অলৌকিক উটের গল্প ও জাহান্নামের ৭ দরজার নাম

রায়হান রাশেদ

ইসলামের আলো

আজকের খতমে তারাবিতে পবিত্র কোরআনের সুরা হিজর ও সুরা নাহল তেলাওয়াত করা হবে। পারা হিসেবে ১৪তম পারা পড়া হবে। তারাবির

2025-03-11T17:46:09+00:00
2025-03-11T18:27:41+00:00
 
  শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬,
২০ আষাঢ় ১৪৩৩
শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬
ইসলামের আলো
অলৌকিক উটের গল্প ও জাহান্নামের ৭ দরজার নাম
তারাবি : ১১
রায়হান রাশেদ
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১১ মার্চ, ২০২৫, ৫:৪৬ পিএম  আপডেট: ১১.০৩.২০২৫ ৬:২৭ পিএম
ফাইল ছবি
আজকের খতমে তারাবিতে পবিত্র কোরআনের সুরা হিজর ও সুরা নাহল তেলাওয়াত করা হবে। পারা হিসেবে ১৪তম পারা পড়া হবে। তারাবির এই অংশে আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে জীবন-মৃত্যু, তাঁর কুদরত ও একত্ববাদ, বান্দার প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ, খুঁটিহীন আকাশ নির্মাণ, আসমানে হরেক রকম গ্রহ-নক্ষত্র, আসমানের সুরক্ষা, জমিন, জমিনের পেটে পাহাড় ও সব ধরনের বৃক্ষ, লতাগুল্ম, বন, দিগন্ত বিস্তৃত ফসলের মাঠ, মানুষের জীবিকার উপকরণ, অবারিত বাতাস, উড়ে বেড়ানো মেঘমালা, পানি পানে সৃষ্টির তৃষ্ণা মেটানো, পশুপাখির জীবনাচরণে মানুষের শিক্ষা, কন্যাসন্তান আল্লাহর নেয়ামত, মানুষ সৃষ্টির ইতিকথা, জান্নাত-জাহান্নাম, বিশ্বাসের দৃঢ়তা, ইবরাহিম (আ.)-এর সন্তান লাভ, লুত (আ.) ও তাঁর জনপদের কাহিনি, কাফেরদের প্রশ্নের খণ্ডন, কিয়ামত দিবসে কাফেরদের আফসোস, শয়তানের ধোঁকা, আল্লাহর নেয়ামত ভুলে যাওয়াসহ ইত্যাদি বিষয়ের আলোচনা রয়েছে। 

উপত্যকায় বাসকারীদের কথা
মক্কায় অবতীর্ণ সুরা হিজরের আয়াত সংখ্যা ৯৯। কোরআনের ১৫তম সুরা এটি। এ সুরায় হিজর উপত্যকায় বসবাসকারী সামুদ জাতির আলোচনা হওয়ায় সুরার নাম হিজর রাখা হয়েছে। সুরাটি শুরু হয়েছে হুরুফে মুকাত্তাআতের (রহস্যময় অক্ষরমালা) মাধ্যমে। এতে কোরআনের প্রশংসা, গুণাগুণ এবং ইসলামের বুনিয়াদি আকিদার দৃঢ়তা বর্ণনা করা হয়েছে। 

অলৌকিক উটের গল্প
সুরা হিজরের ৮০ থেকে ৮৪ নম্বর আয়াতে উট হত্যা ও সামুদ জাতির ধ্বংসের কথা সংক্ষিপ্ত বর্ণনা রয়েছে। হিজাজ ও সিরিয়ার মধ্যস্থলে ‘ওয়াদিউল কোরা’ প্রান্তরে তাদের বসতি ছিল। বর্তমানে তা ‘ফাজ্জুহ নাকাহ’ নামে প্রসিদ্ধ। (কাসাসুল কোরআন, মুহাম্মদ হিফজুর রহমান, অনুবাদ: আবদুস সাত্তার আইনী, খণ্ড ১, পৃ ১২৮)। তারা ছিল অর্থশালী ও শক্তিশালী। তারা বড় বড় প্রাসাদ ও পাহাড় কেটে দালানকোঠা নির্মাণ করত। তাদের ছিল সবুজ-শ্যামল উদ্যান। সোনা-রুপার প্রাচুর্যে মোড়ানো জীবন। কিন্তু তারা এক আল্লাহতে বিশ্বাসী ছিল না। সালেহ (আ.) তাদের কাছে নবি হয়ে এলেন। তিনি তাদের এক আল্লাহর দিকে ডাকলেন। অল্প কয়েকজন কেউ তাঁর ডাকে সাড়া দিল না। তারা প্রাসাদ, অর্থবৈভব ও বিলাসসামগ্রী নিয়ে গর্ব-অহংকার করতে লাগল। তারা সালেহ (আ.)-এর কাছে নবি হওয়ার দলিল চাইল। তারা দাবি করল, আপনি যদি বাস্তবিকই আল্লাহর রাসুল হন, তাহলে আমাদের ‘কাতেবা’ নামের পাথরময় পাহাড়ের ভেতর থেকে একটি ১০ মাসের গর্ভবতী, সবল ও স্বাস্থ্যবতী উট বের করে দেখান। (তাফসিরে মাআরিফুল কোরআন, মাওলানা মুহাম্মাদ ইদরিস কান্ধলভি, অনুবাদ : আবদুল্লাহ আল ফারুক, খণ্ড : ৪, পৃষ্ঠা : ৬৪৪)

