ক্ষমতায় আসার একমাস পার হতে না হতেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য যুদ্ধের নাম শুনলেই শুরুতে চীন সামনে আসে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্প এবার আগের তুলনায় আরও শক্তিশালী এবং প্রস্তুত এক চীনের মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন।
মঙ্গলবার (১১ মার্চ) সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত জানুয়ারিতে হোয়াইট হাউসে আসার পর ট্রাম্প চীনের আমদানি পণ্যের ওপর ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন, বেইজিং যুক্তরাষ্ট্রে প্রাণঘাতী ওপিওইড ফেন্টানিলের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে।
ফেন্টানিল একটি শক্তিশালী মাদক, যা যুক্তরাষ্ট্রে ওভারডোজের কারণে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী।
ট্রাম্প আরোপিত নতুন এই শুল্ক সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আরোপিত শুল্কের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এতে এখন পর্যন্ত ৪০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের চীনা পণ্যের ওপর এর প্রভাব পড়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কারোপে দমে যায়নি চীন। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর পাল্টা শুল্কনীতি ঘোষণা করেছে দেশটি। সর্বশেষ মার্কিন শুল্ককে ট্রাম্পের ‘বুলিং’ এবং ‘ভয়ভীতি প্রদর্শনের’ বাহানা বলে কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে চীন।
এরই অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ভুট্টা, গরুর মাংস, শুকরের মাংস, দুগ্ধজাত পণ্য এবং সয়াবিনের মতো কৃষিপণ্যের ওপর ১০ থেকে ১৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের হুঁশিয়ারি দিয়েছে বেইজিং।
চীনের শুল্কারোপের ঘোষণা তখনই এসেছে গত সপ্তাহে যখন যুক্তরাষ্ট্র বেইজিংয়ের অপরিশোধিত তেল, কৃষিযন্ত্র, পিকআপ ট্রাক এবং কিছু গাড়ির ওপর ১০ শতাংশ এবং কয়লা ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা এসেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি গতকাল সোমবার (১০ মার্চ) থেকে কার্যকর করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও শুল্ক যুদ্ধের উত্তেজনা যখন তুঙ্গে, তখন কঠোর ভাষায় হুঁশিয়ারিও দিয়েছে চীন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়াং গত সপ্তাহে সাংবাদিকদের জানান, তাদের দেশ যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো ধরনের চাপের মোকাবিলা করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
তিনি বলেন, যদি যুদ্ধই যুক্তরাষ্ট্রের চাওয়া হয়— তা শুল্ক যুদ্ধ হোক, বাণিজ্য যুদ্ধ হোক বা অন্য কোনো ধরনের যুদ্ধ, আমরা শেষ পর্যন্ত লড়াই করতে প্রস্তুত।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে চলমান শুল্ক যুদ্ধ ২০১৮ সালের বাণিজ্য যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। যদিও সাত বছর আগের তুলনায় বর্তমান পরিস্থিতি অনেকটাই ভিন্ন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতির দুই দেশ— যুক্তরাষ্ট্র ও চীন ধীরে ধীরে একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ফলে, তাদের পারস্পরিক নির্ভরশীলতা কমে আসায় শুল্কের প্রভাবও আগের তুলনায় অনেকটা কমেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক চীনের ওপর কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে বেইজিংভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্যাভেকাল ড্রাগোনমিকস-এর চীনা গবেষণা বিভাগের উপপরিচালক ক্রিস্টোফার বেডর বলেছেন, সর্বশেষ শুল্ক চীনের জন্য বড় কোনো সমস্যা নয়। চীন তা সহজেই মোকাবিলা করতে পারবে।
তবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের এই শুল্কারোপকে একদমই ছোট করে দেখেননি। তিনি বলেন, এই শুল্কারোপ চীনের শুল্কহার প্রায় তিনগুন বাড়িয়ে দিচ্ছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে চীনের রুপ্তানি খুবই অল্প।
কমছে বাণিজ্য শেয়ার
ব্লুমবার্গের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে মার্কিন বাণিজ্যে চীনের শেয়ার ১৫.৭ শতাংশ থেকে কমে ১০.৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বিপরীতে, চীনে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ার ১৩.৭ শতাংশ থেকে ১১.২ শতাংশে নেমে এসেছে।
আইএনজি-র গ্রেটার চায়না শাখার প্রধান অর্থনীতিবিদ লিন সঙ বলেছেন, শুল্কের কারণে বেইজিংয়ের এখনই উদ্বিগ্ন হওয়ার সম্ভাবনা কম। এটি পূর্ব পরিকল্পনার অংশ। তবে এ ধরনের বাণিজ্য উত্তেজনা এড়িয়ে চলা দরকার বলে মনে করেন তিনি।
তিনি বলেন, শুল্ক বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অবশ্যই এমন কিছু বাণিজ্যিক খাত থাকবে যা অলাভজনক হয়ে যাবে এবং কিছু কোম্পানি প্রভাবিত হবে।
তবে লিন মনে করেন, চীনা রপ্তানিকারকরা- যেমন, শেইন এবং টেমু, তাদের সাফল্য অনেকাংশে ৮০০ ডলারের কম মূল্যের পণ্য রপ্তানির শুল্ক ছাড়ের সুবিধা গ্রহণের ওপর নির্ভরশীল। এই কৌশলটি সরাসরি গ্রাহকদের কাছে সস্তা পণ্য সরবরাহ করার সুযোগ তৈরি করে, যা তাদের ব্যবসায় সফলতার পথ খুলে দিয়েছে।
বেইজিং তাদের অর্থনীতিকে যেকোনো বাণিজ্যিক ঝাঁকুনি থেকে রক্ষা করতে ক্রমাগত বিভিন্ন ব্যবস্থা চালু করে চলেছে।
গত সপ্তাহে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে চীনের ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেস বেশ কিছু আর্থিক উদ্দীপনা ঘোষণা করেছে। এই উদ্দীপনার মধ্যে রয়েছে স্থানীয় সরকারগুলোর জন্য ঋণের স্তর বৃদ্ধি এবং ১.৩ ট্রিলিয়ন ইউয়ান পরিমাণ দীর্ঘমেয়াদী ট্রেজারি বন্ড জারির সিদ্ধান্ত।
চীনা অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ এবং হংকং ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির অধ্যাপক কার্সটেন হলজ বলেছেন, বেইজিংয়ের অভ্যন্তরীণ নীতিগত পদক্ষেপগুলো যুক্তরাষ্ট্রের দাবির বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা তৈরি করেছে।
তিনি বলেন, চীনা আমদানি পণ্যের ওপর ট্রাম্পের সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার প্রভাব বর্তমান সময়ে বাস্তব কিছু নয়। উদাহরণস্বরূপ, যেখানে বেশিরভাগ আইফোন চীনে উৎপাদিত হয়— চীনের জিডিপিতে একটি ক্ষুদ্র অংশেরও কম প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলেন, চীনা জনগণের কাছে বিদেশি আক্রমণকারীদের ‘শান্তি আলোচনা’ শুরু করা একটি স্বৈরাচারী নেতৃত্বের জন্য সম্ভবত হবে না। তারা মনে করেন, ২০১৮ সালের তুলনায় শক্তিশালী অবস্থানে থাকা সত্ত্বেও বেইজিং এখনও ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনা করতে চায়।
বাণিজ্য উত্তেজনা এড়ানো
চীনা কর্মকর্তাদের কাছ থেকে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করতে আগ্রহী। বেইজিংভিত্তিক গবেষণা গ্রুপ ট্রিভিয়াম চায়নার খাদ্য এবং কৃষি বিশ্লেষক ইভেন রজার্স পে বলছেন, চীন তাদের প্রথম দফার শুল্ক তুলনামূলকভাবে হালকা রেখেছে। কারণ, তা খুবই সীমিত সংখ্যক পণ্যের ওপর আরোপ করা হয়েছে। তিনি মনে করেন, এটি বাণিজ্য উত্তেজনা এড়ানোর কৌশল মাত্র।
এতে করে মনে হচ্ছে, চীনও বাণিজ্য যুদ্ধ এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছে। কারণ তারা এমন কোনো বাণিজ্য উত্তেজনার ফাঁদে পড়তে চাচ্ছে না, যেখানে তাদের অনেক বেশি সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে। এমনটি মন্তব্য করেছেন রজার্স পে।
পে বলেন, দেখা যাচ্ছে; বেইজিং খুবই সীমিত সংখ্যক খাতে শুল্ক আরোপ করছে। এর মাধ্যমে তারা রাজনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছে বিশেষ করে, আমেরিকার 'রেড স্টেটগুলোর’ ওপর, যারা বৃহত্তম ভুট্টা, সয়াবিন, সরগুম এবং অন্যান্য কৃষিপণ্য রপ্তানিকারক। চীন চায়, এর মাধ্যমে ট্রাম্প আলোচনায় আসুক।
পে আর বলেন, চীন সম্ভবত দ্বিতীয় পর্বের আলোচনার জন্য অপেক্ষা করছে। কারণ, ২০২০ সালে প্রথম পর্বের চুক্তির মাধ্যমে ট্রাম্পের সঙ্গে বাণিজ্য যুদ্ধ শেষ হয়েছিল।
প্রথম পর্বের চুক্তির অধীনে চীন দুই বছরের মধ্যে কৃষিপণ্যসহ মোট ২০০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের মার্কিন পণ্য ও পরিষেবা কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
তবে, পিটারসন ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিক রিসার্চ-এর তথ্য অনুযায়ী, কোভিড-১৯ মহামারির কারণে বাণিজ্যে বাধা তৈরি হয়েছিল। যার কারণে বেইজিং চুক্তির মাত্র ৫৮ শতাংশ বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয়েছিল।
বেইজিংয়ের ইউনিভার্সিটি অফ ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিক্স-এর অর্থনীতির অধ্যাপক জন গংও চীন এই চাপ মোকাবিলা করতে সক্ষম বলে মত দিয়েছেন এবং চীন আলোচনার জন্যও প্রস্তুত।
গং বলেন, চীনের সরকার অবশ্যই উদ্বিগ্ন। তবে তারা অপমানজনকভাবে পিছু হটবে না। একটি চুক্তির জন্য আলোচনা করতে আগ্রহী। তবে যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে তারা ‘যা হওয়ার হবে’ এমন মনোভাব নেবে।
এদিকে, কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, ট্রাম্প তার কৌশলগত চাল বেশি খেলতে গিয়ে ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
গত বাণিজ্যযুদ্ধের সময় ট্রাম্প কেবল চীনের ওপর মনোযোগ দিয়েছিলেন। তবে, এবার দায়িত্বে আসার পর তিনি মেক্সিকো এবং কানাডাসহ অন্যান্য দেশগুলোর প্রতিও নজর দিচ্ছেন, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি কমানো যায়।
এটাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট এবার অনেক দ্রুত গতিতে পদক্ষেপ নিচ্ছেন।
ওয়াশিংটনভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ট্যাক্স ফাউন্ডেশনের ফেডারেল কর নীতির ভাইস প্রেসিডেন্ট এরিকা ইয়র্কের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রায় এক মাসের মধ্যে ট্রাম্প ১.৪ ট্রিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করেছেন। ২০১৮ এবং ২০১৯ সালে যেখানে এই পরিমাণ ছিল মাত্র ৩৮০ বিলিয়ন ডলার।
তবে ট্রাম্পের এই শুল্কনীতি কতটা কার্যকর থাকবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
মার্চের ৪ তারিখে কানাডা ও মেক্সিকোর ওপর ব্যাপক শুল্ক আরোপের মাত্র দুই দিন পর এপ্রিলের ২ তারিখ পর্যন্ত এই নীতি বিলম্বিত করবেন বলে ঘোষণা দেন ট্রাম্প।
গেভেকাল ড্রাগোনমিকসের বিশ্লেষক ক্রিস্টোফার বেডর বলেন, ট্রাম্পের জন্য ভুল হতে পারে এমন অনেক কিছু আছে। সত্যি বলতে, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব এতটাই খারাপ হতে পারে যে, ট্রাম্প বাধ্য হয়ে অনেক শুল্কনীতি থেকে সরে আসতে পারেন।
তিনি আরও বলেন, চীনের কৌশল হলো, অপেক্ষা করা। পরিস্থিতি দেখা। এবং এর প্রভাব কমানোর জন্য আরও আর্থিক প্রণোদনা প্রয়োগ করা।