃতি, তালুত (আ.) ও জালুতের যুদ্ধের কাহিনি, ঋণ দেওয়ার পদ্ধতি, নবি (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা, নবি-রাসুলদের দাওয়াত, জাহান্নামের আজাব ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের আলোচনা রয়েছে এই অংশে।  
 
একজন মুনাফিক ও মুমিনের কথা
সুরা বাকারার ২০৪ থেকে ২০৭ নম্বর আয়াতে একজন মুনাফিক ও একজন মুমিনের আচার-বৈশিষ্ট্যের ভিন্নতার কথা রয়েছে। মুনাফিক লোকটির নাম আখনাস ইবনে শুরাইক। সে ছিল তুমুল বাগ্মী, মিষ্টিভাষী ও এবং সুদর্শন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে উপস্থিত হলে ভালো কথা বলত। কিন্তু নবিজির থেকে ফিরে গিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করত। মানুষের খেত-খামার জ্বালিয়ে দিত। গবাদি পশু বিনাশ করত। আল্লাহ তার জন্য জাহান্নাম নির্ধারণ করেন। মুমিন লোকটির নাম সুহাইব রুমি (রা.)। তিনি মক্কায় থেকে মদিনায় হিজরতের ইচ্ছা করলে কুরাইশ গোত্রের কিছু লোক তার পথরোধ করল। তিনি তাদের বললেন, আমাকে মদিনায় যেতে দাও, আমার সব সম্পদ তোমাদের দিয়ে দেব। তারা রাজি হলো। আল্লাহ তার প্রতি খুশি হন। (তাফসিরে মাআরিফুল কোরআন, মাওলানা মুহাম্মাদ ইদরিস কান্ধলভি, অনুবাদ : মাওলানা মু. অছিউর রহমান, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ৫৫৯-৫৬০)

মদ ও জুয়া হারাম
মদ ও জুয়া ভয়াবহ অপরাধ। এ দুটি অপরাধের আকর। এতে চক্রবৃদ্ধি হারে অপরাধের শৃঙ্খল তৈরি হয়। আল্লাহ তাআলা মদ ও জুয়া হারাম ঘোষণা করেছেন। পবিত্র কোরআনে প্রথমে মদ ও জুয়াকে ‘অপছন্দের বিষয়’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে এ দুটির কুফল তুলে ধরে ধীরে ধীরে হারাম করা হয়েছে। মদের অধীনে ওই সব নেশা জাতীয় দ্রব্য অন্তর্ভুক্ত; যা মস্তিষ্কের বিকৃত ঘটায়। এভাবে জুয়াও তার সব ধরন ও প্রকারকে অন্তর্ভুক্ত করে। মদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে এমন ১০ শ্রেণির মানুষের ওপর রাসুলুল্লাহ (সা.) অভিসম্পাত করেছেন। যেমন-
১. নির্যাসকারী। 
২. প্রস্তুতকারক। 
৩. পানকারী।
৪. পরিবেশনকারী।
৫. আমদানিকারক।
৬. যার জন্য আমদানি করা হয়।
৭. বিক্রেতা।
৮. ক্রেতা।
৯. সরবরাহকারী।
১০. এর লভ্যাংশ ভোগকারী। (তিরমিজি, হাদিস: ১২৯৫)

ঋতুস্রাব চলাকালে স্বামী-স্ত্রীর মেলামেশার বিধান
আল্লাহ তাআলা সুরা বাকারার ২২২ থেকে ২২৩ নম্বর আয়াতে ঋতুস্রাব চলাকালে স্বামী-স্ত্রীর মেলামেশার বিধানের কথা সুস্পষ্ট বলে দিয়েছেন। একজন নারীর ঋতুস্রাবের সর্বনিম্ন সময় তিন দিন আর সর্বোচ্চ সময় ১০ দিন। ঋতুস্রাব চলাকালে স্বামী-স্ত্রীর মেলামেশা জায়েজ নেই। অবশ্য অন্যান্য পারিপার্শ্বিক মেলামেশা, একসঙ্গে থাকা ও খাওয়া-দাওয়ায় কোনো সমস্যা নেই।
 
