পবিত্র কোরআনের ২১তম পারা তেলাওয়াত করা হবে আজকের তারাবিতে। সুরা আনকাবুতের ৪৫ থেকে সুরা রুম, সুরা লোকমান, সুরা সাজদা ও আহজাবের ১ থেকে ৩০ নম্বর আয়াত পর্যন্ত। এই অংশে নামাজের উপকারিতা, ধৈর্য, স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসা, মাতৃভূমি ত্যাগ, সামাজিক শিষ্টাচার, কোরআন অস্বীকারের পরিণাম, সুদ, সন্তানের প্রতি লোকমান (আ.)-এর উপদেশ, পাঁচ জিনিসের জ্ঞান, পালক পুত্রের বিধান, নবীপত্নীদের প্রতি নির্দেশ, ছয় দিনে পৃথিবী সৃষ্টি, মুমিনের পুরস্কার, নবিদের জীবন উম্মতের আদর্শ, দুনিয়ার মায়া ত্যাগ, জাকাত, দ্বীনের পথে বিপদ, ভ্রমণ, বাতাস, মুমিন ও কাফেরের অবস্থা ইত্যাদি বিষয় আলোচিত হয়েছে।
জীবনের কল্যাণে নামাজ
নামাজের উপকারিতার কথা বর্ণনার মধ্য দিয়ে আজকের তারাবি শুরু হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই নামাজ অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।’ (সুরা আনকাবুত, আয়াত : ৪৫) এই আয়াত নাজিল হলে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করা হলো, ‘নিশ্চয়ই নামাজ অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে’, এর অর্থ কী? তিনি বললেন, ‘যে ব্যক্তিকে নামাজ অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে দূরে রাখে না, তার নামাজ কিছুই নয়।’
তাফসিরকারদের মতে, এই আয়াতের মর্ম হলো, পরিপূর্ণ মনোযোগ ও একনিষ্ঠতার সঙ্গে তাকবির থেকে শুরু করে দাঁড়ানো, অর্থ বুঝে তিলাওয়াত, রুকু, সিজদা ও বৈঠক করা হলো নামাজ। আল্লাহর কাছে নিবেদিত হয়ে যে নামাজ পড়া হয়, তা ব্যক্তিকে অন্যায় ও অশ্লীল কাজ থেকে দূরে রাখে।
নবীজি (সা.) বড় মুজেজা কোরআন
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘কোরআনের মুজেজা কি তাদের জন্য যথেষ্ট নয়।’ (সুরা আনকাবুত, আয়াত : ৫১)। রাসুলুল্লাহ (সা.) সত্য নবী হওয়ার এক সুস্পষ্ট আলামত হলো, তিনি ছিলেন উম্মি; লিখতে-পড়তে জানতেন না। যদি তিনি লিখতে-পড়তে জানতেন, তা হলে অবিশ্বাসীরা এই বলে অপপ্রচার করত যে, তিনি হয়তো আগের কিতাবাদি থেকে এই জ্ঞান অর্জন করে নিয়েছেন। এত স্পষ্ট দলিল সত্ত্বেও তারা মুজেজা দেখতে চায়। অথচ কোরআনের চেয়ে বড় মুজেজা আর কী হতে পারে?
রোমানদের বিজয়ের ভবিষ্যদ্বাণী আছে সুরা রুমে
মক্কায় অবতীর্ণ সুরা রুম কারআনের ৩০তম সুরা। এর আয়াত সংখ্যা ৬০। এই সুরার শুরুতে পারসিকদের বিরুদ্ধে রোমানদের যুদ্ধজয়ের ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে।
৬০৩ খ্রিষ্টাব্দ তখন। রোমানরা পারসিকদের কাছে লাগাতার যুদ্ধে পরাজিত হচ্ছিল। ৬১৫ খ্রিষ্টাব্দে পারস্য দামেস্ক পার হয়ে বায়তুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত দখল করে নেয়। এতে মুসলমানদের মন ভেঙে যায়। অবিশ্বাসীরা খুশি হয়। কারণ পারস্যরাও ছিল তাদের মতো পৌত্তলিক। অন্যদিকে রোমানরা ছিল মুসলমানদের মতো নবি, আসমানি কিতাব, আখেরাত ইত্যাদিতে বিশ্বাসী। এ সময় কোরআনে আয়াত নাজিল হয়, কয়েক বছরের মধ্যেই রোমানরা বিজয়ী হবে। কোরআনের ভবিষ্যদ্বাণী শুনে আবু বকর (রা.) খুশিতে মক্কার চারপাশে অচিরেই রোমানদের বিজয়ী হওয়ার ঘোষণা দিলেন। অবিশ্বাসীরা ঠাট্টা করল।
উবাই ইবনে খলফ আবু বকরকে মিথ্যাবাদী বলল। আবু বকর বললেন, ‘তিন বছরের মধ্যে রোমকরা বিজয়ী না হলে আমি তোমাকে ১০টি উট দেব।’ উবাই রাজি হলেন। জুয়া তখনো হারাম হয়নি।
আবু বকর (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে ঘটনা শোনালেন। তিনি বললেন, ‘আমি তো তিন বছর নির্দিষ্ট করেনি। এটা ৩ থেকে ৯ বছরের মধ্যে ঘটতে পারে। তুমি উবাইকে বলো, ১০টি উটের পরিবর্তে ১০০ উট দেব, তবে সময়কাল ৩ থেকে ৯ বছর।’ উবাই আবু বকরের প্রস্তাবে রাজি হলেন।
হাদিস থেকে জানা যায়, হিজরতের পাঁচ বছর আগে এই ঘটনা ঘটে এবং সাত বছরে পূর্ণ হওয়ার পর বদর যুদ্ধের সময় রোমকরা পারসিকদের বিরুদ্ধে জয় লাভ করে। ৬২৪ সালে রোমানরা ইরানিদের সবচেয়ে বড় অগ্নিকু- ভেঙে ফেলে। (তাফসিরে মাআরেফুল কোরআন, মুফতি মুহাম্মাদ শফি, অনুবাদ : মাওলানা মুহিউদ্দীন খান, পৃ. ১০৩৭)
ভাষার বৈচিত্র্যে স্রষ্টার নিদর্শন
ভাষা আল্লাহর নেয়ামত। সৃষ্টির প্রথম প্রভাত থেকে মানুষের জন্য ভাষা ছিল। পৃথিবীতে হাজারো রকমের ভাষা আছে। সব নবি-রাসুল (আ.)-কে তাদের স্বজাতির ভাষায় পাঠানো হয়েছে এবং সব কিতাবও স্থানীয় ভাষায় নাজিল করা হয়েছে। তারা স্বজাতির ভাষায় প-িত ছিলেন। তারা জাতিকে মাতৃভাষায় দাওয়াত দিতেন। মানুষের মধ্যে আছে ভাষার ভিন্নতা, রুচির ভিন্নতা ও রঙের ভিন্নতা। ভাষাবৈচিত্র্যে রয়েছে আল্লাহর নিদর্শন। কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর তার নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে আকাশম-লী ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য।’ (সুরা রুম, আয়াত : ২২)
কে ছিলেন লোকমান হাকিম
৩৪ আয়াত বিশিষ্ট সুরা লোকমান কোরআনের ৩১তম সুরা। এটি মক্কায় অবতীর্ণ। এই সুরায় লোকমান হাকিমের কিছু প্রজ্ঞাপূর্ণ উপদেশ থাকায় এর নাম রাখা হয়েছে সুরা লোকমান। লোকমান ছিলেন ধার্মিক ও জ্ঞানী। আল্লাহ তাকে প্রজ্ঞা শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি নবি ছিলেন না। ইবনে আব্বাস (রা.), জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) এবং সাইদ ইবনুল মুসাইয়িব (রা.)-এর বর্ণনা উদ্ধৃত করে সুফিয়ান সাওরি (রহ.) বলেন, ‘তিনি নবি নন; বরং আল্লাহর একজন সৎ বান্দা ছিলেন।’ অধিকাংশ আলেম বলেন, ‘লোকমান ছিলেন প্রজ্ঞাবান ও আল্লাহর ওলি। তিনি নবি ছিলেন না।’ (কাসাসুল কোরআন, খ- : ৮, পৃষ্ঠা : ১৬)
ছেলের প্রতি বাবার অমূল্য উপদেশ
সন্তানের প্রতি লোকমান হাকিমের প্রজ্ঞাপূর্ণ ১২টি উপদেশের কথা বর্ণনা করা হয়েছে সুরা লোকমানের ১২ থেকে ১৯ নম্বর আয়াতে। যথা:-
১. আল্লাহর সঙ্গে কাউকে অংশীদার কোরো না।
২. বাবা-মায়ের সঙ্গে সদাচার কোরো।
৩. তারা আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করতে বলে, তাদের কথা গ্রহণ কোরো না।
৪. আল্লাহর জিকির কোরো।
৫. নামাজ কায়েম কোরো।
৬. ভালো কাজের আদেশ দাও।
৭. খারাপ কাজ থেকে নিষেধ কোরো।
৮. বিপদে ধৈর্যধারণ কোরো।
৯. অহংকারবশে মানুষকে অবজ্ঞা কোরো না।
১০. পৃথিবীতে গর্বভরে চলাফেরা কোরো না।
১১. মধ্যপন্থা অবলম্বন কোরো।
১২. কণ্ঠস্বর নিচু রাখো ।
সুরা সাজদা ও আহজাবে যা আছে
কোরআনের ৩২তম সুরা সাজদা মক্কায় অবতীণ। এর আয়াত সংখ্যা ৩০টি। ৭৩ আয়াতবিশিষ্ট সুরা আহজাব মদিনায় অবতীর্ণ। কোরআনের ৩৩তম সুরা এটি। এ দুই সুরায় বিবরণ রয়েছে কোরআনের মহত্ত্ব, আল্লাহর একত্ববাদ ও কুদরত, মানুষ সৃষ্টির বিবরণ, বিশ্বাসীদের ইবাদত, আখেরাতে তাদের পুরস্কার, কিয়ামত, সামাজিক শিষ্টাচার, আল্লাহর বিধান, যুদ্ধসহ ইত্যাদি বিষয়ের।
পালক পুত্রের বিধান
প্রাক-ইসলামি যুগে আরবে পালক সন্তানকে ঔরসজাত সন্তানের মতোই মনে করা হতো। ইসলাম মনে করে, বাবা-মা ও সন্তানের পরিচয়ের বাস্তব ভিত্তি হলো ঔরস ও গর্ভধারণ। রাসুলুল্লাহ (সা.)-ও জায়েদ ইবনে হারেসা নামে এক সাহাবিকে দত্তক নিয়েছিলেন। তাকে সবাই জায়েদ ইবনে মোহাম্মাদÑঅর্থাৎ মুহাম্মদের ছেলে বলে ডাকত। কোরআনে বিষয়টি নিষেধ করে দেওয়া হয়। পরে সবাই তাকে জায়েদ ইবনে হারেসা বলেই ডাকা শুরু করে। সুরা আহজাবের ৪ থেকে ৫ নম্বর আয়াতে পালকপুত্র পুত্র নয়, তাকে তাদের পিতৃপরিচয়ে ডাকা, পরিচয় জানা না থাকলে ভাই-বন্ধু হিসেবে গ্রহণের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
দত্তক সন্তান কখনো আপন সন্তানের স্বীকৃতি পাবে না। আরেকজনের সন্তানকে ঔরসজাত সন্তানের যাবতীয় বিধি-বিধান তথা উত্তরাধিকার, পরিবারের সবার সঙ্গে পর্দাহীনভাবে অবাধে ওঠাবসা, বিয়ে ইত্যাদি সাব্যস্ত করা ইসলামে সুস্পষ্টভাবে হারাম।
এতিম বা পথশিশুকে মমতা ও ভালোবাসা দিয়ে লালন-পালন করা সওয়াবের কাজ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমি ও এতিমের প্রতিপালনকারী জান্নাতে এমনভাবে নিকটে থাকবে; এই বলে তিনি তর্জনী ও মধ্যমা আঙুল দুটি দ্বারা ইঙ্গিত করলেন এবং আঙুল দুটির মাঝে কিঞ্চিত ফাঁক রাখলেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৩০৪)