আজকের তারাবিতে সুরা আরাফের ১২ থেকে সুরা আনফালের ৪০ আয়াত পর্যন্ত তেলাওয়াত করা হবে। অষ্টম পারার শেষ অর্ধেক এবং নবম পারার পুরো অংশ—মোট দেড় পারা। রাসুলুলুল্লাহ (সা.)-এর চিরন্তন মুজেজা, শয়তানের ধোঁকা, লজ্জা, আদম ও হাওয়া (আ.) দুনিয়ায় আগমনের ঘটনা, বিভিন্ন জাতি ধ্বংসের কারণ, মুসা (আ.)-এর মোজেজা, অপচয়, নবি-রাসুলরা নিজ নিজ সম্প্রদায়কে কী বলেছিলেন, জবাবে সম্প্রদায়ের নেতৃস্থানীয় লোকজন কী বলেছিল, ফলে আল্লাহ কী করেছেন, আল্লাহর একত্ববাদের প্রমাণ, বনি ইসরাইলের ওপর আল্লাহর শাস্তি, শয়তানের ধোঁকা থেকে মানুষকে বাঁচার নির্দেশ, মুসা (আ.)-এর লাঠি, ফেরাউনের জাদুর সাপ, বালয়াম ইবনে বাউরার ঘটনা, কাফেরদের শাস্তি ও গনিমতের সম্পদ বণ্টননীতি ইত্যাদি বিষয়ের বর্ণনা রয়েছে।
হে আদম সন্তান
সুরা আরাফে ধারাবাহিকভাবে চারবার মানুষকে ‘ইয়া বনি আদম’ বা ‘হে আদম সন্তান’ বলে সম্বোধন করা হয়েছে। এ সুরা ছাড়া অন কোনো সুরায় এভাবে মানুষকে চারবার ‘হে আদম সন্তান বলে সম্বোধন করা হয়নি। (৩০ মজলিসে কুরআনের সারনির্যাস, পৃষ্ঠা : ৯৫)
যে কারণে বিতাড়িত হলো শয়তান
আল্লাহর সঙ্গে শয়তানের বাগ্বিতণ্ডার কথা পড়া হবে আজকের তারাবির দ্বিতীয় আয়াতেই। আল্লাহর সৃষ্টিতে ফেরেশতা ও জিন ছিল মানুষেরও আগে। জিন জাতির সদস্য ছিল ইবলিস; ছিল আগুনের তৈরি। সে থাকত ফেরেশতাদের সঙ্গে। মন লাগিয়ে আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগি করত। আল্লাহর সৃষ্টিতে তার ইবাদতের আলাপ হতো। দুনিয়াতে আল্লাহ মানুষকে প্রতিনিধি বানাতে চাইলেন। আদম (আ.) সৃষ্টি করলেন। আল্লাহ ফেরেশতাদের আদমকে সেজদার আদেশ দিলেন। ফেরেশতারা সেজদা করল; কিন্তু বেঁকে বসল ইবলিস। নিজেকে আগুনের তৈরি বলে অহংকার করল। আল্লাহ তার প্রতি নারাজ হলেন। বের করে দিলেন জান্নাত থেকে। অবাধ্যতা, অহংকার ও মিথ্যা যুক্তি তার পতন ডেকে এনেছিল।
নামাজের পোশাক যেমন হওয়া প্রয়োজন
সুরা আরাফে মানুষের পরিধেয় পোশাক সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা তিনবার আলোচনা করেছেন। মানুষকে সতর ঢেকে রাখতে ও নামাজে উত্তম পোশাক পরার নির্দেশ দিয়েছেন। সতর ঢেকে রাখা ফরজ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘পুরুষদের সতর নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত এবং নারীদের সতর মুখমণ্ডল, হাতের তালু এবং পদযুগল ছাড়া অবশিষ্ট দেহ।’ (সুনানে কুবরা, বায়হাকি, হাদিস : ৩২৩৫)
পরিপাটি ও উত্তম পোশাকে নামাজ আদায় করতে হবে। নিজের সবচেয়ে ভালো পোশাক পরে আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে। মনে রাখতে হবে, আমি মহামহিম আল্লাহর সামনে দাঁড়াচ্ছি। পৃথিবীতে কত কারণে আমরা নতুন ও ভালো পোশাক পরি, সাজসজ্জা গ্রহণ করি; কিন্তু নামাজে দাঁড়াই অপরিচ্ছন্ন পুরোনো পোশাকে, অপ্রস্তুত এলোমেলো হয়ে। আল্লাহ বলেন, ‘হে আদম সন্তান, প্রত্যেক নামাজের সময় সাজসজ্জা (সুন্দর পোশাকপরিচ্ছদ) গ্রহণ করো।’ (সুরা আরাফ, আয়াত : ৩১)
