আমার ছেলেবেলা কেটেছে মাকে মিস করতে করতে। একদিকে চিকিৎসক মায়ের পেশাগত ডিগ্রির চাপ অন্যদিকে আমরা সবে বড় হচ্ছি। তিন বোন ছিলাম। আমার ছোটবোনের বয়স যখন ৪ বছর, মা তখন একটি ডিগ্রির জন্য আমাদের রেখে ৬ মাসের জন্য ভারতে যাচ্ছিলেন। কিছু বুঝে উঠতে না পারলেও আমাদের মনে ছিল সুতীব্র অভিমান। একদিকে মায়ের ক্যারিয়ার, অন্যদিকে আমাদের শিশুতোষ চাহিদা। মায়ের প্রতি একপক্ষীয় অভিমান নিয়েই বড় হয়েছি আমি। বন্ধুদের সবাইকে দেখি তাদের মায়েরা স্কুল থেকে নিতে আসে, কই আমার মা তো আসেন না। বন্ধুদের মায়েরা তাদের কত জায়গায় নিয়ে যাচ্ছেন, দেখে আফসোস হতো। কিন্তু পঞ্চম শ্রেণিতে উঠতে না উঠতেই বুঝে ফেললাম মায়ের এ ছোটাছুটি মূলত আমাদের জন্যেই। বাংলাদেশের প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থায় মায়ের শক্তিশালী পরিচয় মেয়েকে এক ধরনের সামাজিক ও পারিবারিক নির্ভরতা দেয়। সেই নির্ভরতার জন্যই আমার মায়ের এই ছুটে চলা। তারপর থেকে একটু একটু করে মাকে বুঝতে শুরু করি। এরপরে যত বড় হয়েছি মায়ের প্রতি অভিমান কমে এসেছে, বেড়েছে শ্রদ্ধা।
পেশাগত জীবনে আমার মা হেলেনা বেগম শিশু বিশেষজ্ঞ। আর পারিবারিক জীবনে মা ছিলেন ঘরের খুঁটি। পেশাগত ব্যস্ততার জন্য তাকে চোখের সামনে তেমন একটা দেখা যায় না, কিন্তু অনুভব করা যায়। যখনই কোনো পারিবারিক কিংবা অর্থনৈতিক দুর্যোগ এসেছে আমার মায়ের কল্যাণ্যেই সেটুকু কাটিয়ে ওঠা গেছে নিমেষেই। আমার বাবাও চিকিৎসক। কিন্তু ঘরে-বাইরে মায়ের এই কার্যক্রমকে ঠিক বাকি দশটা মায়ের গল্পের ছাঁচে ফেলা যায় না। ফলে খুব ছোটবেলায় আমরা তিন বোন মেনে নিয়েছিলাম যে আমাদের মা এমনই। প্রচলিত প্রথা ভেঙে আমার স্কুল, কলেজ- এমনকি মেডিকেল কলেজেও আমার লিগ্যাল গার্ডিয়ান ছিলেন আমার মা। আমার বাবাও চিকিৎসক। তিনিও বিষয়টিকে পছন্দ করতেন। শুনতে খুব হাস্যকর মনে হতে পারে তবে, লিগ্যাল গার্ডিয়ান হিসেবে আমার মায়ের পেশা-আয় সবকিছু লেখার সময় আমার ভীষণ গর্ব হতো। আমি মেডিকেল কলেজে ভর্তি হব, এই চিন্তাও মায়ের কাছ থেকে পাওয়া। মায়ের ধারণা ছিল মেডিকেল কলেজের এই বন্ধুর সময়টা আমি সহজভাবে পার করতে পারব। মেডিকেল কলেজে পড়াশোনা খুবই খরুচে বিষয়। আমাদের বই, সরঞ্জাম কিংবা পরীক্ষার ফি সবকিছুতেই মা ছিলেন সব রোগের দাওয়াই। যদিও মেডিকেল কলেজ-পরবর্তী যেকোনো ডিগ্রি অর্জনের বিষয়টিও সহজ নয়। এখানে যেমন মেধার স্বাক্ষর রাখতে হয় তেমনি দরকার অর্থনৈতিক সচ্ছলতা। সেসবও আমি খুব সহজে পেরিয়ে যেতে পেরেছি আমার মায়ের কল্যাণে।
মা ছিলেন সরকারি চিকিৎসক। শিশু বিশেষজ্ঞ মায়ের অফিস আর চেম্বার সামলে যতখানি সময় আমাদের দিতে পারতেন ততখানিই পেতাম আমরা। পরিবার ছাপিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রকে যে নারীর দেওয়ার অনেক কিছু থাকতে পারে সেই বোধের জাগরণটুকুও আমরা মাকে দেখেই শিখেছি। ফলে আমাদের মায়ের গল্প যে বাকি দশজন মায়ের চেয়ে আলাদা হবে- এটাই স্বাভাবিক। আমরা সবাই ভালোটুকুই দেখতে চাই। কিন্তু একজন নারী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিজের পেশাগত দক্ষতা ও ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিয়ে দিনরাত খেটে চলেছেন সেটা আমরা দেখতে নারাজ। এক পর্যায়ে সরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়ে বড় পরিসরে শিশুদের বøাড ক্যানসার নিয়ে কাজ করার ইচ্ছা জাগে তার। যোগ দেন বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটিতে। এসব গল্প আমাদের একেবারে ছোটবেলার। আম্মুকে তখনও যেমন দেখেছি আজও তেমনই দেখি। তার ব্যক্তিত্ব, তার পরিচিতির গণ্ডি, তার পেশাগত ছুটে চলা সবকিছু নিয়েই আমরা তিন বোন গর্বিত।
লেখক: ইনডোর মেডিকেল অফিসার, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতাল, ঢাকা