সোলায়মান (আ.) কি রানি বিলকিসকে বিয়ে করেছিলেন

রায়হান রাশেদ

ইসলামের আলো

১৯তম পারা তেলাওয়াত করা হবে আজকের তারাবিতে। সুরা ফুরকানের ২১ থেকে সুরা শুআরা ও সুরা নামলের ১ থেকে ৫৯ নম্বর

2025-03-16T16:04:01+00:00
2025-03-16T16:04:01+00:00
 
  বুধবার, ১০ জুন ২০২৬,
২৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
ইসলামের আলো
সোলায়মান (আ.) কি রানি বিলকিসকে বিয়ে করেছিলেন
রায়হান রাশেদ
প্রকাশ: রোববার, ১৬ মার্চ, ২০২৫, ৪:০৪ পিএম   (ভিজিট : ১২৮৯)
তারাবি নামাজ আদায় করছেন মুসল্লিরা। ছবি: সময়ের আলো
১৯তম পারা তেলাওয়াত করা হবে আজকের তারাবিতে। সুরা ফুরকানের ২১ থেকে সুরা শুআরা ও সুরা নামলের ১ থেকে ৫৯ নম্বর আয়াত পর্যন্ত। এই অংশে পূর্ববর্তী নবী ও তাঁদের জাতি, আল্লাহর নেয়ামত, অহংকার, আল্লাহর একাত্ববাদ, কোরআনের নেয়ামত, অবিশ্বাসীদের প্রশ্নের জবাব, আল্লাহর কুদরত, আল্লাহর বিশেষ বান্দাদের গুণ, অপচয়, সোলায়মান (আ.) ও পিঁপড়ার ঘটনা, হুদহুদ পাখির সংবাদ সংগ্রহ, সাবার রানি বিলকিসের আত্মসমর্পণ, বিভিন্ন জাতির ধ্বংসের বিবরণ, মুমিন জীবনে পরীক্ষা, মুমিনদের পুরস্কার, ব্যবসায় সঠিক ওজন দেওয়া, মানুষের হক নষ্টের পরিণামসহ ইত্যাদি বিষয়ের বিবরণ রয়েছে।

অবিশ্বাসীদের ভয়ানক অবস্থা হবে যেদিন
সুরা ফুরকানের ২১ থেকে ৩৪ নম্বর আয়াতে অবিশ্বাসীদের কিছু আপত্তি ও অনর্থক দাবির জবাব দেওয়া হয়েছে। তারা বলে, ‘আমাদের কাছে ফেরেশতা আসে না কেন কিংবা কেন আমরা আল্লাহকে দেখি না?’ জবাবে বলা হয়েছে, মুশরিকরা মৃত্যুর সময় ফেরেশতাদের দেখতে পাবে। কিয়ামতের দিনটা হবে অত্যাচারী ও অপরাধীদের জন্য ভয়ানক। সেদিন তাদের আফসোস ছাড়া কিছুই করার থাকবে না।

আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের ১৪ গুণ
আল্লাহর বান্দাদের বিশেষ কিছু গুণের কথা বলা হয়েছে সুরা ফুরকানের ৬৩ থেকে ৭৭ নম্বর আয়াতে। যথা—
১. তারা পৃথিবীতে বিনয়ের সঙ্গে চলাফেরা করে।
২. মূর্খদের থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখে।
৩. রাত জেগে ইবাদত করে।
৪. জাহান্নামের আজাবের ভয় করে।
৫. খরচ করার ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষা করে।
৬. শুধু আল্লাহর ইবাদত করে।
৭. অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করে না।
৮. ব্যভিচার করে না।
৯. পাপ করলে তওবা করে।
১০. মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় না।
১১. বেহুদা আমোদ-প্রমোদ এড়িয়ে চলে।
১২. আল্লাহর কালাম যথাযথ শোনে।
১৩. উত্তম স্ত্রী ও সন্তান লাভে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে।
১৪. সঠিক পথের দিশা ও অন্যদের সঠিক পথ দেখানোর তৌফিক কামনা করে।

সুরা শুআরার বিষয়বস্তু
কোরআনের ২৬তম সুরা শুআরা মক্কায় অবতীর্ণ। এর আয়াত সংখ্যা ২২৭। শুআরা শব্দটি আরবি ‘শায়ির’ শব্দের বহুবচন। অর্থ কবি। সুরার শেষে কবিদের আলোচনা থাকায় এর নাম রাখা হয়েছে শুআরা। (হিদায়াতুল কোরআন, খণ্ড: ৬, পৃষ্ঠা : ১৫৯)


নবীজি (সা.)-এর মন খারাপে আল্লাহর সান্ত্বনা
কাফেররা ঈমান না আনার কারণে নবীজি (সা.)-এর মন খারাপ করতেন। সুরার শুরুতে আল্লাহ তাআলা তাঁকে এ বিষয়ে সান্ত্বনা দিয়েছেন। আল্লাহ চাইলে পৃথিবীর সবাই ঈমান আনতে বাধ্য। কিন্তু তিনি কাউকে ঈমান গ্রহণে বাধ্য করেন না। মানুষের কাছে উপদেশ ও নিদর্শন পাঠিয়ে গ্রহণ-অগ্রহণের সুযোগ দেন।

বিভিন্ন জাতির কাহিনি
এই সুরার ১০ থেকে ১৯১ নম্বর আয়াত পর্যন্ত মুসা-হারুন (আ.) ও ফেরাউনের ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ, ইবরাহিম (আ.) ও তার পিতার কাহিনি, নুহ (আ.)-এর জাতি ধ্বংসের কারণ, হুদ (আ.) ও আদ জাতির বর্ণনা, সালেহ (আ.) ও সামুদ জাতির ঘটনা, লুত (আ.)-এর জাতি ধ্বংসের কারণ, শোয়াইব (আ.) ও মাদায়েনবাসীর বিশ্বাস-অবিশ্বাসের বিবরণ রয়েছে।

পিঁপড়া যেভাবে স্বজাতিকে রক্ষা করেছিল
৯৩ আয়াত বিশিষ্ট সুরা নামল মক্কায় অবতীর্ণ। এটি কোরআনের ২৭তম সুরা। নামল অর্থ পিঁপড়া। এ সুরায় সোলায়মান (আ.)-এর সঙ্গে পিঁপড়ার কথোপকথনের বিবরণ রয়েছে, তাই এটিকে সুরা নামল বলা হয়। আল্লাহ তাআলা সোলায়মান (আ.)-কে বিশেষ জ্ঞান ও ক্ষমতা দিয়েছিলেন। তিনি বাদশাহ ছিলেন। ছিলেন অঢেল ধন-সম্পদের অধিকারী। তাঁর কাছে ওই সময়ে মানবসমাজে ব্যবহৃত সব ধরনের বস্তুসামগ্রীসহ বিশাল সেনাবাহিনী ছিল। তিনি মানুষের ভাষাসহ অন্যান্য প্রাণীর ভাষা বুঝতেন। একদিন তিনি সৈন্যবাহিনী নিয়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। যেতে যেতে পিঁপড়াদের বসতি অতিক্রম করছিলেন। হঠাৎ থেমে গেলেন। শুনলেন, এক পিঁপড়া অন্য পিঁপড়াদের ঘরে প্রবেশের তাড়া দিচ্ছে। নবী সোলায়মান (আ.) ও তাঁর বাহিনীর পায়ে পিষ্ট হওয়া থেকে বাঁচার সতর্কবার্তা দিচ্ছে। পিঁপড়ার কথা শুনে নবী হাসলেন। আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করলেন। পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘যখন সোলায়মান ও তার বাহিনী পিঁপড়ার উপত্যকায় পৌঁছাল, তখন এক নারী পিঁপড়া বলল, হে পিঁপড়ারা, গর্তে প্রবেশ করো। এমন যেন না হয়, সোলায়মান এবং তার সৈন্যরা তোমাদের পিষে ফেলবে, তোমরা তা টেরও পাবে না। সোলায়মান (আ.) পিঁপড়ার কথায় মৃদু হাসলেন।’ (সুরা নামল, আয়াত : ১৮)

উল্লিখিত আয়াত থেকে পিঁপড়ার জীবনযাত্রা সম্পর্কে চারটি ধারণা পাওয়া যায়—
১. পিঁপড়া কথা বলতে পারে। যেমন আয়াতে বর্ণিত পিঁপড়াটি অন্যদের সঙ্গে কথা বলেছে।
২. পিঁপড়া নারীশাসিত পতঙ্গ। তাদের একজন রানি থাকে। পুরুষ পিঁপড়া ঘরে, নারী পিঁপড়া বাইরে থাকে। যখন সোলায়মান (আ.) এবং তাঁর বাহিনী এসে পড়ে, রানি সবাইকে নিজ নিজ ঘরে প্রবেশের নির্দেশ দেয়।
৩. পিঁপড়া আলাদা করে মানুষ চিনতে পারে। যেমন সোলায়মান (আ.)-কে চিনেছিল।
৪. পিঁপড়া বিপৎসংকেত বুঝতে পারে। পিঁপড়া সোলায়মানের আগমন এবং বিপৎসংকেত বুঝতে পেরে সবাইকে সতর্ক করেছিল।


নবীর জন্য খবর সংগ্রহ করত হুদহুদ পাখি
সোলায়মান (আ.)-এর বার্তাবাহক হিসেবে কাজ করত হুদহুদ পাখি। পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে কী হচ্ছে, কী চিন্তাভাবনা চলছে, কোথায় কী ঘটছে, কোন রাজা কোথায় সৈন্য পাঠাচ্ছে, কেন পাঠাচ্ছে ইত্যাদি বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়ার জন্য তিনি এই পাখি ব্যবহার করতেন। এ ছাড়া সোলায়মান (আ.) মরুভূমি বা জনমানবহীন প্রান্তরে বের হলে পানি অন্বেষণ করার কাজও সে করত। পাখির তথ্যমতে সোলাইমান (আ.) জিনজাতির মাধ্যমে মাটি খনন করে প্রয়োজনমাফিক পানি বের করতেন। (তাফসিরে মাআরিফুল কোরআন, মাওলানা মুহাম্মাদ ইদরিস কান্ধলভি, অনুবাদ : মুফতি মুহাম্মাদ আব্দুল হালীম, খণ্ড : ৬, পৃষ্ঠা : ১৪৭)

নবি সোলাইমান (আ.) একবার পাখিটিকে খুঁজে পাচ্ছিলেন না। পাখিটির ওপর বেশ রেগে গেলেন। কোরআনে ঘটনার বর্ণনা এসেছে এভাবে, ‘একদিন সোলায়মান (আ.) পাখিদের খোঁজখবর নিলেন, এরপর বললেন, কী হলো, হুদহুদকে দেখছি না কেন? নাকি সে অনুপস্থিত? আমি অবশ্যই তাকে কঠোর শাস্তি দেব কিংবা হত্যা করব, যদি না সে অনুপস্থিত থাকার যথাযথ কারণ দেখায়। কিছুক্ষণ পর হুদহুদ এসে বলল, আপনি অবগত নন এমন একটি বিষয়ে আমি অবগত হয়েছি। আমি সাবা থেকে নিশ্চিত সংবাদ নিয়ে আগমন করেছি। আমি এক নারীকে সাবাবাসীর ওপর রাজত্ব করতে দেখেছি। তাকে সবকিছুই দেওয়া হয়েছে এবং তার একটা বিরাট সিংহাসন আছে। আমি তাকে ও তার সম্প্রদায়কে দেখলাম তারা আল্লাহর পরিবর্তে সূর্যকে সিজদা করছে। শয়তান তাদের দৃষ্টিতে তাদের কার্যাবলি সুশোভিত করে দিয়েছে।’ (সুরা নামল, আয়াত : ২০-২৪)

রানির নাম বিলকিস। সোলায়মান (আ.) হুদহুদের সংবাদ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চাইলেন। তিনি হুদহুদ পাখির কাছে একটি চিঠি লিখে পাঠিয়ে দিলেন। চিঠিতে রানি বিলকিসকে সূর্র্য পূজা ছেড়ে ইসলাম গ্রহণ ও তাঁর দরবারে আসার আদেশ দিলেন। হুদহুদ সোলাইমান (আ.)-এর মোহারাঙ্কিত চিঠি নিয়ে রানির কাছে পৌঁছল। রানি তখন ঘুমাচ্ছিলেন। হুদহুদ চিঠি রানির বুকের ওপর রাখল। ঘুম থেকে উঠে চিঠি ও হুদহুদকে দেখে বেশ আশ্চর্য হলেন রানি। চিঠি পড়ে হতভম্ব ও ভীত-সন্ত্রস্ত হলেন। সভা ডাকলেন। পরামর্শ করলেন। সব ভেবেচিন্তে তিনি নবির দরবারে এলেন। রাজপ্রাসাদের স্বচ্ছ কাচের সড়কে ভ্রমে পড়ে গোড়ালির কাপড় টেনে ওপরে তুলে ফেললেন। স্বচ্ছ স্ফটিক নির্মিত প্রাসাদ দেখে রানি যারপরনাই বিস্মিত হলেন। এদিকে আবার নিজের সিংহাসন সোলায়মানের কাছে দেখে বিস্ময়ে তাজ্জব বনে গেলেন। পরে তিনি সোলায়মান (আ.)-এর ধর্মে দীক্ষিত হন। সুরা নামলের ২৮ থেকে ৪৪ নম্বর আয়াতে এ ঘটনার বর্ণনা রয়েছে।

সোলায়মান (আ.) কি রানি বিলকিসকে বিয়ে করেছিলেন
সোলায়মানের সঙ্গে রানির বিয়ে হয়েছিল কিনা, এ বিষয়ে কোরআন-হাদিসে স্পষ্ট কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না। ইবনে আসাকির ইকরিমা সূত্রে বলেন, ঈমান গ্রহণের পর রানি বিলকিসের সঙ্গে সোলায়মান (আ.)-এর বিয়ে হয়েছিল। তবে কেউ কেউ এ মতের বিরোধিতা করেছেন।

লেখক: আলেম ও সাংবাদিক


  বিষয়:   তারাবি  আজকের তারাবি  তারাবির সারাংশ  রোজা  রমজান 


Loading...
Loading...
ইসলামের আলো- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: