গেল কয়েক সপ্তাহ ধরে পরিবারের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না মোহাম্মদ জিহাদ আবু সাকের। মা সেবার বলেছিলেন, মাতৃভূমি গাজা ছেড়ে অজানা গন্তব্যে রওনা হয়েছেন তারা। গাজায় মাথা গোঁজারও ঠাঁই নেই। প্রতিদিনই দীর্ঘ হচ্ছে শহিদের মিছিল। মা কিংবা পরিবারের লোকেরা এখন কোথায় আছে, বেঁচে আছে কিনা, জানেন না মোহাম্মাদ জিহাদ। মন পড়ে আছে গাজায়। মন পুড়ছে পরিবারের জন্য। ২২ বছর বয়সি তরুণ মোহাম্মদ জিহাদ পড়াশোনা করেন ঢাকা ডেন্টাল মেডিকেল কলেজে। থাকেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যার পি জে হার্টগ ইন্টারন্যাশনাল হলে। তার বেদনাভরা গল্প শুনেছে সময়ের আলো।
তারা থাকুক নিরাপদে
প্রতিদিনই লাশের মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে ফিলিস্তিনে। আহতের সংখ্যাও বাড়ছে দিন দিন। কত মানুষ যে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে, এর হিসাব নেই। সেখানে পৌঁছতেও পারছেন না উদ্ধারকর্মীরা। নিজ দেশের মানুষের আহত ও নিহত হওয়ার খবরটাই শুধু দেখতে পান মোহাম্মাদ জিহাদ। প্রতিদিন অনেক মানুষের মৃত্যুর খবর দেখেন অনলাইনে-পত্রিকায়। আহতের আর্তনাদ শুনেন ভিডিওতে। মাতৃভূমি ধ্বংসের চিত্র দেখেন। টেলিভিশনের প্রত্যেকটা চ্যানেলই তাকে দিয়ে যায় মৃত্যুর খবর। বেদনার খবর। জিহাদ চান, গাজার সবাই ভালো থাকুক। পরিবারের সদস্যরা নিরাপদ থাকুক। ‘আমি প্রার্থনা করছি, সবাই ভালো থাকবে এবং নিরাপদে থাকবে এবং আমি সবার কাছে দোয়া চাইছি।’ বলছিলেন মোহাম্মাদ জিহাদ।
‘আমরাও মানুষ’
‘প্রতিদিনই আমাদের নিয়ে শিরোনাম হচ্ছে, আজ ফিলিস্তিনে এতজন মারা গেছেন। এত লোক আহত হয়েছেন। অমুক শহর বা হাসপাতাল ধ্বংস হয়েছে। দেখুন আমরা শুধু সংখ্যা নই। আমরাও মানুষ। মানুষ হিসেবে আমাদের বাঁচানো প্রয়োজন।’ মোহাম্মাদ জিহাদের কণ্ঠে আকুতি ঝরে পড়ছিল একরকম।
বন্ধ হোক নৃশংস হত্যাযজ্ঞ
দুই বছর ধরে গাজায় গণহত্যা চলছে। এর মধ্যে কোনো কোনো দেশ এই গণহত্যা বন্ধে চেষ্টা করেছে। কেউ কেউ আবার সমর্থন করছে দখলদার ইসরায়েলকে। এখন পর্যন্ত প্রায় ৬০ হাজার ফিলিস্তিনি শহিদ হয়েছেন। এভাবে চলতে থাকলে গাজায় ধ্বংসস্তূপ ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। এই গণহত্যা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। মোহাম্মাদ জিহাদের ভাষায়, ‘আমরা চাই এই গণহত্যা এখনই বন্ধ করার জন্য পদক্ষেপ নেওয়া হোক। যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, আমরা সেসব পদক্ষেপের প্রশংসা করি। কিন্তু আমরা চাই যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য, গণহত্যা বন্ধ করার জন্য—একটি কার্যকর পদক্ষেপ।’
বিজয় হবে আমাদেরই
দখলদার ইসরায়েলি বাহিনীর বর্বরতা, গণহত্যা এবং মাতৃভূমি ছেড়ে যাওয়ার কষ্ট–এর ভেতরও আশায় বুক বাঁধেন ফিলিস্তিনিরা, নিজেদের মাতৃভূমি একদিন ফিরে পাবেন। একদিন তারা মুক্ত হবেন। নিজেদের বিজয় নিয়ে কোনো সন্দেহই নেই মোহাম্মাদ জিহাদের মনে। বললেন, ‘আল্লাহর ওপর আমাদের ১০০% বিশ্বাস আছে, আমরা মুক্ত হব এবং আমরা বিজয় অর্জন করব, ইনশাআল্লাহ।’
আমাদের আছে আল্লাহ
মোহাম্মাদ জিহাদের মন পড়ে আছে গাজায়। মন পুড়ছে মা-বাবা, ভাইবোন ও পরিবারের জন্য। তারা কেমন আছে, কোথায় আছে–জানেন না জিহাদ। অন্তত বেঁচে আছে কি না–এই খবরটাও জানতে পারছেন না। এর আগে কাছের মানুষদের হারিয়েছেন জিহাদ। তাদের মৃত্যু দেখেছেন। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা বেশ কঠিন। সেখানে বিদ্যুৎ নেই। ইন্টারনেট নেই। কয়েক সপ্তাহ আগে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে কথা বলতে পেরেছিলেন। তখন গাজা ছেড়ে অজানা গন্তব্যের দিকে রওনা করেছেন পরিবারের সদস্যরা। এরপর আর তাদের সঙ্গে কথা হয়নি জিহাদের। ‘আমি তাদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ করতে পারছি না। যোগাযোগ করা খুবই কঠিন, বিদ্যুৎ নেই, ইন্টারনেট নেই। আমি শুধু আশা করতে পারি যে, তারা নিরাপদে থাকবে। আল্লাহ তাদের রক্ষা করুন এবং আমি সবার কাছে তাদের জন্য দোয়া চাইছি।’ বলেন মোহাম্মাদ জিহাদ।
প্রাণ হয়ে আসে টেক্সটগুলো
জিহাদ প্রতিদিনই প্রার্থনা করেন, আজ যোগাযোগ হোক পরিবারের সঙ্গে। আজ টেক্সট আসুক তাদের। কিন্তু আসে না। বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট কিছুই নেই গাজায়। মাঝে-মধ্যে ইন্টারনেট সংযোগ পেলে পরিবারের লোকেরা তাকে টেক্সট পাঠান। এতেই প্রশান্তি পান জিহাদ। বললেন, ‘তারা সামান্য ইন্টারনেট পেলেই আমাকে টেক্সট করে শুধু কয়েকটি শব্দে, শুধু তাদের সম্পর্কে আমাকে আশ্বস্ত করার জন্য।’
মানুষ হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ান
বাংলাদেশের সব মানুষের হৃদয়ে ফিলিস্তিন। এর মধ্যে তারা ফিলিস্তিনে সহযোগিতা পাঠিয়েছেন। অনেকে ইসরায়েলি পণ্য বয়কট করেছেন। মিটিং-মিছিল করেছেন কোটি মানুষ। মোহাম্মাদ জিহাদ বাংলাদেশিদের ফিলিস্তিনপ্রেমে বেশ প্রীত। তারপরও বাংলাদেশের মানুষকে ফিলিস্তিন সম্পর্কে সচেতন করছেন জিহাদ। গণহত্যার বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলার কথা বলছেন। গণহত্যার বিরুদ্ধে কথা বলা ও রুখে দাঁড়ানো প্রতিটি মানুষের দায়িত্ব উল্লেখ করে জিহাদ বলেন, ফিলিস্তিনের বিষয়টি ধর্ম নিয়ে নয়, বা জাতি নিয়ে নয়, এটি আসলে মানবতার প্রশ্ন। আমি আশা করি- প্রত্যেকে এই দায়িত্ব অনুভব করতে পারবে এবং এ ব্যাপারে বাস্তব পদক্ষেপ নেবে।’