খাবারে মধ্যপন্থা অবলম্বনই শ্রেয়
আল্লাহ তাআলা মানুষকে পরিমাণমতো খাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন সুরা আরাফের ৩১ আয়াতে। এই আয়াতের অধীনে মুসলিম পণ্ডিতরা আটটি মাসয়ালা উদ্ভাবন করেছেন।
১. প্রয়োজনমতো পানাহার করা ফরজ।
২. শরিয়তে কোনো খাদ্যবস্তু অবৈধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত সব বস্তুই হালাল।
৩. আল্লাহ তাআলা ও রাসুলুল্লাহ (সা.) কর্তৃক নিষিদ্ধ বস্তুগুলো ব্যবহার করা অপব্যয় ও অবৈধ।
৪. যেসব বস্তু আল্লাহ তাআলা হালাল করেছেন, সেগুলো হারাম মনে করাও অপব্যয় এবং মহাপাপ।
৫. পেট ভরে খাওয়ার পরও আহার করা নাজায়েজ।
৬. এতটুকু কম খাওয়াও অবৈধ, যার ফলে কর্ম সক্ষমতা হারিয়ে যায়।
৭. সব সময় পানাহারের চিন্তায় মগ্ন থাকাও অপব্যয়।
৮. মনে কিছু চাইলেই তা অবশ্যই খাওয়া অপব্যয়। (তাফসিরে মাআরেফুল কোরআন, মুফতি মুহাম্মাদ শফি, অনুবাদ : মাওলানা মুহিউদ্দীন খান. পৃষ্ঠা : ৪৩৮)
জান্নাতি, জাহান্নামি ও আরাফবাসীর কথোপকথন
সুরা আরাফের ৪৬ থেকে ৪৮ নম্বর আয়াতে জান্নাতি, জাহান্নামি ও আরাফবাসীদের কথোপকথনের আলোচনা এসেছে। জান্নাতিরা জাহান্নামিদের ডেকে বলবে, ‘আমাদের সঙ্গে আমাদের প্রতিপালক যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা আমরা সত্য পেয়েছি। তোমরা কি তোমাদের প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতি সত্য পেয়েছ?’ জাহান্নামিরা বলবে, ‘হ্যাঁ।’ তারপর একজন ঘোষক ঘোষণা করবেন, ‘আল্লাহর অভিসম্পাত জালিমদের ওপর।’ আরাফে থাকবে ওই সমস্ত মুমিন, যারা নেক আমলের ক্ষেত্রে জান্নাতিদের চেয়ে পিছিয়ে পড়েছে। তারা না জান্নাতি, না জাহান্নামি। আল্লাহ তাদের জান্নাতে প্রবেশ করাবেন একসময়। কোরআনে এদের ‘আসহাবুল আরাফ’ বলা হয়েছে।
প্রাচীন ৬ জাতি ধ্বংসের কাহিনি
এ সুরার ৬৫ থেকে ৮৭ আয়াতে প্রাচীন ছয় জাতির অবাধ্য ও গজবে ধ্বংস হওয়ার আলোচনা রয়েছে।
১. নুহ (আ.)-এর জাতি : মূর্তিপূজা না ছাড়ার কারণে ভয়ংকর বন্যা ও জলোচ্ছ্বাস দিয়ে নুহ (আ.)-এর জাতিকে ধ্বংস করা হয়েছিল। (ফি জিলালিল কোরআন, সাইয়িদ কুতুব, খ-: ৬, পৃষ্ঠা: ৩৪৩০)
২. আদ জাতি : শক্তি ও ক্ষমতার বাহাদুরি এবং মূর্তিপূজা না ছাড়ার কারণে বিভিন্ন আজাব দিয়ে হুদ (আ.)-এর সম্প্রদায় আদ জাতিকে ধ্বংস করা হয়েছিল। (তাফসিরে রুহুল মাআনি, খ-: ৮, পৃষ্ঠা: ১৪০-১৪১)
৩. সামুদ জাতি : আল্লাহর নিদর্শন বিশেষ একটি উট হত্যার কারণে ভূমিকম্প দিয়ে সালেহ (আ.)-এর সম্প্রদায় সামুদ জাতিকে ধ্বংস করা হয়েছিল। (কাসাসুল কোরআন, খ- ১, পৃ ১৪৪-১৪৫)
