হজ ইসলামের মৌলিক স্তম্ভ। সামর্থ্যবানদের ওপর হজ করা ফরজ। হজ তিন প্রকার—তামাত্তু, ইফরাদ ও কিরান। বাংলাদেশের অধিকাংশ হাজি তামাত্তু হজ পালন করেন। এটি পালন করা সুবিধাজনক। কষ্টও কম হয়। এক ইহরামে উমরা শেষ করে আরেক ইহরামে মূল হজ করাকে তামাত্তু হজ বলে। তামাত্তু হজ কীভাবে পালন করবেন, এর ধারাবাহিক বিবরণ তুলে ধরা হলো—
কাজ—১ : উমরার ইহরাম (ফরজ)। প্রথমে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা সেরে অজু-গোসল করতে হবে। তারপর ইহরাম পরতে হবে। সরাসরি মক্কায় গেলে পুরুষরা ঘর কিংবা হজক্যাম্প থেকে সেলাইবিহীন একটি সাদা কাপড় পরতে হবে। অন্যটি গায়ে জড়াতে হবে। নারীরা তাদের ইহরামের পোশাক পরে নিতে হবে। পরে ইহরামের নিয়তে দুই রাকাত নামাজ পড়ুন। শুধু উমরার নিয়ত করে এক বা তিনবার তালবিয়া (লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক...) পড়ুন। নিয়তের শব্দ মুখে উচ্চারণ করা জরুরি নয়; অন্তরের ইচ্ছাই যথেষ্ট।
কাজ—২: উমরার তাওয়াফ (ফরজ)। অজুর সঙ্গে ইজতিবাসহ সাতবার কাবাঘর তাওয়াফ করুন। ইহরামের চাদরকে ডান বগলের নিচে রেখে চাদরের দুই মাথাকে বাম কাঁধের সামনে ও পেছনে ফেলে রাখা হলো ইজতিবা। হাজরে আসওয়াদ সামনে রেখে তার বরাবর ডান পাশে দাঁড়িয়ে ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ বলে দুই হাত কাঁধ পর্যন্ত উঠিয়ে তাওয়াফ শুরু করুন। হাজরে আসওয়াদে চুমু দিন বা স্পর্শ করুন, যদি সম্ভব হয়। রুকনে ইয়ামেনি হাত দিয়ে স্পর্শ করুন, যদি সম্ভব হয়। রুকনে ইয়ামেনি থেকে হাজরে আসওয়াদের মাঝখানে
‘রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাও ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাতাও ওয়া কিনা আজাবান্নার, ওয়াদ খিলনাল জান্নাতা মাআল আবরার, ইয়া আজিজু ইয়া গাফফার, ইয়া রাব্বাল আলামিন’ দোয়াটি পড়ুন। হাজরে আসওয়াদ পর্যন্ত এসে চক্কর পুরো করুন। এরপর হাজরে আসওয়াদ বরাবর দাঁড়িয়ে হাত দিয়ে ইশারা করে দ্বিতীয় চক্কর শুরু করুন। এভাবে সাত চক্করে তাওয়াফ শেষ করুন। প্রথম তিন চক্করের সময় পুরুষের জন্য রমল করা সুন্নত। রমল হলো দ্রুতগতিতে বীরদর্পে ঘন ঘন পায়ে চলা। পরের চার চক্কর সাধারণভাবে হেঁটে তাওয়াফ করুন।
কাজ—৩ : দুই রাকাত নামাজ (সুন্নত): তাওয়াফ শেষে মাকামে ইবরাহিমের পেছনে বা হারাম শরিফের যেকোনো জায়গায় (মাকরুহ সময় ছাড়া) দুই রাকাত নামাজ পড়ুন। এটি দোয়া কবুলের জায়গা। নামাজ শেষে দাঁড়িয়ে জমজমের পানি পান করুন।
কাজ—৪ : সাঈ করা (ওয়াজিব): সাফা পাহাড়ের ওপরে উঠে কিবলামুখী হয়ে সাঈর নিয়ত করে হাত তুলে তিনবার তাকবির বলে দোয়া করুন। তারপর সাঈ শুরু করুন। সাফা থেকে মারওয়ার দিকে রওনা হয়ে দুই সবুজ দাগের জায়গাটি দ্রুত অতিক্রম করুন। এভাবে এক চক্কর পূর্ণ হলো। মারওয়া পাহাড়ে ওঠার আগে দোয়া করুন। মারওয়া পাহাড়ের ওপরে উঠে কিবলামুখী হয়ে হাত তুলে দোয়া করুন। এবার সাফায় আসুন। এভাবে সাতটি চক্কর দিলে একটি সাঈ পূর্ণ হয়। সপ্তম চক্কর মারওয়ায় গিয়ে শেষ হবে।
কাজ—৫ : হলক করা (ওয়াজিব)। পুরুষরা মাথা মুণ্ডন করুন। মাথার চুল ছাঁটতেও পারবেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) মাথা মুণ্ডন করতেন। নারীরা চুলের এক ইঞ্চি পরিমাণ কাটুন। এতে ওমরার কাজ সম্পন্ন হবে। এরপর হজের ইহরাম না বাঁধা পর্যন্ত স্বাভাবিক হালাল সব কাজ করা যাবে।
কাজ—৬ : হজের ইহরাম (ফরজ)। হারাম শরিফের যেকোনো স্থান বা নিজ বাসা থেকে আগের নিয়মে শুধু হজের নিয়তে ইহরাম বেঁধে ৮ জিলহজ জোহরের আগে মিনায় পৌঁছে যান।
কাজ—৭ : মিনায় অবস্থান (সুন্নত)। ৮ জিলহজ জোহর থেকে ৯ জিলহজ ফজর পর্যন্ত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মিনায় আদায় করুন এবং সেখানে অবস্থান করুন।
কাজ—৮ : আরাফাতে অবস্থান (ফরজ)। জিলহজের ৯ তারিখ সূর্য হেলার পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আরাফায় অবস্থান করা ফরজ। সে সময় মনোযোগসহকারে হজের খুতবা শুনুন। তাঁবুতে অবস্থানকারীরা জোহর ও আসর নামাজ মুকিম হলে চার রাকাত এবং মুসাফির হলে দুই রাকাত করে আদায় করুন। মসজিদে নামিরায় উভয় নামাজ জামাতে পড়লে একসঙ্গে পড়ুন। সূর্যাস্তের পর মাগরিব না পড়েই মুজদালিফার দিকে রওনা হোন।
কাজ—৯ : মুজদালিফায় অবস্থান (ওয়াজিব)। আরাফা থেকে সূর্যাস্তের পর মুজদালিফায় গিয়ে এশার সময় মাগরিব ও এশা এক আজানে এবং এক ইকামাতে একসঙ্গে আদায় করুন। (মাগরিবের ওয়াক্ত চলে গেলেও, রাত গভীর হলেও মুজদালিফায় পৌঁছেই মাগরিব ও এশা পড়তে হবে)। এখানেই রাতযাপন করুন, এটি সুন্নত। ১০ জিলহজ ফজরের নামাজের পর সূর্যোদয়ের আগে কিছু সময় মুজদালিফায় অবস্থান করা ওয়াজিব। সূর্য ওঠার আগে মুজদালিফা থেকে মিনার উদ্দেশে রওয়ানা হতে হবে। সম্ভব হলে রাতে ৭০টি ছোট ছোট পাথর সংগ্রহ করুন। মিনায় যাওয়ার পথেও সংগ্রহ করতে পারবেন।
কাজ—১০ : পাথর নিক্ষেপ (১০ জিলহজ, ওয়াজিব)। মিনায় পৌঁছে বড় জামারাকে (বড় শয়তান) সাতটি পাথর নিক্ষেপ করা ওয়াজিব। ১০ তারিখ সুবহে সাদিকের পর থেকে পর দিন সুবহে সাদিকের আগে যেকোনো সময় পাথর নিক্ষেপ করা যাবে। দুর্বল ও নারীরা রাতে এ কাজটি করতে পারেন।
কাজ—১১ : কোরবানি করা (ওয়াজিব)। ১০ জিলহজ পাথর মারার পরই সঠিকভাবে কোরবানি করুন। কোরবানির পর মাথা মুণ্ডন বা মাথার চুল ছাঁটা ওয়াজিব। নারীরা এক ইঞ্চি পরিমাণ চুল কাটুন। পাথর মারা, কোরবানি করা ও চুল কাটার মধ্যে ধারাবাহিকতা রক্ষা করা জরুরি। ব্যতিক্রম বা ভুল হলে দম বা কোরবানি দিতে হবে।
কাজ—১২ : তাওয়াফে জিয়ারত (ফরজ)। ১২ জিলহজ সূর্যাস্তের আগেই তাওয়াফে জিয়ারত করতে হবে। ১২ তারিখের পর তাওয়াফে জিয়ারত আদায় করলে দম বা কোরবানি দিতে হবে। নারীরা প্রাকৃতিক কারণে না করতে পারলে পবিত্র হওয়ার পর করবেন।
কাজ—১৩ : সাঈ (ওয়াজিব)। তাওয়াফ শেষে সাফা-মারওয়ায় গিয়ে সাঈ করুন। সাফা থেকে শুরু হয়ে মারওয়ায় গিয়ে সাঈ শেষ হয়। সাফা পাহাড়ের ওপরে উঠে কিবলামুখী হয়ে সাঈর নিয়ত করে সাঈ শুরু করুন। সাফা থেকে মারওয়ার দিকে রওনা হয়ে দুই সবুজ দাগের জায়গাটি দ্রুত অতিক্রম করুন। এভাবে এক চক্কর পূর্ণ হলো। মারওয়া পাহাড়ে ওঠার আগে দোয়া করুন। মারওয়া থেকে সাফায় আসুন। এভাবে সাতটি চক্কর দিলে একটি সাঈ পূর্ণ হয়। সপ্তম চক্কর মারওয়ায় গিয়ে শেষ হবে।
কাজ—১৪: পাথর নিক্ষেপ (ওয়াজিব)। ১১ ও ১২ জিলহজ প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় জামারায় (ছোট, মধ্যম ও বড় শয়তান) সাতটি করে ২১টি পাথর নিক্ষেপ করা ওয়াজিব। ছোট জামারা থেকে শুরু করে বড় জামারায় তা শেষ করুন। এ দুই দিন দুপুর থেকে পাথর নিক্ষেপের সময় শুরু। পরদিন সুবহে সাদিকের আগ পর্যন্ত যেকোনো সময় পাথর নিক্ষেপ করা যাবে। সূর্যাস্তের আগে হলে ভালো। রাতেও করা যাবে। দুর্বল ও নারীরা নিরাপদ সময়ে নিক্ষেপের জন্য বেছে নিতে পারেন।
কাজ—১৫ : মিনায় রাতযাপন ও মিনা ত্যাগ। ১০-১১ জিলহজ মিনাতেই রাতযাপন করুন। ১৩ জিলহজ মিনায় না থাকতে চাইলে ১২ জিলহজ সন্ধ্যার আগে মিনা ত্যাগ করুন। ১৩ তারিখ সুবহে সাদিকের পর মিনায় অবস্থান করলে তার জন্য ১৩ তারিখেও পাথর নিক্ষেপ করা সুন্নত। ১২ তারিখের পর একজন হাজি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারবেন।
কাজ—১৬ : বিদায়ী তাওয়াফ (ওয়াজিব)। বাংলাদেশি হজযাত্রীদের হজ শেষে বিদায়ী তাওয়াফ করতে হয়, এটি ওয়াজিব।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক