একটা দল প্রায় এক যুগ ধরে খালি হাতে ফিরে আসে, তবু স্বপ্ন দেখা ছাড়ে না। আর সেই দল যখন অবশেষে ঘুরে দাঁড়ায়, তখন গল্পটা শুধু ক্রিকেটের থাকে না- হয়ে ওঠে বিশ্বাস, পরিকল্পনা আর সমষ্টিগত পরিশ্রমের এক অনন্য উদাহরণ। এবার ঠিক এমনটাই ঘটিয়েছে পাঞ্জাব কিংস।
২০০৮ সাল থেকে আইপিএলে অংশ নিলেও পাঞ্জাব কিংস (পূর্ব নাম কিংস ইলেভেন পাঞ্জাব) ছিল চিরকালীন আন্ডারডগ। গত ১৭ মৌসুমের মধ্যে ১৫ বারই উঠতে পারেনি প্লে-অফে। সর্বশেষ ১০ মৌসুম তো যেন দুর্ভাগ্যের প্রতিচ্ছবি। একবারও টপকাতে পারেনি লিগ পর্ব। এক সময় তো ফ্র্যাঞ্চাইজির মালিক প্রীতি জিনতা নামই বদলে ফেললেন, ২০২১ সালে ‘কিংস ইলেভেন’ থেকে হয়ে গেল ‘পাঞ্জাব কিংস’। কিন্তু সেখানেও ছিল শুধু হতাশা।
অবশেষে এলো বদলের হাওয়া। ২০১৪ সালের পর প্রথমবার, আর ১১ বছর পর আবারও প্লে-অফে জায়গা করে নিয়েছে পাঞ্জাব কিংস। শুধু তাই নয়, আইপিএল ২০২৫ -এর পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে থেকেই শেষ করেছে লিগ পর্ব।
পথ বদলের রূপকার পন্টিং
এই রূপান্তরের মূল কারিগর বলা চলে রিকি পন্টিংকে। ফ্র্যাঞ্চাইজির প্রধান কোচ হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই শুরু করেন এক নতুন পরিকল্পনা-‘প্রজেক্ট পাঞ্জাব’। যিনি নিজে খেলোয়াড় ও কোচ হিসেবে জিতেছেন একাধিক ট্রফি। সেই পন্টিংয়ের ভাবনায় এবার দল সাজান প্রীতি জিনতা। আর সে দল গড়তে গেল বছরের মেগা নিলামে সবচেয়ে বেশি অর্থ ১১০ কোটি ৫০ লাখ রুপি নিয়েই মাঠে নামেন তিনি!
আইয়ারে ভরসা, অধিনায়কেই অনুপ্রেরণা
শ্রেয়াস আইয়ারকে ২৬ কোটি ৭৫ লাখ রুপিতে দলে নেওয়াটা অনেকেই হয়তো অবাক হয়ে দেখেছিলেন। কিন্তু এখন বোঝা যাচ্ছে, কেন এই সিদ্ধান্ত। ব্যাট হাতে যেমন ভয়ডরহীন, তেমনি দলের নেতৃত্বেও শান্ত, কৌশলী। নিজের অভিষেক মৌসুমেই করেছেন ৫১৪ রান, যা পাঞ্জাবের মধ্যে সর্বোচ্চ। পাওয়ারপ্লের পরবর্তী সময়ে তার স্ট্রাইক রেট ১৭৮.০৫। যা এই মৌসুমে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।
শুধু রান নয়, তার নেতৃত্বের উদাহরণও তৈরি করেছে দৃষ্টান্ত। যেমন, গুজরাটের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে যখন তিনি ছিলেন ৯৭ রানে, তখনও শেষ ওভারে ব্যাটিংয়ের সুযোগ দিয়ে দেন সতীর্থ শশাঙ্ক সিংকে। নিজের সেঞ্চুরির সুযোগ ছেড়ে দিয়ে দলের স্বার্থে নেওয়া এমন সিদ্ধান্তই তাঁকে অধিনায়ক হিসেবে আলাদা করে তোলে।
আনক্যাপড খেলোয়াড়দের উত্থান
পাঞ্জাব কিংসের এবারের সাফল্যে বড় অবদান রেখেছেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এখনো অভিষেক না হওয়া খেলোয়াড়রাও। ওপেনার প্রিয়াংশ আর্য ও প্রভসিমরান সিং জুটি গড়েছেন ৪৬৭ রান, যা দুই আনক্যাপড ওপেনারের মধ্যে আইপিএল ইতিহাসে সর্বোচ্চ। পাশাপাশি নেহাল ওয়াধেরা ও শশাঙ্ক সিংয়ের মতো তরুণরাও ছিলেন দারুণ কার্যকর।
বোলিং আক্রমণে অর্শদীপ-চাহালের ছাপ
দলের বোলিং আক্রমণের দুই বড় ভরসা অর্শদীপ সিং ও যুজবেন্দ্র চাহাল। দুজনকে পেতে ১৮ কোটি রুপি করে খরচ করে পাঞ্জাব, আর তারা সেই বিনিয়োগের প্রতিদান দিয়েছেন পুরোপুরি। ১৮ উইকেট নিয়ে অর্শদীপ দলটির সেরা বোলার, আর চাহাল নিয়েছেন ১৪ উইকেট, যদিও ইনজুরির কারণে শেষ দুটি ম্যাচে খেলতে পারেননি।
দল থেকে হয়ে ওঠে পরিবার
পাঞ্জাব কিংসের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটা মনোভাবের। এবার তারা শুধু ম্যাচ জেতার জন্য খেলছে না। তারা খেলছে একে অন্যের জন্য। কোনো একক নায়ক নেই, পুরো দলটাই পরিপূর্ণভাবে যেন একেকটা অংশ হয়ে কাজ করছে। এ কারণেই মাঠে প্রতিটি খেলোয়াড়ের চোখেমুখে শিরোপা জয়ের লক্ষ্য স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
শুধু কোয়ালিফাই নয়, এবার চোখ ফাইনালে
আজ রাতে আইপিএলের প্রথম কোয়ালিফায়ারে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর মুখোমুখি হবে পাঞ্জাব কিংস। ম্যাচটি জিতলেই তারা চলে যাবে সরাসরি ফাইনালে। ম্যাচকে সামনে রেখে পন্টিং বলেছেন, ‘এটা কেবল শুরু। আমরা এখনো সন্তুষ্ট নই।’