নারীর অধিকার
নারীসম্পর্কিত বিধিবিধান, নারীর মর্যাদা ও অধিকারের কথা বলা হয়েছে এই সুরার ২২৪ থেকে ২৪২ নম্বর আয়াতে। স্ত্রীর অধিকার হিসেবে মোহর নির্ধারণ করেছেন। জাহেলি যুগে অনেক নারীদের জীবজন্তুর মতো বেচাকেনা করা হতো। তাদের স্বাধীনতা ছিল না। বিয়ের ব্যাপারে তাদের মতামত কিংবা পছন্দের মূল্য ছিল না। সম্পদ বা মিরাসের উত্তরাধিকারী পেত না। ধর্ম-কর্মেও তাদের অংশ ছিল না। নিজ ঘরেই পরিত্যক্ত আসবাবের মতো বিবেচিত হতো। ইসলাম এসে নারীকে মর্যাদা ও অধিকারের মসনদে বসিয়েছে। তাকে স্বাধীনতা দিয়েছে।

সম্পদের উত্তরাধিকারী বানিয়েছে। ধর্ম-কর্মে উৎসাহিত করেছে। তাকে মানুষ হিসেবে সম্মানিত করেছে। সংসারজীবনে স্ত্রীর ওপর যেমন স্বামীর অধিকার আছে, তেমনি স্বামীর ওপর আছে স্ত্রীরও। স্ত্রীর প্রতি স্বামীর যেমন কিছু কর্তব্য আছে, স্বামীর প্রতি আছে স্ত্রীরও। সম্মান উভয়ের আছে। মহান আল্লাহ স্বামী-স্ত্রীর উভয়ের অধিকারের কথা বলতে গিয়ে স্ত্রীর অধিকারের কথা আগে বলেছেন। বর্ণনা ধারার মাধ্যমে সতর্ক করে দিয়েছেন যে, স্ত্রীর অধিকারই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ বলেন, ‘আর পুরুষদের যেমন স্ত্রীদের ওপর অধিকার রয়েছে, তেমনিভাবে স্ত্রীদেরও অধিকার রয়েছে পুরুষদের ওপর নিয়ম অনুযায়ী।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২২৮)। মহানবি (সা.) বিদায় হজের ভাষণে বলেছেন, ‘স্ত্রীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। কেননা, তুমি তোমার স্ত্রীকে গ্রহণ করেছ আল্লাহর জিম্মায়।’ (মুসলিম, হাদিস : ৩০০৯)


আয়াতুল কুরসি কেন শ্রেষ্ঠ আয়াত
সুরা বাকারার ২৫৫ নম্বর আয়াতের নাম আয়াতুল কুরসি। এটি কোরআনের সর্বশ্রেষ্ঠ আয়াত। এর মধ্যে ৫০টি শব্দ ও ১০টি বাক্য আছে। এ আয়াতে আল্লাহর একত্ববাদ, মর্যাদা ও গুণের বর্ণনা রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর আয়াতুল কুরসি নিয়মিত পাঠ করে, তার জন্য জান্নাতে প্রবেশের পথে একমাত্র মৃত্যু ছাড়া অন্য কোনো বাধা থাকে না।’ (নাসায়ি, হাদিস: ৯৯২৮)
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, ‘সুরা বাকারায় একটি আয়াত আছে, যা কোরআনের সকল আয়াতের সরদার। তা হলো আয়াতুল কুরসি। যে ঘরে তা পাঠ করা হয়, শয়তান সেই ঘর থেকে বেরিয় যায়।’ (হাকেম, আল-মুসতাদরাক, হাদিস : ২০৫৯)

অর্থনৈতিক লেনদেন যেমন হবে
এ সুরার ২৮২ আয়াতে ব্যবসা-বাণিজ্য, পরস্পর লেনদেন ও বন্ধকের বিধানের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের আলোচনা রয়েছে। যেমন-
এক. বাকিতে লেনদেন হলে কাগজে লিখে নিতে হবে। 
দুই. বাকিতে লেনদেনের ক্ষেত্রে মেয়াদ সুস্পষ্ট করে ঠিক করে নিতে হবে। 
তিন. লেখার কিছু না পেলে কোনো কিছু বন্ধক রাখতে হবে। 
চার. নগদ লেনদেনে লেখার প্রয়োজনীয়তা নেই। 

ইমরান পরিবারের গল্প আছে যে সুরায়
মদিনায় অবতীর্ণ কোরআনের তৃতীয় সুরা আলে ইমরান। এ সুরার আয়াত সংখ্যা ২০০। আলে ইমরান অর্থ ইমরানের পরিবার। ইমরান (আ.)-এর পরিবার ও বংশধর সম্পর্কে এই সুরায় বিশেষভাবে বর্ণনা রয়েছে, সেই দৃষ্টিকোণ থেকে এর নাম রাখা হয়েছে আলে ইমরান। 

মহানবির (সা.) আদর্শের অনুসরণ
আল্লাহকে ভালোবাসার পূর্বশর্ত হলো মহানবি (সা.)-এর অনুসরণ। তিনি উত্তম চরিত্রের অধিকারী। পৃথিবীর সব মানুষের জন্য তাঁর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ। তাঁর আদর্শের অনুসরণ ও অনুকরণে জীবন বড় সুন্দর হয়। জীবনে কল্যাণ আসে। আল্লাহ বলেন, ‘বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাস, তাহলে আমাকে অনুসরণ কোরো, যাতে আল্লাহও তোমাদের ভালোবাসেন...।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ৩১)

অলৌকিক তিন ঘটনা
শিক্ষণীয় তিনটি অলৌকিক ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে এই সুরার ৩০-৬২ নম্বর আয়াতে।
এক. মরিয়ম (আ.)-এর জন্ম: মরিয়ম (আ.)-এর পিতা ইমরান ছিলেন নেক ও পরহেজগার মানুষ। তাঁর মা হান্নাহ বিনতে ফাকুজ সচ্চরিত্রা ও সতীসাধ্বী নারী ছিলেন। তাদের সন্তান ছিল না। তারা সন্তানের আকাঙ্ক্ষা করতেন। আল্লাহর কাছে সন্তানের জন্য দোয়া করতেন। আল্লাহ দোয়া কবুল করলেন। বৃদ্ধ বয়সে তাদের এক মেয়ে হলো। নাম রাখলেন মরিয়ম। আল্লাহ মরিয়মকে মসজিদুল আকসার জন্য কবুল করলেন।  মাধ্যমে কোনো নারীকে মসজিদুল আকসার জন্য এই প্রথম কবুল করে নিলেন। মরিয়মের ভরণপোষণ ও লালন-পালনের দায়িত্ব পেলেন সে যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ জাকারিয়া (আ.)। (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, হাফিজ ইবনে কাসির আদ- দামেশকি, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ১১৫; ফাতহুল বারি, খণ্ড: ৬, পৃষ্ঠা: ৩৬৫)

দুই. জাকারিয়া (আ.)-এর সন্তানলাভ: মরিয়ম (আ.) দিনমান আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকতেন। তাঁর জন্য জান্নাত থেকে খাবার ও ফলমূল আসত। এসব অলৌলিক কর্মকাণ্ড দেখে জাকারিয়া (আ.) বিমুগ্ধ ও বিস্মিত হতেন। তাঁর ভেতর সন্তানের প্রবল আগ্রহ জেগে উঠে। তাঁরও কোনো সন্তান ছিল না। আল্লাহর কাছে সন্তান চাইলেন। অথচ তিনি শতবর্ষী বৃদ্ধ। তাঁর স্ত্রীও বৃদ্ধা, উপরন্তু বন্ধ্যা। আল্লাহ তাঁদের পুত্রসন্তান দিলেন। ইয়াহইয়া নামও রেখে দিলেন। (তাফসিরে মাআরেফুল কোরআন, মুফতি মুহাম্মাদ শফি, অনুবাদ: মাওলানা মুহিউদ্দীন খান, পৃষ্ঠা: ১৭৪)

তিন. ইসা (আ.)-এর জন্ম: আল্লাহ মরিয়ম (আ.)-এর মাধ্যমে পৃথিবীতে পিতা ছাড়া সন্তান জন্মদানের ইচ্ছা করলেন। মরিয়ম (আ.) তখন প্রাপ্তবয়স্ক। জিবরাইল (আ.)-কে তাঁর কাছে পাঠালেন। মরিয়ম (আ.) জিবরাইলকে দেখে ভয় পেয়ে বসলেন। জিবরাইল তাঁকে আল্লাহর ইচ্ছা জানালেন। তিনি অবাক হলেন। মানুষের সংযোগ ছাড়া সন্তান জন্মের ব্যাপারটি তিনি মেনে নিতে পারছিলেন না। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছায় তাঁর গর্ভে ইসা (আ.)-এর জন্ম হলো। (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, খণ্ড: ২)

লেখক: আলেম ও সাংবাদিক



  বিষয়:   তারাবি  আজকের তারাবি  তারাবির সারাংশ  রমজান  রোজা 


Loading...
Loading...
ইসলামের আলো- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: