উন্নত চিকিৎসায় বিএনপি চেয়ারপরসন খালেদা জিয়াকে যুক্তরাজ্যে নেওয়া হচ্ছে। তাকে বহনকারী কাতার এয়ার অ্যাম্বুলেন্সটি শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টার পর ঢাকা ত্যাগ করার কথা। খালেদা জিয়াকে রাজধানীর এভারকেয়ার থেকে অ্যাম্বুলেন্সযোগে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নেওয়া হবে। তাকে ভর্তি করা হবে অত্যাধুনিক লন্ডন ব্রিজ হাসপাতালে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ডের একজন সদস্য সময়ের আলোকে এসব তথ্য জানান।
তিনি বলেন, ম্যাডাম আগের চেয়ে কিছুটা ভালো। তাকে ঘুমের ওষুধ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে। সবচেয়ে ভালো লক্ষণ হলো- তার চেস্ট (বুক) পরিষ্কার হচ্ছে। নিউমোনিয়োয় আক্রান্ত হওয়ায় যেখানে কফ জমে ছিল। বৃহস্পতিবার ম্যাডামের স্বাস্থ্যের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়েছে। যেখানে প্যারামিটারগুলো ভালোর দিকে যাচ্ছে। মেডিকেল বোর্ড এতে স্বস্তি প্রকাশ করেছে।
তিনি জানান, প্রথমে সিঙ্গাপুর নেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু সেখানে মাল্টিপুল ডিসপেন্সারি সেন্টার অত্যাধুনিক না হওয়ায় লন্ডনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। আর চীন থেকে আগত চিকিৎসক দল ম্যাডামকে তাদের দেশে নিতে জোর আগ্রহ দেখিয়েছিল। সবশেষ মেডিকেল বোর্ড লন্ডন ব্রিজ হাসপাতাল চূড়ান্ত করে।
খালেদা জিয়াকে নিতে পুত্রবধূ ডা. জুবাইদা রহমান দেশে ফিরবেন কি না? জবাবে বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য আতিকুর রহমান রুমন সময়ের আলোকে বলেন, শুক্রবার সকাল সাড়ে নয়টায় জুবাইদা রহমান শাহজালাল বিমানবন্দরে নামবেন। তাকে আমরা রিসিভ করব। অসুস্থ শাশুড়িকে (খালেদা জিয়া) সঙ্গে নিয়ে তিনি আবার লন্ডনে ফিরবেন।
তারেক রহমানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন জানান, এই চিকিৎসা-প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন ডা. জুবাইদা রহমান, যিনি লন্ডন থেকে সার্বিক সমন্বয় করে যাচ্ছেন। তিনি শুক্রবার সকালে ঢাকা পৌঁছানোর চেষ্টা করবেন, যেন খালেদা জিয়াকে লন্ডন নিয়ে যেতে পারেন। তবে তার আগেই যদি ফ্লাইট ব্যবস্থা করা যায় কিংবা তার আসা না হয়, সেই বিবেচনায় লন্ডনের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রিচার্ড বিলি ইতিমধ্যে ঢাকায় এসেছেন।
বিএনপি চেয়ারপারসনের সহকারী ব্যক্তিগত সচিব মো. মাসুদুর রহমান বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সময়ের আলোকে বলেন, আলহামদুলিল্লাহ ম্যাডাম আগের চেয়ে ভালো আছেন। তিনি সাড়া দিচ্ছেন। সবাই দোয়া রাখবেন। আমরা লন্ডনে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি।
এদিকে বৃহস্পতিবার দুপুরে এভারকেয়ার হাসপাতালের বাইরে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে বিএনপি চেয়ারপারসনের ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেন জানান, যদি সবকিছু ঠিক থাকে, আমরা কাতার রয়্যাল এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের মাধ্যমে খালেদা জিয়াকে শুক্রবার সকালের ভেতর লন্ডনে নিয়ে যাব।
যাত্রাপথে যাতে কোনো ধরনের সমস্যা না হয়, সেজন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়ার কথা জানিয়ে খালেদা জিয়ার জন্য দেশবাসীর দোয়া চান বিএনপি নেতা জাহিদ। তিনি বলেন, খালেদা জিয়াকে বিদেশে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হলে চীনও এয়ার অ্যাম্বুলেন্স পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছিল, কিন্তু সেক্ষেত্রে জ্বালানি নিতে মাঝে কোথাও নামতে হতো, সরাসরি লন্ডনে যাওয়ার সুযোগ ছিল না। সব বিবেচনা করে খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান কাতারের আমিরের এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের পক্ষেই মত দেন।
কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করেই চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি চিকিৎসার জন্য লন্ডনে গিয়েছিলেন খালেদা জিয়া। সেখানে লন্ডন ক্লিনিকে ভর্তি রেখে কিছুদিন তার চিকিৎসা চলে। পরিস্থিতির উন্নতি হলে কিছুদিন লন্ডনে তারেকের বাসায় থেকে চিকিৎসা নেন। অনেকটা সুস্থ হয়ে গত ৬ মে একই এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে তিনি দেশে ফিরেছিলেন।
৭৯ বছর বয়সী সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দীর্ঘ দিন থেকে আর্থরাইটিস, ডায়াবেটিসের পাশাপাশি কিডনি, লিভার, ফুসফুস, হৃদযন্ত্র, চোখের সমস্যাসহ নানা জটিলতায় ভুগছেন।
গত ২৩ নভেম্বর রাতে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য খালেদা জিয়াকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু ফুসফুসে সংক্রমণ ধরা পড়ায় তাকে ভর্তি করে নেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাকে নেওয়া হয় ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটে।
হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শাহাবুদ্দিন তালুকদারের নেতৃত্বে এভারকেয়ার হাসপাতালের ১২ সদস্যের একটি মেডিকেল বোর্ড খালেদা জিয়ার চিকিৎসার তদারক করছিলেন। চীন ও যুক্তরাজ্য থেকেও কয়েকজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক গত কয়েক দিনে দেশে আসেন চিকিৎসা সহায়তা দেওয়ার জন্য।
বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টায় এভারকেয়ার হাসপাতালে বৈঠকে বসে খালেদা জিয়ার মেডিকেল বোর্ড। যুক্তরাজ্য ও চীন থেকে আসা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরাও বৈঠকে অংশ নেন। বৈঠক শেষে বেলা ২টা ৪০ মিনিটে এভারকেয়ারের সামনে সংবাদ সম্মেলনে আসেন ডা. জাহিদ হোসেন। তিনি জানান, খালেদা জিয়ার পরিস্থিতি আগের থেকে উন্নতি হয়েছে। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া, উনার নামের আগে আমরা সবাই আপসহীন বলি। আল্লাহর অশেষ মেহেরবানিতে উনি অনেক প্রতিকূলতার মাঝেও ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। এবারও ইনশাল্লাহ উনি আমাদের মাঝে ফেরত আসবেন, এ আশাবাদ ব্যক্ত করছি।
খালেদা জিয়ার সঙ্গী যারা
জানা গেছে, খালেদা জিয়ার সঙ্গে যুক্তরাজ্যে যাবেন ১৪ জন। তারা হলেন, খালেদা জিয়ার পুত্রবধূ সৈয়দা শামিলা রহমান, ব্যক্তিগত চিকিৎসক এজেডএম (আবু জাফর মো.) জাহিদ হোসেন, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ড. মোহাম্মদ এনামুল হক চৌধুরী, চিকিৎসক ফখরুদ্দিন মোহাম্মদ সিদ্দিকী, চিকিৎসক মো. শাহাবুদ্দিন তালুকদার, যুক্তরাজ্যের চিকিৎসক রিচার্ড জন বিলি, চিকিৎসক নূরউদ্দিন আহমদ, চিকিৎসক জিয়াউল হক (আইসিইউ ইনচার্জ), ডা. মো. জাফর ইকবাল (আইসিইউ কনসালটেন্ট), চিকিৎসক মোহাম্মদ আল মামুন, স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের (এসএসএফ) হাসান শাহরিয়ার ইকবাল, স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের সৈয়দ সামিন মাহফুজ, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সহকারী মো. আবদুল হাই মল্লিক, সহকারী ব্যক্তিগত সচিব মো. মাসুদুর রহমান, গৃহপরিচারিকা ফাতেমা বেগম ও ব্যক্তিগত স্টাফ রুপা শিকদার।
শুক্রবার সারাদেশে দোয়া
খালেদা জিয়ার আশু আরোগ্য কামনায় শুক্রবার সারাদেশে মসজিদে মসজিদে দোয়া এবং অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ে প্রার্থনা সভা করবে বিএনপি। বৃহস্পতিবার সকালে নয়া পল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এই কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার আশু সুস্থতা কামনায় আগামীকাল শুক্রবার প্রতিটি মসজিদে দোয়া মাহফিল, মন্দির এবং অন্যান্য ধর্ম সম্প্রদায়ের উপাসনালয়ে প্রার্থনা সভা হবে। প্রতিটি মসজিদে মসজিদে দোয়া ও বিশেষ মোনাজাত হবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও খালেদা জিয়ার আশু রোগমুক্তি কামনা করে শুক্রবার জুমার পর দেশের সব মসজিদে দোয়ার আহ্বান জানিয়েছে। বৃহস্পতিবার প্রধান উপদেষ্টার দফতরের এক বিজ্ঞপ্তিতে মন্দির, গির্জা ও প্যাগোডাসহ অন্যান্য ধর্মের উপাসনালয়েও সংশ্লিষ্ট ধর্মের রীতি ও আচার অনুযায়ী প্রার্থনার আহ্বান জানানো হয়।