অন্ধকার ঘর, জানালা দিয়ে ঝড়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে। পুরনো একটা টেবিলের ওপর ছড়িয়ে আছে পত্রিকা, যেখানে বড় হেডলাইনে লেখা: “ম্যাচ ফিক্সিংয়ের ছায়ায় পাকিস্তান ক্রিকেট!
একটা রাত ছিল সেটা… লাহোরের বিলাসবহুল এক হোটেল রুম। অন্ধকার ঘরের জানালা দিয়ে বাইরে উঁকি দিচ্ছে নিঃসঙ্গ চাঁদ। ফোনটা বাজল, কেউ একজন ধীরে ধীরে রিসিভ করল। ওপাশ থেকে একটা কণ্ঠস্বর ‘কালকের ম্যাচটা মনে রাখিস… আমাদের যা দরকার, সেটা যেন ঠিকঠাক হয়!
সেই কণ্ঠ কার ছিল? কী ছিল সেই চুক্তি? তা জানা যায়নি কোনোদিনই। কিন্তু সেই কণ্ঠই ছিল পাকিস্তান ক্রিকেটে ঘনিয়ে আসতে থাকা এক ভয়ঙ্কর ঝড়ের পূর্বাভাস। সেই ঝড়ের নাম ম্যাচ ফিক্সিং! ম্যাচ ফিক্সিংয়ের এই ঝড়ে যেসব তারকা কিংবদন্তির মূল উপড়ে যায়, তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ওয়াসিম আকরাম!
ওয়াসিম আকরাম—পাকিস্তান ক্রিকেটে সুইংয়ের রাজা। যাকে সবসময় টুপি খোলা অভিবাদন জানায় পুরো ক্রিকেট বিশ্ব। কিন্তু কোনো এক অদৃশ্য ছায়া তাকে নিয়ে গিয়েছিল বিতর্কের গভীর অন্ধকারে।
১৯৯৯ বিশ্বকাপে পাকিস্তান দল ছিল দুর্দান্ত ফর্মে। গ্রুপ পর্বে একের পর এক ম্যাচ জিতে দলটি চলে যায় ফাইনালে। সেমিফাইনালে নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে তারা হয়ে ওঠে আরও শক্তিশালী প্রতিপক্ষ। কিন্তু তারপর ফাইনালে ঘটে যায় এক অপ্রত্যাশিত বিপর্যয়!
২০ জুন, ১৯৯৯। লর্ডসের ফাইনালে পাকিস্তানের প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়া। ওয়াসিম আকরাম ছিলেন দলের অধিনায়ক, লর্ডসের উইকেটে টস জিতে প্রথমে ব্যাটিং না করে বোলিং করবেন এটাই ছিলো প্রত্যাশিত। পাকিস্তান দলে তখন দুর্দান্ত ব্যাটসম্যানদের মেলা, যারা বোলারদের নাভিশ্বাস তুলে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। অথচ সেই ম্যাচে যা হলো, সেটা পাকিস্তানের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম রহস্যজনক অধ্যায়!
পুরো দল অলআউট হয়ে গেল মাত্র ১৩২ রানে! পাকিস্তানের তারকা ব্যাটসম্যানরা, যারা পুরো টুর্নামেন্ট দারুণ পারফর্ম করেছিলেন, ফাইনালে এসে তারা যেন নিজেদের ছায়া হয়ে গেলেন। ইনজামাম-উল-হক ও সাঈদ আনোয়ারের মতো ব্যাটারস করলেন মাত্র ১৫ রান করে, মঈন খান ৬। এইভাবে একের পর এক ব্যাটসম্যান ফিরে গেলেন প্যাভিলিয়নে।
অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের পারফর্ম ছিল দুর্দান্ত, কিন্তু পাকিস্তানের ব্যাটসম্যানদের আত্মসমর্পণ ছিল অস্বাভাবিক। কিছু উইকেটের পতন দেখে সন্দেহ হয়েছিল অনেকের—ব্যাটসম্যানরা কি ইচ্ছাকৃতভাবে বাজে শট খেলছেন?
ফলাফল- ১৩৩ রানের টার্গেট তাড়া করতে নেমে মাত্র ২০.১ ওভারে অস্ট্রেলিয়া খুব সহজেই ম্যাচ জিতে যায়! পাকিস্তানের বোলিং লাইনআপ ছিল অন্যতম সেরা, কিন্তু সেই দিন তাদের বলে যেন কোনো ধারই ছিল না। ওয়াসিম আকরাম নিজে ৮ ওভারে রান দিলেন ৪১। শোয়েব আখতার, সাকলায়েন মুশতাক, আজহার মাহমুদেরাও ছিলেন নিষ্প্রভ।
ফাইনালের পরপরই ওঠে ফিক্সিংয়ের অভিযোগ। ২০০০ সালে পাকিস্তান ক্রিকেটে তদন্ত শুরু করে মালিক কায়ুম কমিশন। তদন্তে বেশ কিছু খেলোয়াড়ের বিরুদ্ধে প্রমাণ পাওয়া যায়। ওয়াসিম আকরাম সরাসরি দোষী সাব্যস্ত না হলেও রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, তার বিরুদ্ধে যথেষ্ট সন্দেহের কারণ রয়েছে। কমিশন সুপারিশ করে, তাকে আর অধিনায়ক করা উচিত নয়।
ওয়াসিম আকরাম বারবার এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। বলেছেন, তিনি কখনোই ক্রিকেটের সাথে প্রতারণা করেননি। তবে, কিছু সতীর্থ খেলোয়াড় ও কর্মকর্তার মতে, পাকিস্তান দলে সেই সময় কিছু একটা ঘটছিল, যা ক্রিকেটের নিয়মের বাইরে ছিল।
সাবেক খেলোয়াড় রশিদ লতিফ এবং আমির সোহেল বারবার বলে আসছিলেন, পাকিস্তানের ড্রেসিংরুম তখন একটা বিভক্ত জায়গা ছিল। অনেকেই টাকা নিয়েছিলেন, কেউ স্বীকার করেছিলেন, কেউ করেননি। কিন্তু ওয়াসিম আকরামের নাম যখন উঠে আসে, তখন সবাই স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল পুরোপুরি!
সেই রহস্যের মীমাংসা হয়নি আজও। ওয়াসিম আকরাম কি সত্যিই দোষী ছিলেন? নাকি তিনি ছিলেন ষড়যন্ত্রের শিকার?