সালেহ (আ.)-এর প্রার্থনায় আল্লাহ গর্ভবতী ও দুগ্ধবতী উট বের করে দিলেন পাথরময় পাহাড় থেকে। এ বিস্ময়কর মোজেজা দেখে কিছু লোক তৎক্ষণাৎ ঈমান আনলেও অনেকে বিরত থাকল। এই উট হত্যা করতে তাদের নিষেধ করা হয়েছিল। তারা অবাধ্য হয় এবং উটটি হত্যা করে।

তাদের ওপর আল্লাহর গজব নেমে আসে। এক শনিবার প্রভাতের সময় গগনবিদারী গর্জন, মুহুর্মুহু বিজলির চমক আর ভয়াবহ ভূমিকম্পে তাদের প্রাণবায়ু বেরিয়ে যায়। তারা নিজ নিজ ঘরে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকে। পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায় সামুদ জাতি। 

কারা জাহান্নামি হবে
যারা আল্লাহর একত্ববাদের সঙ্গে অংশীদারত্ব নির্ধারণ করেছে, আল্লাহ ও নবি-রাসুলদের অবাধ্যতা করেছে, ইসলাম ভিন্ন অন্য জীবনব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, তাদের ঠিকানা হবে জাহান্নাম। তাদের আজাবের জন্য রয়েছে সাতটি জাহান্নাম। জাহান্নামে প্রবেশের আছে সাত দরজা। তারা নিজেদের পাপ অনুসারে জাহান্নামের পৃথক পৃথক দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে। আল্লাহ বলেন, ‘তাদের সবার নির্ধারিত জায়গা হচ্ছে জাহান্নাম। এর সাতটি দরজা আছে, প্রত্যেক দরজার জন্য পৃথক পৃথক শ্রেণি আছে।’ (সুরা হিজর, আয়াত : ৪৩-৪৪)

জাহান্নামের ৭ দরজা
সুরা হিজরের ৪৩ নম্বর আয়াতে জাহান্নামের সাতটি দরজার কথা উল্লেখ হয়েছে। তাফসিরের বিভিন্ন কিতাবে সাতটি নাম পাওয়া যায়। যেমন :-
১. জাহান্নাম (আগুনের গর্ত)
২. সায়ির (উজ্জ্বল অগ্নি)
৩. জাহিম (জ্বলন্ত আগুন)
৪. হুতামা (চূর্ণবিচূর্ণকারী)
৫. হাবিয়া (অতল গহ্বর)
৬. লাজা (অতি উত্তপ্ত)
৭. সাকার (যা ঝলসে ও গলিয়ে দেয়)। (তাফসিরে মাআরিফুল কোরআন, মাওলানা মুহাম্মাদ ইদরিস কান্ধলভি, অনুবাদ : আবদুল্লাহ আল ফারুক, খণ্ড : ৪, পৃষ্ঠা : ৬৩৪)

মৌমাছির জীবনচক্রের বয়ান সুরা নাহলে
১২৮ আয়াত বিশিষ্ট সুরা নাহল মক্কায় অবতীর্ণ। এটি কোরআনের ১৬তম সুরা। নাহল অর্থ মৌমাছি। এ সুরায় মৌমাছির জীবনচক্র ও মধুর কথা থাকায় নাম রাখা হয়েছে সুরা নাহল। 

আল্লাহ ঘৃণা করেন অহংকারীকে
অহংকার পতনের মূল। অহংকার মানুষের জীবন ধ্বংস করে দেয়। পৃথিবীতে প্রথম পাপ চালু হয় অহংকারের বশীভূত হয়ে। আল্লাহ তাআলা যখন আদম (আ.)-কে সেজদার জন্য ইবলিশকে আদেশ করেছিলেন, তখন সে অহংকার দেখিয়ে বলেছিল, ‘সে মাটির তৈরি আর আমি আগুনের। আমি তাকে সেজদা করব না।’ 

অহংকারের ফলে ইবলিশ বিতাড়িত হলো। পৃথিবীর ইতিহাসে যারাই অহংকার করেছে, কেউ টিকতে পারেনি। শেষ পরিণতি শুভ হয়নি। নবি-রাসুল ও সাহাবিরা অহংকার ও দাম্ভিকতা এড়িয়ে চলতেন। অহংকারী আল্লাহর ভালোবাসা পায় না। আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ অহংকারীদের ভালোবাসেন না।’ (সুরা নাহল, আয়াত : ২৩)

কন্যাসন্তান আল্লাহর নেয়ামত
কন্যাসন্তান আল্লাহ তাআলার নেয়ামত। মা-বাবার জন্য সেরা উপহার। কন্যাসন্তান মা-বাবার চক্ষু শীতলকারী। তাদের হৃদয়ে থাকে মা-বাবার জন্য অফুরন্ত শুভকামনা ও মায়ার ভাণ্ডার। কন্যাসন্তান অশুভ মনে করা গুনাহ। অবহেলা করা পাপ। তাদের সঠিক লালন-পালনে আল্লাহ খুশি হয়। ব্যক্তির জন্য জান্নাত মেলে। মেলে জাহান্নাম থেকে মুক্তি। অথচ জাহেলি যুগে অনেকে কন্যাসন্তান হওয়াকে অপমান মনে করত। এখনো অনেকে কন্যাসন্তান হওয়ার সংবাদ পেলে মন খারাপ করেন। আল্লাহ বলেন, ‘আর যখন তাদের কাউকে কন্যাসন্তানের সুসংবাদ দেওয়া হয়; তখন তার চেহারা কালো হয়ে যায়। আর সে থাকে দুঃখ ভারাক্রান্ত।’ (সুরা নাহল, আয়াত : ৫৮)

মৌমাছির বিস্ময়কর জীবনচক্র
সুরা নাহলের ৬৮ থেকে ৬৯ নম্বর আয়াতে আছে মৌমাছির বিস্ময়কর জীবচক্রের কথা। আল্লাহর বিস্ময়কর ও অপূর্ব সৃষ্টি  মৌমাছি। এটি আকৃতিতে ছোট। কিন্তু আল্লাহর হুকুমে সে বিস্ময়কর সব কর্ম সাধন করে। মৌমাছির সুশৃঙ্খল সংঘবদ্ধ জীবন, দক্ষ নেতৃত্ব, একনিষ্ঠ আনুগত্য, বিচক্ষণতা, কর্মদক্ষতা, উদ্যমী মনোভাব, চাক বানানো, আপসে বিভিন্ন দায়িত্ব বণ্টন, দূরে অবস্থিত বৃক্ষলতা গাছপালা বনবনানি ও ফসলি খেত থেকে ফোঁটা ফোঁটা করে মধু সংগ্রহসহ কত কিছুই করে। এর কর্মযজ্ঞে আছে মুগ্ধ হওয়ার মতোই ব্যাপার। এদের তৈরিকৃত বাসায় ২০ থেকে ৩০ হাজার কক্ষ থাকে, যেগুলো মধু সংগ্রহের পর তা রাখার জন্য স্টোররুম হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া বাচ্চাদের জন্য থাকার আলাদা ঘর আছে। আছে ময়লার রাখার গুদামঘর। (তাইসিরুল কোরআন, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা : ৬৫)

বিজ্ঞানীরা বলছেন, মৌমাছি খুবই পরিশ্রমী পতঙ্গ। এক পাউন্ড মধু বানাতে ৫৫০ মৌমাছিকে প্রায় ২০ লাখ ফুলে ভ্রমণ করতে হয়! আবার এক পাউন্ড মধু সংগ্রহ করতে একটি কর্মী মৌমাছিকে প্রায় ১৪.৫ লাখ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে হয়! যা দিয়ে পৃথিবীকে তিনবার প্রদক্ষিণ করা সম্ভব।

মধু অসংখ্য রোগের ওষুধ; এবং খাদ্যও। এটি বেহেশতের পানীয় বিশেষ। রাসুলুল্লাহ (সা.) মধু পছন্দ করতেন। (শামায়েলে তিরমিজি, হাদিস : ১২১) কারও অসুখ হলে মধু খাওয়ার পরামর্শ দিতেন।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা কোরআন ও মধু দিয়ে ব্যাধি নিরাময়ের ব্যবস্থা করবে।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩৪৫২)

৬ নির্দেশ
সুরা নাহলের ৯০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা তিনটি বিষয়ের আদেশ এবং তিনটি বিষয় থেকে নিষেধ করেছেন। আদেশ তিনটি হলো, ন্যায়পরায়ণতা, সদাচার ও নিকটাত্মীয়দের সহায়তা প্রদান। নিষেধ তিনটি হলো, অশ্লীল কাজ, অসংগত কাজ ও সীমা লঙ্ঘনমূলক কাজ।

লেখক: আলেম ও সাংবাদিক


  বিষয়:   তারাবি  তারাবির সারাংশ  আজকের তারাবি  তারাবির নামাজ  রোজা  রমজান 


Loading...
Loading...
ইসলামের আলো- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: