আল্লামা সুলতান যওক নদভী (রহ.) ছিলেন বাংলাদেশের একজন বরেণ্য শিক্ষাবিদ এবং আরবি-ফারসি সাহিত্যিক। বাংলাদেশের মাদরাসা শিক্ষাকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছানোর ক্ষেত্রে যে কয়েকজন মানুষের ভূমিকা অনস্বীকার্য তাদের মধ্যে তিনি অন্যতম। বাংলাদেশের কওমি মাদরাসায় আরবি চর্চার ক্ষেত্রে যে দুজন মানুষের কথা বলবে ইতিহাস, তার মধ্যে প্রথমজন তিনি। রাজনীতির আড়ালের মানুষ ছিলেন, কখনোই ব্যানারে অথবা সভামঞ্চে সাধারণত আগমন করতেন না। কিন্তু পেছনে থেকে কাজ করতেন, বুদ্ধি দিতেন সুপরামর্শ দিতেন, তত্ত্বাবধায়ন করতেন, করতেন রাহনুমায়ী।
রাজনীতিতে প্রকাশ্য না থাকলেও বাংলাদেশে বিগত ৫০ বছরে ইসলামি রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণে তার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। ২ মে ২০২৫, শুক্রবার বিকাল ৪টায় বাংলাদেশের আকাশ থেকে বিদায় নিলেন এই ক্ষণজন্মা মনীষী।
আল্লামা সুলতান যওক নদভী ১৯৩৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন দ্বীপ জনপদ মহেশখালীর জাগীরাঘোনা গ্রামের এক মধ্যবিত্ত দ্বীনদার পরিবারে। তার পিতার নাম আলহাজ সুফি আবুল খায়ের। মাতার নাম রূহ আফজা বেগম। তার নানা মাওলানা মকবুল আহমদ ছিলেন উপমহাদেশের বিখ্যাত ইসলামী জ্ঞান তাপস হজরত মাওলানা যফর আহমদ (রহ.)-এর বিশেষ সাহচার্যপ্রাপ্ত মানুষ। আল্লামা নদভীর পিতা ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপরায়ণ ও পরহেজগার মানুষ। ফলে স্থানীয় লোকেরা তাকে সুফি আবুল খায়ের হিসেবেই চিনত। মাত্র চার বছর বয়সে তার মাতৃবিয়োগ হয়। তবে মা হারিয়ে যাওয়ার পর মা হারানোর এই তীব্র ব্যথা সন্তানকে অনুভব করতে দেননি তার পিতা। পিতার কাছেই আল্লামা নদভী পেয়েছেন বাবার স্নেহ এবং মায়ের আদর।
আল্লামা সুলতান যওক নদভীর প্রাথমিক শিক্ষা তার নিজ গ্রামে অর্জন হলেও শিক্ষা জীবনের এক আলোকিত মুহূর্তে তিনি আগমন করেন দেশের ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জামিয়া ইসলামিয়া পটিয়ার আলোকিত আঙিনায়। জামিয়ার সম্মানিত শিক্ষকবৃন্দ, বিশেষ করে হাজি ইউনুস এবং মুফতি আজিজুল হক (রহ)-এর হৃদয়ের তাপ ও উত্তাপে মাওলানা নদভী হয়ে উঠেন যুগের এক অনন্য কীর্তিমান আলেম। পাশাপাশি ছাত্র বয়স থেকেই তিনি আরবি সাহিত্যে ব্রত হয়ে ওঠেন। আল্লামা নদভী জামিয়া পটিয়ায় তার শিক্ষা জীবনের অনন্য সময়টি সমাপ্ত করেন ১৯৫৯ সালে ইসলামি শরিয়াহ বিভাগ হতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে। অর্জন করেন দাওরায়ে হাদিসের মর্যাদাময় সনদ। দস্তারবন্দি অনুষ্ঠানে হজরতকে পাগড়ি পরিয়ে দেন চট্টগ্রামের প্রসিদ্ধ বুজুর্গ শাহ আবদুর রহমান চূড়ামনী (রহ.)। এরই মাধ্যমে তার প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ার সমাপ্তি ঘটে।
আল্লামা নদভীর কর্মজীবনের প্রধান মিশন ছিল শিক্ষার জন্য নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া। জীবনের প্রাথমিক সময়ে তিনি যে কয়েকটি মাদরাসায় শিক্ষকতা করেছেন তার মধ্যে অন্যতম একটি হলো চট্টগ্রামের সাতকানিয়া নদীবিধৌত শতবর্ষী দ্বীনি প্রতিষ্ঠান বসরত নগর মাদরাসা। আমার সুযোগ হয়েছিল গত বছর মাদরাসাটির ৯৮তম মাহফিলে উপস্থিত হওয়ার। আল্লামা নদভী তার কর্মমুখর জীবনে আরও কিছু প্রতিষ্ঠানে হৃদয়ের আলো বিচ্ছুরণ করেছেন। এর মধ্যে কিশোরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী জামিয়া এমদাদিয়া, পটিয়ার জামিয়া জমিরিয়া, ফটিকছড়ির বিখ্যাত শতবর্ষী দ্বীনি প্রতিষ্ঠান জামিয়া ইসলামিয়া বাবুনগর অন্যতম। এসব প্রতিষ্ঠানে তার হাতে গড়ে উঠেছেন সময়ের সেরা ও আলোচিত মেধাবী শিক্ষার্থীরা। আল্লামা নদভী শিক্ষা জীবনের একটি অনন্য মিশন ছিল কওমি মাদরাসার শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো। আর সেই চিন্তা ও ভাবনার আলোকে তিনি চট্টগ্রামের প্রাণকেন্দ্রে প্রতিষ্ঠা করেন ‘জামিয়া দারুল মাআরিফআল ইসলামিয়া’। সময়টা ১৯৮৫ ঈসায়ি মোতাবেক ১৪০৫ হি.-এর শাওয়াল মাস। আর এই প্রতিষ্ঠান থেকেই বিশ্বব্যাপী তিনি ছড়িয়ে দিতে থাকেন তার হৃদয়ের উদারতা, চিন্তার প্রখরতা এবং ভাবনার গভীরতা। আল্লামা নদভী তার শিক্ষাব্যবস্থাকে পৃথিবীতে এতটাই ছড়িয়ে দিয়েছেন যেটা এক শতাব্দী সময়কাল ছাড়িয়েছে বলা যায়।
আজ থেকে প্রায় ১৮ বছর আগের একটি স্মৃতি আমার চোখে এখনও জীবন্ত হয়ে আছে। রাজধানী ঢাকার প্রাণকেন্দ্র গুলশানের পাঁচ তারকা হোটেল ওয়েস্টিনের কনফারেন্স লাউঞ্জে একটি অনুষ্ঠান ধারণের আয়োজন চলছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিখ্যাত টেলিভিশন ‘কানাআতুল মাজদ’ চ্যানেলের জনপ্রিয় সাক্ষাৎকারধর্মী আয়োজন এটি। মধ্যপ্রাচ্য থেকে টিভি চ্যানেলের একটা বড় গ্রুপ বাংলাদেশে এসেছে। দেশের বরেণ্য ১০ জন মানুষের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করছিলেন তারা। এর মধ্যে ছিলেন শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবী, টিভি আলোচক, বিচারপতিসহ সমাজের নানা প্রান্তের কীর্তিমান মানুষজন। আয়োজনের দ্বিতীয় দিনে রেকর্ডিং সেটে ক্যামেরা আর লাইটের ঝলসানো আলোতে কথা বলছেন একজন সফেদ পোশাকের মানুষ। এই সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়েছেন আরবি সাহিত্যের জগতে তার বিপুল সুখ্যাতি ও সুনামের কারণে। তিনিই আল্লামা সুলতান যওক নদভী।
আল্লামা সুলতান যওক নদভীর ইন্তেকালে বাংলার আকাশ থেকে ইলমি একটি নক্ষত্র হারিয়ে গেল। তার প্রিয় প্রতিষ্ঠান, নিজ হাতে গড়া ইলমি বাগান জামিয়া দারুল মাআরিফের এক মায়াঘেরা কোণে তিনি শুয়ে থাকবেন অনন্তকাল। তার রেখে যাওয়া এ বাগানের ফুল আর পাপড়িদের ইলমি সুবাস তিনি অনুভব করবেন অনন্তকাল পর্যন্ত।
এএডি/