৪. লুত (আ.)-এর জাতি : সমকামিতার অপরাধে ভূমি উল্টে পাথর বৃষ্টি দিয়ে লুত (আ.)-এর জাতিকে ধ্বংস করা হয়েছিল। (তাফসিরে ইবনে কাসির, খ-: ২, পৃষ্ঠা: ৪৫৫)
৫. মাদায়েনবাসী : তওহিদে অবিশ্বাস, মাপে কম দেওয়া, সম্পদ আত্মসাৎ, অর্থনৈতিক অসততা ও মানুষকে ধর্ম পালনে বাধা দেওয়ায় ভূমিকম্প দিয়ে শোয়াইব (আ.)-এর সম্প্রদায় মাদায়েন জাতিকে ধ্বংস করা হয়েছিল। (সিরাত বিশ্বকোষ, খ- : ১, পৃষ্ঠা : ৪১৭)
৬. ফেরাউন ও তার জাতি : নিজের ক্ষমতার প্রতি অন্ধ মোহ, মুসা ও হারুন (আ.)-কে হত্যার পরিকল্পনা করার কারণে ফেরাউন ও তার জাতিকে নীল নদে ডুবিয়ে ধ্বংস করা হয়েছিল। (তাফসিরে রুহুল মায়ানি, খ-: ২০, পৃষ্ঠা: ৮৬-৯৮)
আলেম ও সাধকের পথভ্রষ্ট হওয়ার কারণ
সুরা আরাফের ১৭৫ ও ১৭৬ আয়াতে আল্লাহ জ্ঞানী বালয়াম ইবনে বাউরার ঘটনা বলেছেন। বালয়াম ছিল একজন বিজ্ঞ আলেম ও সাধক। বায়তুল মুকাদ্দাসের নিকটবর্তী কেনানের অধিবাসী। সেসময় মুসা (আ.) জাব্বারিন (আধিপত্যবাদী) সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য সৈন্যবাহিনী নিয়ে সিরিয়ায় আসেন। এদিকে বালয়াম ইবনে বাউরার গোত্রের লোকেরা তার কাছে এসে মুসার বিরুদ্ধে বদদোয়া কামনা করে। মুসা (আ.)-এর কথা শুনে সে তাদের তাড়িয়ে দেয়। লোকেরা আবার আসে। বালয়াম বলল, ‘আমি আল্লাহর কাছে অনুমতি চেয়েছিলাম, তিনি নিষেধ করেছেন।’ লোকেরা তার স্ত্রীকে উৎকোচ গ্রহণে তাড়িত করল। স্ত্রীর প্ররোচনায় সে আল্লাহর কাছে আবার অনুমতি চাইল। এবার কোনো উত্তর পাওয়া গেল না। লোকেরা বলল, আল্লাহ যেহেতু কিছুই জানালেন না, এবার তবে দোয়া করুন। বালয়াম দোয়া করতে গিয়ে আল্লাহর কুদরতে নিজ সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধেই দোয়া করল। নিজ সম্প্রদায়ের ওপর ধ্বংস নেমে এল। তার জিহ্বা বেরিয়ে এসে বুকের ওপর লটকে গেল। (তাফসিরে মাআরেফুল কোরআন, পৃষ্ঠা : ৫০১)
সুরা আনফালের বিষয়বস্তু
মদিনায় অবতীর্ণ সুরা আনফাল কোরআনের অষ্টম সুরা। এ সুরার আয়াত সংখ্যা ৭৫। আনফাল ‘নফল’ শব্দের বহুবচন। অর্থ অতিরিক্ত। অবিশ্বাসীদের সঙ্গে যুদ্ধ চলাকালে যে সম্পদ মুসলিমদের হস্তগত হয়, তাকে নফল বা গনিমত বলা হয়। এ সুরায় গনিমতের সম্পদ বণ্টন নিয়ে আলোচনা থাকায় এ সুরাকে আনফাল বলা হয়। আল্লাহর পথে জিহাদ, গনিমতের সম্পদ বণ্টনের নীতি, নবিজি (সা.)-এর বিরুদ্ধে কাফেরদের ষড়যন্ত্র, বদর যুদ্ধের বিস্তারিত বিবরণ, মুসলমানদের অভিভাবক আল্লাহ ইত্যাদি বিষয়ের বিবরণ আছে এ সুরার ৫ থেকে ৪০ আয়াতে।
বিশ্বাসীদের ৫ গুণ
বিশ্বাসীদের পাঁচটি গুণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে সুরা আনফালের ২ থেকে ৪ আয়াতে। যথা—
এক. আল্লাহর ভয়।
দুই. কোরআন তেলাওয়াত।
তিন. আল্লাহর ওপর ভরসা।
চার. নামাজের সংরক্ষণ।
পাঁচ. আল্লাহর বান্দাদের ওপর অনুগ্রহ।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক